প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা-মন্তব্য হাইকোর্ট রায়ের চেতনাবিরোধী by মিজানুর রহমান খান

যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। এটা শুনে অনেকের মনে আবারও হয়তো প্রশ্ন জাগবে, আপিলে তা হ্রাস পেলে কিংবা অন্য যাঁরা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মতো ‘আজীবন কারাদণ্ড’ পেয়েছেন বা পেতে পারেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রপতিরা কী করবেন? পুরোনো প্রশ্ন নতুনই থাকছে: সরকার বদলে গেলে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীরা পার পেয়ে যাবে না তো? আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক এ বিষয়ে একটি আশাবাদ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভবিষ্যৎ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না এলে যাতে অন্য সরকার তাঁদের ছেড়ে না দিতে পারে, সে জন্য সংবিধান সংশোধনের কথা ভাবা হচ্ছে। কিন্তু এই বক্তব্য যে দ্রুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উড়িয়ে দেবেন, সেটা ভাবিনি। তবে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, গত অক্টোবরে এক সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা বিষয়ে তিনি যে বক্তব্য দেন, তাতে আমাদের মনে হয়েছে, তিনি প্রচলিত আইনে সাধারণ অপরাধীদের ক্ষমার যে বিধান, তাতে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না মর্মে মত দিয়েছেন। ৪৯ অনুচ্ছেদের আওতায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিধান থাকবে কি থাকবে না? প্রধানমন্ত্রী যদি সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকেন, তাহলে তার সঙ্গে দ্বিমত করব না। ক্ষমতার অপব্যবহারের অনেক বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নির্বাহী বিভাগের কাছে নিশ্চয় এই ক্ষমতা থাকতে হবে।

কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির কাছে এ ধরনের কিছু ক্ষমতা থাকতে হবে।’ এতে মনে হতে পারে সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে আর তার মধ্যে ক্ষমার ক্ষমতা অন্যতম। এটা সত্য নয়। বাংলাদেশ সংবিধান প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীনভাবে অন্য কোনো দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়নি। বরং প্রধানমন্ত্রী একটি অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করতে পারতেন যে সংবিধানে নির্দিষ্ট করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ লাগবে না, সংবিধানে এটি থাকার পরও প্রধানমন্ত্রীরা তা পদ্ধতিগতভাবে অমান্য করে চলেছেন। এবং আলোচিত জিন্টু এবং তাহেরপুত্রের মতো বহু দণ্ডিত অপরাধীর সাজা মওকুফ করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীরা যেরূপ পরামর্শ দেন, রাষ্ট্রপতিরা তা বিনা বাক্যব্যয়ে সাধারণত তামিল করে থাকেন। কখনো কোনো রাষ্ট্রপতি এ-সংক্রান্ত নথি ফেরত পাঠিয়েছিলেন কি না, তা আমরা জানতে পারি না।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সংবিধান যাকে যেভাবেই ক্ষমতা দিক না কেন, তা কোনো অবস্থাতেই স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্গে জনকল্যাণের প্রশ্ন অগ্রাহ্য করে প্রয়োগ করতে পারে না। সেটা এখতিয়াবহির্ভূত। ৪৯ অনুচ্ছেদটির দিকে এ পর্যন্ত বিশেষভাবে নজর দিয়েছেন সম্প্রতি মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদানকারী ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। তিনি হাইকোর্ট বিভাগে থাকাকালে ২০১২ সালের ২৫ এপ্রিল সারওয়ার কামাল বনাম রাষ্ট্র মামলায় ৪৯ অনুচ্ছেদ প্রয়োগে ভারতীয় নজির বিবেচনায় একটি গাইডলাইন বা বিধি প্রস্তুত এবং সিআরপিসি সংশোধনের দিকে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তিনি রায়ের কপি রাষ্ট্রপতির সচিব এবং আইন ও বিচারসচিবকে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। এবং নিশ্চয় সেটা খামোখা নয়। এরপর দুই বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। কিন্তু আদালতের এই নির্দেশনার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের কোনো প্রতিক্রিয়া জানা গেল না। অবশ্য আমরা রুটিন যুক্তি শুনতে পারি, ওই রায় তো চূড়ান্ত নয়। আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। তবে কেবল এই যুক্তিতে সরকার গাইডলাইনের মাধ্যমে ৪৯ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা অনুশীলনের যৌক্তিকতা দূরে ঠেলতে পারে না।
ওই রায়ে উল্লেখ করা হয়, ক্ষমার ক্ষমতা অনুশীলনে কোনো বিধি বা ‘স্ট্যান্ডার্ড গাইডলাইন’ নেই। সে কারণে আমরা মনে করি, ‘প্রতিবেশী একটি দেশ যেভাবে করেছে সেভাবে এ বিষয়ে ন্যায্য, যথাযথ ও খাঁটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকার বিধি-গাইডলাইন কিংবা সিআরপিসি সংশোধন করতে পারে।’ এরপর হাইকোর্ট বিভাগ অত্যন্ত যুক্তিসংগত মন্তব্য করেন যে ‘সম্ভবত ক্ষমার ক্ষমতা প্রয়োগবিষয়ক সমালোচনা এবং ক্ষমা করার ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এড়াতে চিন্তাভাবনা করার এখনই হাইটাইম।’
এখানে দুটি বিষয়। যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়েও ৪৯ অনুচ্ছেদের ক্ষমতার অপপ্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার দাবি রাখে। প্রতিবছর কত লোক কে কীভাবে সুবিধা পাচ্ছে বা দরখাস্ত করেও প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে, সেই বিষয়ে আমরা অন্ধকারে আছি। সেই বিচারে প্রধানমন্ত্রী ৪৯ অনুচ্ছেদের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, তা হাইকোর্টের ওই রায়ের চেতনাবিরোধী। শেখ হাসিনা সরকারের (১৯৯৬-২০০১) সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম তাঁর কন্সটিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ বইয়ে আওয়ামী লীগের বর্তমান সরকারের দ্বারা ৪৯ অনুচ্ছেদ অপপ্রয়োগের কঠোর সমালোচনা করেছেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ২০১২ সালের ১৪ নভেম্বর সংসদে এক প্রশ্নোত্তরে বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান তিন বছরে (২০০৯-২০১২) মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২১ জনকে ক্ষমা করেছিলেন। এর মধ্যে ২০১০ সালেই ১৮ জনকে ক্ষমা করা হয়। ১৯৭২ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ৩৬ বছরে মাত্র চারজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়েছিলেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে তথ্য প্রকাশ করেছিলেন কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা দেননি। সুতরাং ক্ষমা বিষয়ে আমাদের রাষ্ট্রপতিদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার কোনো উপায় নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ অক্টোবর যুক্তি দিয়েছেন, ‘এটা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা। এটা থাকতে পারে। আমরা (সরকার) দেশ চালাই। নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপতি কিছু ক্ষমতা রাখতে পারেন’ (বিডিনিউজ২৪)। প্রশ্ন হলো, সরকার চালানোর মানে কী? সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ যুক্তি দেন, সামরিক আদালতে দণ্ডিত হওয়ার কারণে জিন্টুকে ক্ষমা করা হয়েছে। কিন্তু এটাই কি রাষ্ট্রের নীতি? এটা কি সবার জন্য প্রযোজ্য? আমরা কি এটা গাইডলাইনে লিখতে রাজি আছি? ১৯৬৮ সালের ১২ নভেম্বর ভারতের মন্ত্রিসভা এ মর্মে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ওই তারিখ পর্যন্ত সারা দেশের মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হবে। সে দিনের ‘অপরিপক্ব’ গণতন্ত্রের দেশ যা পেরেছিল, আমরা কি এমন কিছু আজ চিন্তাও করতে পারি? তবু সরকার চালাই তাই এই ক্ষমতা চাই, এ কথার কিন্তু যুক্তি আছে। কারণ, ৪৯ অনুচ্ছেদের অন্তর্গত দর্শন হলো, সমাজে ‘শান্তি ও সুসরকার’ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে কখনো কখনো এর প্রয়োগ দরকার হতে পারে।
কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী হাইকোর্টের রায় মেনে নিতে উৎসাহী বলে মনে হয় না। সারওয়ার কামাল বনাম রাষ্ট্র মামলায় ক্ষমার আবেদনকারীরা (একজন মীর কাসেম নামধারীও ছিলেন) ১৯৮৯ সালে প্রত্যেকে ১০ বছর করে সাজা পেয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে খালেদা জিয়ার সরকার এদের ছেড়ে দিল। ক্ষমা চাওয়ার একটি দরখাস্তের ভাষা এ রকম: ‘শহীদ জিয়ার আদর্শের সৈনিকেরা যাতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব বাস্তবায়নসহ দুই মরণপথযাত্রী সম্ভ্রান্ত পরিবারকে রক্ষার স্বার্থে।’ এই ছিল খালেদা জিয়ার সরকার চালানোর নমুনা। আবু তাহেরের আবেদন ও নথিপত্র পড়েছিলাম। সেখানেও এই একই সুর ধ্বনিত।
তাই নাগরিকের মনে এই সন্দেহ জাগতেই পারে যে নির্বাহী বিভাগ এই ক্ষমতা দিয়ে কার্যত একটি ‘সুপ্রিম নির্বাহী আপিল কোর্ট’ চালু রাখতে কিংবা ইতিমধ্যেই তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে কি না। এটা আমাদের অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ভারতের উচ্চ আদালতে এটা মীমাংসিত যে ক্ষমার ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের কোনো নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নয়। এটা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য। কিন্তু এটা দুঃখের বিষয় যে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে ৪৯ অনুচ্ছেদবিষয়ক কোনো মামলা এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি
হয়নি। মাহমুদুল ইসলাম ৪৯ অনুচ্ছেদ নিয়ে ভাষ্য লিখতে গিয়ে দুই ডজন বিদেশি রায়ের বরাত দিয়েছেন। সেখানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট অনুপস্থিত। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সরকারগুলো দলীয় স্বার্থে এই ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। দণ্ডিত ব্যক্তি ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার আত্মীয় বিবেচনায় সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করেছেন, সেটা কেবল সাংবিধানিকতা ও আইনের শাসনবিরুদ্ধ নয়। বরং এটা দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংসের নামান্তর।’
জেনারেল এরশাদ আওয়ামী লীগের শ্রদ্ধাভাজন নেতা ময়েজউদ্দিন হত্যাকাণ্ডের আসামি আজম খানকে দণ্ড প্রদানের পরপরই ক্ষমা করেছিলেন।
ড. কামাল হোসেন শনিবার আমাকে বলেন, ‘এটা চ্যালেঞ্জ করতে ময়েজউদ্দিনের ভাইকে একজন রিটকারী হতে তিনি অনুরোধ করেছিলেন। তিনি তাৎক্ষণিক রাজি হলেও পরে আর আসেননি। এ বিষয়ে নাগরিক সমাজকে আইনি লড়াইয়ে নামতে হবে। তবে সরকারের কাছে অনুরোধ, হাইকোর্টের রায় যেন তারা অবিলম্বে বিবেচনায় নেয়। সত্যিই এ বিষয়ে একটা কিছু করার এখনই ‘হাইটাইম’।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.