সময়ের প্রতিধ্বনি-দুই নেত্রীর সমঝোতা না হলে মহাবিপদ! by মোস্তফা কামাল

বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া আবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য অবিলম্বে সংলাপে বসুন। আলোচনায় বসতে না চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করুন।
আমরা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই।
বিরোধীদলীয় নেতার এই আহ্বানে সরকারপক্ষ সাড়া দেবে কি না তা নিয়ে আমাদের যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কারণ সরকার এরই মধ্যেই টের পেয়ে গেছে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া তাদের জন্য কঠিন হবে; যদিও তারা যেকোনো মূল্যে আরেকবার ক্ষমতায় থাকতে চায়। সে জন্য এমন একটি নির্বাচন প্রয়োজন, যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হবে। এটা মাথায় রেখেই সরকারপক্ষ সংলাপ চায়। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুটি এজেন্ডায় রাখতে চায় না।
প্রধানমন্ত্রী প্রায় নিয়মিতই বলছেন, বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও সেভাবেই হবে। অর্থাৎ সবার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট। সরকার কিছুতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে রাজি নয়। শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগ এবং চেষ্টা বেশ লক্ষ করা যাচ্ছে। পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনকে সেভাবেই ঢেলে সাজানো হচ্ছে। হঠাৎ আওয়ামী লীগ বনে যাওয়া কর্মকর্তারা তর তর করে ওপরে উঠে যাচ্ছেন। অনেকেই সহকর্মীদের কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে ধরাশায়ী করে এগিয়ে যাচ্ছেন। হায়রে দলবাজ প্রশাসন!
সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বেশ তৎপরতা শুরু করেছে। ইসি বলছে, তাদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব তারা যথাযথভাবে পালন করতে বদ্ধপরিকর। এই নির্বাচনে কোন দল এলো, আর কোন দল এলো না, সেদিকে নজর দেওয়া তাদের দায়িত্ব নয়। কথা তো ঠিকই। কিন্তু ১৫ ফেব্রুয়ারি মার্কা নির্বাচন অনুষ্ঠানের সেই কলঙ্কিত অধ্যায়ের কথা কি ইসির মনে নেই? ওই ধরনের দু-একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যই তো ইসিকে সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করা হয়। ইসি যদি মনে করে, পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে তাদের নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে; তাহলে কিন্তু ভুল হবে। জাতীয় নির্বাচন আর স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন এক কথা নয়।
তা ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের এই নির্বাচনগুলো নিরপেক্ষভাবে করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুবই আন্তরিক ছিলেন। তবে এই আন্তরিকতা ভিন্ন উদ্দেশ্য থেকে দেখানো হয়েছে বলে সবাই মনে করেন। তিনি এর মধ্য দিয়ে পুরো বিশ্বকে বোঝাতে চেয়েছেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে এ পর্যন্ত যে নির্বাচনগুলো হয়েছে, তার সবই নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। বিশ্ববাসীও দেখল, দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে সরকার কোনো কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়নি। যদিও সব সিটিতে শোচনীয় পরাজয়ের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। সাধারণ মানুষ ধরেই নিয়েছে, সরকারের জনপ্রিয়তায় এক ধরনের ধস নেমেছে।
সিটি নির্বাচন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মোটামুটিভাবে সরকারের ওপর সন্তুষ্ট। তবে প্রধান বিরোধী দল ছাড়া নির্বাচন হোক, সেটাও তারা চায় না। তারা চায়, সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে তত্ত্বাবধায়ক হোক, আর নির্দলীয় হোক- একটা ব্যবস্থায় যেতে হবে। এ জন্য শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে কিছু ছাড় দিয়ে হলেও সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। অন্যথায় দেশে সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। দেশের পরিস্থিতি যতই ঘোলাটে হবে, তৃতীয় শক্তি ততই উৎসাহিত হবে। আর তৃতীয় শক্তি ক্ষমতা দখল করার জন্যও তো পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে পারে। সেটা কি প্রধানমন্ত্রী অনুভব করতে পারেন!
শেখ হাসিনা যতই বলুন, অনির্বাচিত শক্তি যাতে ক্ষমতায় না আসতে পারে সে জন্য তিনি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় ফিরবেন না। এ দেশের রাজনীতির অতীত সম্পর্কে নিশ্চয়ই তাঁর স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে। অতীতে যাঁরা অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতায় এসেছিলেন, তাঁরা সংবিধানকে স্থগিত রেখেই ক্ষমতায় এসেছিলেন। কাজেই সংবিধান স্থগিত রেখে যেকোনো সময় তৃতীয় শক্তি ক্ষমতা দখল করতে পারে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়কে ফিরে যাওয়া যাবে না, এমনটা বলা বোধ হয় সমীচীন হবে না।
তবে সরকারের ভেতরের একটি পক্ষ বিএনপি ছাড়াই নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষপাতী। সে ক্ষেত্রে মহাজোট থেকে জাতীয় পার্টি বেরিয়ে যাবে এবং ৩০০ আসনে মনোনয়ন দেবে। জামায়াতকেও নির্বাচনে টানার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রচেষ্টা কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা তারা নিজেরাও পরিষ্কার নন। আরেকটি পক্ষ বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা করবে। এটা সফল হলে শেখ হাসিনার অধীনে জাতীয় নির্বাচন হবে। এ ধরনের উদ্যোগের মানে কী? এই নির্বাচন কি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে?
এদিকে বিএনপি রোজার পরই সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করবে বলে হুমকি দিয়ে রেখেছে। সরকার হয়তো সেই হুমকিকে থোড়াই কেয়ার করছে। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি যে অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এক হেফাজতের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশে যা ঘটে গেছে, তার পর থেকে দেশের মানুষ কিন্তু প্রতিনিয়ত শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। দেশের মানুষকে প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় রাখার অর্থ কী? দুই নেত্রীকে দেশের মানুষ অতিমাত্রায় ভালোবাসে বলেই কি তাদের খেসারত দিতে হচ্ছে? দেশের মানুষ একবার মুখ ফিরিয়ে নিলে কিন্তু বিপদে পড়তে হবে। দুই নেত্রী নিশ্চয়ই তা উপলব্ধি করতে সক্ষম।
দুই নেত্রীকে এটাও মনে রাখতে হবে, 'মাইনাস টু' ফর্মুলাটি কোনো ব্যক্তিবিশেষের নয়। এটা ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী সময়ের একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছিল। বিভিন্ন মহল থেকে তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে চিরতরে বিদায় করতে না পারলে দেশে শান্তি আসবে না। একটা পর্যায়ে দুই নেত্রীকে 'মাইনাস' করার ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহল থেকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। তার পরই দুই নেত্রীকে বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথমে শেখ হাসিনাকে পাঠানো হয়। পরে খালেদা জিয়াকে পাঠানোর চেষ্টা চলে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে খালেদা জিয়া বেঁকে বসেন। আর তাতেই ঘটে বিপত্তি। তখন বাধ্য হয়ে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু তার পরও মাইনাসের ফর্মুলা এগিয়ে নিতে দুই নেত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনেক মামলাও হয় তাঁদের বিরুদ্ধে। সেই দিনগুলোর কথা নিশ্চয়ই দুই নেত্রী ভুলে যাননি।
বিভিন্ন সূত্রের দেওয়া তথ্য মতে, দুই নেত্রীকে মাইনাসের ফর্মুলা কিন্তু এখনো বহাল আছে। সে অনুযায়ী এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। তাঁরা যদি সমাধানের পথে না আসতে পারেন, তাহলে মহাবিপদ অনিবার্য। সেই বিপদ ওয়ান ইলেভেনের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। বিষয়টি মাথায় রেখেই দুই নেত্রীর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে যা যা করণীয়, তা করতে সংলাপে বসা উচিত। গোঁ ধরে বসে থাকলে উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আর সেটা দেশের জন্যও মঙ্গলজনক হবে না।
এ কথা সবাই জানেন, একটি ইস্যুতে রাজনৈতিক সংকটটি ঘুরপাক খাচ্ছে। সেটা হচ্ছে নির্দলীয় সরকারপ্রধান কে হবেন? শেখ হাসিনার পরিবর্তে যাঁকেই নির্দলীয় সরকারপ্রধান করা হবে, তাঁকেই বিএনপি মেনে নেবে। এ রকম একটা মনোভাব বিএনপিতে আছে। এটা মানতে নিশ্চয়ই শেখ হাসিনার কোনো অসুবিধা নেই! গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে সংখ্যাগরিষ্ঠের চাওয়াটাকেও মূল্য দিতে হবে।
আমরা বিশ্বাস করি, দুই নেত্রীই দেশপ্রেমিক। তাঁরা দেশকে ভালোবাসেন। ভালোবাসেন দেশের মানুষকে। দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে তাঁরা অবিলম্বে বৈঠকে বসবেন। দেশকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া তাঁদের দায়িত্ব নয়। দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে দুই নেত্রীর সমঝোতা বড় প্রয়োজন। সমঝোতার ভিত্তিতে দুই নেত্রী যদি দেশ পরিচালনা করেন, তাহলে আমাদের আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। অচিরেই এই দেশ একটি উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। এ দেশের তরুণ প্রজন্মই এই দেশকে এগিয়ে নেবে। আপনারা শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাটুকু নিশ্চিত করুন।

২.
শুধু রাজনৈতিক নয়, সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপও বেশ বাড়ছে। বিভিন্ন ইস্যুতে আগামী কয়েক মাস সরকার প্রবল চাপে থাকবে। সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো শক্তি ও সামর্থ্য সরকারের আছে কি না তা বলা মুশকিল। তবে সামনের দিনগুলো যে খুবই জটিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশের বিরুদ্ধে আসন্ন চাপ সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করুন। অন্যের নাক কেটে নিজের যাত্রা ভঙ্গ করে দেশের ক্ষতি করবেন না। দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমাদের সবাইকে চরম মূল্য দিতে হবে। দেশবাসীর পক্ষ থেকে দুই নেত্রীর প্রতি আকুল আবেদন, এখনো সময় আছে, সংলাপে বসুন; সমস্যার সমাধান করুন।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
mostofakamalbd@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.