সিরীয় যুদ্ধের নয়া মোড় by তারেক শামসুর রেহমান

সিরিয়ার যুদ্ধ একটি নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। গেল শনিবার সিরিয়া থেকে ছোড়া গোলার আঘাতে ইসরাইলের একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। সিরিয়ার গত সাত বছরের গৃহযুদ্ধে ইসরাইল এর আগে কখনও জড়িত হয়নি। এই প্রথম এ যুদ্ধে ইসরাইল তার বিমান হারাল। ইসরাইলের সিরীয় সংকটে জড়িয়ে যাওয়া এবং বিমান হারানোর ঘটনা ঘটল এমন এক সময় যখন তুরস্ক সিরিয়ার অভ্যন্তরে কুর্দি অঞ্চলে সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে। এক সময় ধারণা করা হয়েছিল, সিরিয়া ও ইরাক থেকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিদের উৎখাতের পর হয়তো সেখানে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। কিন্তু সেখানে যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে, তা বলা যাবে না। মার্কিন ও রুশ বিমানবহর সেখানে সীমিত কিছু টার্গেটের ওপর বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। সিরিয়ার যুদ্ধ এখন দেশটির সীমান্ত ছাড়িয়ে লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ইসরাইলের বিমান ধ্বংস হওয়ার পর ইসরাইল লেবাননের হিজবুল্লাহ জঙ্গিগোষ্ঠীর ওপর এবং একইসঙ্গে ইরানি অবস্থানের ওপর বিমান হামলার হুমকি দিয়েছে। হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী ইরান ও সিরিয়ার সমর্থনপুষ্ট। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী সিরিয়ার সেনাবাহিনীর একটি ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালিয়েছে। এর আগে সিরিয়া থেকে পাঠানো ইরানের একটি ড্রোন ইসরাইলের আকাশসীমায় প্রবেশ করলে সেটিকে ভূপাতিত করা হয়। এর পরপরই সিরিয়ায় অবস্থিত ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইল। এ হামলা চালাতে গিয়েই ইসরাইল তার বিমানটি হারায়। উল্লেখ্য, একটি এফ-১৬ বিমানের দাম ১৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সিরিয়া যুদ্ধে এখন কয়েকটি ফ্রন্টের জন্ম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, তুরস্ক, ইরান- সবারই সিরিয়ায় স্বার্থ রয়েছে। এখন যোগ হল ইসরাইল। যুদ্ধবিমান হারানোর পর ইসরাইল এটাকে হালকাভাবে নেবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। তুরস্ক সিরিয়ার কুর্দি অধ্যুষিত আফরিন দখল করে নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। অথচ দুটি দেশই ন্যাটোর সদস্য। তুরস্কের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। রাশিয়া থেকে অস্ত্রও কিনছে তুরস্ক। এ অস্ত্র কেনার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ভালো চোখে দেখছে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে আফরিনে তুরস্কের সামরিক আগ্রাসন যুক্তরাষ্ট্রের ভালো না লাগারই কথা। তুরস্কে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড হয়েছে, তা কুর্দি সন্ত্রাসীদের কাজ বলে আংকারার অভিযোগ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কুর্দি অঞ্চল মানবিজকে নিয়ে। মানবিজ সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের একটি শহর। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র অংশের অবস্থান রয়েছে, যারা সেখানে ‘উপদেষ্টা’ হিসেবে কর্মরত। তুরস্ক মানবিজ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান জেনারেল জোসেফ ভোগেল সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি সেনা প্রত্যাহারের ব্যাপারে আদৌ কোনো চিন্তাভাবনা করছেন না। তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন, পেন্টাগন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখবে। এ ফোর্স আফরিন শহরকে মুক্ত করার জন্য তুরস্কের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ করছে। ফলে সিরিয়া সংকট নতুন একটি মোড় নিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে আফরিন অঞ্চল থেকে কুর্দি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ওয়াইপিজি উচ্ছেদ হলেও তারা পাল্টা লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। তুরস্কের সামরিক আগ্রাসন সিরিয়ার শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও বিঘ্নিত করবে। জেনেভায় জাতিসংঘের উদ্যোগে যে শান্তি আলোচনা চলে আসছিল, তা কোনো ফল বয়ে আনতে পারছিল না। অন্যদিকে রাশিয়ার সোচিতে ২৯ জানুয়ারি যে শান্তি আলোচনার আহ্বান করা হয়েছিল, সিরিয়ার বিরোধী পক্ষ তাতে যোগ না দেয়ায় কার্যত সেই উদ্যোগও এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ফলে সঙ্গতকারণেই এ প্রশ্ন উঠেছে যে, সিরিয়ার রাজনীতি এখন কোন পথে? সিরিয়া থেকে আইএসের মতো জঙ্গিগোষ্ঠী একরকম উচ্ছেদ হয়েছে। বিশেষ করে বছর দুয়েক আগে মার্কিন ও রুশ বিমান হামলার পর আইএস সিরিয়ায় দুর্বল হয়ে যায়। তারা ২০১৪ সালের পর থেকে যেসব এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল এবং যেসব এলাকায় তারা তথাকথিত একটি ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠা করেছিল, ওই বিমান হামলায় তা ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে আইএস সিরিয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু রাশিয়ার বিমান হামলা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ ওঠে, রাশিয়ার বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে আসাদবিরোধী বেশকিছু বিদ্রোহী গ্র“প, যারা আইএসের সঙ্গে জড়িত ছিল না। এই যখন পরিস্থিতি, তখন আফরিনে তুরস্ক সামরিক আগ্রাসন চালাল। তুরস্ক তার সামরিক আগ্রাসনের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছে। তুরস্ক বলছে, তারা শহরটিকে সন্ত্রাসীদের করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেবে না। এ সামরিক আগ্রাসনের ঘটনা ন্যাটোভুক্ত যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছে। তুরস্কের সামরিক আগ্রাসনের একদিন আগে সিরিয়ার তুরস্ক সীমান্তবর্তী এলাকায় কুর্দিদের নিয়ে শক্তিশালী সীমান্তরক্ষী বাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) নেতৃত্বেই যুক্তরাষ্ট্র এ পরিকল্পনা করে। পিকেকে তুরস্কে নিষিদ্ধ। ওয়াইপিজে হচ্ছে পিকেকের সামরিক শাখা। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে তুরস্কের অভ্যন্তরে যেসব সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে, তার পেছনে পিকেকের হাত রয়েছে বলে তুরস্ক অভিযোগ করেছিল। আফরিনে তুরস্কের সামরিক অভিযানে সিরিয়ার জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ আরও বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কুর্দি ওয়াইপিজি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এ হামলা ট্রাম্প প্রশাসনকে ন্যাটোভুক্ত তুরস্কের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে সিরিয়ার রাকা শহর থেকে আইএসকে উৎখাতে ওয়াইপিজির সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে বিমান হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু তুরস্ক ওয়াইপিজি-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতাকে ভালোভাবে নেয়নি। তুরস্কের ভয় ছিল কুর্দি বিদ্রোহীরা ভবিষ্যতে মার্কিন সহযোগিতা নিয়ে তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাকের অংশবিশেষ নিয়ে একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। সিরিয়ার কুর্দিরা বেশিরভাগই দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাস করে। ওয়াইপিজি ২০১২ সালে ইউফ্রেটিস নদীর পূর্বপাড়ের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর থেকেই তুরস্ক একধরনের অস্বস্তিতে ছিল। বলা ভালো, ১৯৮৪ সাল থেকেই পিকেকে তুরস্কের বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধ চালিয়ে আসছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অনেকের স্মরণে থাকার কথা, কুর্দি শহর কোবানিকে আইএসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ২০১৪ সালে সেখানে বিমান হামলা চালিয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসনের বক্তব্য যদি আমরা সত্য বলে ধরে নিই, তাহলে এটা স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় তাদের উপস্থিতি রাখতে চায়। তারা সিরিয়ায় দুই হাজার সামরিক উপদেষ্টা পাঠাতে চায়। আর তাই তারা ব্যবহার করতে চায় ওয়াইপিজিকে। সমস্যাটা তৈরি হয়েছে এখানে। তুরস্কের এটা পছন্দ নয়। ওয়াইপিজি যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে তা দেশটির (তুরস্ক) সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। এক সময় ওয়াইপিজির সঙ্গে রাশিয়ার ভালো সম্পর্ক ছিল। অভিযোগ আছে, রাশিয়ার উপদেষ্টারা আফরিনে ওয়াইপিজির পক্ষে কাজ করত। কিন্তু ওয়াইপিজি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দ্বিতীয় ফ্রন্ট ওপেন করায় রাশিয়া কুর্দিদের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, আফরিনে তুরস্কের সামরিক অভিযানের ব্যাপারে রাশিয়ার কোনো আপত্তি ছিল না।
এখানে বৃহৎ শক্তি ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর একটি ভূমিকা লক্ষ করার মতো। সিরিয়ার রাজনীতিকে কেন্দ্র করে স্পষ্টতই দুটি পক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। এটা স্পষ্ট যে রাশিয়ার কারণেই আসাদ সরকার টিকে গেল। এখানে রাশিয়া-ইরান-সিরিয়া একটি পক্ষ। আর যুক্তরাষ্ট্র আসাদবিরোধী। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান রাশিয়া-ইরান-সিরিয়া জোটের বিরুদ্ধে। তুরস্ক তার জাতীয় স্বার্থের কারণেই রাশিয়া-ইরান-সিরিয়া শিবিরে অবস্থান করছে। তাহলে সিরিয়া সংকটের সমাধান হবে কোন পথে? সেখানে একটি সংবিধান প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। ক্ষমতায় আসাদকে রাখা না রাখা নিয়ে একটি ‘বিতর্ক’ আছে। সিরিয়ায় আসাদবিরোধী অনেক ‘পক্ষ’ রয়েছে, যারা একদিকে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ করছে, অন্যদিকে ক্ষমতা দখলের জন্য নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত। দুটি বড় শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াও সিরিয়া সংকটে নিজেদের জড়িত করেছে। জাতিসংঘের উদ্যোগে জেনেভায় একটি শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কিন্তু ওই সম্মেলনে এখন অব্দি একটি শান্তি ফর্মুলা উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। একইসঙ্গে রাশিয়ার উদ্যোগে সোচিতে আসাদবিরোধীদের নিয়ে একটি শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করে আসছে রাশিয়া। কিন্তু সেখানেও কোনো সমাধান বের করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ সোচি বৈঠক বয়কট করেছে আসাদবিরোধী পক্ষ, যাদের কেউ কেউ জেনেভা সম্মেলনেও অংশ নিয়েছিল। জেনেভা সম্মেলনে যোগ দিতে বিরোধী দলগুলোর উদ্যোগে একটি ‘হাই নেগোসিয়েশন্স কমিটি’ (এইচএনসি) গঠিত হয়েছিল। কিন্তু এ কমিটির মধ্যেও দ্বন্দ্ব আছে। এইচএনসি সৌদি আরব সমর্থিত। তবে কুর্দিদের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে এখানে দ্বন্দ্ব আছে। বস্তুত ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর জন্ম হওয়া এইচএনসির কোনো ভূমিকা নেই। তাহলে সমাধানটা হবে কীভাবে? সিরিয়ার পরিস্থিতি সত্যিকার অর্থেই জটিল হয়ে পড়েছে। এখানে কার্যত দুটি বড় শক্তির অবস্থান পরস্পরবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই কুর্দিদের নিয়ে সিরিয়ায় আসাদবিরোধী একটি ফ্রন্ট গড়ে তুলতে চায়। অর্থাৎ আসাদবিরোধী একটি পক্ষকে সমর্থন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় তার অবস্থান ধরে রাখতে চায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে তুরস্কের সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে না। কুর্দিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহাবস্থান ও সমর্থন তুরস্ক ভালো চোখে দেখছে না। যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে সিরিয়ায় ইরানি প্রভাব কমানো। এ ক্ষেত্রে সুন্নি ধর্মাবলম্বী তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক মিত্র হতে পরত। কিন্তু তা হয়নি। বরং তুরস্ক ও ইরান একধরনের অ্যালায়েন্সে গেছে। রাশিয়া আইএসবিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে ছিল। কিন্তু রাশিয়া চায় না আসাদ অপসারিত হোক। আসাদকে রেখেই রাশিয়া একধরনের সমাধান চায়। এ ব্যাপারে তুরস্কের আপত্তি থাকলেও বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তুরস্ক আজ রাশিয়ার মিত্র।
রাশিয়া নিজ উদ্যোগে সিরিয়ায় একটি রাজনৈতিক সমাধান বের করতে চায়। সেজন্যই সোচিতে সিরিয়ার সব দল ও মতের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সম্মেলনের আহ্বান করেছিল, যাকে তারা বলছিল ‘সিরিয়ান কংগ্রেস অব ন্যাশনাল ডায়ালগ’। কিন্তু আগেই বলেছি, সিরিয়ার বিরোধীপক্ষ এ সম্মেলনে অংশ নেয়নি। সিরিয়া সংকটের মূলে রয়েছে সব মত ও পথকে একটি কাঠামোর অধীনে আনতে না পারা। সেখানে সুন্নি, শিয়া মতাবলম্বীসহ বিভিন্ন সামরিক গ্র“পও রয়েছে। আসাদ সমর্থকরাও একটি পক্ষ। কিছু ইসলামিক গ্রুপও রয়েছে, যারা আইএসের বিরোধিতা করেছিল। সবাইকে নিয়ে একটি সমাধান বের করা সহজ কাজ নয়। যদিও সোচিতে সবাই সিরিয়ার অখণ্ডতা রক্ষায় একমত হয়েছেন। একইসঙ্গে গণতান্ত্রিক ধারা ও নির্বাচনের প্রশ্নে সবাই একমত হয়েছেন। তারপরও কথা থেকে যায়- বড় বিরোধী দলের অবর্তমানে এ সমঝোতা আদৌ কাজ করবে কিনা? এই যখন পরিস্থিতি তখনই ইসরাইলি বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা ঘটল। ইসরাইল এ ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে। ইসরাইলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু হুমকির সুরে বলেছেন, তার দেশের বিরুদ্ধে এ ধরনের ‘হুমকি’ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইল এ ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে সিরিয়া ও ইরানের কোনো কোনো প্রশিক্ষণ শিবিরে বিমান হামলা চালাতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে সিরিয়ায় একটি সর্বাÍক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া। লেবাননের ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যাফেয়ার্সের গবেষক সামি নাদেরের মতে, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে ইসরাইলের যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ল। এতদিন দেশ দুটি লেবানন ও সিরিয়ায় একধরনের ‘প্রক্সি যুদ্ধে’ নিয়োজিত ছিল। এখন তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে। এ আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। ইরানের ব্যাপারে ট্রাম্পের একধরনের নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ইরানের সঙ্গে ৬ জাতি পারমাণবিক সমঝোতা মানেন না। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র তার ‘চাপ’ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যোগ দিল ইসরাইল। এর মধ্য দিয়ে সিরিয়ার সংকট নতুন একটি মাত্রা পেল। তাতে করে সিরিয়ায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে। সিরিয়ায় নতুন নতুন ‘ফ্রন্ট’ যুক্ত হচ্ছে। একদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার স্বার্থ, অন্যদিকে তুরস্ক, ইরান ও ইসরাইলের নিজ নিজ স্বার্থ। সব মিলিয়ে দেশটি এখন বহুমাত্রিক স্বার্থের দ্বারা আষ্টেপৃষ্ঠে আবদ্ধ। গত বছর আইএস সেখান থেকে উৎখাত হয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ সেখানে থামেনি। আগামীতেও থামার সম্ভাবনা কম।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
tsrahmanbd@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.