কানাডায় হিজাবের নবসমাদর by মঈনুল আলম

কানাডার একমাত্র ফরাসিভাষী প্রদেশ কুইবেকের সরকার যখন মুসলিম মহিলাদের কর্মেেত্র মাথায় হিজাব পরা নিষিদ্ধ করেছে, তখন পাশের প্রদেশ অন্টারিওতে কানাডার বৃহত্তম নগরী টরন্টোতে হিজাবকে নারীদের পোশাকের সৌন্দর্যবর্ধক বলে নতুনভাবে মূল্যায়ন ও সমাদর লাভ করছে। মুসলিম নারীদের হিজাব পরা অমুসলিম শ্বেতাঙ্গদের এমন দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে, কানাডার বৃহত্তম সংবাদপত্র ‘টরন্টো স্টার’ হিজাবপরা মুসলিম যুবমহিলার পূর্ণপৃষ্ঠা ছবি এবং সেই সাথে আরো একাধিক চিত্রসংবলিত করে চার কলাম বিস্তৃৃত শিরোনাম ‘মাই হিজাব ইজ মাই স্টেটমেন্ট’ (আমার হিজাব আমার বক্তব্য) দিয়ে মুসলিম যুবমহিলার বক্তব্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
আমি জানি না, জনসংখ্যার  ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশের কোনো প্রধান সংবাদপত্রে হিজাবের সমাদরে এমন জোরালো বক্তব্যসংবলিত একাধিক চিত্র দিয়ে এমন প্রায় পূর্ণপৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে কি না। ‘টরন্টো স্টার’ প্রতিবেদনের উপশিরোনামে লিখেছে, ‘দিনা জায়েদ হ্যাজ ফাউন্ড ক্রিয়েটিভ ওয়েজ টু অনার হার রিলিজিয়াস বিলিফ্স’ (দিনা জায়েদ তার ধর্মবিশ্বাসকে সম্মান করার সৃষ্টিধর্মী প্রক্রিয়া দেখতে পেয়েছেন)।
‘টরন্টো স্টার’ প্রায় পূর্ণপৃষ্ঠাব্যাপী প্রতিবেদনে দিনা জায়েদের হিজাব পরা দাঁড়ানো ও বসা বিভিন্ন পোজে চিত্রের পাশাপাশি প্রকাশ করেছে তার দীর্ঘ বিবৃতি। আরেক উপশিরোনামে পত্রিকাটি লিখেছে, ‘মুসলিম মহিলা তার ধর্মের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সৃষ্টিধর্মী পোশাক সম্পর্কে সাহসী বক্তব্য রেখেছেন’ (মুসলিম উইম্যান মেইক্স বোল্ড, ক্রিয়েটিভ ফ্যাশন স্টেটমেন্টস হোয়াইল অনারিং হার রিলিজিয়ন)।
দিনা জায়েদ তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘প্রায়শ মানুষ মনে করে যে নির্যাতনের ভয়ে বাধ্য হয়ে মুসলিম মেয়েরা হিজাব পরেন এবং হিজাব পরলে নারীকে অসুন্দর দেখায়; কিন্তু এটা সত্য নয়। হিজাব পরা একটি ধর্মীয় আচার যেটা পালন করা বা না করা নারীর ওপর বর্তায়, যেমন খ্রিষ্টানদের গির্জায় যাওয়া তাদের একটি ধর্মীয় বিধি। মুসলিম দেশগুলোতে যেহেতু বেশির ভাগ অধিবাসীই মুসলিম এবং ধর্ম পালনে আগ্রহী, সেহেতু হিজাব পরা কালক্রমে সংস্কুতির একটি অঙ্গ হয়ে গেছে।’
দিনা জায়েদ আরো বলেছেন, ‘আমার বিশ্বাস আমি হিজাব পরাতে যে একটা সামঞ্জস্য এনেছি, তা-ই আমাকে আমি কে, সে পরিচয় দিয়েছে। আমি অপরিহার্যভাবে কালো রঙের হিজাব পরি না। আমি শরীরের নিচের অংশে যে রঙের পোশাক পরি তার সাথে সুন্দরভাবে মানায় এমন রঙের হিজাব পরি। দর্শকেরা আমার হিজাব পরাকে কেবল একটি ধর্মীয় আচার পালন রূপে না দেখে আমার হিজাব পরার মধ্যে আমার একটা নিজস্ব পরিচয় ফুটে ওঠে বলে উপলব্ধি করে।’
‘আমার হিজাব পরার জন্য আমি বেশ প্রশংসা পাই। আমি বুঝেছি মানুষ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে উজ্জ্বল রঙের মাধ্যমে প্রকাশ করছে দেখলে খুশিই হয়। অমুসলিম ব্যক্তিদের কাছ থেকে আমি প্রায়শ ‘ওহ্, আপনার স্কার্ফটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে’, ‘আপনি মাথায় যেটা (হিজাব) দিয়েছেন তাতে আপনাকে বেশ জমকালো দেখাচ্ছে’, ‘আপনার সমগ্র পোশাকে রঙের যে সুন্দর সমন্বয় ঘটিয়েছেন তা আমার খুব ভালো লাগছে’Ñ এসব ধরনের মন্তব্য শুনতে পাই। এসব প্রশংসাসূচক মন্তব্য আমাকে বোঝাচ্ছে যে, পরিধানের সাথে হিজাবের সামঞ্জস্য করে আমি যে প্রকারের পোশাক পরিকল্পনা করি এবং পরিধান করি, তা করতে আমি যে চিন্তা ও সময় বিনিয়োগ করি মানুষ তা উপলব্ধি করে।
দিনা আরো বলেছেন, ‘আমার পোশাকে অপরিহার্যরূপে হিজাব পরার মাধ্যমে আমি বলতে চাই, কেবল ধর্মীয় আচার পালনের বাধ্যবাধকতা পালনরূপে আমি হিজাব পরি না, হিজাব পরার মাধ্যমে আমি একটা বার্তা পৌঁছাতে চাই। তা হলো, আমি একজন মুসলিম নারী এবং হিজাব পরি বলে আমাকে অসুন্দর দেখায় না। হিজাব পরেই আমি একই সময়ে আমাকে শ্রীমণ্ডিত এবং বিনয়ী করে তুলতে পারি।’
টরন্টোতে বসবাসকারী গুজরাটি মুসলিম নারীরা শিশুকাল থেকে হিজাব পরেন এবং শরীর পুরাপুরি পোশাকাবৃত রাখেন। এই নারীশিশু ও বালিকারা হিজাব পরা এবং সারা শরীর আবৃত পোশাকেই রাস্তায় সাইকেল চালায়, স্কুলের মাঠে সব ধরনের খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ করে নির্দ্বিধায়। টরন্টোর কোনো কোনো এলাকায় যেখানে গুজরাটি মুসলমানেরা বেশ সংখ্যায় বাস করে, সেখানে কোনো কোনো আগন্তুকের চোখে এলাকাটিকে গুজরাট অথবা পাকিস্তানের কোনো শহরের এলাকা বলে মনে হতে পারে। কানাডার জাতীয় মহিলা বাস্কেট বলের টিমে যেসব মুসলিম মহিলা খেলোয়াড় আছেন, তাদের খেলার মধ্যেও মাথায় হিজাব রাখার অনুমোদন দেয়া হয়েছে বছর দুয়েক আগে।
লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক, প্রবাসী
moyeenulalam@hotmail.com

No comments

Powered by Blogger.