বিশেষ রচনা :ওমর খৈয়াম by ড. শামসুল আলম সাঈদ

শরীয়ত বিরোধী বেদাত সৃষ্টির জন্য তাঁদের ওপর জুলুম, অত্যাচার শুরু হলে তাঁরা পালিয়ে ইউরোপে চলে গিয়ে সেখানেই সাধনা করে জগৎ বিখ্যাত হন।

ওমর খৈয়ামের ওপরও বার বার নির্যাতন হয়েছিল। তিনি কৌশলে মোলস্নাতন্ত্রীদের এড়িয়ে সব দেশের ভেতর বিবেকের রশ্মি প্রজ্বলিত রাখেন
ওমর খৈয়ামের নাম শোনেনি বিশ্বে এমন একজন শিক্ষিত লোকও নেই। তিনি ইরান বা পারস্যের একজন কবি, গাণিতিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তাঁর অমর সৃষ্টি রুবাইয়াত ও বীজগণিত। তাঁর আবিষ্কৃত বীজগণিতের নাম আলজাবর বা এলজেব্রা, অঙ্কশাস্ত্রের আকর। তবে ওমর খৈয়ামের বিশ্বখ্যাতির মূলে রয়েছেন একজন ইংরেজ কবি, নাম এডওয়ার্ড ফিটস জেরাল্ড (১৮০৯-১৮৮০)।
তিনি ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াতের ৭৫টি তরজমা করেন ১৮৫৯ সালে এবং তাতে করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। বিশ্ব নতুন চিন্তা, আদর্শ, মতবাদ ও দর্শনে, তাছাড়া কাব্য ধারায় বিমুগ্ধ ও অভিষিক্ত হয়ে পড়ে। হাজার বছর আগের ইরানি চিন্তা নতুন বিশ্বকে ঢেলে সাজিয়ে গড়তে সহায়তা করল।
ওমর খৈয়াম ইরানের খোরাসানের নিশাপুর নগরে ১০৪৮ সালের ১৮মে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২৯ অক্টোবর ১১২৩ সালে মৃতু্যবরণ করেন। তাঁর পুরো নাম আবুল ফতেহ গিয়াসউদ্দিন ওমর ইবনে আল ইব্রাহিম আল খৈয়াম। তাঁর পিতার নাম ইব্রাহিম খৈয়াম। খৈয়াম তাঁদের বংশগত উপাধি। খৈয়াম অর্থ তাবু নির্মাতা। তাঁরা জাতে তুর্কি, ভাগ্যান্বেষণের কারণে তাঁর পিতা ইরানে আসেন। ইব্রাহিম খৈয়াম সেনাবাহিনীতে তাঁবু পরিচর্যায় নিযুক্ত থাকতেও পারেন কিন্তু ওমর পিতৃ পেশায় কখনও হাত দেননি। বাল্যকালে তাঁর পিতার মৃতু্য হয়, তবুও ওমর নিজে খৈয়াম উপাধি গ্রহণ করেছিল বলে অনেকে মনে করেন খৈয়াম হচ্ছে ওমরের কাব্য নাম বা তঘলস্নুস। তাঁর রচিত কয়েকটি কবিতায় এ প্রসঙ্গে উলেস্নখ আছে। তিনি কেবল দর্শনের তাঁবু সেলাই করেন। তবে নিতান্ত তাবু নির্মাতা বললেও তিনি তৎকালীন পারস্যের অতিশয় যশস্বী ও গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
খৈয়ামের মাতার নাম বিবি আরজুমন্দ। তাঁর নানা বা মাতামহ ছিলেন একজন নক্বাশ বা শিল্পী, তাঁর নাম বদরুদ্দিন নক্বাশ, সেই সুবাদে খৈয়ামের মাতাও শিল্পকর্মে নিপুণা ছিলেন। নিশাপুরের কেতাব পট্টিতে ছিল তাঁদের নিবাস, স্বভাবত জ্ঞানী-গুণী-কবি-শিল্পীদের আনাগোনা হত সেখানে। কেতাব লেখা, লিপিকরের কাজ, অনুলিখন, পৃষ্ঠার ধারে ধারে নক্সি কাজ কিংবা তসবির আঁকাতে আরজুমন্দ পারদশর্ী ছিলেন। স্বামীর মৃতু্যর পর এ কাজের দ্বারা জীবন নির্বাহ ও শিশু পুত্রকে মানুষ করার চেষ্টা করেন। নক্সি করা বা শিল্পীদের যাবতীয় কাজকে তখন সম্মানের চোখে দেখা হত না, খুব হেয় কিংবা নিচ ধরনের কাজ বিবেচনা করা হত। এমন কি কবিতা রচনা, গান, বাদ্য বা তসবির আঁকাকে নাজায়েজ মনে করা হত। তবু কেতাব পট্টিতে বিখ্যাত দার্শনিক, বিজ্ঞানী, বুজুর্গ, কবি, শিল্পীদের আনাগোনা অব্যাহত ছিল। তারা এখান থেকেই তাঁদের কেতাব প্রকাশ করতেন। এখানেই দার্শনিক ইবনে সিনার সঙ্গে ওমর খৈয়ামের সাক্ষাৎ হয়, ওমর খৈয়াম ছিলেন ইবনে সিনার অনুসারী। তবে ইবনে সিনা, আভেরুশ প্রমুখ শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা রক্ষণশীল গোষ্ঠীর রোষের শিকার হয়েছিলেন। শরীয়ত বিরোধী বেদাত সৃষ্টির জন্য তাঁদের ওপর জুলুম, অত্যাচার শুরু হলে তাঁরা পালিয়ে ইউরোপে চলে গিয়ে সেখানেই সাধনা করে জগৎ বিখ্যাত হন। ওমর খৈয়ামের ওপরও বার বার নির্যাতন হয়েছিল। তিনি কৌশলে মোলস্নাতন্ত্রীদের এড়িয়ে সব দেশের ভেতর বিবেকের রশ্মি প্রজ্বলিত রাখেন। তবু ওমর খৈয়ামকে খোরাসান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের পদটি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এই গোঁড়াপন্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তিনি রুবাইয়াত রচনা শুরু করেন।
অনেকের ধারনা বিজ্ঞানী ওমর খৈয়াম কবিতা রচণা করেননি, কারণ তাঁর অন্যান্য বিষয়ের পাণ্ডুলিপি মহাফেজখানায় রয়েছে কিন্তু কবিতার পান্ডুলিপি নেই। এটা স্বাভাবিক কবিতাগুলো তিনি অস্ত্রের মতো ব্যবহার করেছিলেন আর তা যুদ্ধের মাঠে থেকে কুড়িয়ে নিয়ে মহাফেজখানায় রাখেননি, সেখানে তিনি রক্তাক্ত হয়েছিলেন বা শত্রুকে ঘায়েল করেছিলেন সেসব যুদ্ধাস্ত্রগুলো যুদ্ধক্ষেত্রেই রয়ে গেছে, অন্য লোকজন তা কুড়িয়ে সংরক্ষণ করেছে এবং পরে সংকলিত করে প্রকাশ করে দিয়েছে বলে বিশ্ব আজ তাঁর সে কবিতার শব্দাস্ত্রগুলোর কী ধার বুঝতে পাচ্ছে।
ওমর খৈয়াম অবহেলায় কিংবা বিশেষ কারণে কবিতা রচনা করেছেন, তাঁর সমসাময়িককালে তাঁকে কবি কিংবা তাঁর কবিতার কোনও কদর নিয়ে কেউ কোনও কথা বলেননি। তবু সে কবিতাগুলো বিশ্বমানের কবিতা হয়েছে। ওমর খৈয়াম নিজেও তা বুঝতে পারেননি। তবে তিনি রুবাই ছাড়া আর কোনও ধরনের কবিতা রচনা করেননি। রুবাই হল মাত্র চার লাইনের ক্ষুদ্র কবিতা, এগুলো রচনার যেমন বাহাদুরি আছে তেমনি উপযোগিতা রয়েছে। মুসলমানরা যেহেতু কাব্যকলা বা তসবির রচনাকে নাজায়েজ মনে করেন, এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তবুও যাঁরা কবিতা কিংবা মূর্তি রচনা বা ছবি আঁকেন, আক্রান্ত হলেই মাত্র তা লুকিয়ে ফেলতে পারেন সে ধরনের সৃষ্টির কৌশল আবিষ্কার করেছেন, তাই ক্ষুদ্র কবিতা রুবাই, ক্ষুদ্রচিত্র বা মিনিয়েচার এসবের দিকে ঝুঁকেছিলেন। রুবাই মাত্র চার পঙক্তির কবিতা, এর স্ত্ববকগুলো প্রথম, দ্বিতীয় এবং চতুর্থ লাইন শেষে অন্তমিলযুক্ত, তৃতীয়টি ছাড়া। খুব কম শব্দ খরচ করে বেশী কথার স্থানসংকুলান করাই হচ্ছে রুবাই রচনার উদ্দেশ্য। এর বিষয়বস্তু স্থাপনের নিয়ম ছিল একটা সাধারণ বা চিন্তাপূর্ণ আরম্ভ দিয়ে তৈরি কোনও বিষয়াশেস্নষ, শেষ লাইনে ঝাঁপিয়ে পড়া পরিণাম ও আঁকড়ে ধরা মীমাংসা খুঁজে পাওয়ার প্রয়াস। তবে তাতে বর্ণনা বা চিন্তার কোনও সম্পর্ক নেই। ফিটসজেরাল্ডের মতে লঘু গুরুর একটা অদ্ভুত খিচুড়ি মাত্র। বিশেষজ্ঞদের ধারণা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় কবিতাটি হল ওমর খৈয়ামের এ রুবাই। ১১১০ সালের রচনা ১৮৫৯ সালে ফিটসজেরাল্ড যার ইংরেজি অনুবাদ করেন।
ঐবৎব রিঃয ধ ষড়ধভ ড়ভ ইৎবধফ নবহবধঃয ভড়ধময
অ ঋষধংশ ড়ভ রিহব অ নড়ড়শ ড়ভ ঠবৎংব ধহফ ঃযবৎব নবংরফব সব ংরহমরহম রহ ঃযব রিষফবৎ-হবংং- ড়য, রিষফবৎহবংং বিৎব ঢ়ধৎধফরংব বহড়.ি
মূল ফার্সিতে খৈয়াম রচনা করেছিলেন
তুঙ্গী ময় লাল খোহাম ওয়া দিওয়ানী
সদ্দ রমকী বায়েদ ওয়া নিফসে নাজী
ওয়াজ গাছ মান ওয়াতু নিশফতে দর ওয়ারাজী
খোশতর বুদ আম সামলাকাতই সুলতানী
কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৫৯ সালে-
এক সোরাহি সুরা দিও, একটু রুটির ছিলকে আর
প্রিয় সাকি, তাহার সাথে একখানি বই কবিতার
জীর্ন আমার জীবন জুড়ে রইবে প্রিয়া আমার সাথ
এই যদি পাই চাইব নাকো তখত আমি শাহাজ শার।
ওমর খৈয়াম বেহেশত বানাবার যে ফিরিস্তি দিয়েছেন তার চাইতে উৎকৃষ্ট আকাঙ্ক্ষা মানবজীবনে আর হতে পারে না। সেই ফিরিস্তিগুলোর শ্রেষ্ঠ হল বই। সৈয়দ মুজতবা আলী তাই বলেছেন, 'রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে। কিন্তু বইখানি থাকবে অমর যৌবনা, যদি সেরকম বই হয়।' তবে 'প্রিয়া' বা তুমি নামটিও চিরকাল একই রকম থাকবে মানুষের মনে।
ওমর খৈয়াম ইবনে সিনার মতাদর্শের অনুসারী ইবনে সিজা ছিলেন পৃথিবীর সেরা মুক্ত চিন্তার দার্শনিক ও চিকিৎসক, মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত ইউনানি বা হেকেমি চিকিৎসার তিনি আদি জনক। এ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি প্রাচীন গ্রিকে প্রচলিত ছিল। মুসলমান মনীষীরা গ্রিক দর্শন, কাব্যাদর্শকে পুনর্জন্মদান করেছেন। খ্রিষ্টীয় জবরদস্তিমূলক আচরণ মধ্যযুগে ইয়োরোপ থেকে সকল সুকৃতি-সক্রেটিস, পেস্নতো, আরিস্ততল প্রমুখের অবদানকে পেগাজ অপবাদে গুঁড়িয়ে ফেলেছিল। মুসলমানদের যাঁরা গ্রিক এই ঝড়ঢ়য বা বোধির চর্চা করতেন তাদের বলা হত ফালসোফ, সংক্ষেপে সোফি বা সুফী। ইরানে সুফী দর্শন এভাবে গড়ে উঠেছিল, পরবতর্ীকালে গোঁড়া মতবাদ মিশে ধমর্ীয়বোধে আবিল আবত হয়েছে।
ওমর খৈয়ামের বাল্যকালীন শিক্ষা নিয়ে তিন স্কুল বন্ধুর এক মুখরোচক গল্প প্রচলিত, তৎকালীন নিশাপুরের শ্রেষ্ঠ গুণী ইমাম মোয়াকফিক্কর উদ্দিনের ছাত্র ছিলেন। লোকের ধারণা ছিল, একমাত্র সৌভাগ্যবান ও দুর্লভ প্রজ্ঞাপন্নরাই ইমামের ছাত্র হবার গৌরব অর্জন করতে পারত, কেবল আমীর রইসের পুত্রদের তিনি শিক্ষা দিতেন। তখন তাঁর বয়স ৮৪, কোনও ছাত্র গ্রহণ করতে চাইতেন না, মাত্র তিনজন সৌভাগ্যবান ছাত্র তাঁর গৃহে অধ্যয়নরত ছিলেন। তাদের একজন তুস নগরের হাসান আল তুসি, তিনি ইতিহাস বিখ্যাত নিযামুল মুলক, পরবতর্ীকালে ইরানের উজীরে আযম। দ্বিতীয় ছাত্রটি হচ্ছেন ওমর খৈয়াম আর তৃতীয়টি হলেন হাসান আব্বাস, পরবতর্ীকালে ইতিহাসের এ্যাসিসিজ-ইয়োরোপীয়দের বর্ণনায় 'ক্রুসেডার ওল্ড' ম্যান অব দি মাউন্টেনস' বা পর্বতের বুড়ো বদমাশ।
ইমামের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিযামুল মুলক সুলতানের অধীনে চাকুরি করে অবশেষে উজীরে আযম হন। বাল্যকালে তিন বন্ধু পাঠ্যাবস্থায় এক চুক্তিনামায় অঙ্গীকারাবদ্ধ হন যে, বিখ্যাত ইমামের ছাত্র হিসেবে তাদের তিনজনের যে কোনও একজন যদি চরম সৌভাগ্যের শিখরে অধিষ্ঠিত হন তবে তার সৌভাগ্যের অংশ অন্য দুই বন্ধুকে ভাগ করে দেবেন। এই চুক্তিনামা তিনজনের হাতের আঙ্গুল কেটে রক্ত বের করে মিশিয়ে লেখা হয়েছিল নাকি।
সেই হিসেবে দুই বন্ধু হাসান সাব্বাহ ও ওমর খৈয়াম একদিন উজীরে আযমের দরবারে এসে সৌভাগ্যবান বন্ধুকে বাল্যকালের চুক্তিনামার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। নিযামুল মুলক তাঁদের নিরাশ করেননি, শীঘ্রই ওয়াদা পূরণ করেন। হাসান সাব্বাহকে সুলতানের দরবারে একটি গুরুত্বপূর্ণ উজীরের পদ দান করেন। কিন্তু দুরাত্মা হাসান উপকারী বন্ধুর মহানুভবতার সুযোগে ব্যক্তিগত মতলব হাসিল উদ্দেশ্যে সুলতানের কানে উজীরে আযমের বিরুদ্ধে কুৎসা রচনা করে লাগান এবং সুলতান নিযামুল মুলককে কারারুদ্ধ করেন, কিন্তু পরবতর্ীকালে এই দুরভিসন্ধি ফাঁস হয়ে নিযামুল মুলক মুক্ত হন, হাসান সাব্বাহ পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। কিন্তু পরে দুস্যদরে সঙ্গে মিলিত হয়ে নানা দুষ্কার্য করেন এবং আলামূত পর্বতের পাদদেশে এক দসু্য রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। হালাকু খান তাদের বিধ্বস্ত করেন। হাসান দুস্যতা করার উদ্দেশ্যে হাশিশ নামক এক প্রকার মাদকদ্রব্য ব্যবহার করত, তা দিয়ে অচেতন করে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করত, সেই হাশিশ থেকে তার নাম এ্যাসিসিজ বা গুপ্ত হত্যাকারী হয়েছে।
হাসান সাব্বাহর মতো ওমর খৈয়ামও বন্ধু উজীরে আযম নিযামুল মুলকের নিকট দাবি নিয়ে উপস্থিত হলেন। কিন্তু কোনও রাজপদ বা দায়িত্বপূর্ণ কাজে নিযুক্ত হবার আবদার করলেন না, বরং বললেন, 'সর্বোচ্চ অনুগ্রহ আপনি আমাকে করতে পারেন যদি আপনার সৌভাগ্যের ছায়াতলের এক কোণে আমাকে বাস করার অনুমতি প্রদান করেন, যাতে আমি বিজ্ঞানের সাধনা করতে পারি এবং আপনার উত্তরোত্তর উন্নতি ও দীর্ঘ জীবন কামনা করতে পারি।'
নিযামুল মুলক খৈয়ামের এই অপকট ব্যবহার ও দাবির জন্য তাঁর ওপর কোনও জোর খাটালেন না। তাঁকে কেবল ১২০০ মিশকাল স্বর্ণ মুদ্রা বাৎসরিক বৃত্তি নিশাপুর কোষাগার থেকে মঞ্জুর করে দিলেন, যা নিয়ে গবেষণাগারে তিনি বিজ্ঞান সাধনায় নিমগ্ন রইলেন এবং জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় প্রভূত উৎকর্ষ লাভ করেন।
এই গল্পের সারবত্তা বিশেষ কিছু নেই তা বর্তমানে প্রমাণিত হয়েছে, কারণ নিযামুল মুলক প্রকৃতপক্ষে ওমর খৈয়ামের চাইতে ত্রিশ বছরের বড়ো ছিলেন।
ওমর খৈয়াম সারাজীবন বিজ্ঞান সাধনায় ও মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে কাটান, বিয়ে-সাদী বা সংসার করার সময় পাননি। তবে বিয়ে না করলেও নারীসঙ্গ বা বিভিন্ন রুবাইতে নারী প্রসঙ্গের যেসব উক্তি করেছেন তাতে তাঁকে একজন প্রেমিক না বলে উপায় থাকে না। হালে আবিষ্কৃত তথ্যে জানা গেছে যে, ওমর খৈয়াম জীবনে ভালোবাসাবিহীন ছিলেন না। জীবনের প্রথমে হালিমা বেগম নাম্নি এক পদস্থ কর্মচারীর কন্যার সঙ্গে তার বিবাহের আয়োজন ও তা সম্পন্ন করার প্রাক্কালে এক দুর্ঘটনার জন্য খৈয়াম তাঁর প্রণয়িনীকে হারান। ঘটনার বিবরণ এই, হালিমার পিতার নাম সালেম বেগ, তিনি সুলতানের দরবারের একজন কর্মচারী এবং প্রৌঢ় উজীরের অনুগ্রহভাজন ও অনুরক্ত ছিলেন। মেধাবী যুবক ওমরের গুণপনার পরিচয় পেয়ে তাঁর পিতা না থাকা সত্ত্বেও তার সঙ্গে আপন কন্যার পরিণন দেবার সকল ব্যবস্থা সম্পন্ন করেন। ঠিক সে সময় প্রৌঢ় উজীর সালেম বেগের বাড়ি এসে তাঁর কন্যাকে দেখে আশীর্বাদ করার পরিবর্তে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। কন্যার বিয়ে পূর্বে ঠিকঠাক হয়ে গেছে শুনে ওমরের বৃত্তান্ত সংগ্রহ করে জানান যে, সে যুবক একজন বেদাতি সুফি ও মুতাজিলি মতগ্রস্ত হয়ে বিনষ্ট কাফের হয়ে গেছে, তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হলে সুলতানকে বলে সালেম বেগকে কারাগারে পাঠাবেন এবং তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবেন। ভয় পেয়ে সালেম বেগ গোপনে প্রৌঢ় উজিরের সঙ্গে কন্যার বিয়ে দিয়ে উজীরের রোষ থেকে বাঁচলেন। কিন্তু ওমর খৈয়াম হূদয়ে প্রচণ্ড আঘাত খেয়ে জীবনের ধারা বদলে ফেললেন।
ওমর খৈয়ামের সঙ্গে তাঁর সাকির প্রসঙ্গ অনিবার্য। সাকি কুরানীর শব্দ, অর্থ শরাব পরিবেশন কারিনী বালিকা অথবা বালক, বলা হয়েছে বেহেশতে মুমিনদের শরাবন তহুরা পান করানো হবে, সাকি তা পান করাবেন। খৈয়াম সেই আদর্শে কাব্যে সাকি সৃষ্টি করেছেন, তবে তাঁর সাকি রক্ত মাংসের এবং তাঁর শরাবও আঙ্গুরের রস।
কথিত আছে সারাদিন বিজ্ঞান গবেষণার শেষে সন্ধ্যায় ওমর খৈয়াম শহরের সেরা মেসখানা বা মধ্যপানের আসরে বন্ধুদের সঙ্গে হালকা অথবা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় নিমগ্ন থাকতেন। হাসির টুকরা ও রুবাইও তার সঙ্গে থাকত। তখন তাঁর বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। এ বয়সে তিনি একটা অঘটন ঘটান। তিনি আসরে প্রায় বলতেন, এমন করে শরাব পান করবে যেন যৌবন উৎপাদন এবং জীবন চিরন্তন থাকে। কীভাবে সম্ভব সকলে তার কৌশল তাঁর কাছ থেকে জেনে নিত। আমির রইস শাহজাদা শ্রেণীর লোকেরা সে জন্য তাঁর চারদিকে ভিড় লাগাত। একদিন তিনি নিজে এ সমস্যায় পড়েন, বাগদাদ থেকে সদ্য আসা এক বালিকা শরাব পরিবেশন কারিনী তাঁর পেয়ালায় মদ্য ঢালার মুহূর্তে তার দৈহিক রূপ সৌন্দর্যের দিকে ইংগিত করে এক রুবাই রচনা করেন। বন্ধুকে লক্ষ্য করে বললেন, এইরূপ সৌন্দর্যের লীলা মাত্র এক সপ্তাহের জন্য, তারপর দেখবে জীর্ণবাস। কিন্তু আমি পারি, তার দাওয়া আমার কাছে আছে, আমি তাকে চিরন্তনী রূপ দিতে পারি।
সেই বালিকা প্রকৃতপক্ষে ইয়ামেনের এক রইস কন্যা, অপূর্ব সুদর্শনা। ডাকাতরা তাকে চুরি করে এনে শরাব খানার মালিকের কাছে বিক্রয় করে দিয়েছে। সে বালিকা খৈয়ামের কথা শুনে কেঁদে পড়ল, বলল, আপনি আমাকে মুক্ত করুন এই শুড়িখানার মালিকের কাছ থেকে এবং আপনার লীলা সঙ্গিনী করে আজীবন সঙ্গে রাখুন, আমি আপনার কাব্যের সৌন্দর্যের রানি হয়ে থাকব।
সে থেকে সাকি খৈয়ামের সমস্ত কাজের ভেতর, সৌন্দর্যের ভেতর, কাব্যের ভেতর অবস্থান করে তার রূপ জগতের কাছে প্রকাশ করেছে। বিশ্ব আজ সাকির প্রেমে আকুল।
====================
নাটক- 'বিম্বিত স্বপ্নের বুদ্বুদ' by মোজাম্মেল হক নিয়োগী  গল্প- 'জয়া তোমাকে একটি কথা বলবো' by জাহিদুল হক  গল্প- 'নতুন বন্ধু' by আশরাফুল আলম পিনটু  গল্প- 'টপকে গেল টাপ্পু' by ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ  গল্প- 'নাচে বানু নাচায়রে' by আতা সরকার  গল্প- 'রূপকথার মতো' by নাসির আহমেদ  গল্প- 'বিয়ে' by আর্নল্ড বেনেট  গল্প- 'মাদকাসক্ত' by আলী ইদ্রিস  গল্প- 'বেঁটে খাটো ভালোবাসা' by রেজানুর রহমান  কবর by জসীম উদ্দীন (পল্লীকবি)  গল্প- 'নদীর নাম চিলমারী' by নীলু দাস  গল্প- 'লাউয়ের ডগা' by নূর কামরুন নাহার  গল্প- 'অপূর্ব সৃষ্টি' by পারভীন সুলতানা গল্প- 'ঊনচলিস্নশ বছর আগে' by জামাল উদ্দীন  গল্প- 'সুচ' by জাফর তালুকদার   গল্প- 'বাসস্ট্যান্ডে যে দাঁড়িয়েছিল' by ঝর্না রহমান  গল্প- 'গন্না' by তিলোত্তমা মজুমদার  গল্প- 'ঘুড়িয়াল' by শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়  গল্প- 'প্রক্ষেপণ' by মোহিত কামাল  গল্প- 'গন্তব্য বদল' by রফিকুর রশীদ  গল্প- 'ঝড়ের রাতে' by প্রচেত গুপ্ত  গল্প- 'শুধু একটি রাত' by সাইপ্রিয়েন এক্ওয়েন্সি। অনুবাদ বিপ্রদাশ বড়ুয়া  গল্প- 'পিতা ও কুকুর ছানা' by হরিপদ দত্ত  স্মরণ- 'শওকত ভাই : কিছু স্মৃতি' by কবীর চৌধুরী  সাহিত্যালোচনা- 'রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পালাকারের নাটক  স্মরণ- 'আবদুল মান্নান সৈয়দ : কবি ও প্রাবন্ধিক' by রাজু আলাউদ্দিন  স্মরণ- 'সিদ্ধার্থ শংকর রায়: মহৎ মানুষের মহাপ্রস্থানে by ফারুক চৌধুরী  গল্প- 'ফাইভ স্টার' by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম  গল্প- 'নূরে হাফসা কোথায় যাচ্ছে?' by আন্দালিব রাশদী 


দৈনিক ইত্তেফাক এর সৌজন্য
লেখকঃ ড. শামসুল আলম সাঈদ


এই রচনা'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.