রেমিটেন্স ও রিজার্ভে বর্তমান সরকারের রেকর্ড

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত মহাজোট সরকারের অনেক সাফল্যের মধ্যে রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি ও দেশের ইতিহাসে সর্বাধিক রিজার্ভের ঘটনা অন্যতম। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি আর গত অর্থ বছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে।


অনেক নেতিবাচক খবরের ভিড়ে এই দুটি খবর কেবল স্বস্তিকর নয়, অনুপ্রেরণাদায়কও বটে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় সাড়ে ১১ বিলিয়ন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। আমদানি ব্যয় হ্রাস ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স বাড়ার ফলেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এই পর্যায়ে স্থিতি লাভ করেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। আগের বছর (২০১০-১১) এই ব্যয় বেড়েছিল ৪২ শতাংশ। বর্তমান রিজার্ভে প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব, যেখানে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যায় এমন রিজার্ভকে অর্থনীতির দিক দিয়ে যথেষ্ট বলে বিবেচনা করা হয়। গত অর্থবছরে ১১৩ কোটি ৬০ ডলারের বেশি বিনিয়োগ আসে, আগের বছরের তুলনায় যা ছিল ১৫ কোটি ডলার বেশি। বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভের দিকটি বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। রিজার্ভ সন্তোষজনক হলে তারা মনে করে, লাভসহ তাদের বিনিয়োগ তারা ফেরত পাবে। বৈদেশিক মুদ্রার পর্যাপ্ত মজুদ যেহেতু বিদেশী বিনিয়োগকে অনুপ্রাণিত ও নিশ্চিত করে সেহেতু আশা করা যায়, আগামীতে বিদেশী বিনিয়োগ আরও বাড়বে। বিদেশী বিনিয়োগ বাড়লে, বলাবাহুল্য, দেশী বিনিয়োগও বাড়বে।
বাংলদেশের অর্থনীতির যে প্রেক্ষাপট ও বিদ্যমান অবস্থা তাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। বিনিয়োগ বাড়লে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, উৎপাদন ও রফতানি বাড়বে। অতএব, বৈদেশিক মুদ্রার বর্তমান স্থিতি রক্ষা এবং বাড়ানোর প্রয়াস অব্যাহত রাখার পাশাপাশি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধির তৎপরতা জোরদার করতে হবে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান দুটি উৎসবে একটি রফতানি আয় এবং অন্যটি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স। রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসে গার্মেন্টস পণ্য রফতানি থেকে। গার্মেন্টস পণ্য ও জনশক্তি রফতানি এই উভয় ক্ষেত্রেই ইতি ও নেতিবাচক খবর আছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে গার্মেন্টস পণ্য রফতানি হ্রাসের আশঙ্কা এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। রফতানি প্রবৃদ্ধি কমছে, এমন তথ্য যেমন আছে, তেমনি পণ্যমূল্য হ্রাসের তথ্যও আছে। এটা শিল্পের জন্য এবং রফতানি প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকিস্বরূপ বলে কেউ কেউ মনে করছেন। আবার অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য উৎসাহজনক খবর এই যে, গার্মেন্টস পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোতে উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকহারে বেড়ে যাবার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য বিক্রি করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে উৎপাদন ব্যয় কম হওয়ায় তার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তাদের তুলনায় বেশি। বাংলাদেশ যদি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তবে তার আয় বর্তমান অপেক্ষা অনেক বাড়তে পারে।
জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে নেতিবাচক দিক হলো, এ খাতের রফতানি প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক নয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও মালয়েশিয়ায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বাংলাদেশীর কর্মসংস্থান রয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এ সব দেশে জনশক্তি রফতানি প্রায় হচ্ছেই না। অথচ প্রতিটি দেশেই জনশক্তির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ সব দেশে জনশক্তি রফতানি নিয়ে যে সব সমস্যা দেখা দিয়েছে, তা দূর না হলে জনশক্তি রফতানিতে বিপর্যয় দেখা দেবে বলে অনেকে মনে করেন। পক্ষান্তরে সমস্যাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে গেলে রফতানিতে নতুন জোয়ার সৃষ্টি হবে। এ ব্যাপারে সরকারের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা দরকার।
রফতানি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে রিজার্ভস্থিতি বাড়ানো ও তার বদৌলতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চলমান উদ্যোগ-প্রয়াস জোরদার করা অপরিহার্য। সরকারকে গার্মেন্টস পণ্য ও জনশক্তি রফতানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকার রাজনৈতিক ও অন্যান্য ইস্যুতে যতটা গুরুত্ব ও ব্যস্ততা প্রদর্শন করছে, অর্থনৈতিক ইস্যুগুলোতেও ততটাই গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমাবনতিশীল। বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদি সঙ্কট প্রকট। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভঙ্গুর ও বিপর্যয়কর। এ অবস্থায় দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ উৎসাহিত হওয়ার বদলে নিরুৎসাহিত হওয়াই স্বাভাবিক। এই বাস্তবতা, অনভিপ্রেত ও অনাকাক্সিক্ষত। রাজনৈতিক ও অন্যান্য ইস্যুর প্রতি মনোযোগ ও দৃষ্টি কমিয়ে সরকারের উচিত অর্থনীতির দিকে মনোনিবেশ ও দৃষ্টিপাত করা। সরকারের উচিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তার উন্নয়ন, গ্যাস-বিদ্যুত ইত্যাদি সংস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন-পুনর্গঠন এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ-পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এ সব দিকের অগ্রগতি ও নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠিত হলে উৎপাদন, রফতানি, বিনিয়োগ সবই বাড়বে। দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে, সমৃদ্ধ হবে এমনটাই প্রত্যাশিত।
ড. এম এ দিকপাল

No comments

Powered by Blogger.