খবর- আফগানিস্তান শান্তি কত দূর?' by তৌহিদ আজিজ

আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তালেবান বিরোধী অভিযান চলছে প্রায় এক দশক ধরে। এ লক্ষ্যে তারা দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীকে সরবরাহ করছে অত্যাধুনিক পিস্তল, মেশিন গান, রকেটচালিত গ্রেনেড ইত্যাদি লাখ লাখ অস্ত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের এ বিপুল অস্ত্র সরবরাহকে অনেকেই সমালোচনার চোখে দেখছেন। আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে পাঠানো এসব অস্ত্রের মান নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, সংশয় প্রকাশ করেছেন। সেই স্নায়ুযুদ্ধকালে দেশটিতে সোভিয়েতপন্থী শাসন উৎখাতের জন্য যে অস্ত্র সরবরাহ করা হতো এখনো তাই করা হচ্ছে। তবে পেন্টাগন বলছে, আফগান ন্যাশনাল আর্মিকে ন্যাটো মানের অস্ত্র প্রদানের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
আফগানিস্তানে অস্ত্র সরবরাহের এই বিষয়টিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। ২০০১ সালের শেষের দিকে যৌথবাহিনী এবং সিআইএ'র টিম যখন এখানে প্রথম আসে তখন কিছু কিছু অস্ত্র দেয়া হয় মিলিশিয়াদের । বাকিগুলো সাহায্যকারী ইউনিট এবং আফগান ন্যাশনাল অক্সিলিয়ারি পুলিশকে দেয়া হয়। তবে অস্ত্র পাঠানোর এ প্রক্রিয়া শুধু আফগান যুদ্ধেই হয়নি, বরং এটি শুরু হয়েছিল আরো ৩০ বছর আগে, আফগানিস্তানে সোভিয়েতপন্থী সরকার উৎখাতের সময়। যুক্তরাষ্ট্র তখন বিভিন্ন পন্থায় কখনো মিত্র দেশের মাধ্যমে এগুলো পাঠাতো। তখনকার বাস্তবতা ছিল সোভিয়েত সমর্থিত শাসনের অবসান ঘটানো কিন্তু সোভিয়েত শাসনের উচ্ছেদ হলেও যুক্তরাষ্ট্র পরবতর্ীতে নতুন পথে নামে। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার জন্য আল কায়েদাকে দায়ী করে আফগানিস্তনে তারা অভিযানে নামে। এরপর থেকেই তারা ন্যাটো ও অন্যান্য বাহিনীর মাধ্যমে আফগানিস্তানে জঙ্গিবিরোধী অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
আফগানিস্তানে প্রতিনিয়ত অস্ত্রের ঝনঝনানি ও এর ব্যাপক সরবরাহকে সমালোচকরা ভিন্নভাবে দেখছেন। তাদের মতে, যে ধরনের অস্ত্রশস্ত্র এখানে পাঠানো হচ্ছে তার মান নিয়ে প্রশ্ন তো আছেই পাশাপাশি এর কোন নির্দিষ্ট জবাবদিহিতাও নেই। আর থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। তাদের মতে এর জন্য আন্তর্জাতিক অস্ত্র সরবরাহ গোষ্ঠীর নিম্ন-মানসিকতা দায়ী। এদের মধ্যে অনেকে আবার সরাসরি আফ্রিকা এবং বিভিন্ন দেশে কালোবাজারে এসব অস্ত্রের বিক্রির অভিযোগও তুলেছেন।
দেশটিতে যারা এ অস্ত্র গ্রহণ করছে তাদের অভিযোগ, যদিও এসব অস্ত্র সার্বিক নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে দেয়া হচ্ছে তারপরও এটি বাস্তবে কতখানি কাজে লাগছে তাও প্রশ্নসাপেক্ষ। সরবরাহকৃত এসব অস্ত্রের মধ্যে দুই ধরনের রাইফেল নিয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে। প্রথমটি হলো হাঙ্গেরীর তৈরি এএমডি-৬৫ এবং অপরটি হলো চেকপ্রজাতন্ত্রের ভিজেড-৫৮। যুক্তরাষ্ট্র এগুলো ক্রয় করে আফগান পুলিশকে দিচ্ছে।
এএমডি-৬৫ দেখতে অনেকটা অদ্ভুত ও ছোট আকৃতির। আফগানরা বলছেন এর পারফর্মেন্স অনেকটা নিম্নমানের। ২০০৬ সালে আফগান পুলিশের কাছে এর ব্যাপক ব্যবহার করতে দেখা যায়। তবে আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে এ ধরনের অস্ত্রই তালেবান জঙ্গিরা অনেক সময় হামলা চালিয়ে লুট করে নেয়। সেইসঙ্গে সুবিধাও হচ্ছে অস্ত্রবাহী গাড়িতে খুব সহজে এটি পরিবহন করা যায়। আফগান পুলিশ কেন এ ধরনের অস্ত্র পছন্দ করেন না তার পিছনে অবশ্য তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো এটি কার্যকরী মাত্রার অস্ত্র হলেও রাশিয়ান কালাসনিকভের চেয়েও ছোট। এর দৈর্ঘ্য ১৫ থেকে ১৬ ইঞ্চি। সবচেয়ে বড় কথা হলো এর পারফর্মেন্স আশানুরূপ নয়। দ্বিতীয়টি হলো এটি মেটাল শিট দিয়ে তৈরি হওয়ায় খুব তাড়াতাড়ি গরম হয়ে যায়। আফগানদের অভিযোগ, এটা দিয়ে একনাগাড়ে ৩০ রাউন্ড গুলি ছুঁড়লে তা দিয়ে পরে আর কাজ করা যায় না।
তৃতীয়টি হলো এটি ব্যবহার করতে করতে এক সময় হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। শারজায় আফগান ন্যাশনাল সিভিল অর্ডার পুলিশের সার্জেন্ট আকমাদ ফাইম বলেন, এটি পাঁচবার গুলি ছোঁড়ার পরপরই বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, আমি এ ধরনের অভিযোগের কথা বিগত বছরগুলোতে পুলিশের কাছ থেকে বহুবার শুনেছি। কিন্তু এ বছর এ সংক্রান্ত অভিযোগ বেশি করে আসছে।
এ সকল অভিযোগের বিষয়ে পেন্টাগন বলছে যে, আফগান ন্যাশনাল আর্মিকে ন্যাটোমানের অস্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনার আওতায় আনা হবে। কেননা আফগান সৈন্যদের ইতিমধ্যে এম-১৬ রাইফেল সরবরাহ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের অনেক ইতিবাচক দিকও রয়েছে। তাহলে এর মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের দিকে যাওয়া যায়। এছাড়া এর ফলে পুলিশের মধ্যে এক ধরনের আন্তঃক্রিয়া তৈরির মাধ্যমে পারস্পরিক ঐক্যও গড়ে উঠে। আফগান সীমান্ত পুলিশের পস্নাটুন লিডার লেফট্যান্যান্ট আহমাজ বলেন, আমরা যথার্থ স্থানে গুলি ছুঁড়তে পারি না। যেখানে চাই সেখানে হয় না। তিনি বলেন, এএমডি-৬৫ দিয়ে ৫০ গজ দূরে গুলি ছুঁড়লেও তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। গুলি গিয়ে পড়ে অন্য কোনো স্থানে। তাই এ সকল কারণে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় আফগান যুদ্ধে এ ধরনের অস্ত্র পাঠানোর নেপথ্যে কোন্ দেশসমূহ রয়েছে? এর ডিলারই বা কারা?
সামরিক বাহিনীর প্রদানকৃত তথ্য-উপাত্তে বলা হয়, ২০০৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০০৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পেন্টাগন ৪৫ হাজার এএমডি-৬৫ রাইফেল ক্রয় করেছে। এর জন্য তাদের ১ কোটি ৩৭ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। প্রতিটার দাম পড়েছে গড়ে ৩শ ৪ ডলার। আর এটি অন্যান্য কালাসনিকভ রাইফেলের চেয়েও বেশি দাম। ইরাক এবং আফগানিস্তানের জন্য এ সব অস্ত্র কেনা হয়। এছাড়াও হাঙ্গেরী তার স্টকে অতিরিক্ত থাকায় ৩৯ হাজার এএমডি-৬৫ অনুদান হিসাবে দিয়েছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র হাঙ্গেরীকে কি সুবিধা দিয়েছে তা আমাদের জানা নেই কিংবা তা বলাও কঠিন বিষয়। মূলত মূল্য এবং কূটনীতি এখানে সমানে চলেছে। আফগান যুদ্ধে এ ধরনের অস্ত্র সম্ভার নিরাপত্তাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়া কতখানি নিরাপত্তা বিধান করবে তা বলা কঠিন। তারপরও রয়েছে এসব অস্ত্রের সরবরাহ সম্পর্কে জবাবদিহিতার অভাব। তদুপরি আফগান জনগণের নিরাপত্তা বিধানে যুক্তরাষ্ট্র কতখানি আন্তরিক তাও দেখার বিষয়। কাবুলে মার্কিন কর্মকর্তারা আফগান সেনাদের প্রশিক্ষণের নামে কি করছে তা দেখভাল করারও কেউ নেই। যা হোক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তি আফগানিস্তানে জঙ্গি দমনের যে প্রয়াস চালাচ্ছে তা কতখানি আন্তরিকতার নিরিখে হবে তা-ও প্রশ্নের সম্মুখীন। তবে এটাও
সত্য যে, দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার এবং প্রচেষ্টা একটা দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানে রক্ষাকবচ হতে পারে। কেননা দেশটিতে দুনর্ীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে পেঁৗছেছে। প্রশাসন থেকে শুরু করে সব স্থানে দুনর্ীতি বাসা বেঁধেছে। এ সকল পরিস্থিতিকে সামনে রেখে আফগানিস্তান কতখানি শান্তির পথে এগুবে তা বলা দুষ্কর। এছাড়া এখানে রয়েছে মাদকের রমরমা ব্যবসা। নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারাও বাদ যাননি এ পথ থেকে। ঊধর্্বতন এক পুলিশ কর্মকর্তাসহ ১১ জনকে সম্প্রতি মাদক ব্যবসার অপরাধে সাজা দেয়া হয়। মাদক ব্যবসা রোধে গঠিত বিশেষ আফগান ক্রিমিনাল জাস্টিস টাস্ক ফোর্স (সিজেটিএফ) বলেছে, গত ৩ মাসে তারা ১৫৫ জনকে কারাবন্দি করেছে। তার মধ্যে রয়েছে এ ১১ কর্মকর্তা। সিজেটিএফের এক মুখপাত্র বলেন, এর মধ্যে একজন পুলিশ জেনারেলও রয়েছেন। গত বছর সিজেটিএফ বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাসহ ৬শ' জনের বিচার করেছে, তাদের মধ্যে এক আর্মি জেনারেলের বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। সবশেষে বলা যায় যে, যুদ্ধের দামামায় বিধ্বস্ত আফগানিস্তানে অনেক নিরাশার কথা থাকলেও কিছু রয়েছে আশার কথাও। প্রাকৃতিক সম্পদে ভাসছে দেশটি। প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার হবে এর মূল্যমান। সোনা থেকে শুরু করে লিথিয়াম, লোহা, তামা ও নিকেল পর্যাপ্ত রয়েছে এই খনিজ সম্পদের তালিকায়। তাই দেশটিতে যদি হানাহানি ও রক্তারক্তির পথ পরিহার করে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করা যায়, তাহলে সেদিন আর দূরে নয় যেদিন আফগানিস্তানে উড়বে শান্তির পতাকা।
===========================
গল্প- 'ঝল্সে ওঠে জরিণ ফিতা' by রফিকুর রশীদ  ফিচার- ‘আক্রান্ত' by জাফর তালুকদার  স্মরণ- 'একজন বিস্মৃতপ্রায় বুদ্ধিজীবী' by আহমাদ মাযহার  গল্প- 'অলৌকিক উপাখ্যান' by হাসান মোস্তাফিজুর রহমান  গল্প- 'জয়মন্টপের জায়াজননী' by জামাল উদ্দীন  আলোচনা- 'তুর্গিয়েনেফ প্রসাদাৎ' by হায়াৎ মামুদ  গল্প- 'একটাই জীবন' by হাজেরা নজরুল  ফিচার- 'এটি একটি সংখ্যামাত্র' by রণজিৎ বিশ্বাস  গল্প- 'সোনালি চিল' by সৈয়দ মোফাজ্জেল হোসেন  গল্প- 'বোবা ইশারা' by মণীশ রায়  গল্প- 'চিরদিনের' by মঈনুল আহসান সাবের  স্মরণ- 'আবদুল মান্নান সৈয়দ সাহিত্যের এক সর্বসত্তা  আলোচনা- 'বাংলা চর্চা পরিচর্যা ও ইংরেজি শেখা'  আলোচনা- 'আমার ছেলেবেলার ঈদ আর বুড়োবেলার ঈদ'  আলোচনা- 'নৈতিক চেতনা : ধর্ম ও মতাদর্শ' by আবুল কাসেম ফজলুল হক খবর- গণতান্ত্রিক সব শক্তির সঙ্গে কাজ করতে চাই: সু চি  ফিচার- ‘নিজের কথা : বেঁচে আছি' by হুমায়ূন আহমেদ  কবিতা- সাম্প্রতিক সময়ের কিছু কবিতা  আলোচনা- 'মোস্লেম ভারত' পত্রিকায় চর্চিত মুসলিম ধর্ম- দর্শনের স্বরূপ  ইতিহাস- 'চারশ' বছরের ঢাকা লোক ঐতিহ্যের দশ-দিগন্ত' by আনিস আহমেদ  গল্পালোচনা- 'মৃত্যুর মুশায়রা' by সেলিনা হোসেন  গল্প- 'বৃষ্টি নেমেছিল' by ইমদাদুল হক মিলন  গল্প- 'সড়ক নভেল' by হাসনাত আবদুল হাই  গল্প- 'জানালার বাইরে' by অরহ্যান পামুক  স্মৃতি ও গল্প- 'কবির অভিষেক' by মহাদেব সাহা  ইতিহাস- 'ভাওয়ালগড়ের ষড়যন্ত্র' by তারিক হাসান


দৈনিক ইত্তেফাক এর সৌজন্য
লেখকঃ তৌহিদ আজিজ


এই খবর'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.