সৃষ্টিশীল এক মানুষের নীরব প্রস্থান

আগস্ট এলেই বুকটা কেঁপে ওঠে। কাকে কখন ছিনিয়ে নেবে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। নেয় এমন সব ব্যক্তিত্বকে, যাঁরা আমাদের দেখান আলোর পথ। তেমনি একজন ব্যক্তিত্ব চলচ্চিত্রকার আখতারুজ্জামান। ২৩ আগস্ট অনেকটা নীরবে, নিভৃতে চলে গেলেন সৃষ্টির নেশায় মশগুল থাকা এই মানুষটি। তেমন আলোচিত নন, তবে আলোকিত একজন মানুষ। আত্মমগ্ন ও অভিমানী এই মানুষটি কখনোই প্রচারের আলোয় থাকেননি। কত কত জনকে পৌঁছে দিয়েছেন খ্যাতির সিংহাসনে, আর দূর থেকে তা দেখে মিটিমিটি হেসেছেন। নিজে কখনো সিংহাসনে বসতে চাননি। আত্মমর্যাদাশীল এই মানুষটি অনেক সুযোগ থাকার পরও কখনোই কারও কাছে করুণা চাননি। যতটুকু করেছেন, সবটাই নিজের যোগ্যতা আর সামর্থ্য দিয়ে। যতটা করেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি করার স্বপ্ন নিয়ে ছটফট করতেন। সেটা করতে না পারার অসহায়তা তাঁকে অস্থির করে রাখত।
বাংলার বাণী ভবন থেকে প্রকাশিত হতো সাপ্তাহিক সিনেমা। চলচ্চিত্রবিষয়ক এই পত্রিকা নতুন করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৮৫ সালে পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হয়ে আসেন আখতারুজ্জামান। সাপ্তাহিক চিত্রালীর সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তখন তাঁর বেশ সুখ্যাতি। তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয় সিনেমা পত্রিকার নবযাত্রা। সেই নবযাত্রায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ফাল্গুনী হামিদ, শামীম আলম দীপেন, শাহনেওয়াজ করিম, মুজতবা সৌদ, গুলজার, খান আখতার হোসেন, অশোক দত্ত, মৃদুল সাহা।
১৯৮৭ সালে কর্মরত ছিলাম দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায়। এরশাদ সরকার রাজনৈতিক কারণে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। আমরা সবাই হঠা ৎ বেকার হয়ে যাই। বাংলার বাণীতে কর্মরত আমরা কেউ কেউ সিনেমা পত্রিকাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। সে সময় তাঁকে কাছ থেকে দেখার ও জানার কিছুটা সুযোগ হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি যখন বাংলার বাণী পত্রিকায় যোগ দেন, তখন তাঁকে পাই আরও কাছে। একটু একটু করে চিনতে পারি আত্মকেন্দ্রিক ও লাজুক স্বভাবের এই মানুষটিকে। একজন উদ্যমী, সৃষ্টিশীল, মেধাবী ও প্রাণোচ্ছল মানুষ বলতে যেমনটি বোঝায়, তিনি ছিলেন তেমনই। সব সময় বিভোর থাকতেন সৃষ্টির আনন্দে। পত্রিকার মেকআপ, গেটআপ বর্ণিল করার ব্যাপারে তাঁর জুড়ি মেলা ছিল ভার। চলচ্চিত্র সাংবাদিক হয়েও চটকদার কোনো কিছুতেই বিশ্বাসী ছিলেন না। গসিপ দিয়ে পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর পক্ষপাতী ছিলেন না। ছিলেন না বলেই চলচ্চিত্র অঙ্গনের সবাই তাঁকে সমীহ করতেন, আপন ভাবতেন।
১৯৪৬ সালের ১০ ডিসেম্বর নরসিংদীতে আখতারুজ্জামানের জন্ম। সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে সাংবাদিকতা করেছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। তবে চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তাঁর একটা ভালোবাসার টান। এ কারণেই চলচ্চিত্রের অন্যতম পুরোনো পত্রিকা চিত্রাকাশ দিয়ে তাঁর হাতেখড়ি হয় ১৯৬৬ সালে। এরপর কাজ করেছেন পিপল, নেশন, দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক চিত্রালী, সাপ্তাহিক সিনেমা, দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক মুক্তকণ্ঠ, দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায়। তবে চলচ্চিত্র সাংবাদিক হিসেবেই তাঁর পরিচিতি। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) সাধারণ সম্পাদক হন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি নতুন কিছু করার আশায় নির্মাণ করেছেন সিনেমা। ১৯৮৩ সালে বন্ধু সাংবাদিক রফিকুজ্জামানকে নিয়ে যৌথভাবে নির্মাণ করেন ফেরারী বসন্ত। ছবিটি শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ বাচসাসের ছয়টি পুরস্কার পায়। পরের বছর এককভাবে পরিচালনা করেন প্রিন্সেস টিনা খান। এটি শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ বাচসাসের আটটি পুরস্কার লাভ করে। এরপর নির্মাণ করেন লেখক মঞ্জু সরকারের উপন্যাস নগ্ন আগন্তুক অবলম্বনে একাই এক শ। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ছবিটি আজও মুক্তির আলো দেখতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে নির্মাণ করেন তাঁর জীবনের সেরা ছবি সেলিনা হোসেনের কাহিনি অবলম্বনে পোকামাকড়ের ঘরবসতি। সরকারি অনুদানে নির্মিত হয় ছবিটি। পোকামাকড়ের ঘরবসতি সেরা ছবি হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। এ ছাড়া সেরা পরিচালক, সেরা কাহিনি ও সেরা চিত্রগ্রাহক বিভাগেও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় ছবিটি। একই সঙ্গে পায় বাচসাসের ১০টি পুরস্কার।
পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও একদমই চুপচাপ বসে থাকেননি। বেশ কয়েকটি নাটক ও টেলিফিল্ম নির্মাণ করেছেন। জড়িয়েছেন শিক্ষকতার সঙ্গে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর স্বপ্ন ও কল্পনা চারিত করেছেন তরুণ প্রজন্মের হূদয়ে। চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে দূরে থাকলেও তিনি কখনো থেমে থাকেননি। ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে প্রস্তুতি। দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতির পর সরকারি অনুদান নিয়ে শুরু করেছিলেন সূচনা রেখার দিকে। ছবিটির ৯০ শতাংশ কাজ শেষ করেছিলেন। অসুস্থতার কারণে বাকিটা করতে পারেননি। ছবিটাই শুধু অসম্পূর্ণ রয়ে গেল না, সেই সঙ্গে অসম্পূর্ণ থাকল তাঁর অনেক স্বপ্ন। আমরা হারালাম একজন স্বাপ্নিক ও সৃজনশীল মানুষকে।
দুলাল মাহমুদ
dulalmahmud@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.