মাহমুদা বেগমের শিল্পকর্ম by এবিএম ফজলুর রহমান

গ্রাম-বাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্য, পাহাড়ের ঝর্ণা, কৃষকের বাড়ি, মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা দৃশ্য, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, পেঁপে, কলা, আম, ঝুড়ি থরে থরে সাজানো রয়েছে বিশাল আকৃতির আলমারিতে। অসংখ্য রকমের মাটির তৈরি শিল্পকর্ম দেখে কার না চোখ জুড়ায়। তবে প্রথমে কেউ বিশ্বাস-ই করতে পারেনি এসব শিল্পকর্মের নির্মাতা মাহমুদা বেগম।


পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার চরশাহপুর গ্রামের মৃত আফছার আহমাদের স্ত্রী মাহমুদা খাতুন। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি তার গভীর ভালোবাসা। বাবা মনিরুদ্দীনের চাকরির সুবাদে ছোটবেলায় পার্বত্য চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে তাদের আবাস ছিল। কর্ণফুলী নদীর তীর থেকে কাদামাটি এনে পেঁপে, কলা, আম, ঝুড়ি, পুতুলসহ নানা জিনিস তৈরি করতেন। তখন তিনি তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী। পাহাড়ের চূড়ায় বসে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখে তার সুনিপুণ শিল্পকর্মে ফুটিয়ে তুলে স্কুলের অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন তিনি। সেই থেকে তার উৎসাহ আজও তাতে ভাটা পড়েনি। দীর্ঘ আড়াই যুগ ধরে তার প্রতিভাকে লালন করে চলেছেন। বিদ্যুৎ বিভাগের একজন লাইনম্যানের মেয়ে মাহমুদা বেগমের বিয়ে হয় বিদ্যুৎ বিভাগেরই এক কর্মচারী আফছার উদ্দীনের সঙ্গে। মাহমুদা বেগমের পৈতৃক নিবাস কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার মাঝদিয়ার গ্রামে। দারিদ্র্যের কারণে পড়ালেখায় বেশিদূর এগোতে পারেননি তিনি। অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায়। নানা টানাপড়েনের সংসারে রাত জেগে শিল্পকর্ম তৈরি করে তা বিক্রি করে দু'মেয়েকে পড়াশোনা করান। ১৩ বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত স্বামী মারা যাওয়ার পর তার এ উপার্জন দিয়েই সংসার চালান তিনি। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বর্তমানে তিনি ঈশ্বরদীতে বড় মেয়ের বাড়িতেই আছেন এবং সেখানেই তার শিল্পকর্ম তৈরির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছেন। তার এ কাজ দেখে এলাকায় বেশ সাড়া পড়েছে। তার এই শিল্পকর্ম তৈরি শিখছে এলাকার অনেকেই।
তীক্ষষ্ট মেধার অধিকারী মাহমুদা খাতুন যে কোনো দৃশ্য একবার দেখলেই মাটি দিয়ে নিখুঁতভাবে তৈরি করতে পারেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২শ' রকমের শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন। তার এই কাজের কোনো প্রচার না থাকলেও বিভিন্ন স্থান থেকে অনেকেই শিল্পকর্ম কিনতে হাজির হন তার বাড়িতে। ১শ' টাকা থেকে শুরু করে ৭ হাজার টাকায় পর্যন্ত তার শিল্পকর্ম বিক্রি করেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শৌখিন পর্যটকরা তার তৈরি নানা জিনিষ কিনে নিয়ে গেছেন।
প্রচন্ড ভালোবাসা তার এই কাজকে ঘিরে। এগিয়ে যেতে চান অনেক দূর। তার এ কাজের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে নিজের দেশকে তুলে ধরতে চান তিনি। বললেন, আমার শখের কাজটি এখন আমার জীবিকা। আমি আমার কাজকে ছড়িয়ে দিতে চাই। আজীবন এই শিল্পকর্মের মধ্যে বেঁচে থাকতে চান মাহমুদা। এ জন্য তিনি দেশের নামকরা চিত্রশিল্পীসহ সবার সার্বিক সহযোগিতা চেয়েছেন।
 

No comments

Powered by Blogger.