তত্ত্ব ধূসর বন্ধু হে, জীবনবৃক্ষই চিরসবুজ by মাহবুব কামাল

’৯১-এর প্রথম সংসদ অধিবেশনের যে রাতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঐকমত্যের ভিত্তিতে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার পদ্ধতি থেকে দেশকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরিয়ে এনেছিল, সে রাতে রাজধানী থেকে ৫০০ কিমি. দূরের এক উপজেলায় আমিও অন্য অনেকের মতো টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখেছিলাম। তিন জোটের রূপরেখার বাস্তবায়ন হলো ভেবে অধিবেশনের সবাই উল্লসিত, মধ্যরাতের সেই উল্লাসে মেতেছিলেন আমার পাশে বসা একজন কলেজ-অধ্যাপকও। আমি মাতিনি। গেল শতাব্দীর গোটা সত্তর দশক বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম বলে উপহার হিসেবে আমি পেয়েছি একটা পলিটিক্যাল মাইন্ড। সেই রাজনৈতিক মানসের সুবাদেই অধ্যাপক মহোদয়কে বলেছিলাম- হাতির রমণ দেখছেন তো এখন, দু’দিন পর তাদের যুদ্ধ দেখবেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংসদ সদস্যদের সম্মিলিত অট্টহাসির বিপরীতে ঈশ্বরও বুঝি হেসেছিলেন সে রাতে। তবে সেটা মুচকি হাসি। তিনি হয়তো দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছিলেন- ওহে বান্দারা, আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না। আর সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেছিলেন- তোমরা প্রপোজ করেছো তো; ওয়েট করো, আমি ডিসপোজ করে দেবো। নূর হোসেনকে আজ গালি দিতে ইচ্ছে করে। করে তো খাচ্ছিলি ব্যাটা, তবে কেন দিতে গেলি প্রাণ? বল কেন গেলি? আরে আহাম্মক, তোকে আর ‘শহীদ’ বলবো না। শহীদ তাকেই বলে, যিনি আদর্শের জন্য প্রাণ দেন। তুই কি জানতিস না, যাদের জন্য প্রাণ দিলি তাদের আদর্শ-ফাদর্শ বলে কিছু নেই? কবর ফুঁড়ে এসে দেখে যা, তোর সাধের গণতন্ত্রের প্রতিমা চিত্র থেকে এখন শুধুই পোড়া গন্ধ বেরোয়। তুই মরেছিলি গুলিতে, এতদিন বেঁচে থাকলে মরতি পেট্রলবোমায়।
সংসদীয় গণতন্ত্রের বর্তমান পর্বে অর্থাৎ ২০১৫ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উত্তরপত্রে কোনো ছাত্র যদি লেখে- হাসিনা-খালেদার সংসদীয় গণতন্ত্র এরশাদের রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির চেয়ে ভালো- শিক্ষক উপযুক্ত হলে তিনি পাস মার্ক দেবেন কি-না সন্দেহ। হ্যাঁ, কোন্ সেই প্যারামিটার, যা দিয়ে মেপে বলা যাবে এরশাদের আমল এখনকার চেয়ে খারাপ ছিল? আমরা বঙ্গবন্ধুর গণতন্ত্র দেখেছি, দেখেছি হাসিনা-খালেদার গণতন্ত্র। বিতর্কটা আমিই তুলছি যে, এ দেশে বর্তমান ধারার গণতন্ত্র উপযুক্ত, নাকি বিনেভোলেন্ট ডিক্টেটরশিপ ভালো? হ্যাঁ, বিতর্ক করা ছাড়া সিদ্ধান্ত টানা চলবে না। কারণ সামরিক শাসনের ‘মারো ডাণ্ডা, করো ঠাণ্ডা’ আর এখনকার ‘মারো বোমা, পাল্টাও খোমা’- এ দুয়ের পার্থক্যটা বের না করে সোজা বলে দিলাম- হাসিনা-খালেদার গণতন্ত্রই ভালো- তা হবে না। যা হোক।
আমরা এখন দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলবো। টেলিভিশনের টকশো ও পত্রিকার কলামে অনেকেই চেষ্টা করছেন পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার। প্রথমেই বলতে হয়, মিথ্যার একটা বড় গুণ এই যে, সে শ্রোতার কাছ থেকে বিশ্বাসযোগ্যতা দাবি করে। যে মিথ্যায় বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, তা মিথ্যা নয়, উদ্ভট। আবার সত্যের একটি দোষ আছে, কখনো কখনো সে মিথ্যার মতো বেজে ওঠে। বক্তা বা লেখক কীভাবে মিথ্যার বিশ্বাসযোগ্যতা দাবি করছেন অথবা তাদের সত্য কীভাবে মিথ্যার রঙ ছড়ায়, তা ধরতে না পারলে টকশো শুনে কিংবা কলাম পড়ে কিছুই বোঝা যাবে না।
বর্তমান অবস্থাটা আসলে কীভাবে তৈরি হয়েছে? রাজনীতি হচ্ছে এক ধরনের ফসকা গেরো, সুতোর ঠিক প্রান্ত ধরে টানলেই ফক্কা; কিন্তু সূত্র ভুল হলেই তৈরি হয় ফাঁস। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই ভুল সূত্রে নিজ নিজ গলায় ফাঁস লাগিয়েছে। একতরফা নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ আর পেট্রলবোমা চালু করে বিএনপি। বলা বাহুল্য, এই দুই দলের গলার ফাঁস সমগ্র দেশবাসীকেও ফাঁসিয়ে দিয়েছে। দল দুটি তাদের ফাঁস কীভাবে খুলবে অথবা আদৌ খুলতে পারবে কি-না, সেটা তারাই স্থির করুন। কথা হচ্ছে, আমাদের গলায় যে ফাঁস পরিয়ে দেয়া হয়েছে, তা কি আমরা খুলতে পারবো?
এ বড় কঠিন টাস্ক। দেশে নির্দলীয় মানুষের চেয়ে দলভুক্ত মানুষের সংখ্যা বেশি, না কম, সেই হিসাবে না গিয়ে বলা যায়, দলভুক্তরা সংঘবদ্ধ বলে তারা নির্দলীয়দের চেয়ে বেশি শক্তি ধারণ করে। জাতি ফাঁসমুক্ত হতে পারে কেবল তখনই, যদি দলভুক্তদের একটা বড় অংশ এবং নির্দলীয়রা অকৃত্রিম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সিনা টান করে পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাঠে নামতে পারে। স্বপ্নটা মধুর, তবে অলীক। প্রথমত, দেশপ্রেম মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিগুলোর অন্যতম হলেও এ দেশবাসীর দেশপ্রেম এখন লুপ্তপ্রায়, পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে তা। আমরা এখন যেমন মসলিন কাপড়ের গল্প করি, একটা সময় হয়তো আসবে, যখন বাঙালি গল্প করবে- একদা এ দেশে এক ধরনের মানুষ ছিল, যারা ভাষার জন্য বুকের জামা খুলে হাঁক ছেড়েছিল- করো গুলি; স্বাধীনতার জন্য দালাল চিৎকারে নিজের বাবাকে পর্যন্ত গুলি করেছিল। সেই দেশপ্রেমিক মানুষ ধীরে ধীরে আপনপ্রেমিক হয়ে উঠেছে। পরার্থ বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই তার মধ্যে। সে এখন রাষ্ট্র বোঝে না, গৃহ বোঝে; সমষ্টি বোঝে না, ব্যক্তি বোঝে; টোকাই বোঝে না, সন্তান বোঝে; হৃদয় বোঝে না, বস্তু বোঝে; দায়িত্ব বোঝে না, প্রতিষ্ঠা বোঝে; প্রতিবাদ বোঝে না, পলায়ন বোঝে; বমি করতে জানে না, হজম জানে- সে এখন দুই নয়ন মেলে তাকাতেও পারে না, চোখ বন্ধ করে থাকতে ভালোবাসে।
বস্তুত সারা জাতি আজ এক কঠিন অসুখে আক্রান্ত, দেশপ্রেমের ঘাটতির অসুখ। AIDS-এর চেয়ে ভয়ংকর এ অসুখের নাম APDS (Acquired Patriotism Deficiency Syndrome)। কেন ভালোবাসবে মানুষ রাষ্ট্রকে? রাষ্ট্র কি ভালোবাসে তাকে? একতরফা প্রেম কখনও, কোনোকালে হয়েছে কোথাও? যদি বলি রাষ্ট্র তার সকল বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে এক অতি মামুলি ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে, খুব কি বাড়াবাড়ি হবে সে কথা? রাষ্ট্র তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে বলেই চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারীকে পুলিশের হাতে দিতে চায় না মানুষ, আইন তুলে নেয় নিজের হাতে। এতই বিচ্ছিন্নতা অনুভব করে মানুষ রাষ্ট্রের সঙ্গে। দুই নেত্রী যখন জনতাকে কাছে টানতে দেশপ্রেমের আবেগ উসকে দিতে চান, তখন হাসি চেপে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আবেগেরও একটি বস্তুগত ভিত্তি থাকে। গনগন আগুনের পাশে বসে প্রেমালাপ করবো, নাকি চামড়া বাঁচাবো? মানুষের দেশপ্রেমকে এখন হংসলতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। শীতে (মুক্তিযুদ্ধের সময়) একরাশ ফুল ফুটিয়ে শুকিয়ে গেছে; অবশ্য গোড়া সজীব রয়েছে। বর্ষার জল (পরিশুদ্ধ নেতৃত্ব) নামবে যখন, তখন ডাল বেরিয়ে নতুন ফুলের জন্ম হবে আবার। সেই নেতৃত্ব এমন হবে, যার বক্তৃতা শুনে অন্ধ শ্রোতা চক্ষুষ্মান হয়ে সামনের দিকে তাকাবে, বধির শ্রবণশক্তি ফিরে পেয়ে দৌড়াবে কলকারখানার দিকে, খঞ্জ উঠে হেঁটে যাবে ক্ষেতে-খামারে, আতুর (নবপ্রজন্ম) প্রাণ সঞ্জীবনী সুধা পেয়ে দাপাদাপি করে মাতিয়ে রাখবে দেশ।
ফিরে আসি বর্তমান অবস্থায়। একটি বেসরকারি মন্তব্য এখন আদালতের রায়ের সমান মর্যাদা ভোগ করছে। মন্তব্যটি- এরা কি মানুষ? টেলিভিশনে নাটক দেখতে দেখতে কখনও নিজের অজান্তেই বলে উঠতে হয়- এসব কী? এর নাম নাটক? ঠিক তেমন, মানুষ এখন অহর্নিশ বলে চলেছে- এর নাম রাজনীতি? লক্ষ করার বিষয়, পেট্রলবোমা নিক্ষিপ্ত হচ্ছে সাধারণ গতরখাটা মানুষের ওপর, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নয়। কারণটা রাজনীতির আলিফ-বে-তে-ছে জানা লোকটাও ধরতে পারে। বোমা নিক্ষেপকারীরা এমন নিয়ম প্রতিষ্ঠা করতে চায় না, যে নিয়মের বলে তারা ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের অবরোধকারীরা তাদের ওপর বোমা মারবে। ফলে মরে মরুক সাধারণ মানুষই। পাঠক আরও লক্ষ করুন, বর্তমান সরকার যে সংসদ কর্তৃক বিচারপতি অপসারণের আইন করেছে, বিএনপি সেই কালাকানুনের বিরোধিতা করছে না। কারণ, এটি তাদেরও কাজে লাগবে। আবার দেখুন, সাংবিধানিক আরও অনেক সংস্থা থাকতে বিএনপি শুধু নির্বাচন কমিশনের সংস্কার চায়, বাকিগুলোর নয়। এখানেও কারণটা না বোঝার মতো বেকুব নেই নিশ্চয়ই। নির্বাচন কমিশন হলো ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যম। দুর্নীতি দমন কমিশন? এর সংস্কার করলে ক্ষমতায় গিয়ে দুর্নীতি করবো কীভাবে?
হ্যাঁ, পেট্রলবোমা হামলা সরকার যেহেতু বন্ধ করতে পারছে না, তাই চলুন আমরা একটা কাজ করি। কোরআনের সূরা লাহাবের এক জায়গায় বলা হয়েছে- লাহাবের ওপর অভিসম্পাত বর্ষিত হোক। আমরাও সেভাবে প্রার্থনা করতে পারি- পেট্রলবোমাবাজদের ওপর আল্লাহর গজব নাজিল হোক।
বিএনপি নেতৃত্ব কেন অবরোধ তুলে নিচ্ছে না, বোঝা ভার। নিজেদের স্বার্থেই তো বন্ধ করা উচিত এভাবে সাধারণ মানুষ হত্যা। ধরা যাক, পেট্রলবোমায় আরও দু’চারশ মানুষ দগ্ধ হওয়ার পর সরকার একটা আপস ফর্মুলায় এলো এবং সে অনুযায়ী নির্বাচন হলো, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতাও পেয়ে গেল তাতে। সেক্ষেত্রে তারা কতদিন ধরে রাখতে পারবেন ক্ষমতা? কারণ ইতিমধ্যে প্রমাণ হয়ে গেছে যে মাস দেড়েক-দুয়েক অবরোধ, পেট্রলবোমা ইত্যাদি অব্যাহত রাখতে পারলে সরকারের কাছ থেকে যে কোনো দাবি আদায় করা সম্ভব। আওয়ামী লীগ কি তখন সেই সুযোগ নিতে চাইবে না? আর যদি চায়, এই দলের কর্মীদের চেয়ে বেশি পেট্রলবোমা আর কে নিক্ষেপ করতে পারবে? সুতরাং বিএনপির উচিত হবে না এমন কোনো নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা, যে নিয়মের ফাঁদে একদিন তাদেরই পড়তে হবে।
নেতা-নেত্রীদের কথায় এখন ‘ই’ প্রত্যয়ের ছড়াছড়ি। তারা ‘ই’ যোগ না করে বাক্য শেষ করতে পারেন না। যেমন, তারা বলেন না- এ সরকারের পতন হবে; বলেন- পতন হবেই। ওদিকে আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীরা বলেন- বিএনপি-জামায়াতের নাশকতা বন্ধ হবেই। ইতিহাসে এই ‘ই’ প্রত্যয় যে কতবার মার খেলো, তার হিসাব কি তারা রাখেন? ভদ্রলোক অথবা বিবেচকরা কখনো যেখানে-সেখানে ‘ই’ প্রত্যয় ব্যবহার করেন না। এটা ব্যক্তিত্বের প্রশ্নও বটে। একটা কথা ফললো না- এ কি কম অবমাননাকর?
তাই বলি কী, এসব ছাড়েন। রবীন্দ্রনাথ একটা দামি কথা বলেছিলেন (অবশ্য তার কোন্ কথাটা দামি নয়?)। বলেছেন, মানুষ পণ করে পণ ভাঙ্গিয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিবার জন্য। আপনারাও পণ ভেঙ্গে হাঁফ ছাড়ুন। হ্যাঁ, দুই পক্ষই।
পুনশ্চঃ সম্প্রতি এক টকশোতে আমার এক অনুজপ্রতিম পণ্ডিত, যিনি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ছাড়া কথা বলতে পারেন না, নানা তত্ত্বকথা ঝেড়ে যা বললেন, তার মানে দাঁড়ায় অনতিবিলম্বেই এ সরকারের পতন ঘটবে। তার কথা শুনতে শুনতে জার্মান কবি গ্যয়টের (Goethe) একটি কোটেবল কোট মনে পড়লো : All theory is gray my friend. But forever green is the tree of life- বাংলায়- তত্ত্ব ধূসর বন্ধু হে, জীবনবৃক্ষই চির হরিৎবর্ণের। রুশ বিপ্লবের আগে অতি তাত্ত্বিকরা যখন অতিমূল্যায়নে পরিস্থিতির অপব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন, লেনিন এই কথাগুলোর উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন তখন। হ্যাঁ, তত্ত্ব দিয়ে সবকিছু বোঝা যায় না। জীবনঘনিষ্ঠতাই জ্ঞানের প্রকৃত উৎস।
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
mahbubkamal08@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.