সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় জয়নাল হাজারী by শাহজালাল রতন,

বুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছেন জয়নাল হাজারী। ফেনীর আলোচিত-সমালোচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি জয়নাল হাজারী শীর্ষমহলের নির্দেশ পেলেই ফেনীতে ফিরে আসবেন। শুরু করবেন রাজনীতি। শীর্ষমহল যখন বলবেন তখনই যাবেন, তার আগে নয়। হাজারী বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে শামীম ওসমান জয় পেলেই তার পথ পরিষ্কার হবে। তিনি তারই অপেক্ষায় রয়েছেন। ফেনীর রাজনীতি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন এমন লোকজন জানান, ফেনী জেলা আওয়ামীলীগর সাবেক সাধারণ সম্পাদক


ও তিন তিনবারের এমপি জয়নাল হাজারী বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন। ২০০১ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিশেষ অভিযানের মুখে জয়নাল হাজারী ফেনী ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর হাজারী দেশে ফিরে আসেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ ও তার বিরোধীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হলে বছর দেড়েক আগে তিনি ফেনী ত্যাগ করেন। তখন থেকেই তিনি ঢাকায় আছেন।
হাজারীর রাজনীতি
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে জয়নাল হাজারী আলোচনা-সমালোচনার মধ্য গগনে অনেক ভেসেছেন। প্রায় তিন দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি যখন বিরোধী দলে ছিলেন তখনও ফেনীর রাজনীতিকে নিজের হাতের মুঠোয় রাখতে সক্ষম হন। রাজনৈতিক জীবনে কখনও তিনি যুদ্ধ করেছেন জাতীয় পার্টির নেতা ও সাবেক মন্ত্রী জাফর ইমাম এবং তার টাইগার বাহিনীর বিরুদ্ধে। কখনও বিএনপি ও ভিপি জয়নালের বাহিনীর বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের অভিমত, হাজারী ভালো-মন্দ যেমনই হোন, দলের অনেক নেতাকর্মী তাকে এখনও 'দেবতা' মনে করে থাকেন।
১৯৯৬ সালে দল ক্ষমতায় এলে জয়নাল হাজারী হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। গঠন করেন ভয়ঙ্কর স্টিয়ারিং বাহিনী। ক্রমশ বিতর্কিত হতে থাকেন তিনি। তার স্টিয়ারিং কমিটির প্রায় ৫ হাজার সদস্য প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে সর্বত্র মহড়া দিয়ে ফেনী জেলার সব এলাকায় তাদের আধিপত্য বিস্তার করে।
বিভিন্ন ঘটনায় হাজারী পলাতক থাকা অবস্থায় হাজারীবিরোধী একটা শক্তি ফেনীতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। জানা যায়, হাজারীবিরোধী শক্তিকে ঢাকায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত একটি প্রভাবশালী মহল রাজনৈতিকভাবে সহযোগিতা করতে শুরু করে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছুদিন কারাগারে থেকে তিনি বের হয়ে আসেন ও রাজনীতিতে যোগ দেন। ততদিনে ফেনী নদীর পানি অনেক দূর গড়িয়েছে। হাজারীবিরোধীরা তার এককালের সহযোগী যুবলীগ নেতা নিজাম হাজারীর সঙ্গে হাত মেলান। হাজারীর স্টিয়ারিং কমিটির অনেকেই তাকে ত্যাগ করেন। এর মধ্যে রয়েছেন স্টিয়ারিং কমিটির অন্যতম সচিব ফুলগাজীর উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি দাগনভূঞা উপজেলা চেয়ারম্যান দিদারুল কবির রতন, সাধারণ সম্পাদক শুসেন শীল, জেলা যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির আদেল, জেলা কৃষক লীগ সাধারণ সম্পাদক পৌর কাউন্সিলর আশরাফুল আলম গিটার, জয়নাল হাজারীর পিএস জয়লস্কর ইউপি চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ মিলন প্রমুখ। দু'পক্ষের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। হাজারী বাহিনী ও নিজাম বাহিনী প্রায় প্রতিদিন সংঘর্ষে লিপ্ত হতে থাকে। হাজারী সমর্থকরা অভিযোগ করেন, জেলা প্রশাসন ও ফেনী সদর থানার তৎকালীন ওসি জয়নাল হাজারী সমর্থকদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন ও ধরপাকড় চালিয়ে নাজেহাল করেন। এ পর্যায়ে জয়নাল হাজারী ঢাকায় চলে যান এবং তার সমর্থকরা হতাশ হয়ে পড়েন।
জয়নাল হাজারী যা বলেন
জয়নাল হাজারী তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পরিকল্পিতভাবে কয়েকটি পত্রিকা তাকে 'গডফাদার' হিসেবে চিহ্নিত করে। দল ক্ষমতায় এলে দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা একটি মহল তাকে কৌশলে দল থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।
তিনি বলেন, এখন অনেক নেতাই আবার স্বপদে বসেছেন। বাকি রয়েছেন কেবল তিনি। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে শামীম ওসমান মেয়র নির্বাচিত হলে তার পথ পরিষ্কার হবে।
তিনি তিনবার ফেনী থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ৪০ বছর ধরে রাজনীতি করছেন। রাজনীতিতে উত্থান-পতন আছেই। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে শামীম ওসমানকে দলনেত্রী মনোনয়ন দিয়েছেন, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে মায়া চৌধুরীকে আবার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আবুল হাসানাত আবদুল্লাহকে বরিশালে দলের দায়িত্বে রেখে কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখা হয়েছে, লক্ষ্মীপুরে আবু তাহেরকে মনোনয়ন দেওয়ায় পৌর মেয়র পদে জয়লাভ করা সম্ভব হয়েছে। এখন বাকি আছেন একমাত্র তিনি। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে দু'জন উপদেষ্টার সঙ্গে তার রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছে। তাদের সঙ্গে বিএনপির চট্টগ্রাম রোডমার্চ নিয়ে কথা হয়েছে। বৈঠকে তিনি স্পষ্ট করে তাদের বলেছেন, নেত্রী দায়িত্ব দিলে তিনি শেষ রক্তবিন্দু দিতে রাজি আছেন।
হাজারীর অভিমত, ফেনীর অবস্থা এখন নাজুক। আওয়ামী লীগের কয়েকজন উপজেলা চেয়ারম্যান ও মেয়রের সিন্ডিকেট বিএনপির সঙ্গে আঁতাত করে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, বালুমহাল লুট করছে। গত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে গণজোয়ার থাকলেও ফেনীতে বিপুল ভোটের ব্যবধানে এ চক্রটি হেরেছে। তিনটি সংসদীয় আসনের একটিও পায়নি আওয়ামী লীগ। তিনি জানান, গত ইউপি নির্বাচনে ফেনীতে সিন্ডিকেটটি কমিশন বাণিজ্য করেছে। তাদের দেওয়া অধিকাংশ প্রার্থী পাস করতে পারেননি।
জয়নাল হাজারী বলেছেন, সরকারের তরফ থেকে গোয়েন্দা রিপোর্ট নেওয়া হয়েছে। জেলার শতকরা ৮০ শতাংশ তৃণমূল নেতাকর্মী তার পক্ষে রয়েছেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি এ প্রতিবেদককে প্রশ্ন করেন, 'আজ যদি আমি কোনো প্রচার ছাড়া হঠাৎ করে ফেনী ট্রাংক রোডে একটা মাইক নিয়ে দাঁড়াই কত লোক জড়ো হবে বলতে পারেন?' পরে নিজেই বলেন, 'কমপক্ষে ১০-২০ হাজার লোক জড়ো হয়ে যাবে।' তিনি বলেন, 'এটাই আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অর্জন।' অবশ্য হাজারীর এই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ফেনীর বাস্তবতার কত মিল রয়েছে তা নিয়ে অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
অন্যরা যা বলেন
ফেনী আওয়ামী লীগের কোনো নেতা এসব ব্যাপারে মুখ খুলতে চান না। জেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আজিজ আহাম্মদ চৌধুরী বলেন, নেত্রী যা করেন, যা করবেন, ফেনী আওয়ামী লীগ তা অবশ্যই মেনে নেবে। হাজারী আসবেন কি-না এ ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান জানান, জেলায় সদস্য সংগ্রহ শুরু হচ্ছে। তারপর একে একে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হবে। কাউন্সিলররা যাকে চাইবেন তিনি নেতৃত্ব পাবেন। হাজারীকে কাউন্সিলররা চাইলে তাকেই দল মেনে নেবে। হাজারীবিরোধীরা বলছেন, জয়নাল হাজারীর সে অবস্থা এখন আর নেই। তিনি বিগত দিনগুলোতে বিভিন্ন সময় দিন-তারিখ দিয়ে আসার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। তার ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়নি।
'জয়নাল হাজারী নেই তাতে কী' খবরের প্রতিবাদ কাল ছাপা হবে
গতকাল মঙ্গলবার সমকালের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত জয়নাল হাজারী ও নিজাম হাজারী সংক্রান্ত খবরের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম, পরশুরাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামালউদ্দিন মজুমদার ও পরশুরাম পৌরসভার মেয়র নিজামউদ্দিন চৌধুরী সাজেল। তাদের প্রতিবাদ ও সমকাল প্রতিবেদকের বক্তব্য আগামীকাল ছাপা হবে। বা. স.

No comments

Powered by Blogger.