মানবতাবিরোধী অপরাধ-বিচার :প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা by ডা. এমএ হাসান

গোলাম আযম এবং মুজাহিদ গংয়ের বিচার সম্পন্নের মধ্য দিয়ে বিচারহীনতার নীরবতা কিছুটা হলেও ভেঙেছে। তবে এতে সামগ্রিক সত্য যে উদ্ঘাটিত হয়নি এবং '৭১-এর ঘাতক গোষ্ঠী কর্তৃক সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধের ক্ষুদ্রতম অংশও যে আমরা উন্মোচিত করতে পারিনি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এর পেছনে কেবল রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা নয়, দেশের সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবী সমাজের ভয়াবহ অক্ষমতা জড়িত। আমি, আমিত্ব, নিকৃষ্ট অহংবোধ ও স্বার্থচিন্তায় নিমজ্জিত মুক্তিযুদ্ধের কতিপয় ফেরিওয়ালা তথা বুদ্ধিজীবী দেশ ও জনগণকে বিভ্রান্ত করে আসছেন স্বাধীনতার শুরু থেকে। আর প্রচারমাধ্যমও এদেরকে বটগাছ মনে করে আঁকড়ে ধরেছে। মুক্তিযুুদ্ধকালে যে তরুণ যুদ্ধে শরিক হয়নি, যে নারী গ্রাম্যবালার মতো নিজেকে উজাড় করে দেয়নি বা দেশের জন্য সক্রিয় ত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয়নি, তাদেরই মুক্তিযুদ্ধের মুখপাত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। যেমন পাকিস্তানিদের অঙ্কশায়িনী অথবা রাজাকারদের সঙ্গে আত্মীয়তা স্থাপনকারীদের মাথায় তুলে রাখা হয়েছে।
এ রকম নানা আপসকামিতায় নিমজ্জিত জাতি যে সত্যকে ছুঁতে পারবে না_ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ কারণেই নানা মিথ্যাচার, অন্ধত্ব ও অসহিষ্ণুতা আলোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এসব ব্যর্থতা এবং সীমাহীন হতাশার মাঝে আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা একটি আলোকবর্তিকা প্রজ্ব্বলিত করার চেষ্টা করছেন।
বিচারক যখন বলেন, 'গোলাম আযমের বিরুদ্ধে জমা দেওয়া দলিলের বেশিরভাগই নথিভিত্তিক, প্রধানত সংবাদ প্রতিবেদন।
'বই, গবেষণা বা সাময়িকীর নিবন্ধের মতো আরও একাডেমিক জিনিসপত্র প্রসিকিউশন জমা দিলে আরও ভালো হতো।
'ডকুমেন্ট বলতে আসলে সে রকম কিছুই দেয়নি প্রসিকিউশন। প্রসিকিউশনের নথিপত্র একেবারেই যথেষ্ট ছিল না'_ তখন এর মধ্যে অনুলি্লখিত অনেক কথাই পাঠ করা সম্ভব।
মূলত ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করে যে যুদ্ধ পরিচালনা করে, তা সব বিবেচনায় একটি পূর্বপরিকল্পিত গণহত্যা এবং বেপরোয়া নিধনযজ্ঞ ছিল। গণহত্যা ও নিধনকে সফল করে রাজনৈতিক তথা সামরিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা একদিকে যেমন ধর্ষণকে যুদ্ধের হাতিয়ার বা কৌশল (As an instrument of war) হিসেবে বেছে নেয়, তেমনি সীমাহীন নির্যাতন, বেপরোয়া ধ্বংসযজ্ঞ, নানা প্রক্রিয়ায় নারী নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে জনগণকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে পরিকল্পিতভাবে দেশান্তরিত হতে বাধ্য করেছে (Forced Migration and Deportation)। এ ছাড়া অন্তরীণ মানুষদের নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত করে, বিপুলসংখ্যক নারীকে যৌন দাসত্বে আবদ্ধ করে পুরো দেশকে পাকিস্তানিকরণ এবং ইসলামীকরণে মনোসংযোগ করে এ নরপশুরা।
এই ঘৃণ্য মানবতাবিরোধী অপরাধে তারা দেশে বসবাসকারী পাকিস্তানপন্থি রাজনৈতিক দলসহ অবাঙালি জনগোষ্ঠী, ধর্মান্ধ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে। এসব রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, মুসলিম লীগ, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি, জামায়াতে ওলামায়ে ইসলাম, কনভেনশন মুসলিম লীগসহ বেশ কিছু দল, ব্যক্তি, গোষ্ঠীসহ অধিকাংশ মসজিদ ও মাদ্রাসার ইমাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এরা পাকিস্তানের পক্ষে থাকার জন্য জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং পাকিস্তানি সেনাদের হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনে সার্বিক সহায়তা প্রদান করে। এরা মানবতাবিরোধী অপকর্মে কেবল উদ্দীপনাই সৃষ্টি করেনি, কখনও নিজেরাই হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন এবং ধ্বংসযজ্ঞে অংশগ্রহণ করে এবং শান্তির বিরুদ্ধে নানা নেতিবাচক অবস্থান নেয়। এদের অনেকে গণহত্যায় প্রণোদনা সৃষ্টিসহ হিন্দু তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ বিষোদ্গার বা Hate speech প্রচার করে।
এ ক্ষেত্রে নানা রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতাদর্শগত বিভেদ থাকলেও বা অপকর্মে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও জামায়াতে ইসলামী এবং তার ছাত্র সংগঠন (ICS) নষ্ট কর্মে উন্মাদ হয়ে ওঠে।
যেসব পাকিস্তানি অফিসার প্রধানত তাদের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং যাদের নির্দেশ ও তত্ত্বাবধানে তারা সে সময় শক্তিশালী হয়ে ওঠে তারা হলেন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সিভিল উপদেষ্টা জেনারেল রাও ফরমান, ইপিসিএফ প্রধান জেনারেল জামশেদ, আলবদর প্রধান জেনারেল রহীম, ব্রি. বশীর, লে. কর্নেল আহসানউল্লাহ, মেজর রিয়াজ হোসেন, ব্রি. মোহাম্মদ হায়াত খান, ব্রি. আসলাম, লে. কর্নেল তাজ।
ময়মনসিংহের জামালপুরের আশরাফ হোসেন যে বদর বাহিনী গঠন করে, তা দৈনিক সংগ্রামের পাতায় প্রশংসিত হয়। জামালপুরের কামরান, কামারুজ্জামান, সাকিব, ঢাকার আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মঈনুদ্দীন তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য স্বাধীনতার পরপরই কুখ্যাত হয়ে ওঠে। আশরাফুজ্জামানের দেশত্যাগ ও পাকিস্তানে আশ্রয়ের কথা প্রকাশিত হয়েছে তার আত্মকথায় এবং জামায়াতের জেলা আমির মহিউদ্দীন চৌধুরী রচিত SUN SET AT MIDDAY গ্রন্থে।
পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত‘SUN SET AT MIDDAY শীর্ষক একটি গ্রন্থের লেখক তথা জামায়াতের ভূতপূর্ব আমির মহিউদ্দীন চৌধুরী তার আত্মকথার ৬৬ পাতায় উল্লেখ করেন, I was elected Secretary of District PDM and then District DAC. I was selected Secretary and then elected as Amir of District Jamaat-e-Islami in 1968. I was holding the post of District Jamaat till dismemberment of East Pakistan in 1971. In 1971 when Peace committee had been formed to cooperate with Pakistan Army to bring law and order in East Pakistan, I was again elected Secretary, District Peace committee তিনি আরও উল্লেখ করেন,Among twenty District Amirs of Jamaat-e-Islami, Peace committee presidents and secretaries only one’s citizenship was cancelled through Government Gazette, Bangladesh government had declared prize if that one could be arrested or killed, and that one was this humble author.

'৭১-এর পর এই ব্যক্তি পাকিস্তানে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং ড. আলী আশরাফ করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধানের পদটি ছেড়ে দিলে ওই পদে মহিউদ্দিন চৌধুরী যোগ দেন। এটা ছিল '৭৩-এর ২৬ জানুয়ারির ঘটনা। ইতিপূর্বে '৭২-এর ২৬ মে লাহোরে পেঁৗছলে তার অভিজ্ঞতার বিষয়টি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, They recognized me and embraced me and laughed in a loud voice. I came to my senses and recognized them. One was Dr. Habibullah, brother-in-law of Nargis and the other was Ashrafuzzaman, Dhaka University student and a veteran Al-Badar leader. Dr. Habibullah was al-ways clean shaved; Now he had grown big mustaches that made difficult to recognize him, and Ashraf was clean shaved also; before hand he had very small beard.
After a stay of ten days at Sajjad murads residence we proceeded to Lahore as we were the guests of central Jamaat. We reached Lahore on 26th May 1972 at about 8 O’clock at night. Three Bengali speaking Jamaat workers including one Maulana Ali Hussain, a student of Dhaka University and an Al-Badar and also and acquaintance of Dr. Habibullah and his wife came to Lahore station.

এখানেই স্পষ্ট হয়েছে বুদ্ধিজীবী হত্যার খলনায়ক আশরাফুজ্জামান খান ও ড. হাবিবুল্লাহর সঙ্গে জামায়াত ও আলবদরের সম্পর্ক।
কেন '৭১-এ পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত জামায়াতের প্রতিটি কর্মী এবং ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে বিচার করতে হবে_ সে বিষয়টি পরিষ্কার হয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিতThe Vanguard of Islamic Revolution : Jamaat-e-Islami of Pakistan’ নামক গ্রন্থে। জামায়াতের গঠন ও সামাজিক ভিত্তির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে এর ৬৬, ৬৭ পাতায় উল্লেখ করা হয় Not surprisingly the IJT was pushed further into the political limelight between 1969 and 1971 when the Ayub Khan regime collapsed and rivalry between the People’s Party and the secessionist Bengali party, the Awami League, resulted in civil war and the dismemberment of Pakistan. The IJT, with the encouragement of the government, became the main force behind the Jama’at’s national campaign against the people’s party in West Pakistan and the Awami League and Bengali secessionists in East Pakistan. The campaign confirmed the IJT’s place in national politics, especially in May 1971, when the IJT joined the army’s counter insurgency campaign in East Pakistan. With the help of the army the IJT organized two paramilitary units, called Al-Badar and Al-Shams, to fight the Bengali guerrillas. Most of Al-Badar consisted of IJT members, who also galvanized support for the operation among the Muhajir community settled in East Pakistan. Mati’u’r-Rahman Nizami, the IJT’s nazim-i a’la (supreme head or organizer) at the time, organized Al-Badar and Al-Shams from Dhaka University. The IJT eventually paid dearly for its part in the civil war. During clashes with the Bengali guerrillas (the Mukti Bahini) numerous IJT members lost their lives. These numbers escalated further when scores were settled by Bengali nationalists after Dhaka fell. .
প্রকাশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত শিক্ষকের হত্যাকারী কুখ্যাত আলবদর সালাহউদ্দিন কোম্পানির কমান্ডার আশরাফুজ্জামান মতিউর রহমান নিজামীর শিষ্য ছিল। একইভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইমরান ইসলামী ছাত্রসংঘের কেবল সদস্য ছিল না, সে নিজামীর অনুগত হিসেবে ইসলামী ছাত্রসংঘ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ শাখার সভাপতি এবং ঢাকা শহরের আলবদর প্রধান ছিল।
'৭১-এ এদের ভূমিকা আংশিকভাবে স্পষ্ট হয়েছে আলবদর শীর্ষক গ্রন্থে। আশরাফুজ্জামান খান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক মানুষ জানত যে, এ হচ্ছে আলবদরের লোক। (সূত্র :আলবদর)। ১৬ ডিসেম্বর তার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে সে বলে, 'জেনারেল ফরমান আলীর দেয়া আমার পরিচয়পত্র তাদের তল্লাশীতে পাওয়া গেল।' ১৮ ডিসেম্বর আর এক কুখ্যাত আলবদর কামরানের সঙ্গে বন্দি হওয়ার কথা উল্লেখ করে আশরাফুজ্জামান তার আত্মকথায়।
গোলাম আযমের সঙ্গে ফেনীর মহিউদ্দীন বা গোলাহাটের মতিন হাসমির সম্পর্কের কথা প্রসিকিউশন প্রদত্ত তথ্যে উলি্লখিত হয়নি। এদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যাগুলো উপস্থাপিত হয়নি। অথচ এরা এসব করেছে গোলাম আযমের নির্দেশেই। যে ব্রি. সাদুল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে ৪০ জনের বেশি বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছিল, তার সঙ্গে গোলাম আযমের সম্পর্কটুকু আড়ালে রয়ে গেল। অথচ ন্যায়, সত্য এবং সমঝোতা তথা মানবমর্যাদা প্রতিষ্ঠাই একটি বিচারের লক্ষ্য।


আহ্বায়ক, ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি

No comments

Powered by Blogger.