গল্প- 'বিয়ে' by আর্নল্ড বেনেট (অনুবাদঃ আবু তাহের মজুমদার)

ক. এ সম্পর্কিত কর্তব্য
প্রায়শই সেই অমর শ্রেণীর ব্যক্তিকে নিয়ে, যিনি বর্তমানের অবমূল্যায়ন করে অতীতের প্রশংসায় মেতে ওঠেন, বিশ্বস্তভাবে আলোচনা করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।

আমি এখানে হোরেস-এর উলেস্নখ করব না, যদিও পণ্ডিতসুলভ সব ঐতিহ্যের আলোকে করাই উচিত, কারণ হোরেস ছিলেন একজন চিকিৎসাতীত সুবিধাবাদী, তিনি বিয়ের প্রসঙ্গটি সব সময়ে এড়িয়ে যেতেন।
আমি যে তার খুব একটা ভক্ত তাও নয়। সমপ্রতি অতীতের একজন প্রশংসাকারী বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তিনি আমাদের বলছেন যে, কপর্দকশূন্যতা এবং পাগলামী ভীষণভাবে বেড়ে চলেছে এবং যদিও এটার ঠিক বিপরীতটাই ঘটছে বলে প্রমাণিত হয়েছে এবং তিনি দুঃখও প্রকাশ করেছেন।
তিনি কয়েক মাসের মধ্যেই এই ভুল সংশোধনের ব্যাপারটি ভুলে যাবেন এবং আবারও নতুন করে বিলাপ শুরু করবেন। তিনি আমাদের বলছেন যে, আমাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে এবং বলছেন এরূপ আতঙ্কের স্বরে যে, আমরা ভয়ে কেঁপেছি এবং আমাদের মধ্যে অনেকেই ব্যাপারটি বিশ্বাস করেছে। তিনি এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখেছেন যে মৃতু্যহার কমে যাচ্ছে, বস্তির সংখ্যাও কমে যাচ্ছে, রোগশোক কমে যাচ্ছে এবং একজন কৃষি শ্রমিক আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি খেতে পারছে। আমাদের বিশ্বাস এসব আমাদের কার্যকারণ নির্ণয় করার ক্ষমতার খুব সহায়ক হচ্ছে না। অবশ্য শহরগুলোতে এখন ভীষণভাবে মানুষের ভিড় বাড়ছে, আমি জানতে বেশ আগ্রহী যে, কোন কোন ক্ষেত্রে আজকালকার শহরবাসীদের স্বাস্থ্যের চেয়ে অতীতের গ্রামবাসীদের স্বাস্থ্য অনেক বেশি ভাল ছিল। কৃষিকাজে নিয়োজিত ঝানু ব্যক্তিদের সরাসরি দেখে আমি কিছু বুঝতে পারি না; তাদেরকে দেখে মনে হয় তারা সেসব ক্ষুধার্ত বাসড্রাইভারের মতো যাদের শরীর বজ পাতের ফলে এঁকেবেঁকে বিকৃত হয়ে গেছে।
কিন্তু অতীতের প্রশংসাকারীর এখন আপত্তির বিষয় হল বিয়ে, শুভবুদ্ধিজাত ইঙ্গিতের সাথে সে দৃষ্টি আকর্ষণ করল জন্মহারের প্রতি। তিনি বিয়ে সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে এখন বেশ একটা চমৎকার সময় কাটাবেন। ঝড়ের প্রথম শব্দ ইতোমধ্যে কানে এসে পেঁৗছেছে। পাদ্রীরা বাঁকা চোখে জন্মহারের প্রতি তাকিয়েছেন এবং তাদের অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একটা শব্দগুচ্ছ আছে না, ("বিষয়টি একেবারে মূলে আঘাত করছে"। হে বন্ধুগণ, আমরা আগের চেয়ে দেরিতে বিয়ে করছি। আমাদের মধ্যে অনেকেই আমাদের পেশাগত কাজকর্ম এবং দৌড়ঝাঁপ নিয়ে এত ব্যস্ত যে আমরা বিয়ের কথা ভুলে যাচ্ছি। দেশের নাগরিকদের বিয়ে করা এবং ছেলেমেয়ে জন্মদান করা একটি কর্তব্য এবং আমরা আমাদের এই কর্তব্যে অবহেলা করছি, আমরা হয়ে পড়ছি আত্মসর্বস্ব! অতীতকালের মতো এখন আর সেই গৌরবজনক "একঘর ছেলেমেয়ের" জন্ম হচ্ছে না। আমাদের বাবারা বিয়ে করেছেন বিশ বছর বয়সে; আর আমরা এখন বিয়ে করছি পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে। কেন এমন হচ্ছে? এর কারণ হল একটি স্থুল এবং স্নায়ুদুর্বলকারীর বিলাসিতা আমাদের পেয়ে বসেছে। হায়! এরকম চলতে থাকলে ইংল্যান্ডের কী হবে? এই ইংল্যান্ড আর থাকবে না! কাজেই বিষয়টি আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। এই একই তালে বলাবলি চলতে থাকল।
যারা এরকম চিৎকার জুড়ে দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও দেবেন তাদের সবাইকে আমি জিজ্ঞেস করতে চাই : আপনারা কি "ঢ" পড়েছেন? এখন আমি "ঢ" শিরোনামের যে বইটির কথা উলেস্নখ করছি সেটি একটি রহস্যময় বই, প্রায় একশত বছরেরও অধিক পূর্বে একজন ইংরেজ পাদ্রি এটি লিখেছিলেন। এটি ইংরেজিতে বিজ্ঞানের একটি চিরায়ত গ্রন্থ; প্রকৃতপক্ষে, এটি বিশ্বের মহৎ বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি ঊনবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান বিষয়ক, বিশেষ করে ডারউইনের চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। "চেম্বারস সাইক্লোপিডিয়া অব ইংলিশ লিটারেচার" এইচ. জি. ওয়েলসের উদ্ধৃতি দিয়ে জানাচ্ছে যে, "ইতোপূর্বে যেসব বই লেখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যেগুলো লেখা হবে সেগুলোর মধ্যে এই বইটি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি 'বিপর্যয়কারী'।" আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উলেস্নখ করে বলতে চাই যে, এই বইটি আমাকে যত বেশি গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে আমার পড়া বিজ্ঞান বিষয়ক আর কোনো বই তত করেনি। যদিও এটি বোঝা খুবই সহজ এবং এটিতে সামান্যও প্রায়োগিক কোনো ব্যাপার নেই, তবুও এই বইটি ইংরেজি সাহিত্যের এমন একটি বই যেটিকে শুধু এ কারণে সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝা হয়েছে যে এটি কেউ পড়ে না। এটি সম্পর্কে চালু যে ধারণা আছে তা একেবারেই মিথ্যে। এ বইটি সাধারণ এবং সমাজবিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষার একটি শক্তিশালী উপকরণ হতে পারে, কিন্তু প্রকাশকেরা এটি পুনঃমুদ্রণ করবে না, অন্তত তারা করছে না এবং এতদসত্ত্বেও এটি গিলবার্ট হোয়াইট সেলবোর্ন পক্ষীকুল সম্পর্কে যে সব মন্তব্য করেছেন তার চেয়ে চলিস্নশ গুণ বেশি আগ্রহোদ্দীপক এবং চারশত গুণ বেশি শিক্ষামূলক। আমি "ঢ" কী তা আপনাদের অনুমানের উপর ছেড়ে দেব, কিন্তু আমি এই সমস্যাটির সমাধানের জন্য কোনো পুরস্কার প্রদান করব না, কারণ আমার বিপুলসংখ্যক পাঠক অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে এটির সমাধান করে ফেলবেন।
যেসব ব্যক্তি বিবাহপদ্ধতিতে পরিবর্তনের আশঙ্কা করে উদ্বিগ্ন তারা "ঢ" পড়বেন এবং সম্ভবত উদ্বিগ্ন হওয়া থেকে বিরত থাকবেন। কারণ তারা এটা উপলব্ধি করবেন যে তারা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিয়ে আসছিলেন; এটাও বুঝবেন যে তারা এমন কতগুলো আচরণ বিধিকে এমন কতগুলো মৌলিক নীতিমালার মর্যাদায় উন্নীত করেছেন যেগুলোর একমাত্র উৎস হল কতগুলো গড়পড়তা অবস্থা থেকে উদ্ভূত কতগুলো গড়পড়তা সহজাত প্রবৃত্তি। তারা এখন ভীত, কারণ অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে এবং এগুলোর সঙ্গে সঙ্গে আচরণবিধিগুলোরও পরিবর্তন হয়েছে। "ঢ" অন্যতম যে সত্যটিকে স্পষ্ট করে তোলে তা হলো এই যে, আচরণ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়, কিন্তু পরিস্থিতি আচরণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয় না।
কর প্রদান করা প্রত্যেক নাগরিকেরই একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। কিন্তু বিয়ে করা এবং সন্তান-সন্ততির জন্মদান করা কোনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নয়। বিয়ে এবং সংশিস্নষ্ট সব ফলাফল হচ্ছে ব্যক্তিগত অনুরাগ এবং সুযোগসুবিধার একটি বিষয়। এটি কখনো অন্যরকম কোনো ব্যাপার ছিল না এবং অন্যরকম কোনো ব্যাপারে পরিণতও হবে না। কেমন করে এটি অন্যরকম কিছু হবে? কোনো ব্যক্তি যদি তার নিজের অনুরাগ এবং সুযোগ-সুবিধার ("যা হচ্ছে বিয়ে নামক চুক্তির সারৎসার") বিরুদ্ধে যায়, তাহলে তিনি শুধু একজন পরিতৃপ্ত নাগরিকের পরিবর্তে রাষ্ট্রকে একজন (যদি দু'জন না হয়) অপরিতৃপ্ত নাগরিকই উপহার দেবেন! কোনো রাষ্ট্রের সুখময় অবস্থা হচ্ছে সে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের সুখময় অবস্থার যোগফল; কোনো ব্যক্তি যদি নিজের সুখ কমিয়ে ফেলেন, তাহলে তিনি কি একটি অনন্যসাধারণ পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের প্রতি স্বীয় দায়িত্ব পালন করবেন না! আপনি কি মনে করেন না যে লোকজন যখন তাড়াতাড়ি বিয়ে করে, তারা রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই তা করে ? তখন কি মনে হয় না যে আমাদের "আধুনিক বিলাসিতা" এই দায়িত্ববোধটিকে দুর্বল করে দিয়েছে? আমার মনে হয় তারা এ কারণেই বিয়ে করছে যে বিয়ে তাদের জন্য যথাযোগ্য হয়েছে। তারা বিয়ে করছে নিরেট আত্মসর্বস্বতার তাড়নায়, যে রকম সব শোভন ব্যক্তিরাই করে থাকে। বিয়ে করার কর্তব্য নিয়ে যারা হৈ চৈ আর বকবক করে তারা কি তাদের প্রিয়তমা মেয়েদের সার্বিক কল্যাণের কথা মনে রেখেই চুম্বন করে? আমি কল্পদৃশ্যে দেখতে পাই তারা যেন বলছে, "হে আমার দেবী, আমি তোমাকে ভালবাসি। রাষ্ট্রের প্রতি একটি দায়িত্ববোধ থেকেই আমার এ ভালবাসা। এসো, আমরা অসংখ্য ছেলেমেয়ে লালনপালন করি রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বাবোধ থেকেই।" এসব কথা শুনে তরুণীরা কী মুগ্ধই না হবে!
যদি বিয়ে করার বয়সের সময়সীমার পরিবর্তন হয়, যদি জন্মহার মৃতু্যহারকে অনুসরণ করার সহানুভূতিসূচক প্রবণতা দেখায় কারোরই আতঙ্কিত হবার প্রয়োজন নেই। ভাল এবং মন্দের প্রাথমিক নীতিগুলো তাদের ভিত্তির উপর থরো থরো কাঁপছে না। মানবিক বিবেককে নীরবও করে দেয়া হয় না। দেশটি উচ্ছন্নেও যাচ্ছে না। আচার-আচরণও নতুন পরিস্থিতিগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, মোটের উপর এই তো হল অবস্থা। পরিস্থিতিগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে তা সঠিকভাবে দেখতে আমরা সমর্থ নাও হতে পারি। তবে এটি অবশ্য বিশদ করে দেখার একটি বিষয় এবং আমাদের বংশধরেরা তা সঠিকভাবেই দেখতে পাবে; ইতোমধ্যে আমাদের আচার-আচরণের মধ্যে যে পরিবর্তন হচ্ছে তা থেকে কোনো সূত্রও পাওয়া যেতে পারে। যদিও স্নায়বিকভাবে দুর্বল কিছু কিছু ব্যক্তি আতঙ্কিত হয়ে ধমর্ীয় প্রচারণায় মেতে উঠতে পারেন এবং কিছু "পদক্ষেপও নিতে" পারেন, আমরা বাকিরা কিন্তু এই দৃঢ়বিশ্বাসে শান্ত থাকতে পারি যে "পদক্ষেপগুলি" কোনোভাবেই উপকারে আসবে না। যদি এমন কোনো দুটি বিষয় থাকে যেগুলোকে আইন করার, সব রকমের "আন্দোলনের", সব ধর্মযুদ্ধের এবং ধর্মপ্রচারের অনেক ঊধের্্ব রাখা হয়, তার একটি হবে বিয়ের বয়সসীমা এবং অন্যটি জন্মহার। কারণ এসব ক্ষেত্রে দেখা যায় সবচেয়ে শক্তিশালী সহজাত প্রবৃত্তিটি জেগে ওঠে এবং সব সৎ যুক্তিগুলোকে এবং কৃত্রিম পরার্থবাদকে নির্দয়ভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেয়; সবকিছুকেই দলিত করে, যথার্থ অর্থে, অমায়িকভাবে মন্তব্য করে : "আমি আমার সুবিধা মোতাবেক কাজ করব এবং স্বয়ং প্রকৃতি ছাড়া আমার সঙ্গে আর কেউ কথা বলবে না। ভাল এবং মন্দের কথা বলে আমাকে জ্বালাতন করো না। ভালোও এবং মন্দও ঃ", এভাবে বক্তব্যের ক্ষেত্রকে বাজে ব্যাপার-স্যাপার থেকে কিছুটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করে, আমি এরপর বিয়ে সম্পর্কে কিছু সহজ-সরল মন্তব্য করতে যাচ্ছি।
খ. বিয়ের ক্ষেত্রে দুঃসাহসিকতা
রাষ্ট্র বা মানবসমাজের প্রতি একটি দায়িত্ববোধ থেকে যে পুরুষদের বিয়ে করা উচিত নয়, উচিত হবে শুধু বিয়ে করার একটি অহংবাদী অনুরাগ থেকে, এটা বোঝাতে চেষ্টা করার পর, আমি এখন বলব এমন একজন পুরুষের বিশেষ ব্যাপার নিয়ে, যিনি বিয়ে করার মত অবস্থানে আছেন এবং যার আবেগগুলো এখনও কাউকে ঘিরে জড়িত হয়নি। অবশ্য, এরূপ ব্যক্তি যদি প্রেমে পড়ে থাকেন এবং তিনি যদি একজন অত্যধিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি না হন, তিনি বিয়ের ভাল এবং মন্দ দিক নিয়ে যাচাই-বাছাই করবেন না; তিনি কেবল বিয়ে করবেন এবং চলিস্নশ হাজার মন্দও তাকে বিরত করতে পারবে না। তার এ কাজটি হবে সম্পূর্ণরূপে সঠিক এবং যুক্তিযুক্ত, যেমন সম্পূর্ণরূপে সঠিক এবং যুক্তিযুক্ত হচ্ছে একটি খড়কুটোর প্রবল স্রোতের টানে ভেসে যাওয়া। কিন্তু প্রেমে পড়ার সৌভাগ্য প্রত্যেক ব্যক্তির হয় না, এবং গভীর প্রেমে পড়ার অসীম সৌভাগ্যে ধন্য হয় মাত্র অল্প কয়েকজন। সে যাই হোক, অনুকূল সব পরিস্থিতির কারণে যদি কোনো ব্যক্তি বিয়ে করতে চায়, কিন্তু সে প্রেমে পড়েনি বা খুব অল্প মাত্রায় প্রেম ভাবাপন্ন, তবুও সে বিয়ের কথা ভাববে। কিন্তু কেমন হবে তার এই ভাবনা?
আমি আপনাদের এ কথা বলব যে, প্রথমত, তিনি যদি আফ্রোদিতির দ্বারা কোনোভাবে বিক্ষত না হয়েই তিরিশ বছরে পদার্পণ করেন, তিনি ভাববেন যে প্রতিদিন ভোরে তিনি যে রোমাঞ্চকর প্রত্যাশার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অনুভূতি নিয়ে ঘুম থেকে ওঠেন বিয়ের পর তা আর থাকবে না, অথচ এই অনুভূতিটা কত গভীরভাবেই না সুখময়! কিন্তু হতাশার মুহূর্তগুলোতে তার মনে এই অনুভূতি জাগবে যে, তিনি এমন একটা কাজ করেছেন যা সংশোধনের অতীত এবং তিনি তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রকাশের একটি পথ নিশ্চিতভাবেই বন্ধ করে দিয়েছেন। (অনুগ্রহপূর্বক মনে রাখবেন যে আমি কিন্ত এই মানব সন্তানটির কী চিন্তা করা উচিত তা বর্ণনা করছি না। তিনি কী চিন্তা করেন আমি তা-ই বর্ণনা করছি।) দ্বিতীয়ত, তিনি এটা ভাববেন যে, অবিবাহিত যুবকেরা প্রায়শই নারীদের নিকট থেকে যে মধুর স্বাগতম পেয়ে থাকে বিয়ের পর সে রকমটির প্রত্যাশা আর থাকবে না; তখন সম্ভাবনার ক্ষেত্রে তার "কেচ্ছা খতম" হয়ে যাবে এবং যুবকটি ভবিষ্যতে সম্ভাবনার ক্ষেত্রে এই কেচ্ছা খতম হয়ে যাবার ব্যাপারটি হজম করতে পারবে না। কমবেশি "স্বাধীনতা", (ওহো, কী রহস্যময় এবং রোমাঞ্চকর শব্দ!) হারাবার সঙ্গে যুক্ত এসব বিবেচনা, তার তাত্তি্বক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করবে এবং এটা মনে রাখতে হবে যে, এমনকি একা থাকার এবং বিষাদাক্রান্ত হবার স্বাধীনতাও কিন্তু স্বাধীনতাই।
আপনাআপনিই অন্যান্য ধারণাগুলোর উদ্ভব হবে। একদিন সকালে সে যখন চুল আঁচড়াবে সে মাথায় একটি পাকা চুল লক্ষ্য করবে এবং বয়সে সে যতই তরুণ হোক না কেন, তার মনে জেগে উঠবে বার্ধক্যের আগমনবার্তা। কী নিঃসঙ্গ একটি বার্ধক্য এমন একটি বার্ধক্য যেটি নিজের সামাজিক এবং সাংসারিক প্রয়োজনীয়তাসমূহের জন্য ভাইজ্তা/ ভাগনে এবং এবং ভাইজ্তি/ ভাগনীর বা আরও দূরের আত্মীয়-স্বজনদের প্রসন্নতার উপর নির্ভরশীল! কী আতঙ্ককর ব্যাপার! কী চিন্তাতীত ব্যাপার! তার প্রথম চলাই হবে, বিশেষ করে যদি সে দ্য মোঁপাসার  উপন্যাস পড়ে থাকে, দ্রুত রাস্তার উপর ছুটে যাওয়া এবং প্রথম যে মেয়েটির মুখোমুখি হবে তার নিকট বিয়ের প্রস্তাব করা, যাতে সে এই ভয়ানক আতঙ্কের নিঃসঙ্গ বার্ধক্য এড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু সে দরজার চৌকাঠ পর্যন্ত দূরত্বে যেতে না যেতেই আরো চিন্তা তার মাথায় ভিড় করে। সে ভাবে সে বিয়ে করল এবং বিশ বৎসর পর তার স্ত্রীর মৃতু্য হল এবং তাকে রেখে যাবে একজন মৃতদার পুরুষ হিসেবে! ফলে আবার তার জীবন হবে একজন নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের, এবং সে বিয়ে না করে একাকী থাকলে তার জীবন যে রকম বিষাদ-করুণ হত এখন হবে তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি বিষাদ-করুণ। কাজেই একটি নিঃসঙ্গ বার্ধক্যের জন্য বিয়ে কোনো নিশ্চিত সমাধান নয়; এটা বরং জ্বালাযন্ত্রণাকে তীব্রতরই করতে পারে। আর ছেলেমেয়ে? কিন্তু মনে করুন তার কোনো ছেলেমেয়েই নেই! ধরুন তার ছেলেমেয়ে ছিল কিন্তু সবাই মারা গেছে। কী যে যন্ত্রণা! মনে করুন তারা সবাই গুরুতর অসুখে পড়ল এবং ভাল হয়ে গেল। বৃদ্ধ বয়সেও কী করুণ বয়স-বাড়ানোর অভিজ্ঞতা! ধরুন তাকে সবাই হতাশ করলো। কী অন্তহীন অনুতাপের ব্যাপার! তারপর মনে করুন, তারা বিপথগামী হলো (ছোট ছেলেমেয়েরা যেমন হয়)। কী লজ্জার ব্যাপার! ধরুন, শেষ বয়সে সে একজন অকৃতজ্ঞ সন্তানের অনিচ্ছুক দয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কী চরম অবমাননার ব্যাপার! এসব ব্যাপার সর্বত্রই অহরহ ঘটে চলেছে। মনে করুন তার স্ত্রী এক সময়ে তাকে ভালবাসতো, কিন্তু এখন বাসে না অথবা ধরুন তিনিই এখন আর তাকে ভালবাসতে পারছেন না! এই বিষয়গুলো নিজেরা নিজেদের হুকুমে চলে না। ব্যক্তিগতভাবে, আমার হিসেবে শতকরা এক ভাগ সব রোমান্টিক বিয়েতেও বিয়ের তিন বৎসর পর স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যেও পরস্পরের জন্য আর তেমন গভীর আবেগ পোষণ করার সামর্থ্য থাকে না। প্রেমের আবেগের প্রাবল্য কতই না ক্ষণস্থায়ী! সম্ভবত শতকরা তেত্রিশ ভাগ ক্ষেত্রেই আবেগ একটি প্রশান্ত স্নেহময়তায় স্থিত হয় আর এটাই হল আদর্শস্থানীয়। শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ক্ষেত্রে এটি নিরেট ঔদাসীন্যের অতলে তলিয়ে যায় এবং একজন ব্যক্তি তার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অথবা একজন স্ত্রী তার স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যান্য অভ্যাসের মতই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং বাকি শতকরা ষোল জনের ক্ষেত্রে আবেগটি পর্যবসিত হয় অপছন্দ অথবা ঘৃণায়। আপনি কি মনে করেন আমার শতকরা হিসেবে কোনো ভুল আছে? আপনি তো বহু পূর্বেই বিয়ে করেছেন এবং জানেন এই বিশ্বসংসারটা কী? আপনি হয়তো এই হিসেবটায় কিছুটা পরিবর্তন আনতে পারেন; কিন্তু আমার বিশ্বাস আপনি বেশি পরিবর্তন করতে চাইবেন না। শেষ পর্যন্ত নিজেকে শতকরা ষোল জনের মধ্যে আবিষ্কারের ঝুঁকিটি বিয়ে না করার সরল এবং সুবিধাজনক কৌশলটি অবলম্বন করে এড়িয়ে যাওয়া যায় এবং এই একই সুবিধাজনক কৌশল অবলম্বন করে অন্যান্য ঝুঁকিগুও এড়ানো যায়। এগুলোর সঙ্গে অন্য যেসব ঝুঁকি আমি উলেস্নখ করিনি সেগুলোও। এটা এখন সম্পূর্ণরূপে স্পষ্ট যে, এর ফলে (বাস্তবিকই, এটা উলেস্নখ করার জন্য আমি ক্ষমাপ্রাথর্ী) বিয়ের প্রতি মুক্ত-হূদয় ব্যাচেলরটির যে দৃষ্টিভঙ্গি তা হবে মোটের উপর একটি অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি জানেন যে তিনি ইতোমধ্যেই একটি ভাজির কড়াইয়ের মধ্যে আছেন, কিন্তু আগুনের নৈকট্যের কথা বিবেচনা করে সে ভাবে যে তার হয়তো যে অবস্থায় আছে সে অবস্থাতেই থাকা উচিত। তার জীবন হবে অধিকতর প্রশান্ত, একটি শীত যাপনকারী সাপের মতই; তার চিত্তবৃত্তিগুলো হয়ে উঠবে ভোঁতা, কিন্তু খুব তীব্রভাবে দুর্ভোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাগুলো খুব বাস্তবসম্মতভাবেই কমে যাবে।
যার ফলে যে ব্যাচেলরটি বিয়ে করার অবস্থানে আছে কিন্তু প্রেমে পড়েনি, অন্তত তত্ত্বের দিক থেকে নিশ্চিতভাবেই সে, অর্থাৎ সে যদি ভীরু হয়, সে যদি ভাজি করার কড়াই বেশি পছন্দ করে, যদি তার উদ্যোগ গ্রহণ করার ক্ষমতা না থাকে, তার যদি একটি ইঁদুরের আত্মার মত আত্মা থাকে, যদি সে যতটুকু সম্ভব কম বাঁচতে চায়, যদি সে তার স্বজাতিকে ঘৃণা করে, যদি তার অহংবোধ হয় এমন কষ্টকর যে তা অন্যের অহংবোধের সঙ্গে মিশতে চায় না, সে বিয়ের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু যদি সে অধিকতর সুখময়ভাবে গুণসমৃদ্ধ হয় তাহলে সে এই সিদ্ধান্ত নেবে যে, এই চমৎকার দুঃসাহসিকতাপূর্ণ কাজটিতে ঝাঁপিয়ে পড়া সঠিক হবে; কিন্তু তার মধ্যে যে চমৎকার জুয়া খেলার প্রবৃত্তি আছে তা তাকে প্রথম সুযোগেই বৃটিশ সরকার কর্তৃক অনুমোদনপ্রাপ্ত একমাত্র লটারির একটি টিকেট কিনতে উদ্বুদ্ধ করবে। কারণ, মোটের উপর একজন স্বাভাবিক স্বামী পরস্পরের প্রতি যে অধিকারবোধ অনুভব করবে তা হল একটি অনন্য বস্তু, এমন একটি বস্তু বিয়ে করা ছাড়া যেটির মত কোনো কিছু পাওয়া যাবে না। এইতো সেদিন একটি মূল্যছাড় দেয়া দোকানে আমি একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রীলোককে দেখলাম; আমি এত দূরে ছিলাম যে তাদের কথা কিছুই শুনতে পারছিলাম না, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম তারা একটি অত্যন্ত প্রাণবন্ত যুক্তিতর্কে মগ্ন। সম্ভবত সে তর্কটি ছিল বালিশের ওয়াড়ের উপর নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে; তারা নিজেদের মধ্যে গভীরভাবে মগ্ন ছিল। তারা বাইরের জগৎ সম্পর্কে ছিল বাহ্যজ্ঞানরহিত। এবং আমি ভাবলাম : "কী দৈব এবং মাধুর্যমণ্ডিত শক্তি এটি যা দ্বারা একটি সিল্কের তৈরি হ্যাট এবং একটি ঢিলেঢালা ও কালো ওভারকোট পরিহিত অদ্ভুত, মলিন ও স্বল্পবাক জীবন এবং আরেকটি উজ্জ্বল ফার এবং পালকবিশিষ্ট পোশাক পরিহিত অদ্ভুত, সজীব, ঝগড়াটে, অযুক্তিবাদী জীব, এ দুটি ভিন্নধমর্ী আত্মার মেলবন্ধন ঘটিয়েছে?" যখন তারা এখান থেকে দূরে সরে গেল তখন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে আগ্রহোদ্দীপক দুটি দৃশ্যমান বস্তু দূরে সরে গেল। আমি ভাবলাম : "ঠিক যেভাবে কোনো বিয়ারই খারাপ নয়, কিন্তু কিছু কিছু বিয়ার অন্যান্য বিয়ারের চেয়ে শ্রেয়তর, ঠিক সেভাবেই কোনো বিয়েই খারাপ নয়।" বিয়ের প্রধান যে সুফল তা এমন একটি বস্তু যা বিয়ে থেকে উদ্ভূত হতে বাধ্য , যেমন এমন এক ধরনের সাহচর্য যার রহস্যময় আকর্ষণীয়তা কোনো কিছুই মস্নান করতে পারে না। কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে এমনভাবে ঘৃণা করতে পারে যে সে মহিলা তার বিরক্তি উৎপাদন না করে সুঁইতে সুতা ঢুকাতো না। কিন্তু যখন স্বামীটি বা স্ত্রীটি মারা যায় তখন স্বামীটি বা স্ত্রীটি বলে : "না ভাই, তাকে তো আমার ভালই লাগতো।" এবং যে কোনো ব্যক্তির ভালই লাগে। এই তো সে রাত্রে ছেচলিস্নশ বৎসর বয়স্ক এক ব্যাচেলর বলল : "শূন্যতার চেয়ে যে কোনো কিছু শ্রেয়তর।"
গ. বিয়ে করার দুটি উপায়
বিয়ে করার স্যাবাইন এবং অন্যান্য সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিগুলো সব রুচিবান জাতি কতর্ৃক পরিত্যক্ত হওয়ার পর এখন দুটি বিশদ সাধারণ পদ্ধতি বাকি রয়েছে। এর একটি হল ইংরেজদের পদ্ধতি। আমরা প্রকৃতিকে তার পথ বেছে নেয়ার সুযোগ দেই। আমরা হূদয়ের আহ্বানে সাড়া দেই। বিশ্বের সব দুর্বিপাক এবং দুর্ঘটনার মধ্যে যখন দুটি হূদয় "পরস্পরকে আবিষ্কার করে", আমরা উলস্নসিত হই। আমাদের সহজাত আকাঙ্ক্ষা হল এই যে তারা বিয়ে করবে, যদি কোনো-না-কোনোভাবে এই বিয়ের ব্যবস্থা করা যায়। আমরা খোলামেলাভাবে জীবনের রোমাঞ্চের দাবীকে স্বীকৃতি দেই এবং আমরা এর জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকি। আমরা বেদীমূলে একটি তরুণ দম্পতিকে দেখি; তারা পরস্পরকে ভালবাসে। খুবই উত্তম! তারা দরিদ্র। কী দুর্ভাগ্যের ব্যাপার! কিন্তু এতদসত্ত্বেও আমরা অনুভব করি ভালবাসা তাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে। দরকষাকষি এবং বিনিময়ের অত্যন্ত অপ্রীতিকর যে ফরাসি পদ্ধতি রয়েছে তা আমাদের মহান প্রতিবেশিদের আচার-পদ্ধতিসমূহের মধ্যে এমন একটি বস্তু যা আমরা না পারি বুঝতে না পারি ক্ষমা করতে। এই পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা বিনম্র থাকার চেষ্টা করি; কিন্তু আমরা কিছুতেই তা পারি না। এটি আমাদের সূক্ষ্মতম এবং কোমলতম অনুভূতিকে বিপর্যস্ত করে। স্পষ্টতই এটি প্রকৃতির বিরোধী।
দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হল ফরাসি পদ্ধতি, একটু আগেই যেটির প্রতি দরকষাকষি এবং বিনিময় বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এখন ফ্রান্সের একজন ব্যক্তি আমাদের মত একটি এত বিস্ময়করভাবে প্রায়োগিক এবং গভীরভাবে বিচক্ষণ জাতির পদ্ধতিসমূহের মধ্যে এমন একটি বস্তু আছে যেটি বুঝতেও পারে না, ক্ষমাও করতে পারে না, সেটি হল ইংরেজদের বিয়ের পদ্ধতি। সে ব্যক্তি এটির ব্যাপারে বিনম্র হওয়ার চেষ্টা করে এবং সফলও হয়। কিন্তু এটি তার সূক্ষ্মতম এবং কোমলতম অনুভূতিকে বিপর্যস্ত করে। সে স্বীকার করে এটি প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ীই হয়; সে সঠিকভাবেই এই যুক্তিতর্কে অবতীর্ণ হয় যে, সভ্যতার সমগ্র অগ্রগতি হচ্ছে প্রকৃতি থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টার ফলশ্রুতি। "কী ব্যাপার!" মানুষ প্রতিষ্ঠা করতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এরকম সম্পর্কটি ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেবে, যখন জাগ্রত সাড়া জাগানোর একটিমাত্র ইশারাই আবেগকে জাগ্রত করতে পারে অথবা কাঁচুলির রং উদ্দীপ্ত করে কামনা! না, ভাই ইংরেজ, তোমরা যারা আত্মনিয়ন্ত্রিত, তোমরা এই ধরনের ব্যাপারকে গুরুত্বের সঙ্গে সমর্থন করতে পার না! তোমরা এমনভাবে ভালবাসার কথা বল যেন তা চিরন্তন। তোমরা ভালবাসার জন্য ত্যাগ স্বীকারের কথা বল; কিন্তু তোমরা সত্যিকারভাবে যা ত্যাগ কর, বা ত্যাগ করার ঝুঁকি নাও, তাহল প্রথম দুই বা তিন বছরের জন্য বিবাহিত জীবনের পরবতর্ী সমগ্র অংশ। বিয়েটা একটি দীর্ঘায়িত মধুর চন্দি মা নয়। আমরা চাই যদি তাই হত। আপনারা যখন বিয়ের ব্যাপারে সম্মতিদান করেন তখন আপনাদের চোখ থাকে মধুচন্দি মার দিকে নিবদ্ধ। আমরা যখন কোনো বিয়ের ব্যাপারে মত দেই, আমরা চেষ্টা করি এখন থেকে পাঁচ বা দশ বছর পরে এটা কী অবস্থায় দাঁড়াবে তা দেখতে। আমরা বলি যে গড়পড়তা দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রে, বিয়ের পাঁচ বছর পরে, স্বামী বা স্ত্রী বিয়ের দিন পরস্পরকে ভালবাসত কিনা তা আদৌ বিবেচ্য নয়। কাজেই আমরা ক্ষণিকের তাড়নার নিকট আত্মসমর্পণ করব না। আপনাদের পদ্ধতি হচ্ছে, অবিচক্ষণতার বা অদূরদর্শিতার একটি পরিণাম; এটা অদূরদর্শিতার একটি ফলশ্রুতি। আপনি আপনার মেয়েদের যৌতুক ছাড়া বিয়ে দিতে পারেন এবং এই সামর্থ্য থাকার ফলে আপনার মেয়েদের প্রতি আপনার যে সাধারণ কর্তব্য তা অবহেলা করতে এই সামর্থ্য আপনাকে প্রলুব্ধ করতে পারে এবং আপনি সব সময় এই প্রলোভনের প্রতিরোধ করেন না। আমাদের বিচক্ষণতা, সযত্ন ভাবনা, দীর্ঘ ভবিষ্যৎ-দৃষ্টি ভিত্তিক বিয়েগুলো থেকে আপনাদের 'রোমাঞ্চ' ভিত্তিক বিয়েগুলো কি শ্রেয়তর বলে প্রমাণিত হয়? আমাদের কিন্তু তা মনে হয় না।
দুটো দিনের জন্য এটুকু পর্যন্ত থাকল। ড. জনসনের মতে,দেশপ্রেম হচ্ছে একজন স্কাউন্ড্রেলের শেষ আশ্রয়, কিন্তু উপর্যুক্ত দু'জনকে নিয়ে বিচার করতে বসার আমার কেনো ইচ্ছেই নেই, যদিও আমার মন তা করার জন্য উসখুস করছে, নইলে আমাকে এর জন্য অভিযুক্ত করা হবে। এতদসত্ত্বেও আমি এই ইঙ্গিত দিতে পারি যে ফরাসিদের প্রশংসনীয় যুক্তিতে সঠিকভাবে আমার প্রত্যয় উৎপাদিত হলেও আমি এখনও রোমান্টিক সব বিয়ের ক্ষেত্রে ইংরেজদের মনোহর অযৌক্তিকতার সমর্থন করি (এই বিষয়টি অবশ্য উপলব্ধির ব্যাপার যে ইংল্যান্ডে এখন যে রকম যৌতুকের ব্যবস্থা আছে তার তুলনায় যৌতুক আরো বেশি হওয়া উচিত)। একজন ফরাসি ব্যক্তি যদি আমাকে এই বলে অভিযুক্ত করে যে, প্রথম দুই-তিন বছরের সুখময় জীবনের জন্য আমি বিবাহিত জীবনের পরবতর্ী অংশটুকুকে উৎসর্গ করার ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, আমি দ্বিধাহীন চিত্তে জবাব দেব : "হ্যাঁ, আমি সেই ত্যাগের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। আমার হিসেবে বিবাহিত জীবনের প্রথম দুই-তিনটি বছর এর জন্য যুক্তিসঙ্গত।" কিন্তু, দেখুন আমি একজন ইংরেজ, এবং সেজন্য প্রকৃতিগতভাবে রোমান্টিক। একবার লন্ডন শহরের দিকে তাকান, এই সেই শহর যার সবচেয়ে উলেস্নখযোগ্য গুণ হচ্ছে রোমান্টিক গুণ; এবং আবার তাকান একজন ইংরেজ নারীর দিকে যারা এই শহরের বিস্ময়কর রাস্তাগুলো দিয়ে হাঁটাচলা করছে! তাদের চোখগুলোই তো রোমাঞ্চে ভরপুর। তারা হয়তোবা আদৌ প্রাধান্য বিস্তার করার ভাবে সমৃদ্ধ নয়, কিন্তু তারা তো সবই নাটকের নায়িকা। এরপর তাকান প্যারিসের দিকে : প্যারিসের চমৎকার এবং সঠিক রেখাগুলোর মধ্যে রোমাঞ্চের ভাব আছে সামান্যই। এবার প্যারিসবাসিনীদের দিকে তাকান। এখন পর্যন্ত প্রকৃতি যেসব সবচেয়ে বিস্ময়াবিভূতকারিণী এবং মনোহারিণী নারী সৃষ্টি করেছে এরা তো তারাই। কিন্তু তারা কেউই রোমান্টিক নয়, আপনারা তো তা জানেন। রোমাঞ্চ কী তারা তা জানে না। তারা এতই গদ্যবৎ যে, আপনি যখন তাদের এই গদ্যবৎ অবস্থার কথা ভাববেন আপনার শিরদাঁড়া শিরশির করে কেঁপে উঠবে।
এবার আগের কথায় ফিরে আসি। জীবনের এই দুটো দিককে আপনি ভিন্ন আলোতেও দেখতে পারেন। সম্ভবত এই দুই জাতির মধ্যকার পার্থক্যটা, মৌলিকভাবে যত না "জীবনের সময়ের" দুটি ধারণার মধ্যকার পার্থক্য, ততোটা দুটো জাতির ধারণার মধ্যকার পার্থক্য নয়; এবং ফ্রান্সে প্রবীণের দৃষ্টিভঙ্গিটি প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। আপামর জনগণের বয়স যতই বাড়তে থাকে, এমনকি ইংরেজ জনগণেরও, তারা রোমাঞ্চ ভরা বিয়ের বিপরীতে অধিক থেকে অধিকতর যুক্তিনির্ভর বিয়ের পক্ষপাতী হয়ে উঠছে। তরুণ প্রজন্মেরা, এমনকি ফ্রান্সেও জোরালোভাবে যুক্তি-নির্ভর বিয়ের তত্ত্ব এবং তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগের বিরুদ্ধবাদী। কিন্তু তাদের জীবনে যৌবনের অনন্য এবং মূল্যবান পরমানন্দ এখনও অতিক্রান্ত হয়নি, অথচ তাদের দেশের প্রধানেরা এর স্বাদ বেমালুম ভুলে গেছে। কোন্টি সঠিক? কারো পক্ষেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই পদ্ধতি কিংবা ঐ পদ্ধতির কোনোটিই সবক্ষেত্রে অথবা প্রায় সবক্ষেত্রে কল্যাণকরভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। ইংল্যান্ডে হাজার হাজার রোমান্টিক বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে এই কথাগুলো বলা যাবে যে যদি ফরাসি পদ্ধতিটি চালু থাকত এবং যার ফলে রোমান্টিক বিয়েগুলোর অস্তিত্বই থাকত না, তাহলে শ্রেয়তর হতো এবং একইভাবে ফ্রান্সে হাজার হাজার রোমান্টিক বিয়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু যদি সেখানে ইংলিশ পদ্ধতি চালু থাকত, তাহলে সে বিয়েগুলো কত চমৎকারভাবে সম্পন্ন হত। ইংল্যান্ডে যৌতুক প্রদানের ব্যবস্থাটি চালু থাকার ফলে ইংরেজদের পদ্ধতিটি নিখুঁত নয় (কারণ এটা মনে রাখতেই হবে যে ফরাসিদের বিয়েতে টাকাটা হচ্ছে অনেকগুলো উপাদানের মধ্যে একটি), কিন্তু এই প্রথাটি ইংরেজদের পদ্ধতিটির প্রভূত উন্নতিসাধন করবে। কিন্তু আমরা জাতি হিসেবে মিতব্যয়ী নই, এবং মিতব্যয়ী একটি জাতি হবার তেমন সম্ভাবনাও নেই। কাজেই আমাদের তরুণ প্রজন্মকে নিয়তই যৌতুক প্রথা না থাকার অবস্থার সঙ্গে অবশ্যই খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
আমি আমার বক্তব্যের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি, পাঠকেরা এরকম কল্পনা করছেন বলে তাদেরকে মাপ করা যেতে পারে। কিন্তু আমি শেষ প্রান্তে আসিনি। কারণ এতক্ষণ পর্যন্ত যা বলেছি তা শুধু আমি যা বলতে চাচ্ছি তারাই প্রাথমিক বয়ান। যে ব্যক্তি ইংরেজদের পদ্ধতিটিকে ভালভাবে নিজের জীবনে পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং তার নিকট এটি অসার প্রতিপন্ন হয়েছে, আমি তার বিষয়টি বিবেচনা করতে চাই। ইংল্যান্ডে আমরা এভাবেই ভাগ্যের হাতে নিজেদের ছেড়ে দেই। আমরা ভালবাসার আগমনের প্রতীক্ষা করি। ধরে নিন এর আগমন ঘটল না। তাহলে ইংরেজদের পদ্ধতিটির কী অবস্থা হবে? ধরুন, বিয়ে করার অবস্থানে পেঁৗছানো কোনো ব্যক্তির বয়স কোনো প্রকার প্রেমের আগমন ছাড়াই ত্রিশ বা চলিস্নশে পেঁৗছল। পরিবর্তনের জন্য তিনি কেন ফরাসি পদ্ধতিটি পরীক্ষা করে দেখবেন না? যে কোনো বিয়েই আদৌ কোনো বিয়ে অপেক্ষা শ্রেয়তর। স্বাভাবিকভাবেই, ইংল্যান্ডে, তার পক্ষে তার পছন্দ করা সুন্দরী রমণীর কাছে যাওয়া এবং এই ঘোষণা দেয়া সম্ভব নয় : "আমি যথার্থ অর্থে তোমার প্রেমে পড়িনি, কিন্তু তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে রাজী হবে?" সে হয়তো ভিন্নভাবে কথাগুলো বলবে এবং রমণীটি ব্যাপারটি বুঝতে পারবে। আপনি কি মনে করেন যে সে প্রস্তাবটি প্রত্যাখান করবে?
======================
গল্প- 'মাদকাসক্ত' by আলী ইদ্রিস  গল্প- 'বেঁটে খাটো ভালোবাসা' by রেজানুর রহমান  কবর by জসীম উদ্দীন (পল্লীকবি)  গল্প- 'নদীর নাম চিলমারী' by নীলু দাস  গল্প- 'লাউয়ের ডগা' by নূর কামরুন নাহার  গল্প- 'অপূর্ব সৃষ্টি' by পারভীন সুলতানা গল্প- 'ঊনচলিস্নশ বছর আগে' by জামাল উদ্দীন  গল্প- 'সুচ' by জাফর তালুকদার   গল্প- 'বাসস্ট্যান্ডে যে দাঁড়িয়েছিল' by ঝর্না রহমান  গল্প- 'গন্না' by তিলোত্তমা মজুমদার  গল্প- 'ঘুড়িয়াল' by শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়  গল্প- 'প্রক্ষেপণ' by মোহিত কামাল  গল্প- 'গন্তব্য বদল' by রফিকুর রশীদ  গল্প- 'ঝড়ের রাতে' by প্রচেত গুপ্ত  গল্প- 'শুধু একটি রাত' by সাইপ্রিয়েন এক্ওয়েন্সি। অনুবাদ বিপ্রদাশ বড়ুয়া  গল্প- 'পিতা ও কুকুর ছানা' by হরিপদ দত্ত  স্মরণ- 'শওকত ভাই : কিছু স্মৃতি' by কবীর চৌধুরী  সাহিত্যালোচনা- 'রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পালাকারের নাটক  স্মরণ- 'আবদুল মান্নান সৈয়দ : কবি ও প্রাবন্ধিক' by রাজু আলাউদ্দিন  স্মরণ- 'সিদ্ধার্থ শংকর রায়: মহৎ মানুষের মহাপ্রস্থানে by ফারুক চৌধুরী  গল্প- 'ফাইভ স্টার' by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম  গল্প- 'নূরে হাফসা কোথায় যাচ্ছে?' by আন্দালিব রাশদী  গল্প- 'হার্মাদ ও চাঁদ' by কিন্নর রায়  গল্প- 'মাটির গন্ধ' by স্বপ্নময় চক্রবর্তী  সাহিত্যালোচনা- 'কবি ওলগা ফিওদোরোভনা বার্গলজ'  গল্পিতিহাস- 'বালিয়াটি জমিদারবাড়ির রূপগল্প' by আসাদুজ্জামান  ফিচার- ‘কাপ্তাই লেক:ক্রমেই পতিত হচ্ছে মৃত্যুমুখে' by আজিজুর রহমান


দৈনিক ইত্তেফাক এর সৌজন্য
লেখকঃ আর্নল্ড বেনেট
অনুবাদঃ আবু তাহের মজুমদার


এই গল্প'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.