রাজনৈতিক দাপটে অসহায় মাঠ প্রশাসন by আলী ইমাম মজুমদার

১ অক্টোবর দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ ফরহাত হোসেনের অফিস ভাঙচুর ও তাঁর ওপর হামলা হয়েছে। গুরুতর আহত হয়েছেন ইউএনও। ঘটনার পর ২৯ ব্যক্তির নাম দিয়ে এজাহার হয়। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, এ আসামিরাসহ ৭০ থেকে ৮০ জন লোক এই ঘটনা ঘটান এবং তাঁরা সবাই আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মী। উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুজন যুগ্ম সম্পাদক আর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি এজাহারভুক্ত আসামি। স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতিসহ সাত ব্যক্তিকে পুলিশ ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে বলেও জানা যায়।

সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় আইনপ্রণেতা শিবলী সাদিকের ভাই উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে দলটি ইউএনওকে নির্দয়ভাবে প্রহার এবং অফিস ভাঙচুর করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। গভীর রাতে মুখোশ পরে আসামিরা আসেননি। তাঁরা এসেছেন স্বীয় পরিচয়ের ‘গৌরব ও ক্ষমতার’ প্রতিভূ হিসেবে। এসেছেন প্রকাশ্য দিবালোকে বেলা সাড়ে ১১টায়। হামলাকারীদের ক্ষোভ সেই উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় ৩৯ জন নৈশপ্রহরী নিয়োগ নিয়ে। নৈশপ্রহরীরা নিয়োগ পেয়েছিলেন গত বছরের ডিসেম্বর মাসে। তবে কোনো অদৃশ্য প্রভাবে বেতন পাচ্ছিলেন না। ঈদ সামনে রেখে ইউএনও তাঁদের নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র ঘটনার আগের দিন সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিসে পাঠিয়ে দেন বেতন দেওয়ার সুবিধার্থে। ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিকের খবর অনুসারে, এ পদগুলোয় নিয়োগ দিতে হামলাকারীদের কেউ কেউ তিন থেকে ছয় লাখ টাকা করে নিয়ে রেখেছেন কারও কারও কাছ থেকে। এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে আক্রোশের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটান ১ অক্টোবর।
এ নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাবলয়ে অবস্থানকারী কেউ হয়তো বা একমত ছিলেন না। তবে প্রক্রিয়াটি আইনসিদ্ধ নয়, এমন কোনো অভিযোগও জানা যায় না। হয়নি কোনো প্রশাসনিক অভিযোগ কিংবা আদালতে মামলা। শুধু বেতন দেওয়া হচ্ছিল না নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের। তাঁদের কাগজপত্র ইউএনও অফিসে পড়ে ছিল। আহত ইউএনও সৈয়দ ফরহাত হোসেন নিয়োগ-প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার অনেক পরে যোগদান করেন এ উপজেলায়। নিয়োগপ্রাপ্ত লোকগুলো মাসের পর মাস বেতন পাবেন না কোনো অদৃশ্য প্রভাবে, এটা তিনি মেনে নেননি। তাই কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়ে দেন। পরিণতিতে মোকাবিলা করলেন এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। মামলা হয়েছে। সময়ান্তরে হয়তো কিছু লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন হাজতবাসও করবেন। আদালতে বিচারের জন্য যখন উঠবেন, তখন আহত ইউএনওসহ অনেক সাক্ষীই বদলি হয়ে যাওয়ার কথা। এ-জাতীয় ঘটনার অতীত ঐতিহ্য তা-ই বলে। যাঁরা থাকবেন, তাঁরা বোঝেন কত ধানে কত চাল হয়। তাই সাক্ষ্য দিতে আদালতে গেলেও সে হিসাব মনে রাখবেন। আর বদলীকৃত স্থান থেকে বৈরী পরিবেশে মূল সাক্ষীরা এসে সাক্ষ্য দিতে উৎসাহ হারাবেন। আদালত মামলার বিচার করবেন প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। এ-জাতীয় অনেক ঘটনায় অতীতে যা ঘটেছে, তার ব্যতিক্রম কিছু ঘটবে, এমন দুরাশা কেউ করে না।
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় যা ঘটেছে, তা মাত্রার হেরফের হলেও প্রায়ই ঘটে চলছে দেশের সর্বত্র। পুলিশের ওপরও হামলা হচ্ছে। হামলা হয় থানায়। বিরোধী দলের আন্দোলনকালে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোও যথাযথভাবে আইনের আওতায় আনা যায়নি। সেখানে বেশ কিছু ক্ষেত্রে আসামিদের দৃশ্যমানভাবে সহায়তা করছেন সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা। আর সরকারি দল কিংবা এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা এ-জাতীয় ঘটনা নিজেরাই ঘটিয়ে চলছেন বিভিন্ন অঞ্চলে। শুধু ইউএনও অফিস বা থানা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নানা অজুহাতে এ ধরনের ঘটনা ঘটান। আর কার্যত দায়মুক্তি পাচ্ছেন প্রায় সব ক্ষেত্রে। স্থানীয় যে নেতৃত্ব তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তাঁরা তো থাকছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই। অথচ সবাই সবকিছু জানেন ও বোঝেন। কিন্তু মুখ বুজে সহ্য করতে হচ্ছে। এ কারণে প্রশাসনের অনেকেই ন্যায্য কথা বলার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলছেন।
দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যাঁরা আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের একটি অংশ মনে করে, তাঁদের আওতার বাইরে সেখানকার কোনো কিছুই থাকবে না। ২০০১ সাল থেকে এ প্রবণতা জোরদার হতে শুরু করে। এখন ষোলোকলায় পূর্ণ হয়েছে। ফলে তাঁরা আইনপ্রণেতার কার্যক্রম প্রায় বিস্মৃত হয়ে উপজেলা পরিষদ, স্থানীয় প্রশাসন আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ক্ষমতা নিজেরা প্রয়োগে তৎপর। কাগজ-কলমে যা-ই থাকুক, সিদ্ধান্ত আসে সেই ক্ষমতার বলয় থেকে। এমনটা না হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী নিয়োগ নিয়ে আইনপ্রণেতা কিংবা তাঁর সহযোগী-সমর্থকদের এ তৎপরতা কেন? আর সরকারই বা এসব কেন প্রশ্রয় দিচ্ছে দিনের পর দিন?
দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সরকারি কর্মকর্তাদের আইন অনুসারে ব্যবস্থা নিতে বলেন। নির্দেশনা দেন ভীতি ও অনুরাগের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালনের। কিন্তু বাস্তবে তাঁরা তা করতে পারছেন না, এটা অনেকেরই জানা। আর এতে শাসনযন্ত্রের যত ক্ষতিই হোক, দলীয় লোকদের কর্তৃত্বকে খাটো করতে চাইছেন না শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই। এ কারণে শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকার, দেশ ও জাতি। সরকারি কর্মকর্তাদের এ ধরনের ভীতি ও শঙ্কা উত্তরোত্তর জোরদার হচ্ছে। অনেক ‘বুদ্ধিমান’ কর্মকর্তা তাই এ পরিস্থিতি এড়িয়ে চলেন। নেন না কোনো ঝুঁকি। আইন ও বিধিবিধান অনুসরণের পথ থেকে তাঁরা দূরে থাকেন। এমনকি তাঁদের সহকর্মীদের কেউ অন্যায়ভাবে বৈরী পরিবেশের সম্মুখীন হলে তাঁদের পেছনে দাঁড়ান না। ঊর্ধ্বতন কেউ কেউ তাঁদের ‘ট্যাক্টলেস’ বলে আখ্যায়িত করেন। অথচ দু-একটি ক্ষেত্রে যদি দ্রুত দৃশ্যমান ন্যায়ানুগ প্রতিকার হতো, তাহলে অবস্থার উন্নতি ঘটত।
প্রতিকার হয়নি পাবনায়। সেখানে আইনের পথে চলতে গিয়ে জেলা প্রশাসক ও তাঁর সহকর্মীরা হেনস্তা হয়েছিলেন। ত্বরিত বদলি করে দেওয়া হয় জেলা প্রশাসকসহ ঘটনার সম্ভাব্য সাক্ষী সব কর্মকর্তাকে। মামলায় আসামিরা কিছুদিন হাজতবাস করেন। কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় খালাস পান সবাই। আর সে ঘটনার মূল ইন্ধনদাতা স্থানীয় নেতা রইলেন সম্পূর্ণ ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। উখিয়া ও টেকনাফে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ অনেক কর্মকর্তা। সেখানে লাঞ্ছনার দায়িত্ব নিয়েছেন নেতা স্বয়ং। আগের নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী আইনে মামলা করতে পদক্ষেপ নিলেও জেলা প্রশাসন এড়িয়ে যায়। সম্ভবত তারা কৌশলী বা ‘ট্যাক্টফুল’ থাকতে চেয়েছে। কয়েক মাস আগে নারায়ণগঞ্জে একটি সংসদীয় উপনির্বাচনে জনৈক নেতা পুলিশের একজন এএসপিকে টেলিফোনে হুমকি দেন। সেখানেও নির্বাচনী আইন সরলরেখায় চলছে, এমন খবর পাওয়া যায়নি। স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ে আসীন হয়েও কেউ কেউ এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের অভ্যাস ছাড়েন না, বরং জোরদার হন। যেমন সদ্য অব্যাহতি পাওয়া একজন মন্ত্রী প্রায়ই বাসায় ডেকে কিংবা কোনো অফিসে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন। ক্ষেত্রবিশেষে করতেন মারধর। তাঁর ছয় বছরের মন্ত্রিজীবনের সমাপ্তি ঘটাতে এসব কিছুই কাজ করেনি; পদ গেছে অন্য বিষয়ে কয়েকটি স্পর্শকাতর মন্তব্যের জন্য।
সরকারি কর্মকর্তারা জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে আইন, বিধি কিংবা সরকারি নির্দেশ অনুসারে কাজ করেন। তাঁরা সেগুলো সঠিকভাবে করছেন কি না, এটা জনপ্রতিনিধিরা দেখতে পারেন। সেখানে ব্যত্যয় ঘটলে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরেও আনতে পারেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ কিংবা মতামত সব স্তরেই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। কিন্তু যেটা জনপ্রতিনিধিদের কাজ নয়, সেখানে হস্তক্ষেপ প্রশাসনব্যবস্থার মূলে আঘাত হানছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জন্য বিষয়টি আপাতমধুর হলেও পরিণতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। আর এর মধ্যেই তা ফেলতে শুরু করেছে। মেধাবী উদ্যমী কর্মকর্তারা কি সবাই অন্যায্য দাবির সঙ্গে আপস করে চলবেন? আশা করব, তাঁরা মনোবল না হারিয়ে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে ন্যায়ের পক্ষে সক্রিয় থাকবেন। উনিশ শতকের ইংরেজি ভাষার রোমান্টিক কবিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা শেলি। জীবনের সব অন্ধকার আর কলুষতা থেকে তিনি মুক্তির স্বপ্ন দেখেছেন। কবি তাঁর বিখ্যাত ‘ওউড টু দ্য ওয়েস্ট উইন্ড’ কবিতায় লিখেছেন, ‘শীত যদি আসে, বসন্ত কি দূরে থাকতে পারে?’ দিনাজপুরে সম্প্রতি লাঞ্ছিত ইউএনওসহ বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে যাঁরা আছেন, তাঁরা কবি শেলির এ বিশ্বাসের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারেন।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.