অর্থনৈতিক সংকট-টাকা ছাপিয়ে চাহিদা মেটাচ্ছে সরকার by ফখরুল ইসলাম

র্থনীতির বিদ্যমান সংকটকে জানতে হলে পড়তে হবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা একটি প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, ব্যাংকে তারল্যসংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমে যাওয়ার মতো অর্থনীতির সংকটকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ১৫টি কারণও তারা বের করেছে। কোনো মন্তব্য না থাকলেও এসব সংকট যে সরকারের তৈরি, তা-ও পরোক্ষভাবে মেনে নেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। অর্থ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির জন্য প্রতিবেদনটি তৈরি করা


হয়েছে। আজ সোমবার স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এটি উপস্থাপন করার কথা। প্রতিবেদনে উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য মন্ত্রণালয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণকে দায়ী করে বলা হয়েছে, এর পেছনে আরেকটি কারণ হলো সরকারের পক্ষ থেকে টাকা ছাপানো। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণ হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, গত এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে। এ ছাড়া বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। অন্যদিকে চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় ডলারের দাম বেড়েছে। আর, সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা ভাব তো ছিলই।
মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, গত বছর রেপো ও রিভার্স রেপোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা হয়নি, যা বাংলাদেশ ব্যাংকই করে থাকে। এতেও সংকট তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে—সাধারণের এই মনোভাবটিও উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ।
মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির মতো তারল্যসংকটকে স্বীকার করে অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থ ছাড় করছে না। আর, সে কারণেই তারল্যসংকটে পড়তে হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) নাম উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এদের থেকে গত এক বছরে যে তহবিল পাওয়ার কথা ছিল, তা তারা দিচ্ছে না। এ জন্য অনিবার্য কারণেই তারল্যসংকট তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, পদ্মা সেতুর অর্থ এই তিনটি সংস্থা আটকে দিয়েছে।
তারল্যসংকটের জন্য ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ছাড়াও আমদানি বৃদ্ধিকেও দায়ী করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তারা বলেছে, ডলারের মূল্যমান বাড়ার পরেও কাঙ্ক্ষিত হারে রপ্তানি বৃদ্ধি পায়নি, বরং আমদানি বেড়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ এক বছরে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার কমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১০ সালের ২৭ ডিসেম্বর রিজার্ভ যেখানে ছিল এক হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার, এক বছরের মাথায় ২০১১ সালের একই দিনে তা নেমে এসেছে ৯৬৪ কোটি ডলারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সংকটে প্রবাসী-আয় কমে গেছে। আবার এক বছরে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ ঋণপত্র নিষ্পত্তি করতে (এলসি পেমেন্ট) হয়েছে। এ জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তেল আমদানির ব্যয় মেটাতে আগের তুলনায় বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় উল্লেখ না করলেও মূলত ভাড়াভিত্তিক ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যই জ্বালানি তেল সরকারকে বেশি আমদানি করতে হচ্ছে।
যোগাযোগ করলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, টাকা ছাপার প্রভাব তো মূল্যস্ফীতিতে পড়েই। রেপো ও রিভার্স রেপোর অব্যবস্থাপনা বিষয়ে আগেও একবার কথা উঠেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সাবেক উপদেষ্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, রেপো ও রিভার্স রেপোর মাধ্যমে না-হয় বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে সংকুচিত করা যাবে, কিন্তু সরকার অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করলে তা কীভাবে সংকোচন করা সম্ভব?
মির্জ্জা আজিজ আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্য বেড়ে যাওয়াকে মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণ হিসেবে দাঁড় করানো যায় না। কারণ, এক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্য তত বাড়েনি।

No comments

Powered by Blogger.