রাজনীতির ভাগ্যাকাশে পরিবর্তনের হাতছানি by সিরাজুর রহমান

ছায়া পূর্বগামী। সূর্য যতই অস্তাচলের পথে তলিয়ে যাবে, ছায়াগুলো ততই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকবে। ঠিক বর্তমান সরকারের মন্ত্রীদের মতো। এদের পতন অত্যাসন্ন। কিন্তু তাদের হুঙ্কার, গালিগালাজ ততই কান-ফাটানো হচ্ছে, দমনপীড়ন ততই অমানুষিক হচ্ছে। ঠিক অস্তগামী সূর্যের দীর্ঘায়মান ছায়ার মতো। দিন কয়েক আগে ইন্টারনেটে একটা গুজব ছড়াচ্ছিল, ক্ষমতাশালী ২১ ব্যক্তি নাকি নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার শর্ত আদায় করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। এদের অনেকেই নাকি পরিবার-পরিজন আগেই বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এ সরকারের ভাগ্যাকাশে ছায়া পূর্ব দিকে সরতে শুরু করে গত বছর মে মাসের পর থেকেই। ভারতের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল গরিষ্ঠতায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটকে পরাস্ত করেছে। নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন। আগেও আঁচ করা হয়েছিল এবং এখন প্রমাণিত হয়েছে, মোদি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা ধনতন্ত্রের সাথে ভারতের গাঁটছড়া বাঁধতে চান। এ দিকে বাংলাদেশের সরকার বালুর উত্তাপের মতো দিল্লির কংগ্রেসি সরকারের খুঁটির জোরে ধরাকে সরাজ্ঞান করছিল। পাঁচ বছর ধরে মনমোহন সিংয়ের সরকার বাংলাদেশের মানুষকে হেনস্তা দেখিয়ে আওয়ামী লীগের সাথে বন্ধুত্ব করেছে। মনমোহনের সূর্য ডোবায় বালুও শীতল, সরকারের এখন লেপ-কম্বলের প্রয়োজন।
আওয়ামী নেত্রীর সাথে অনেক গোপন চুক্তি করেছিল দিল্লি ২০১০ সালে- বাংলাদেশের মানুষ শুধু সেটাই জানে। কতগুলো চুক্তি হয়েছে এবং কী সম্বন্ধে, আজো কেউ জানে না। দেশের মানুষ গভীর হতাশা আর বিস্ময়ে দেখেছে- তাদের সড়ক, রেল, নদীপথ, নদী ও সমুদ্রবন্দরগুলো বিনা মাশুলে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে; আমাদের বাণিজ্যকে ভারতের শোষণের অনুকূল করে ঢেলে সাজানো হয়েছে; বাংলাদেশের তরুণ ও যুবকেরা অন্নের সন্ধানে সুদূর বিদেশে অজ্ঞাত ভবিষ্যতের পথে পাড়ি দিয়েছে, পথেই প্রাণ দিয়েছে অনেকে; বিদেশের কারাগারে পচে মরেছে। অথচ বিপুলসংখ্যক ভারতীয় বাংলাদেশের শাঁসালো চাকরিগুলো হাতিয়ে নিয়েছে এবং তাদের রেমিট্যান্সে ভারতের অর্থনীতি স্ফীত হচ্ছে।
যেকোনো মূল্যে আওয়ামী লীগ সরকারকে গদিতে রাখার প্রতিশ্রুতি ভারত দিয়েছিল। বস্তুত সে লক্ষ্যেই ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ঢাকার একটি পত্রিকা গোষ্ঠী, সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ এবং ভারতের হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছিলেন। এই তিন পক্ষের ভুয়া আশ্বাসে মার্কিন দূতাবাসও সে ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েছিল। এরই পরিণতিতে ২০০৮ সালে মাস্টারপ্ল্যানের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিপুল গরিষ্ঠতা দেয়া হয়। নতুন সরকার ক্ষমতা পাওয়ার সূচনা থেকেই প্রশাসন, পুলিশ, নিরাপত্তা বিভাগগুলোসহ সরকারের প্রায় সব বিভাগের দলীয়করণ এবং সংবিধান নিয়ে নানা কারসাজি করে একদলীয় বাংলাদেশ গড়ার আয়োজন হয়। একই লক্ষ্যে মূল বিরোধী দল বিএনপিকে সমূলে ধ্বংস করার চেষ্টায় গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন এবং সাজানো মামলা ও গ্রেফতার ইত্যাদি শুরু হয়ে যায়।
ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ও বাংলাদেশ
ওবামা রাষ্ট্রভার গ্রহণ করেন শেখ হাসিনার কয়েক দিন পরই। ঢাকার আওয়ামী লীগ সরকারের এবং দিল্লির কংগ্রেসি সরকারের আসল মতলব বুঝে উঠতে ওয়াশিংটনে ওবামা সরকারের বিলম্ব হয়নি। কিন্তু বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কট, ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ গুটিয়ে আনা, ফিলিস্তিনি-ইসরাইলি সঙ্কট, পারমাণবিক গবেষণা প্রসঙ্গে ইরানের সাথে বিরোধ এবং সিরিয়ার ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ও তার বৃহত্তর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে ওয়াশিংটন হিমশিম খাচ্ছিল। ভবিষ্যতের পরাশক্তি ভারতের সাথে পাঞ্জা লড়ার মতো অবস্থা ওবামা প্রশাসনের ছিল না। তবে দুই সরকারের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল না। ঢাকার সরকার তার অনেক সুযোগ নিয়েছে।
কথায় বলে- ‘যে হাত খেতে দেয়, সে হাত কামড়াতে নেই’। হিত বাণীগুলো জানার কিংবা শোনার ধৈর্য অর্বাচীন ও মাথাগরম মন্ত্রীদের ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ঋণ ও অনুদানের প্রধান উৎস এবং বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজার ছিল। শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের বৃহত্তম বাজারে পরিণত হয়। সবচেয়ে বড় কথা, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, এমনকি ওয়াশিংটনের ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর মার্কিন নীতির প্রভাবের কথা ভুলে গিয়ে ঢাকার মন্ত্রীরা কারণে-অকারণে যুক্তরাষ্ট্রের লেজে চিমটি কেটেছেন। এমনকি মার্কিন কূটনীতিকদের অপমান করার কোনো সুযোগ ছাড়েননি। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও সফরকারী মার্কিন মন্ত্রীদের সাথে দেখা করতে অস্বীকার করেছেন। কেবিনেট মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে এ ব্যাপারে ‘চ্যাম্পিয়ন’ বলতে হবে। কিছু দিন আগে সর্বশেষ রাউন্ডে তিনি সফররত একজন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘দুই আনার মন্ত্রী’ এবং রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনাকে ‘বাসার চাকর মর্জিনা’ বলে অপমান করেছিলেন।
ভারতে ও বাংলাদেশে ভাষ্যকার ও বিশ্লেষকেরা আঁচ-অনুমান করছিলেন যে ওয়াশিংটনের সাথে নতুন ঘনিষ্ঠতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বাংলাদেশ নীতির ওপর প্রভাব ফেলবে। কিন্তু দিল্লির নীতিতে সম্ভাব্য কোনো পরিবর্তন এত দিন লক্ষ করা যায়নি। অবশ্য সে বিলম্ব ঘটেছে স্বাভাবিক কারণে। কংগ্রেস সরকারগুলোর আমলে ভারতের পররাষ্ট্র নীতিনির্ধারণ ক্রমান্বয়ে গোয়েন্দা সংস্থা র-এর হাতে চলে যায়। র-এর শাখা-প্রশাখা ও শিকড় দেশটির পররাষ্ট্রনীতির সর্বস্তরে পোক্ত হয়ে গেড়ে বসেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি নীতিনির্ধারণ আবার মন্ত্রিপর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে চান, কিন্তু হঠাৎ করে র-কে নাড়া দিতে চাননি। বাংলাদেশে বিরোধী দলগুলো দিল্লির সরকারের বিদেশনীতিতে পরিবর্তনের লক্ষণ খুঁজছিল। তার চেয়েও বেশি আগ্রহ নিয়ে সে দিকে তাকিয়ে আছে শেখ হাসিনার সরকারও। ভারতের শাসক দল বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ অফিসে তালাবন্দী খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করায় সরকারে ও মন্ত্রিপাড়ায় সে জন্যই ‘গেল গেল’ আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল।
সময় থাকতে সাবধান হলে ভালো হতো
সে আতঙ্ক ছাড়াও বিএনপিকে ৫ জানুয়ারি সমাবেশ করতে না দিয়ে সরকার নিজেদের গলার ফাঁস আরেকটু ‘টাইট’ করে ফেলেছে। এখন স্পষ্ট যে, সরকারের মন্ত্রী এবং তাদের নতজানু পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তারাও সে ভুল বুঝতে পেরেছেন। উভয় মহল থেকেই এখন ‘আবার আবেদন করিলেই অনুমতি’ কথা ক’টি ঘন ঘন উচ্চারিত হচ্ছে। এই বোধোদয় আগে ঘটলে সবার জন্য ভালো হতো। বিরোধী দলের সমর্থকদের নিরুৎসাহিত করা এবং বিদেশী প্রভুদের এ কথা বোঝাতে যে, দেশবাসী খালেদার সাথে নেই- মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা স্লোগান দিয়ে যাচ্ছিলেন, খালেদা জিয়া আন্দোলন করতে জানেন না এবং বিরোধীদের আন্দোলন ‘এক সপ্তাহের’ মধ্যেই ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেয়া হবে। মিথ্যাবাদীর অনিবার্য পরিণতির মতো নিজেদের মিথ্যার জালে তারা নিজেরাই জড়িয়ে পড়েছিলেন। এখন একে একে প্রমাণিত হচ্ছে, প্রতিটি ব্যাপারে তারা ভ্রান্ত পদক্ষেপ নিয়েছেন।
সরকারের ও মন্ত্রীদের গায়ের জ্বালা সে জন্যই অসহ্য হয়ে উঠেছে। উল্টোপাল্টা বলেছেন এবং আবোল-তাবোল বকছেন তারা। নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের প্রধান আসামি র‌্যাব অফিসারের শ্বশুর যে মন্ত্রী, তিনি খালেদা জিয়াকে ডাইনি বলে গাল দিয়েছেন। আরো একাধিক মন্ত্রী তো অভিধান ঘেঁটে গালিগুলো লিখে নিচ্ছেন খালেদার বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য। খালেদার অরাজনৈতিক পুত্র কোকোর জানাজায়ও দেশের মানুষের ঢল নামায় কারো কারো মাথা আরো খারাপ হয়ে গেছে। বলতে চেয়েছেন যে, ‘শকুনের অভিশাপে গরু মরে এবং তার ও আওয়ামী লীগের অভিশাপে কোকো মারা গেছে।’ আস্তাগফিরুল্লাহ। 
মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও বিশ্বসমাজ
 আন্দোলন দমনের নামে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রভৃতি মানবাধিকার সংস্থা সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও খালেদাকে গালি আর তার বিরুদ্ধে নির্যাতনের হুমকি দিতে মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। জাতিসঙ্ঘ, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্ট থেকেও ঘন ঘন হুঁশিয়ারি আসছে সরকারের কাছে। তা সত্ত্বেও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে (তাকে সমেত?) পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আট শ’ বছর আগে ইংরেজ রাজা জন ম্যাগনাকার্টা চুক্তিতে সই করেছিলেন। সে চুক্তির প্রধান কথা হলো, রাজা কিংবা রানীও প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে নন। তখন থেকে সভ্য বিশ্বের শাসকেরা মোটামুটি সেই শর্ত মেনে চলেছেন। সরকারপ্রধানের কথায় ও কাজে মনে হতে পারে, তিনি নিজেকে সব আইনের ঊর্র্ধ্বে বিবেচনা করেন। তিনি পুলিশ-র‌্যাবকে ‘যেকোনো উপায়ে’ (এমনকি আইনবহির্ভূত হলেও?) বিএনপির আন্দোলন-অবরোধ দমন করার হুকুম দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের আগাম অব্যাহতি ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, আন্দোলন দমনের ব্যাপারে তারা যেকোনো ব্যবস্থাই নিন না কেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে তার সব দায়দায়িত্ব নেবেন।
এই উক্তি আন্তর্জাতিক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আভাস পাওয়া যাচ্ছে, দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির সরকারও পুলিশকে এই নির্দেশ দান এবং খালেদা জিয়াকে ১৯ ঘণ্টা তার সদ্যবিধবা পুত্রবধূ ও দুই নাতনী নিয়ে অন্ধকার বাড়িতে থাকতে বাধ্য করায় উদ্বিগ্ন। মোদির সরকার বাংলাদেশনীতি চূড়ান্ত করার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কথা বলতে চায় না। কিন্তু সেটা হাসিনার সরকারের জন্য যথেষ্ট নয়। এ সরকারের এখন অস্তিত্বের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। তেমন কোনো মহলেরই সমর্থন তার পক্ষে নেই। দিল্লি কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও দলে ও সরকারে মনোবল ধরে রাখা যেত। বস্তুত এই মনোবল সঙ্কটের কারণেই মন্ত্রীরা উল্টোপাল্টা বিবৃতি দিচ্ছেন।
দখিনা বসন্তের সুনিশ্চিত আগমনবার্তা
যখন এ কলাম লিখছি, বাইরে তখন চার দিক বরফে সাদা হয়ে আছে। আর ভীষণ শীত। বাংলাদেশে এখন মাঘের শেষার্ধ। শুনছি, শীত কমে আসছে। শিগগিরই বাতাস উত্তর থেকে দক্ষিণমুখী হবে। সেটা এই সুনিশ্চিত আশ্বাস যে, বসন্ত এলো বলে। পরিবর্তনের লক্ষণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশেও কিছু দেখা যাচ্ছে। ২০০৬-০৮ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনে ঘসেটি বেগমের ভূমিকা নিয়েছিলেন ভারতীয় হাইকমিশনার বীণা সিক্রি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনে সমর্থন দিতে এসেছিলেন সুজাতা সিং। অত্যন্ত শক্তিধর কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। ভারতীয় পররাষ্ট্র দফতরের সচিব। কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধীর প্রিয়পাত্রী এবং র-এর বরকন্যা। তার পিতা টি ভি রাজেশ্বর এক কালে র-এর ডাকসাইটে মহাপরিচালক ছিলেন। এটা কি তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো রাতের বেলা সুজাতাকে জানিয়ে দেন, অবসর গ্রহণের মাত্র সাত মাস আগে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে? স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা এর আগে মাত্র একবারই ঘটেছিল। ২৮ বছর আগে প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধী চলমান একটি সংবাদ সম্মেলনে আকস্মিকভাবে ঘোষণা করেন যে, তিনি পররাষ্ট্রসচিব এ পি ভেঙ্কটেশ্বরণকে বরখাস্ত করছেন।
 তাৎপর্য খুঁজতে হলে আরো উপাদান আছে। সুজাতা সিংকে বরখাস্ত করা হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভারত সফরের মাত্র এক দিন পরে। নতুন পররাষ্ট্রসচিব নিযুক্ত হয়েছেন সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর। নতুন নিয়োগের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন ওয়াশিংটনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাথে তিনি সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অত্যন্ত সফল ওয়াশিংটন সফরের আয়োজনে তার বিশেষ ভূমিকা ছিল।
জাতিসঙ্ঘের হুঁশিয়ারি
বাংলাদেশে সবার গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির সমালোচনা করে জাতিসঙ্ঘ থেকে বহু বিবৃতি দেয়া হয়েছে। মহাসচিব বান কি মুন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছেন, জাতিসঙ্ঘের একাধিক পদস্থ কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফরও করেছেন। নিশ্চয়ই, দিল্লির খুঁটির জোরে শেখ হাসিনা বিশ্বসভার সেসব তৎপরতাকে পাত্তা দেননি। কিন্তু মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিভেন ডুজারিক গত ২২ জানুয়ারি নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তাতে ঢাকার সরকারের টনক না নড়েই পারে না। কূটনৈতিক ভাষায় তিনি খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার কিংবা তার বিরুদ্ধে নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা নেয়ার বিরুদ্ধে ঢাকাকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।
 এটা জানা কথা যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বহু দেশে জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে কর্মরত আছে। সে বাবদ মোটা অঙ্কের ডলার রোজগার করা সম্ভব হচ্ছে। স্টিভেন ডুজারিক বলেছেন, যারা বিদেশে শান্তি রক্ষা করবে বলে আশা করা হয়, তাদের উচিত স্বদেশেও শান্তি রক্ষায় ভূমিকা রাখা। এ কথার তাৎপর্য গভীর। প্রকারান্তরে তিনি বাংলাদেশ  কোনো প্রকার অভ্যুত্থান অথবা নির্যাতনের পক্ষ নেয়ার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।
 ইতোমধ্যে বেগম খালেদা জিয়া তার কার্যালয়ে পুরো এক মাস অতিক্রম করলেন গৃহবন্দী দশায়। তার সাথে দেখা করতে আসাও যেন মহাপাপ। নিছক পুত্রশোকে সমবেদনা জানাতে এসেও গ্রেফতার হচ্ছেন আগতরা। তার দলের ও জোটের উল্লেখযোগ্য নেতারা সবাই গ্রেফতার হয়ে গেছেন। এখন আর নেতা পাচ্ছে না র‌্যাব-পুলিশ এবং বিজিবিÑ যাদেরকে হত্যা-নির্যাতন চালানো থেকে দায়মুক্তি  দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। সাড়ে আট হাজার নেতাকর্মী কারাগারে। খালেদা জিয়া নিজেও কার্যালয়ের বাইরে বেরোতে অপারগ। এমনকি তার স্যাটেলাইট ডিশ, ইন্টারনেট, টেলিফোন ও মোবাইল বিচ্ছিন্ন। বেগম জিয়াকে গ্রেফতার করে কী করবে এই সরকার? এ আন্দোলন প্রকৃতই গণ-আন্দোলন। খালেদা জিয়ার কপালে যা-ই থাকুক, এ আন্দোলন চলছে এবং চলবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশের শেষ মানুষটিও নেতৃত্ব দেবে। এ আন্দোলনের পরাজয় নেই।
লন্ডন, ০৩.০২.১৫
serajurrahman34@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.