বেহাল সড়ক: ঈদে ঘরমুখী মানুষের দুশ্চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়ক সড়ক-মহাসড়কের করুণ দশা, দুর্ভোগ

নিয়মিত সংস্কার না হওয়ায় সারা দেশের বেশ কিছু সড়ক-মহাসড়ক নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মহাসড়কের কয়েক শ কিলোমিটার অংশ যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।


খানাখন্দে ভরা এসব সড়কে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলছে। প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজটের।
ঈদে ঘরমুখী মানুষের দুশ্চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়ক যোগাযোগের এই করুণ অবস্থা। পরিবহন মালিক ও চালকেরা ঈদের আগে জরুরি ভিত্তিতে সারা দেশের সব সড়ক সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন।
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক-মহাসড়কের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেছেন আমাদের আঞ্চলিক কার্যালয়, নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মিরসরাইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ৪০ কিলোমিটার: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাইয়ের ৪০ কিলোমিটারের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এর মধ্যে বারইয়ারহাট, মিরসরাই সদর, নিজামপুর ও বড় দারোগারহাট অংশে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলছে। বৃষ্টির কারণে মহাসড়কের ওই অংশে দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেক বেড়ে গেছে বলে পরিবহন চালকেরা জানিয়েছেন।
তবে ঈদের আগে সড়কের ওই অংশে বড় ধরনের কোনো সংস্কারকাজ হবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পের অতিরিক্ত পরিচালক স্বপন কুমার নাথ। তিনি বলেন, বর্ষার জন্য ঠিকমতো কাজ করা যাচ্ছে না। ঈদে ঘরমুখী মানুষের চাপ বাড়লে মহাসড়কে প্রকল্পের তদারকি দল পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম বাড়াবে।
বারইয়ারহাটের প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকার রাস্তার পুরোটাই এবড়োখেবড়ো। কয়েক দিন আগে সড়কের বড় গর্তগুলো দায়সারাভাবে ভরাট করা হয়। সামান্য বৃষ্টিতেই আগের রূপে ফিরে গেছে সড়কটি।
অভিযোগ উঠেছে, সড়ক সংস্কারের নামে গর্তের মধ্যে বড় বড় পাথর ঢেলে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে।
ট্রাকচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘লোড গাড়ি নিয়ে সড়ক পার হতে গিয়ে মনে হয়, পুলসিরাত পার হচ্ছি। ভয় হয়, কখন জানি এক্সেলেটর ভেঙে যায়।’
বারইয়ারহাটে মহাসড়কের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা হাবিলদার শাহ আলম বলেন, দিনে তেমন সমস্যা না হলেও সন্ধ্যার পর বারইয়ারহাট এলাকায় যানজট লেগে যায়। কারণ, তখন ভারী যানবাহনগুলো ধীরে চলতে থাকে।
চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রানা প্রিয় বড়ুয়া বলেন, ২০০৯ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পের আওতায় চলে গেছে। তাই ওই সড়ক নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। কারণ, সেখানে অনেক অভিজ্ঞ মানুষ কাজ করছেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম নবী বলেন, প্রায় প্রতিদিনই সড়কে সৃষ্টি হওয়া গর্তে আটকে গাড়ি বিকল হচ্ছে। এতে পরিবহন মালিকেরা ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, যাত্রীদেরও ভোগান্তি বাড়ছে। তিনি ঈদের আগে রাস্তা সংস্কারের দাবি জানান।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ভালুকার এক কিলোমিটারে যত দুর্ভোগ: খানাখন্দে ভরে গেছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভালুকা অংশের এক কিলোমিটার। এ কারণে মহাসড়কের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এই অংশ যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
ভালুকা পৌরসভার বড়টিলা থেকে থানা মোড় পর্যন্ত ওই সড়কের কার্পেটিং উঠে গিয়ে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের দুই পাশ খুঁড়ে গর্ত করায় সরু হয়ে গেছে। বাস ও মালবাহী ট্রাকগুলো মাঝেমধ্যে আটকা পড়ছে এসব খানাখন্দে। এতে দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ যানজট। চলতি বর্ষায় এ সড়কের অবস্থা আরও করুণ হয়ে পড়েছে।
এলাকাবাসী ও বাসচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় দুই বছর ধরে মহাসড়কটির এই অংশের এমন দশা। এ সময়ের মধ্যে কখনো কখনো ইট-সুরকি দিয়ে খানাখন্দগুলো ভরাট করা হয়েছে দায়সারাভাবে। কিন্তু সপ্তাহ যেতে না-যেতেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।
ময়মনসিংহ সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোকাদ্দিসুল হক বলেন, সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মাছের গাড়ি ঢাকায় যায়। এসব গাড়ি থেকে পানি পড়েই সড়কটির এ অবস্থা হয়েছে। এ বিষয়ে মাছ ব্যবসায়ীদের সচেতন করা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান চালানো হবে।
ঈদের আগে সড়কটি সংস্কার করা হবে কি না—জানতে চাইলে মোকাদ্দিসুল আরও বলেন, এটি চার লেন করার পরিকল্পনা আছে। কিন্তু দুই পাশেই বিদ্যুতের খুঁটি থাকায় কিছুটা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
খুলনা-ঢাকা মহাসড়কের জামতলায় বৃষ্টি হলেই দুর্ভোগ: খুলনা-ঢাকা মহাসড়কের যশোর সদর উপজেলার জামতলা এলাকায় সামান্য বৃষ্টি হলেই কাদা হয়ে যায়। সড়কটির বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ছোট-বড় গর্ত। এতে ধীরে ধীরে যান চলায় সৃষ্টি হয় যানজটের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নওয়াপাড়া ভাঙা গেট, গোপালপুর গেট, রূপদিয়া, রাজারহাট, মুড়ুলী মোড়সহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় গর্ত। বিভিন্ন স্থানে ইট ফেলে গর্ত ভরাট করেছে সওজ। কিন্তু বৃষ্টি হলে এই ইটের ওপর দিয়ে গাড়ি দ্রুত গতিতে চলতে পারে না।
সওজ সূত্র জানায়, যশোর শহরের চাঁচড়া থেকে অভয়নগর উপজেলার রাজঘাট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারকাজের জন্য খুলনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেসিক-ইউআইএল জেভিকে ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর এক বছরের সময় দিয়ে ১৮ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ৩০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে তিন কিলোমিটারের বিভিন্ন স্থানে পুনর্নির্মাণ, এক কিলোমিটার মজবুতকরণ ও গোটা সড়কে কার্পেটিং করার কথা রয়েছে। কার্যাদেশের সাত মাসেও কাজের তেমন অগ্রগতি নেই।
সওজ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হায়দার বলেন, বর্ষার আগে কাজ শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ কাজের অগ্রগতি না হওয়ায় জনগণকে দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে।
আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়ক খানাখন্দে ভরা: বড় বড় গর্তের কারণে যানবাহন চলাচলে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে। দ্রুত এসব গর্ত ভরাট করা না হলে ঈদে ঘরমুখী মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়তে পারে।
চার লেনে উন্নীত করার কাজের জন্য যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে নবীনগর-কালিয়াকৈর সড়কে। সড়কের ওপর নির্মাণসামগ্রী ও নির্মাণযন্ত্র রাখার ফলে মাঝেমধ্যেই যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। যানবাহন শ্রমিকেরা জানান, ঈদের আগে উন্নয়নকাজ বন্ধ না রাখলে এ সমস্যা আরও প্রকট হবে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ফুটপাত ও সড়কের ওপর বাজার বসিয়ে যান চলাচল বিঘ্নিত করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই ওই এলাকায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার যানজট লেগে থাকে।
ঢাকা সড়কের কল্যাণপুর উপবিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোমিনুল ইসলাম মৃধা বলেন, বৃষ্টির পানি জমে থাকায় সড়কে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়।
সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ-ভোলাগঞ্জ সড়কে ঝুঁকি নিয়ে যান চলাচল: দীর্ঘদিনেও সংস্কার না হওয়ায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ-ভোলাগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক। খানাখন্দে ভরা এ সড়কে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে।
ইট, সুরকি, বালু আর পিচ-খোয়া উঠে ৩৭ কিলোমিটার এই সড়কের বিভিন্ন অংশে অনেক খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে।
ভোলা-বরিশাল সড়ক ৫৭ কিলোমিটার অংশের করুণ অবস্থা: নিয়মিত সংস্কার না হওয়ায় বরিশালের বাকেরগঞ্জ-চান্দখালী-বরগুনা সড়কের এখন করুণ অবস্থা। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কাদা-পানিতে চারদিক সয়লাব।
গতকাল রোববার বাকেরগঞ্জের কালীগঞ্জ, পাদ্রিশিবপুর ও নেয়ামতি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কটিতে বড় বড় গর্ত। খানাখন্দ ও কাদায় ভরা এ সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন। পথচারীদের ভোগান্তি চরমে।
সওজ বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহ মো. শামস মোকাদ্দেস বলেন, বাকেরগঞ্জ-চান্দখালী-বেতাগী-বরগুনা আঞ্চলিক মহাসড়কের বরিশাল অংশের চার কিলোমিটার রাস্তা কিছুটা খারাপ। সড়কটি সংস্কারে দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
দশমিনা-কালাইয়া সড়কে রাস্তার কার্পেটিং উঠে গেছে: পটুয়াখালীর দশমিনা-কালাইয়া সড়ক এখন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দশমিনা অংশের সড়কের ওপরের কার্পেটিং উঠে গেছে। দশমিনা উপজেলার সঙ্গে বাউফল উপজেলার সবচেয়ে বড় বন্দর কালাইয়ার সহজে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই সড়ক।
মতলব-গৌরীপুর সড়কে ৩০টি স্থান দেবে গেছে: চাঁদপুর ও কুমিল্লার মধ্যবর্তী ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ মতলব-গৌরীপুর (বাবুরহাট-মতলব-পেন্নাই) সড়কটি দ্রুত সংস্কারের দাবিতে বৃহস্পতিবার মতলব-ঢাকা বাস মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ ধর্মঘট পালন করে। গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের ঢাকিরগাঁও, নবকলস, বরদিয়া, ভাঙ্গারপাড়, ধনারপাড়, নাগদা, আশ্বিনপুর, নায়েরগাঁও, নৈয়াইরবাজার, নারায়ণপুর অংশের রাস্তার কার্পেটিং উঠে গেছে। সরে গেছে ইট, বালু ও খোয়া। সড়কটির কমপক্ষে ৩০টি স্থান দেবে গেছে।
{প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ সংবাদদাতা, যশোর অফিস, নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার, বরিশাল অফিস, মতলব দক্ষিণ (চাঁদপুর) প্রতিনিধি, পটুয়াখালী অফিস}

No comments

Powered by Blogger.