সবাইকে আপন করে নেন যিনি

ফারুক চৌধুরী
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ১৯৭৮ সালের ১৮ জানুয়ারি। ব্রাসেলসের বাংলাদেশ দূতাবাসের অফিসকক্ষে বাতি জ্বালিয়ে ফারুক চৌধুরী বসে আছেন একা। বেলজিয়ামের রাজার চিফ অব প্রটোকল অ্যাম্বাসেডর রবার্ট সিক্সের টেলিফোন এল। তাঁর কথার মধ্যে একটা আনন্দের ছোঁয়া ছিল। ‘রাষ্ট্রদূত’, বললেন তিনি, ‘আপনি কাল সকালে ছোটখাটো একটি কূটনৈতিক ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন।’ সেদিন ব্রাসেলসে ফারুক চৌধুরী সত্যি একটা ব্যতিক্রমী ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন। শুধু ব্রাসেলস কেন, অন্য কোথাও এমন একটি কূটনৈতিক ঘটনার দ্বিতীয় কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। এ রকম অদ্বিতীয় একটি মজার কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল সেটি। ব্যাপার হলো কী, বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হয়ে গেছেন ফারুক চৌধুরী। ১৯ জানুয়ারি রাজার কাছে তাঁর পরিচয়পত্র পেশ করার দিন-তারিখ নির্ধারিত হয়ে আছে। এর নড়চড় হবে না। কিন্তু ঢাকা থেকে পরিচয়পত্রটি কোনো কারণে ব্রাসেলসে পৌঁছায়নি। রাজার নিয়ম হলো, কোনো দেশের রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র পেশ করার পর তিনি তাঁর সামনেই খামটি খুলে পড়ে ওই দেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। এটা অপরিহার্য ভদ্রতা বলে মনে করেন তিনি। সমস্যা হলো, ফারুক চৌধুরীর পরিচয়পত্র এসে পৌঁছায়নি, কিন্তু নির্ধারিত সময়ে তা পেশ করতেই হবে। এর সমাধান কী?
ফারুক চৌধুরী পরামর্শ দিলেন, একটি ফাঁকা খাম রাজাকে দেওয়া হোক, আর রাজা অন্তত ওই দিন যেন তা খুলে না দেখেন, সে রকম ব্যবস্থা করা হোক। এ রকম প্রস্তাবে চিফ অব প্রটোকল অ্যাম্বাসেডর রবার্ট সিক্স এমন হতভম্ব হয়ে পড়েন, যা বলার নয়। এটা যে শুধু অসম্ভব তা-ই নয়, এ রকম একটা প্রস্তাব আসতে পারে, সেটা তাঁর কল্পনায়ও ছিল না। তিনি প্রায় অসম্ভব বলে প্রস্তাবটা উড়িয়ে দিয়েও রাজদরবারে তা পেশ করতে রাজি হন। শেষ পর্যন্ত একটা ডামি খামই রাজা বদোয়াঁ গ্রহণ করেন এবং যেন ভুলে সেটা না খুলেই টেবিলে রেখে কথা বলা শুরু করেন। পরিচয়পত্র খুলে পড়ার প্রচলিত ‘ভদ্রতা’ রক্ষা করা থেকে তিনি সেদিন যেন ভুলবশত বিরত থাকেন। ঘটনাটা রবার্ট সিক্সের কাছে ছিল যথার্থই একটা ‘কূটনৈতিক ইতিহাস’! ফারুক চৌধুরী তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অনেক যুগান্তকারী ঘটনার জন্ম দিয়েছেন, সন্দেহ নেই। তার মধ্যে ব্রাসেলসের ঘটনাটা আমি বেছে নিলাম। কারণ, সেটা ছিল যেকোনো অভাবনীয় সমস্যার মুখে বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান বের করার অসাধারণ নৈপুণ্যের একটি উদাহরণ। ফারুক চৌধুরীর সেই গুণটি সবাইকে আকর্ষণ করে। তিনি তখন অপেক্ষাকৃত তরুণ। তরুণেরাই সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা রাখেন। মজার বিষয় হলো, তিনি সেদিন যেমন তরুণ ছিলেন, আজও তেমনই আছেন। তারুণ্যের সীমা এখনো তিনি অতিক্রম করে যাননি। কোনো কোনো মানুষ আছেন, যাঁদের সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেল বোঝা যায় আমরা কত কিছু জানতাম না। ফারুক চৌধুরী সে রকমই একজন অসাধারণ মানুষ। সাহিত্য থেকে ইতিহাস, রাজনীতি থেকে অর্থনীতি, কূটনীতি তো তাঁর নিজেরই বিষয়। কিন্তু যখন তিনি আমাকে ফোন করে বলেন, ‘ছুটির দিনে’ ম্যাগাজিনে আজ ‘কিলায়ে কাঁঠাল পাকানোর’ সম্ভাব্যতা নিয়ে তোমার কার্যকারণ লেখাটা বেশ হয়েছে, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বিজ্ঞানের টুকিটাকিতেও তাঁর আগ্রহ কম নয়। আমি যখন লিখতে বসি, ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা না করলে আমার লেখার বক্তব্য যুক্তিপূর্ণ হলো কি না, তা নিয়ে মনে সন্দেহ থেকে যায়। তাই আমি প্রায়ই তাঁকে ফোন করে জিজ্ঞেস করি, ‘আচ্ছা ফারুক ভাই, আমার সাপ্তাহিক কলাম “হালচালে” আমি এ রকম একটা কথা লিখলে কি সেটা যুক্তিসম্মত হবে?’
তিনি কিছু পরামর্শ অবশ্যই দেবেন। হয়তো এক ঘণ্টা ধরে আমরা কোনো একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাব। তাঁর জানার পরিসীমা যে কত বিশাল, এসব আলোচনার মধ্য দিয়ে জানা যায়। এরপর আমার লেখার মধ্যে অনেক নতুন বিষয় এসে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই। আলোচনায় ফারুক ভাইয়ের কোনো কার্পণ্য নেই। হয়তো আমি ফারুক ভাইয়ের কাছে কোনো জটিল রাজনৈতিক বিষয়ে পরামর্শ চাইলাম। আমি নিশ্চিত যে এ বিষয়ে আমি ফারুক ভাইয়ের কাছ থেকে খুব ভালো ও নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ পাব। আমার লেখা কীভাবে আরও যুক্তিপূর্ণ করা যায়, সে বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেবেন। তারপর আমি তাঁর যুক্তি নেব কি নেব না, সে বিষয়ে তাঁর কোনো কথা নেই। ফারুক ভাইয়ের নিজের লেখার দুটি বৈশিষ্ট্য। প্রথমত, তাঁর লেখার মধ্যে নতুন কিছু বিষয় থাকবেই। তিনি যখন ব্র্যাকের কাজে আফগানিস্তান বা আফ্রিকার কোনো দেশে যান, ফিরে এসে লিখবেন তাঁর অভিজ্ঞতা। সেই লেখায় তিনি বেছে নেবেন ঠিক সেই বিষয়গুলো, অন্যের চোখে যেগুলো ধরা পড়বে না। এখানেই তাঁর লেখার আকর্ষণ। আর দ্বিতীয়ত, আসলে সেটাই প্রধান, তাঁর ভাষা। এমন সহজ ও গতিশীল ভাষায় তিনি লেখেন, মনে হয় একটানা পড়ে যাই। মাঝখানে মোবাইলে কোনো কল এলে বিরক্ত লাগে! ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললে বোঝা যায় তিনি কত আপন। সুন্দর ভরাট গলা। আরও চমৎকার সম্ভাষণ, ‘মুকুল, কেমন আছ? আমি বলি কি...’ খুব কম মানুষই সবাইকে এমন আপন করে নিতে পারেন। আজ ৪ জানুয়ারি। ফারুক ভাইয়ের ৮০তম জন্মবার্ষিকী। আজকের এই শুভদিনে আমি তাঁর দীর্ঘজীবন, সুন্দর স্বাস্থ্য ও আরও সুন্দর সুন্দর লেখা কামনা করি।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.