বিশ্বব্যাংক থাকলে কপালে দুঃখ ছিল! by অজয় দাশগুপ্ত

না জানি কপালে আরও কত দুঃখ আছে_ এক জেলে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে জালে পেয়েছিল একটি মানুষের মাথার খুলি, যার কপালের দিকে লেখা ছিল এ বাক্যটি। জেলে সহজ বুদ্ধিতেই বুঝল যে, লোকটির স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। তাকে কেউ মাটি দেয়নি কিংবা সৎকার করেনি। এটাই তো বড় দুঃখের। মানুষের জন্য এর চেয়ে বেশি আর কী দুঃখ হতে পারে? এই ভেবে জেলে খুলিটা বাড়ি নিয়ে গেল এবং ঘরের এক কোণে যত্ন করে রেখে চলে গেল স্নানে। তার স্ত্রী খুলিটি দেখে সন্দেহ করল এই ভেবে যে, এটি নিশ্চয়ই স্বামীর প্রাক্তন প্রেমিকার হবে। নইলে এত যত্ন করে ঘরে কেন রাখল? ক্ষোভে, ক্রোধে সে খুলিটি ঢেঁকিতে গুঁড়ো করে ফেলে দিল ময়লা ফেলার স্থানে। জেলে স্নান সেরে এসে খুলিটি যথাস্থানে না দেখে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে সবকিছু জানল এবং স্বগতোক্তির মতো বলল, খুলিতে ঠিকই লেখা ছিল_ কপালে আরও কত দুঃখ আছে!
বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে ঋণদানের চুক্তি করেও সরে গেছে_ এ ঘটনাটিকে দুঃখজনক আখ্যায়িত করেও একজন বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করলেন, আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী এ প্রতিষ্ঠানটি সেতুর কাজে যুক্ত থাকলে বাংলাদেশের কপালে আরও দুঃখ ছিল। যে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় বিনা সুদে বাংলাদেশকে ১২০ কোটি ডলার ঋণ দিতে চেয়েছিল তারা থাকলে বাংলাদেশের কপালে দুঃখ ছিল, এটা কেমন কথা? এ প্রশ্ন তাকে করি। তিনি যমুনায় নির্মিত বঙ্গবন্ধু নির্মাণ কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং এ সুবাদে এ তথ্যও জানালেন যে, বিশ্বব্যাংক এ কাজে যুক্ত থাকায় ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল। কাজের মান নিয়েও তারা তদারকি করেছে দক্ষতা ও যত্নের সঙ্গে। কখন কী কাজ করতে হবে ও কোন কাজ আগে এবং কোনটি পরে সে বিষয়েও তাদের বিবেচনা থাকে। এসব ভালো দিক। কিন্তু তারপরও কেন বলছেন_ বিশ্বব্যাংক থাকলে দুঃখ ছিল কপালে? এ প্রশ্নে তিনি একটি ঘটনার উল্লেখ করেন এভাবে_ পদ্মা সেতুর ইস্পাত পিলার স্থাপন হবে এমন একটি চর এলাকায়, যেখানে নদীর কচ্ছপ ডিম পারে। বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা নির্ঘাত এতে আপত্তি তুলতেন এবং ডিজাইন বদলাতে চাপ দিতেন। এর ফলে কাজে বিলম্ব ঘটত।
শেখ হাসিনার সরকার চাইছে ২০১৮ সালের মধ্যে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দিতে। এখন ঢাকার দিকে লৌহজং এবং অপর তীরে মাদারীপুরের শিবচর এলাকায় গেলে দেখা যাবে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। তবে বিশ্বব্যাংক সেতুতে টাকা জোগানো থেকে সরে যাওয়ায় কাজের ধারায় কিছুটা ওলটপালট হয়েছে_ কিছু ক্ষেত্রে আগের কাজ পরে এবং পরের কাজ আগে। সেতুতে কয়েক ধরনের কাজ হবে। যেমন, সেতু তৈরি। নদীশাসন। পূর্ব ও পশ্চিম তীরের সড়ক। সেতু নির্মাণ এবং অন্য কাজে যুক্তদের বাসস্থান। সেতু নির্মাণ এবং নদীশাসনের কাজ পেয়েছে চীনের দুটি কোম্পানি। এর আগে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান সেতু নির্মাণের কাজটি করতে চেয়েছিল। এজন্য তারা বাংলাদেশের ভেতরে শক্ত লবিস্টও নিয়োগ করেছিল। শোনা যায়, মন্ত্রীদের মধ্যেও কেউ কেউ চাইছিলেন মালয়েশিয়াকে কাজটি দিতে। কিন্তু যারা যথেষ্ট যুক্তি দিয়ে তাদের কাজটি প্রদান না করার কথা বলেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার এবং নদীশাসনের ব্যয় ১২০ কোটি ডলার। এ দুটি খাতেই বেশি ব্যয় পড়বে। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণে ব্যয় পড়েছিল সব মিলিয়ে ১০০ কোটি ডলারের মতো। পদ্মা সেতুর অর্থের জোগান আসবে সরকারের তহবিল থেকে। বাংলাদেশের জনগণের কাছে এ মহতী উদ্যোগে উদার হাতে অর্থ প্রদানের আহ্বান জানানো হয়েছিল। এজন্য ব্যাংকে বিশেষ অ্যাকাউন্টও খোলা হয়েছিল। কিন্তু কেন সাড়া মিলল না, সেটা কি সরকারের নীতিনির্ধারকরা আলোচনা করেছেন? আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের কোনো সভাতেও কি প্রসঙ্গটি উঠেছে?
এ ধরনের বড় অর্থনৈতিক প্রকল্পের কাজে যুক্ত ছিলেন এমন কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, যে কোনো আন্তর্জাতিক টেন্ডারে বেশিরভাগ আইন ঠিকাদারের স্বার্থের অনুকূলে। ঠিকাদার চাইবে ব্যয় যত পারা যায় বাড়িয়ে নিতে। অপরদিকে মালিক পক্ষ (এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার) চাইবে ব্যয় কমিয়ে রাখতে এবং মান ঠিক রাখতে। সময়মতো কাজ শেষ হলো কি-না এবং কাজের মান ঠিক থাকল কি-না, সেটা ঠিকাদারের রেপুটেশনের জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মুনাফা। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ রোড চওড়া করার কথা বলেন তারা। এ দুটি কাজ বিলম্বিত হচ্ছে এবং তার একটি বড় কারণ, জমি হুকুমদখলের কাজ সময়মতো না হওয়া। এ দায়িত্ব সরকারের। ঠিকাদার এজন্য সরকারকে তাগিদ দেবেন না। কারণ সরকারের যা করার সেটা সময়মতো করা না হলে এ যুক্তি দেখিয়ে তারা বিল বাড়িয়ে নিতে চাপ দেবে। বড় বড় প্রকল্পে মালিক এবং ঠিকাদারের মাঝে থাকে ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট। তাদের কাজ হচ্ছে মালিকের স্বার্থ দেখা। কখন কোন কাজটি করা দরকার, সময়মতো কাজ হচ্ছে কি-না, ঠিকাদার ঠিকভাবে মালমসলা দিচ্ছেন কি-না, ডিজাইন অনুসরণ করায় কোনো ঘাটতি আছে কি-না_ এসব তারা দেখে থাকে এবং মালিককে সতর্ক করে থাকে। ছয় মাস কিংবা এমনকি আরও পরে কী ধরনের কাজে হাত দিতে হবে সে বিষয়েও তার অনুমান ক্ষমতা থাকা চাই। যমুনা সেতুর কাজে যুক্ত ছিলেন এমন একাধিক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, সে সময়ে যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দেশীয় বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শদাতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের মতামত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতেন। সচিব মোহাম্মদ আলীও কাজ ভালো বুঝতেন। পদ্মা সেতু নির্মাণে আমাদের মুখ পোড়াতে চেয়েছিল বিশ্বব্যাংক। এখন যাতে ভালোয় ভালোয় সব কাজ শেষ করা যায়, সেজন্য চাই সব মহলের সর্বোচ্চ তৎপরতা। আমরা ইতিমধ্যে দুই বছর পিছিয়ে পড়েছি। আর বিলম্ব কাম্য নয়। বিশ্বব্যাংক যুক্ত থাকলে পরিবেশ কিংবা সামাজিক ইস্যু তুলে কারণে-অকারণে বা তুচ্ছ কারণে বাগড়া দিত। এর ফলে কাজে বিলম্ব ঘটত। এখন সে সমস্যা নেই। কিন্তু আমাদের ভেতরেও যে এত বড় একটি প্রকল্প থেকে নিজের বা গোষ্ঠীর ফায়দা লোটার জন্য তৎপর শক্তি নেই, সেটা কি নিশ্চিত করে বলা যায়?
বাংলাদেশের জন্য পানি খুব মূল্যবান। একাধিক হিসাবে দেখা গেছে, সড়কপথে প্রতি কিলোমিটার পণ্য পরিবহনে ব্যয় পড়ে ৬ টাকা ৫০ পয়সা। ট্রেনে এ ব্যয় অনেক কম_ ২ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু নদীপথে এ ব্যয় আরও কম_ মাত্র ৯০ পয়সা। রাজধানী ঢাকার অদূরে পানগাঁও থেকে নৌপথে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার আনা-নেওয়ার উদ্যোগ এ কারণেই। পানগাঁওয়ে টার্মিনাল নির্মিত হলেও এর ব্যবহার এখন পর্যন্ত কম। হরতাল-অবরোধেও নৌপথ অনেকটা নির্বিঘ্ন। আমাদের সংশ্লিষ্ট মহল কেন এ পথের প্রতি তেমন মনোযোগী নয়, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। পদ্মায় সেতু নির্মিত হলেও নদীপথের গুরুত্ব তাই কমবে না। এ নদীপথকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। শুধু পদ্মা নদী নয়, অন্যান্য নদীর নিয়মিত ড্রেজিংয়ের প্রতিও মনোযোগ থাকা চাই। একাধিক পানি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বাংলাদেশে এ কাজে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। একজন পানি বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এলজিইডির (স্থানীয় সরকারের প্রকৌশল বিভাগ) কাজের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। যেখানে ৫০০ ফুট সেতু দরকার, সেখানে ২০০ ফুট সেতু বানাচ্ছে। অনেক স্থানে নদীতীর সংকুচিত হয়ে ছোট হয়ে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে হাজির হয়ে যাচ্ছে দখলদাররা। নদীপথে পণ্য পরিবহন বাড়াতে হলে এ বিষয়ে মনোযোগ বাড়াতেই হবে। আমাদের অর্থনীতির স্বার্থেই চাই নদীপথের আরও বেশি বেশি ব্যবহার। গোটা বাংলাদেশ অভিন্ন সড়ক নেটওয়ার্কে এসে পড়েছে, পদ্মায় সেতুটি নির্মিত হলে সড়কপথে মহাকালের বাধা প্রায় দূর হয়ে যাবে। ঢাকা থেকে বরিশাল, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা, যশোর, খুলনা প্রভৃতি জেলায় যাতায়াত মনে হবে খুব সহজ। কিন্তু নদীকে যেন আমরা না ভুলি। নদীর সর্বনাশ যেন আর না করি। যে নদীর প্রতি যেমন শাসন দরকার, সেটাই যেন করা হয়।
পদ্মা সেতুতে অর্থের জোগান দেবে সরকার। ঠিকাদার ও কনসালট্যান্টদের অর্থের জোগান সময়মতো দেওয়া না গেলে কাজের গতি মন্থর হবে। সরকারের সঙ্গে ঠিকাদারের কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য হলে তার নিরসন দ্রুত হওয়া চাই। এ নিয়ে ঠিকাদারের কোনো আগ্রহ থাকবে না। তাদের পলিসি হবে_ যত দেরি, তত লাভ। সরকারের হাতে এখন অনেক মেগা প্রকল্প_ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রায় তৃতীয় সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাজধানী মেট্রোরেল, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প প্রভৃতি। আমাদের অর্থনীতির ভিত মজবুত করার জন্য এর প্রতিটিই জরুরি। কিন্তু সামর্থ্য সীমিত। পদ্মা সেতুর কাজ ইতিমধ্যে যথেষ্ট এগিয়েছে। বিশ্বব্যাংক যেখানে সরে গেছে, সেটা কি বাংলাদেশ সম্পন্ন করতে পারবে, এমন শঙ্কা অনেকের মনে কাজ করেছে। বাংলাদেশে চার দশক ধরে বিশ্বব্যাংক সক্রিয়। আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে, বিশেষ করে অর্থনীতিবিদ ও আমলাদের মধ্যে একটি অংশ রয়েছেন যারা মনে করেন_ বিশ্বব্যাংক ছাড়া গতি নেই। একটা সময় ছিল যখন বলা হতো, বাংলাদেশের সব পরিকল্পনা প্রণয়ন করে দেয় বিশ্বব্যাংক। এমনকি প্রতি দম্পতি কতটি সন্তান নেবে, সে ব্যাপারেও বিশ্বব্যাংকই শেষ কথা বলে দেয়। পদ্মা সেতু প্রশ্নে বিশ্বব্যাংক যখন দুর্নীতির অভিযোগ তুলল, তখন অনেকেই সেটা এমনকি বিন্দুমাত্র যাচাই-বাছাই না করে রায় দিয়ে বসেছেন_ যা বলছে, সব ঠিক। আমাদের 'চোর' বলে অপবাদ দিয়েছে এবং সেটার প্রমাণ আসার আগেই বলে দিয়েছেন কেউ কেউ_ বিশ্বব্যাংক ঠিক এবং বাংলাদেশ সরকার ভুল। এখন সরকার নিজের অর্থে সেতুটি নির্মাণের ঝুঁকি নিয়েছে। এ চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে পারলে সব মেগা প্রকল্পই আমরা বাস্তবায়ন করতে পারব। আশা করব, সরকার সময়ের কাজ সময়ে করবে। অগ্রাধিকার ঠিক করবে। একই সঙ্গে দুর্নীতির প্রশ্নে গ্রহণ করবে জিরো টলারেন্স।
সেতু এবং নদীশাসনের কাজে যুক্ত রয়েছে চীন। ঠিকাদারদের যোগ্যতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলছে না। বিশ্বব্যাংকের খবরদারি না থাকায় তাদের বাছাইয়ের কাজ অনেক সহজে হয়ে গেছে। এ সেতুটি নির্মাণ হলে চীনের মানমর্যাদা এ অঞ্চলে বাড়বে। আবার এ সেতুর কারণে বিশেষভাবে উপকৃত হবে ভারত, নেপাল ও ভুটান। ভারতের অর্থনীতি যেহেতু বড়, তাদের লাভটাও হবে বেশি। তারা চাইবে সেতুটি নির্বিঘ্নে নির্মিত হোক। এ সেতুর সুবিধা কাজে লাগিয়ে ভারতের আসাম এলাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যুৎ পেঁৗছানো যাবে। সেতুর ডিজাইন প্রণয়নে এ বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সেতুর রেললাইনও তাদের সাহায্য করবে। আমাদের এই আন্তর্জাতিক সুবিধা কাজে লাগাতে হবে। এজন্য কূটনীতির অঙ্গনে তৎপরতা ঠিকঠাক হওয়া চাই। বিশ্ববাজারে এখন তেলের দাম কমেছে। তেলের দাম কম থাকায় ইস্পাতের দাম কম। আর এ সেতুতে চাই বিপুল পরিমাণ ইস্পাত। এ ধরনের আরও সুবিধা বর্তমান বিশ্ববাজারে মিলবে। কিন্তু সময়মতো কাজ শেষ না হলে এ সুবিধা আমরা হারাব। তাতে সেতু নির্মাণের ব্যয় বাড়বে এবং বিশ্বব্যাংকের সমর্থকরাও হয়তো বিজ্ঞের হাসি দিয়ে বলবেন_ দেখলে তো!
সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.