‘সভ্যতা’ শেখাচ্ছেন সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ! by সোহরাব হাসান

বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮(১) ধারায় আছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’
অথচ সেই সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ একের পর এক সংবিধানবিরোধী কাজ করে যাচ্ছেন। এত দিন তিনি দেশের ভেতরে এসব তৎপরতা চালালেও এখন বিদেশে গিয়েও দেশকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন।
জাতীয় সংসদের প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে ইলিয়াস মোল্লাহ কঙ্গো গিয়েছিলেন সে দেশের ‘কালো’ মানুষদের সভ্যতা শেখাতে! তিনি সেখানে কী শিখে এসেছেন, সেই শিক্ষা দেশের জনগণের কী উপকারে লাগবে, সে সম্পর্কে কোনো আভাস না দিলেও একটি কথা জোর দিয়ে বলেছেন, ‘সেখানকার কালো মানুষগুলো সভ্যতা পায়নি। আমাদের আর্মি তাদের সভ্য করার জন্য সেখানে গিয়েছে।...আমি মনে করি, আর্মি তাদের সভ্য করতে সহযোগিতা করছে। তারা সেই কাজটি করেই আসবে।’ (প্রথম আলো, ৫ আগস্ট ২০১৫)
এর মাধ্যমে ইলিয়াস মোল্লাহ নিজেকেই কেবল চরম বর্ণবাদী হিসেবে প্রমাণ করেননি, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর গায়েও বর্ণবাদের কালি লেপ্টে দিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্য মানবতাবিরোধী, সভ্যতাবিরোধী। কোনো মানুষকে বর্ণের পরিচয়ে চিহ্নিত করা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
গত ২৫ থেকে ৩১ জুলাই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির দুটি প্রতিনিধিদল আফ্রিকার কঙ্গো ও আইভরি কোস্ট সফর করে। তারা সেখানে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী দলের সদস্যদের কার্যক্রম পরিদর্শন করে। ফারুক খানের নেতৃত্বে কঙ্গো যাওয়া প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য ছিলেন ইলিয়াস মোল্লাহ। সফর-অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গত বুধবার সংসদ ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইলিয়াস মোল্লাহ এই বর্ণবাদী মন্তব্য করেন। আফ্রিকার মানুষেরা কীভাবে সভ্যতার আলো পায়নি—সাংবাদিকদের এ রকম প্রশ্নের জবাবে সাংসদ বলেছেন, ‘কঙ্গোর মানুষ ১৫ দিন পর এক দিন গোসল করে এবং গায়ে সাবান মেখে পানি দেয় না।’
এটাই নাকি সভ্যতাহীনতার প্রমাণ। যে ব্যক্তির শান্তিরক্ষা দলের কার্যক্রম সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা আছে, সেই ব্যক্তি এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন না। তবে ইলিয়াস মোল্লাহর তা জানার কথা নয়, কেননা তিনি তো দখলবাজি সভ্যতা গড়ে তুলতেই ব্যস্ত।
তবে তাঁর জানা উচিত যে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী দল সেখানকার মানুষকে কথিত সংস্কৃতি বা আচরণ শেখাতেও যায় না। তারা যায় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। তাদের অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করতে। আর ইলিয়াস মোল্লাহ সভ্যতা বলতেই বা কী বোঝেন? তাঁর নির্বাচনী এলাকা মিরপুর-১৬–এ তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের যে ‘সভ্যতা’ গড়ার আলামত পাওয়া যাচ্ছে, তাতে সেখানে নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় মানুষের থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাঠক, এবার ইলিয়াস মোল্লাহর কাণ্ডকীর্তির কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। তিনি কঙ্গোতে সেখানকার মানুষকে সভ্যতা শেখাতে গেলেও তাঁর নিজের নির্বাচনী এলাকায় গত বছর বিহারি বস্তিতে আগুন দিয়ে যে ১০ জন মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হলো, তার মধ্যে অসভ্যতার কিছু দেখেননি। ঘটনার আগে তিনি বিহারিপল্লিতে গিয়ে এই বলে হুমকি দিয়ে এসেছিলেন যে দুই দিন সময় দেওয়া হলো। এর মধ্যে পাশের বাঙালি বস্তিতে বিদ্যুৎ-সংযোগ না দেওয়া হলে খবর আছে।
হ্যাঁ, দুদিন পরই খবর পেয়ে গেলেন সেখানকার বিহারি সম্প্রদায়ের মানুষ।
শবে বরাতের রাতেই ১০ জন মানবসন্তানকে পুড়িয়ে মারা হলো। তালাবদ্ধ ঘরে কারা আগুন দিয়েছে? অভিযোগ আছে, সাংসদের অনুসারী ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা এই আগুন দিয়েছে। গায়ে সাবান মেখে পানি না দিলে সেটি সাংসদ ইলিয়াস মোল্লার কাছে অসভ্যতা হয়, আর আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা সভ্যতা!
১৫ জুন ২০১৪–এ প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি ছিল এ রকম, ‘রাজধানীর পল্লবীর কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে গতকাল শনিবার ভোরে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পুড়ে ঘুমন্ত অবস্থায় একই পরিবারের নয়জন মারা গেছে। এ নিয়ে বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে পুলিশ ও আশপাশের যুবকদের ত্রিমুখী সংঘর্ষে একজন তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন৷ ভোর সাড়ে ৫টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সাত ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষে পুলিশসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে।
‘পুড়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিরা হলেন ক্যাম্পের বাসিন্দা ইয়াছিন আলীর স্ত্রী বেবি আক্তার (৪০), তাঁদের যমজ সন্তান লালু হোসেন ও ভুলু হোসেন (১৪), তিন মেয়ে শাহানা আক্তার (২৪), রোকসানা বেগম (১৮), আফসানা আক্তার (২০) ও ইয়াছিনের নাতি দুই বছর বয়সী মারুফ। আর ১৮ বছর বয়সী আজাদকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে বলে স্বজনদের দাবি। কুর্মিটোলা ক্যাম্পের বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় সাংসদের কথামতো নিউ কুর্মিটোলা ক্যাম্প থেকে পাশের রাজি বস্তিতে বিদ্যুৎ-সংযোগ না দেওয়ায় সাংসদের নির্দেশে যুবলীগের কর্মীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। তাঁরা পুলিশের সামনে অগ্নিসংযোগও করেছেন।
‘জানতে চাইলে সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ জানান, কোনো বস্তির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। বস্তিবাসী বিদ্যুৎ-সংযোগের দাবিতে সড়ক অবরোধ করায় তিনি সংযোগ দিতে চেষ্টা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। এ জন্য তিনি ক্যাম্পের চেয়ারম্যানকে সংযোগ দিতে বলেছিলেন। এ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। তাঁর কোনো লোক কিংবা যুবলীগের কেউ বিহারিদের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িত থাকলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান সাংসদ।’ (প্রথম আলো, ১৫ জুন ২০১৪)
সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ মানুষের গায়ের রং ও সাবানের ফেনায় সভ্যতা খোঁজেন। কিন্তু নিজের নির্বাচনী এলাকায় আগুনে পুড়িয়ে যে দুর্বৃত্তরা ১০ জন মানুষকে হত্যা করল, তাদের অসভ্যতা আমলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না

আগুন লাগানোর সময় আটটি ঘরে তালা লাগানো ছিল। প্রতিবেশীরা ভেতরে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করতে গেলে হামলাকারীরা বাধা দেয়। বাইরে তালা দিয়ে কেউ ঘরের ভেতরে ঘুমান না। যারা বিহারি বস্তিতে আগুন দিয়েছে, তারাই আগুন দেওয়ার আগে ঘরগুলো তালাবদ্ধ করে দিয়েছিল।
১৬ জুনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গত শনিবারের ওই ঘটনার জন্য ক্যাম্পের বাসিন্দারা ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহকে দায়ী করেছেন৷ তবে সাংসদ এ ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন৷ বাম গণতান্ত্রিক মোর্চা এই ঘটনায় ইলিয়াস মোল্লাহকে দায়ী করে গ্রেপ্তার দাবি করে। এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছিল। কিন্তু অগ্নিদগ্ধ ঘরগুলো আর নির্মিত হয়নি। আগুন-সন্ত্রাসীদেরও বিচার হয়নি। বরং উল্টো বিহারিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল।’
কিন্তু ঘটনার ১৪ মাস পার হলেও বিচার দূরের কথা, কোনো সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়নি। তাহলে কি সেখানে ভূত এসে আগুন লাগিয়েছিল? বিহারি নামের এই উন্মূল ও উদ্বাস্তু মানুষগুলোর প্রতি বাংলাদেশ রােষ্ট্রর অবহেলা সীমাহীন। পূর্বসূরিরা অপরাধ করে থাকলে তার দায় কেন উত্তর প্রজন্মের মানুষগুলোকে বইতে হবে? উচ্চ আদালতের রায়ে বিহারিরা ভোটাধিকার পেলেও সব ধরনের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারবঞ্চিত। যে বাংলাদেশ অন্যায়–অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই বাংলাদেশ সম্প্রদায়বিশেষের ওপর এ রকম বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারে না।
সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ মানুষের গায়ের রং ও সাবানের ফেনায় সভ্যতা খোঁজেন। কিন্তু নিজের নির্বাচনী এলাকায় আগুনে পুড়িয়ে যে দুর্বৃত্তরা ১০ জন মানুষকে হত্যা করল, তাদের অসভ্যতা আমলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না। তিনি নিজেকে সভ্যতার ধারকবাহক ভাবেন, আবার তাঁরই সাঙ্গপাঙ্গরা বিহারি বস্তিতে আগুন লাগিয়ে, গরিব বিহারিদের ওপর সদলবলে হামলা চালিয়ে উল্লাস করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সেখান থেকে বিহারিদের তাড়িয়ে জমি দখল করা। কেবল কি ছাত্রলীগ, যুবলীগ? স্বয়ং সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহর বিরুদ্ধে মিরপুরে সরকারি প্লট, জলাশয় দখল, স্কুলের মাঠে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ করে বিদ্যালয়ের মাঠে মেলার আয়োজন ইত্যাদি অভিযোগ আছে। আমরা জানি না, এগুলোকেও তিনি সভ্যতা শেখানোর প্রাথমিক তালিম বলে চালিয়ে দেবেন কি না?
সাংসদ ফারুক খান সংবাদ সম্মেলনে ইলিয়াস মোল্লাহর মন্তব্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। যাঁর মন্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না প্রতিনিধিদলের প্রধান, তাঁকে কেন জনগণের অর্থ খরচ করে বিদেশে পাঠানো হলো? চরম বর্ণবাদী মন্তব্য করে সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ সারা বিশ্বে বাঙালিদের মানবতাবাদী হিসেবে যে উজ্জ্বল ভাবমূর্তি আছে, সেটি ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন।
তাঁর এই জঘন্য মন্তব্যের প্রতিবাদ জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। তাই রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’ কবিতার পঙ্ক্তি ধার করে বর্ণবাদী সাংসদের ঘৃণ্য মন্তবে্যর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:
হায় ছায়াবৃতা,
কালো ঘোমটার নীচে
অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ
উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে।
এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে,
নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে,
এল মানুষ-ধরার দল
গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে।
সভ্যের বর্বর লোভ
নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।
তোমার ভাষাহীন ক্রন্দনে বাষ্পাকুল অরণ্যপথে
পঙ্কিল হল ধূলি তোমার রক্তে অশ্রুতে মিশে;
দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায়
বীভৎস কাদার পিণ্ড
চিরচিহ্ন দিয়ে গেল, তোমার অপমানিত ইতিহাসে।।
আজ সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহর জিবে দেখি সেই ‘সভ্যের বর্বর লোভ ও নির্লজ্জ অমানুষতা’। হায় সাংসদ, হায় সভ্যতা!
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

1 comment:

Powered by Blogger.