দুঃসাহসী অথচ সরল এক মানুষ

মুক্তিযুদ্ধে ৯নং সেক্টরে সাবসেক্টর কমান্ডার হিসেবে জীবন বাজি রেখে পিরোজপুর, বাগেরহাট এবং সুন্দরবনকে শত্রুমুক্ত করতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যে সাহসী যোদ্ধা, সম্মোহনী নেতা, তিনি মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ। যে মানুষটির নাম-পরিচয় জানার আগেই প্রথম সরাসরি দেখার সুযোগ হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। আমি তখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। মাছ ধরার একটি ট্রলারে করে কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে খুবই সংক্ষিপ্ত সফরে সাফা (মঠবাড়িয়া) এসেছিলেন আমাদের চাচা বেলায়েত বেপারীর নিমন্ত্রণে। আমাদের দাদু ইসহাক মাস্টারের বাড়িতেও কিছুক্ষণের যাত্রাবিরতি করেছিলেন। আসলেন, দুপুরের খাবার খেলেন, চলে গেলেন। যাওয়ার সময় তার বড় মনের পরিচয় রেখে গেলেন । বিদায় নেয়ার সময় খালের পানি ভাটিতে অনেক নিচে নেমে গিয়েছিল; সে কারণে ট্রলারে উঠতে গিয়ে একজন মাঝির নৌকায় পা রেখে উঠতে হল।
মাঝি মনের খুশিতেই সাহায্য করেছিল। কিন্তু কেউ কল্পনাও করেনি যে, তিনি একমুঠো টাকার বান্ডিল মাঝির হাতে ধরিয়ে দেবেন। ‘ঝাঁকড়া চুল’, ‘১৪ ইঞ্চি সাদা-কালো টেলিভিশন সাইজের চোখ’! ‘বিরাট কলজের এই মানুষটি’ আমার স্মৃতিতে গেথে গেল। দীর্ঘ ৮ বছর পর আমার সুযোগ হল সেই মানুষটিকে খুব কাছে থেকে দেখার। ১৯৯২ সালে পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজে পড়াকালীন কলেজ থেকে শিক্ষা সফরের আয়োজন করা হল। ব্যক্তিগতভাবে সুন্দরবনের প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে। এছাড়া প্রকৃতি আমাকে সব সময়েই আকর্ষণ করে। আমাদের কয়েকজন ছাত্রের অনুরোধে রুস্তম আলী স্যার (ইসলামের ইতিহাসের বিভাগীয় প্রধান), নুর-ই-জালাল স্যার রাজি হলেন। যোগাযোগ করা হল মেজর জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি যে এত সহজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন তা কেউ চিন্তা করিনি। আইএ এবং বিএ’র ১৪০ জন ছাত্রসহ ১৬০ জনের জন্য একটি স্টিলবডি লঞ্চ আগেই ভাড়া করা হয়েছিল। দুপুরের খাবার সেরে বড় ভাই পলাশসহ রওনা হলাম। যাওয়ার সময় পিরোজপুর সদর রোড থেকে একটি বাইনোকুলার কিনে নিলাম। এক বড় ভাই’র কাছ থেকে একটি ইয়াসাকি স্টিলক্যামেরা ধার করলাম। লঞ্চঘাটে গিয়ে দেখি মেজর জিয়াউদ্দিন আমাদের আগেই তার স্পিডবোট নিয়ে পৌঁছে গেছেন। আমাদের লঞ্চ এবং মেজর জিয়াউদ্দিনের স্পিডবোট নিরাপদ দূরত্বে চলতে শুরু করল। পিরোজপুরের বলেশ্বর অতিক্রম করে কঁচা নদীতে যখন পৌঁছালাম তখন পড়ন্ত বিকাল। দেড় ঘণ্টার মতো চলার পর বাম দিকের মাঝেরচর অতিক্রম করতেই ডানদিক বরাবর সুন্দরবনের সীমানা চোখে পড়ল। সারি সারি গোলপাতা, সুন্দরীসহ বিভিন্ন জাতের নাম না জানা গাছ দেখতে পেলাম। জীবনে এই প্রথম সুন্দরবন দেখার এক অজানা, অচেনা আনন্দে বিমোহিত হয়ে গেলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমাদের লঞ্চের গতি কমে গেছে। মেজর জিয়াউদ্দিন তার স্পিডবোট ছেড়ে আমাদের লঞ্চে উঠে এলেন। স্পিডবোটটি লঞ্চের পেছন দিকে বেঁধে দেয়া হল। লঞ্চ এগিয়ে চলল আরও দক্ষিণে। এবার চোখ পড়ল বঙ্গোপসাগরে। আমার রোমাঞ্চ বেড়ে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ হয়ে গেল। ঠিক সূর্যাস্তের সময়টিতে আমাদের লঞ্চ নদীর মোহনা ছেড়ে সমুদ্রে প্রবেশ করল।
সে এক অবর্ণনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সব ছাত্র একসঙ্গে লঞ্চের সামনের দিকটায় চলে এলো নদী-সাগরের মোহনায় সূর্যাস্ত দেখার লোভে। বেরসিক লঞ্চ কী আর বুঝবে এই মোহনীয় সূর্যাস্ত! লঞ্চের সামনের দিকটা অনেকখানি দেবে গেল। হঠাৎ সবাই ভয় পেয়ে গেলাম। মেজর জিয়াউদ্দিন খুব দ্রুত ইশারা করে সবাইকে ব্যালেন্স করতে বললেন। এরপর মেজর জিয়ার ইন্সট্রাকশনে আমাদের লঞ্চ ডানদিকে মোড় নিয়ে সুন্দরবনের উপকূল বরাবর সোজা পশ্চিমে চলতে থাকল। ঘণ্টা দেড়েক চলার পর সুন্দরবনের একটি খালের মধ্যে ঢুকেই নোঙর করল আমাদের লঞ্চ। স্থানটি সুন্দরবনের সর্বদক্ষিণের একটি চর। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগর উপকূলে সুন্দরবনের এই নির্জন এলাকাটির নাম ‘মেহের আলী’র (দুবলার) চর’। কী চমৎকার সময়ই না কাটিয়েছি পরপর চারদিন। পঞ্চম দিন খুব ভোরে আমরা পিরোজপুরে ফেরার উদ্দেশে রওনা করলাম। সুন্দরবনের খাল থেকে আমাদের লঞ্চ যখন আবার সমুদ্রে প্রবেশ করল- ঠিক সেই মুহূর্তটা ‘সাগরের বুক চিড়ে একফালি টকটকে লাল আলোকবার্তা’- যেন এখনও চোখের কোণায় আটকে আছে। ১৯৯২ সালের কথা। জানি না কিভাবে সেই দিনগুলো এতগুলো বছর পরেও স্মৃতিতে খোদাই হয়ে আছে! চারদিনের সফরে মেহের আলী’র চরের জেলেদের জন্য একটা মায়া জন্মে গেল। আর সেটা প্রচণ্ড রকম অনুভব করলাম মেহের আলী’র চর ছেড়ে আসার মুহূর্তে- চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। মাছ শিকার করে রোদে শুকানো, সংগ্রামী কিন্তু সরল জীবনযাত্রা- তারা যেন অন্য এক জগতের মানুষ। মনের খাতায় লেখা রয়ে গেল ‘মেহের আলী’র চর’, ‘দীঘি-আইল্যান্ড’, ‘দীঘির চারপাশের খেজুরগাছ’, ‘বনের গভীরে মেজর জিয়াউদ্দিনের প্রশিক্ষণ গ্রাউন্ড’, ‘হরিণের ট্রিমড করা বড়ই গাছ’। সে এক অন্য জগৎ। সুযোগ পেলে আরেকবার যেতে চাই ওই জগতে। সমরেশ মজুমদারের কালজয়ী উপন্যাস ‘গর্ভধারিণী’র কথা মনে পড়ছে বারবার। সংগ্রামের এক পর্যায়ে শহর থেকে বহু দূরে দুর্গম পাহাড়ের অন্য প্রান্তে জয়ীতা, কল্যাণ, সুদীপদের নতুন একটা সমাজ গঠনের প্রয়াস আর মেহের আলী’র চরের জেলেদের জীবন সংগ্রাম অনেকটা একই রকম। এ লেখার শুরুতেই আমার ক্ষমা চেয়ে নেয়া উচিত ছিল। অনেকদিন ধরে লেখালেখির অভ্যাস নেই আমার; ভুল-ত্রুটির জন্য মাফ চেয়ে নিচ্ছি। লেখায় উৎসাহ দেয়ার জন্য এক লেখক মামার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এ লেখাটি সম্পাদনায় সহযোগিতার জন্য আমার জুনিয়রকে ধন্যবাদ। শেষটায় এসে সেই মানুষটির কথা বারবার মনে করতে হয়, যিনি ১৯৭১ সালে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে এনেও যুদ্ধ যার হয়নি শেষ; সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার জন্য, সুন্দরবনজীবীদের নিরাপদে রাখার স্বার্থে সংগ্রাম করেছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন বহুবার, মহান হৃদয়ের অধিকারী, নির্লোভ এবং দুঃসাহসী- সুন্দরবনের মুকুটহীন সম্রাট মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ- ‘তোমায় স্যালুট’।
জিয়াউল ইসলাম : লন্ডন প্রবাসী
yiaulislam77@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.