নারী নিগ্রহের প্রাচীন প্রথার অবসান কবে? by মোকাম্মেল হোসেন

দেশে-বিদেশে সাড়ম্বরে উদযাপিত আন্তর্জাতিক নারী দিবস কি বিশ্বকে নতুন কোনো বার্তা দিতে পেরেছে, নাকি এটি ছিল একটি ‘গতানুগতিক উদযাপন’ যা কেবল ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে? ব্যক্তিগতভাবে আমি তা মনে করি না, তবে ‘হ্যাশট্যাগ মি টু’তে প্রতিফলিত নারী নিগ্রহের মাত্রা অথবা সম্প্রতি রাজধানীর রাজপথে প্রকাশ্যে একদল তরুণের নারী নিপীড়নের চিত্র এ বাস্তবতাই তুলে ধরছে- অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। দেখা যাচ্ছে- মেধা ও শ্রমে, আত্মত্যাগ আর বাৎসল্যে সমাজের চাকাকে সচল রাখছে যে নারী, তার সব গৌরব মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে শুধু নারী হয়ে জন্ম নেয়ার কারণে। নারীর জীবন ও মর্যাদা, তার মানবাধিকার পুরুষের চেয়ে কম- আমাদের প্রাত্যহিক অভ্যাসে তা পরিস্ফুট হয়ে উঠছে। মূলত জন্মের পর থেকেই নারী অবমূল্যায়ন ও অমর্যাদার শিকার হয়। হিন্দু শাস্ত্রকার মুনু বলে গেছেন- নারী কুমারীকালে পিতার, যৌবনে স্বামীর ও বার্ধক্যে পুত্রের তত্ত্বাবধানে থাকবে। নারী কখনই স্বাধীন থাকার উপযুক্ত নয়। খ্রিস্টান ধর্মাযাজক জন পলের বক্তব্য আরও ভয়াবহ- নারী পরাধীন থেকে নীরবে শিক্ষা লাভ করুক, তারা চুপচাপ থাকুক। কিন্তু তারা যে শেখাবে অথবা পুরুষের ওপর কর্তৃত্ব করবে আমি তা সহ্য করব না। চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস নারীকে দেখেছেন দেহসর্বস্ব এক প্রাণীরূপে। তার মতে- নারীর কোনো আত্মা নেই, নারী কেবলই এক দেহমাত্র। আর গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তুষ্ট থেকেছেন এই বলে- ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তিনি আমাকে এথেন্সবাসী করেছেন; বর্বর করেননি। ক্রীতদাস বা স্ত্রীলোক করেননি। প্লেটো থেকে আজ পর্যন্ত, মাঝখানে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান। কিন্তু নারী সম্পর্কে সমাজ যে এখনও নেতিবাচক ধারণাই পোষণ করে তার প্রমাণ পাওয়া যায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে মুম্বাইয়ের ক্লিনিকগুলোয় পুত্র সন্তানের আশায় ৯৫.৫ ভাগ কন্যা-ভ্রূণ হত্যার ঘটনা থেকে।
এই বাস্তবতা আমাদের নিয়ে যায় ওই সময়টিতে- যখন বিশ্বের সমগ্র মধ্য, উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলজুড়ে জন্ম নেয়া মাত্র কন্যাশিশুকে হত্যার বীভৎস প্রথা ব্যাপকভাবে চালু ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে কন্যাশিশু হত্যার প্রথা বিলোপ করার আগে ভারতে এই পৈশাচিকতা প্রায় পাঁচশ’ বছর ধরে চলে আসছিল। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর ব্রিটিশ সরকার ১৯০৬ সালের দিকে কন্যাশিশু হত্যার মতো নির্মম প্রথার পুরোপুরি অবসান ঘটালেও বর্তমানে অন্যভাবে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এই ভারতেই কন্যাশিশু হত্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে- লিঙ্গ নির্ধারণ পদ্ধতি চালু হওয়ার পর প্রথম পাঁচ বছরে ভারতে ৭৮ হাজার কন্যা-ভ্রূণের মৃত্যু ঘটানো হয়েছে সুপরিকল্পিত গর্ভপাতের মাধ্যমে। দাস প্রথা অবসানের সুদীর্ঘকাল পরও অনেক সমাজ মেয়েদের প্রতি এমন আচরণ করে থাকে, যেন তারা ব্যক্তিগত অস্থাবর সম্পত্তি। তাদের বেড়ি হচ্ছে নগণ্য শিক্ষা, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, সীমিত রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রজনন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের সীমিত সুযোগ, কঠোর সামাজিক প্রথা ও আইনের চোখে অসমতা। আর নারীদের হাতে-পায়ে এসব বেড়ি পরিয়ে রাখার জন্য সহিংসতাকে মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিশ্বে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার দ্বার অর্গলমুক্ত রাখার ব্যাপারটি যেন এমন একটি বিশাল কালো প্রকোষ্ঠের চৌকাঠে দাঁড়ানো- যার ভেতরটা সম্মিলিত যন্ত্রণায় প্রকম্পিত হচ্ছে। এই যন্ত্রণা যে কতটা প্রকট, তা উপলব্ধি করতে এই পরিসংখ্যানের দিকে চোখ রাখা যেতে পারে- যেখানে বিশ্বে প্রতি ৬ মিনিটে একজন নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন, প্রতি ৮ সেকেন্ডে একজন নারী শারীরিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় নারীর প্রতি সহিংস আচরণের বেশিরভাগই সামাজিক বিন্যাসের ধারা হিসেবে স্বীকৃত ও সমর্থিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অনেক দেশেই বউ পেটানোকে একটি স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়- যা পুরুষোচিত বিশেষ অধিকার হিসেবে গান, প্রবাদ ও বিবাহ অনুষ্ঠানগুলোয় সোল্লাসে বর্ণিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো শিল্পোন্নত সমাজে, যেখানে ইতিপূর্বে নারী নির্যাতনের বিষয়টির প্রতি ভ্রূকূটি করা হয়েছে, সেখানে নারী নির্যাতনের সত্যিকার চিত্র সরকারি ঘোষণাকে ভ্রান্ত প্রতিপন্ন করেছে।
দেশটিতে প্রতি ৬ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হচ্ছেন, যারা প্রতি ৫ জন পূর্ণবয়স্ক নারীর একজন। এছাড়া সেখানে প্রতি ১৫ সেকেন্ডে একজন নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার কোনো কোনো দেশের আদালতে ‘পারিবারিক সম্মান রক্ষা’র বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করেছে- যেখানে কোনো নারীকে খুন করার পর সেই খুনের শাস্তি থেকে পিতা বা স্বামীর অনায়াসে রেহাই পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। লাতিন আমেরিকার অন্তত ১২টি দেশে ধর্ষিতাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে এবং সে তাতে সম্মত হলে ধর্ষণকারীকে ধর্ষণের অভিযোগ থেকে রেহাই দেয়া হয়। নারীর চেহারা বিকৃত করার জন্য বাংলাদেশে এসিড নিক্ষেপ এমন সচরাচর ঘটনা যে, এজন্য দণ্ডবিধিতে একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে এটি সংযোজন করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বেদনাদায়ক হল- নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে অধিকাংশ অপরাধী শুধু যে শাস্তি এড়িয়ে যায়, তা নয়; বরং তা নীরবে সহ্যও করা হয়। এ নীরবতা নির্যাতিতার, এ নীরবতা সমাজের। অভিনব মনে হতে পারে, তবে এটাই বাস্তবতা- লাখ লাখ নারীর জন্য গৃহ হচ্ছে একটি ত্রাসের কেন্দ্র। নারীরা অপরিচিতজনের হামলাকে যতটা না ভয় পায়, তারচেয়ে বেশি ভয় পায় আত্মীয়জন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রেমিকের নৃশংসতাকে। ঘরের ভেতরে সংঘটিত শারীরিক নির্যাতন নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার সবচেয়ে সার্বজনীন একটি ধরন এবং প্রজনন বয়সী নারীর জখম হওয়ার তা প্রধান কারণ। অপরাধ সংক্রান্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ধর্ষিতা অপরাধীদের চেনেন, যেমন খুন হওয়া অন্তত ৪০ ভাগ নারী তাদের চেনাজানা লোকের হাতে নিহত হন। বস্তুতপক্ষে পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে শিক্ষা, শ্রেণী, আয় ও জাতিগত সীমানা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে পরিচালিত একটি জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে- নারীদের এক-চতুর্থাংশ থেকে প্রায় অর্ধেক অন্তরঙ্গ সঙ্গীর হাতে দৈহিক নির্যাতন ভোগ করেছে। দেশে দেশে সঠিক তুলনামূলক বিচার করার মতো যথেষ্ট উপাত্ত এখন পর্যন্ত না পাওয়া গেলেও পারিবারিক সহিংসতার বিদ্যমানতা এবং এর ধরন এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতিতে উল্লেখ্যযোগ্যভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল সমাজে ধর্ষণ সংক্রান্ত প্রাপ্ত উপাত্তের মধ্যে অদ্ভুত সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। অনেক মানদণ্ডের বিচারে ভিন্ন এই দুই সমাজের নারীরা একই ধরনের নিয়তির মুখোমুখি হচ্ছে। আর বেশিরভাগ দেশের আইনই পারিবারিক গণ্ডির ভেতরের হামলা সম্পর্কে নীরব। নারীকে শৃঙ্খলিত করতে দাসত্ব থেকে শুরু করে অদ্যাবধি অনেক ঘৃণ্য প্রথার যথার্থতা প্রমাণে সংস্কৃতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। দারিদ্র্য, বৈষম্য, অজ্ঞতা ও সামাজিক অস্থিরতা নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার সাধারণ পূর্বাভাস।
নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তার ঘোরতর শত্রু হল, পূত-পবিত্র ঐতিহ্যের নামে প্রচলিত সাংস্কৃতিক শক্তি। আফ্রিকায় বছরে প্রায় ২০ লাখ মেয়ের যৌনাঙ্গছেদের ঘটনাটিকে এই প্রথার সমর্থক যারা এবং যাদের অনেকেই নারী- এটিকে ঐতিহ্যগত ‘সাংস্কৃতিক রেওয়াজ’ হিসেবে দেখে থাকেন, যেখানে অন্যদের ‘মাথা ঘামানোর’ কিছু নেই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি মানবাধিকারের গুরুতর লংঘন এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি অভিশাপ- যা সবরকম সাংস্কৃতিক সীমা অতিক্রম করেছে। ঐতিহ্য ‘যৌতুকের বলি’ প্রথারও রসদ জোগায়, যে প্রথায় একজন নারীকে শ্বশুরপক্ষের যৌতুকের দাবি মেটানোর অপারগতার কারণে হত্যা পর্যন্ত করা হয়ে থাকে। ভারতে এ ধরনের বিরোধের ফলে গড়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ জন নারী প্রাণ হারান এবং এসব মৃত্যুর বেশির ভাগ ঘটে রান্নাঘরের আগুনে, যাতে এটিকে একটি দুর্ঘটনা হিসেবে সাজানো যায়। ‘পুত্রের প্রত্যাশা’ নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত আরেকটি অশুভ চিন্তা। বিশ্বের অনেক স্থানের মতো আফ্রিকায় একজন মহিলা তিন ছেলের জননী হলে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করেন এবং প্রশংসা লাভ করেন। অন্যদিকে তার প্রতিবেশী তিন কন্যার জননী হন করুণার পাত্রী। ঐতিহ্যগতভাবেই প্রায় ক্ষেত্রে নারীরা সবার শেষে খাবার খান এবং অল্প খান। নারীদের শেখানো হয়- যদি তারা অন্যের কাছে ভালো থাকতে চান এবং ভালো ব্যবহার আশা করেন, তাহলে সবার আগে ‘অন্যের প্রয়োজন’ বিবেচনা করতে হবে। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এমন সব অসুবিধা তারা নিঃশব্দে মেনে নেন, পুরুষের ক্ষেত্রে যেগুলো নিয়ে হৈ চৈ করা হয় এবং যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গৃহীত হয়। কোনো নারী গুরুতর অসুস্থ হলেও তার কাছে ‘কাজ’ প্রত্যাশা করা হয়, আর কোনো ছেলের মাথাব্যথা হলে তাকে বলা হয় শুয়ে থাকতে এবং আশা করা হয়, নারী তার যন্ত্রণা ও দুর্ভোগ ধৈর্য সহকারে সয়ে যাবেন। বস্তুত নারীকে এটাই শেখানো হয়- যত বেশি দুর্ভোগ তিনি সইতে পারবেন, তার প্রশংসাও হবে ততো বেশি। আমাদের সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে এক সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বাংলাদেশে নারী নির্যাতন ক্রমবর্ধমান নিত্যদিনকার ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌতুকের জন্য হত্যা, এসিড নিক্ষেপ, বলপূর্বক অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত করানো এবং অন্যান্য নারী ও শিশু নির্যাতনমূলক অপরাধ প্রতিনিয়ত ঘটছে। জনগণ নিজ নিজ পরিবারের মেয়েদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ঘরে বা ঘরের বাইরে নারী নির্যাতন, ভীতি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে যথাসময়ে যথোপযুক্ত বিচার না হওয়ায় মহিলাদের জীবন অত্যন্ত ভীতিপ্রদ ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে এবং এই ভীতি নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের পথে বাধা হিসেবে কাজ করছে। পরিণতিতে জাতীয় উন্নয়নের প্রচেষ্টাও সামগ্রিকভাবে বিলম্বিত হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, নির্যাতন ও হয়রানির ভয় নারীদের সামগ্রিক গতিশীলতার পথে একটি স্থায়ী বাধা। এ বাধা উন্নয়ন ও মূল কর্মধারার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রকে সংকুচিত করে তোলে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। ১৯৭২ সালে নবগঠিত বাংলাদেশের সংবিধানে নারীর মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে তদানীন্তন সরকার নারী উন্নয়নকে অগ্রাধিকার প্রদান করেছিলেন। সংবিধানের ২৭ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ ২৮(১) ধারায় রয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’ ২৮(২) ধারায় আছে, ‘রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ও ছিন্নমূল নারীর পুনর্বাসনে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে বোর্ডের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৭৪ সালে এটিকে বৃহত্তর কলেবরে পুনর্গঠিত করে নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত করা হয়। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারীর নিরাপত্তা বিধানের জন্য ইতিমধ্যে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে এবং হচ্ছে। এ ধারাবাহিকতায় নারী ও শিশুবিষয়ক একটি পৃথক মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করা হয়েছে। পাশাপাশি মহিলাবিষয়ক অধিদফতর এবং বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা সংস্থা নারী উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নারী অধিকার ও উন্নয়ন আন্দোলনের অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও কনভেনশনে অংশগ্রহণ ও সমর্থন প্রদান করেছে। নারী নিপীড়নের বিষয়টি যে পরিবর্তনের অতীত- তা নয়। জাতিগত বিদ্বেষের মতোই এটি ক্ষমতার একটি প্রয়োগ, যা পরিবর্তন করা সম্ভব।
কিন্তু যেহেতু এটি এতকাল ধরে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে আছে, তাই এসব সামাজিক কাঠামো ভাঙতে হলে সৃজনশীলতা, ধৈর্য এবং নানাদিক থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অভিজ্ঞতা বলছে- নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করতে হলে শুধু আলাদা আলাদাভাবে সহিংস কাজের জন্য শাস্তির বিধান করলেই চলবে না; বরং এই ধারণাটির পরিবর্তন করতে হবে- নারীর মূল্য পুরুষের চেয়ে কম। পুরুষের ন্যায় একইরকম শক্তিশালী ও সমমর্যাদাসম্পন্ন সদস্য হিসেবে সমাজে নারীর অবস্থান নিশ্চিত করতে পারলে তবেই আমরা তাদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতার অবসান ঘটিয়ে এটিকে একটি ‘দুঃখজনক বিচ্যুতি’ হিসেবে ভাবতে পারব। একটি সামান্য পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে দীর্ঘতম যাত্রাটির সূচনা হয় বলে প্রাচীন যে প্রবাদ রয়েছে- নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা এবং তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অবসান ঘটাতে বিশ্বের প্রতিটি সমাজের প্রতিটি খাতে যেমন বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সমাজকর্মী, স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষ, রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতা, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এবং অবশ্যই ব্যক্তি নারী ও পুরুষকে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। এটি আজ ব্যাপকভাবে স্বীকৃত- নারী উন্নয়নে বিনিয়োগ মূলত সমগ্র দেশের জন্যই উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নততর স্বাস্থ্য এবং উচ্চশিক্ষার প্রসার ত্বরান্বিত করে। তাই নারীকে পশ্চাতে রেখে, নারীকে অন্ধকারে রেখে কোনো জাতির পক্ষেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন-চূড়ায় আরোহণ করা সম্ভব নয়। নারীকে নারী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে উন্নয়ন সহযোগীর ভূমিকায় তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে আজ এ সত্য প্রতিষ্ঠিত করতে হবে- প্রথমত এবং প্রধানত নারী একজন মানুষ, যেমন মানুষ একজন পুরুষ। কেবল এই সত্য, এই বাস্তবতা অনুধাবনের মধ্য দিয়েই এমন এক আদর্শ সমাজব্যবস্থার বিনির্মাণ সম্ভব- যার স্বপ্ন দেখে এই দেশের, এই বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ।
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক
mokamia@hotmail.com

No comments

Powered by Blogger.