আলোচনা- ছিটমহলবাসীর নাগরিক অধিকার by গোলাম ফারুক সরকার টুকু

বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যনতরের ১৬২ টি ছিটমহলে ৫ থেকে ৬ লক্ষ মানুষের বসবাস থাকলেও ছিটমহল বলতে সাধারণ মানুষ শুধু আঙ্গরপোতা-দহগ্রামের তিন বিঘা করিডর সম্পর্কে কমবেশি জানেন। আর উইকিপিডিয়ার কল্যাণে অনেকে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি উপজেলাস্থ ভারতের 'দাশিয়ার ছড়া' ছিটমহলের নামটি জেনেছেন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেকের মুখে তিনবিঘা করিডরকে 'দেখার মত জায়গা' বলতে শুনেছি। অর্থাৎ সেটা একটা পর্যটন কেন্দ্র, নিরেট বিনোদনের জন্য দর্শনীয় স্থান এবং প্রায়শই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ দেখার জন্য সেখানে ভিড় করে থাকেন। সেই ভিড়ের ভেতর থেকে হয়তোবা কেউ কেউ সেখানকার মানুষের বন্দিজীবন দেখে সমব্যথী হন। তবে তাদের সমবেদনায় সেসব বন্দি মানুষের জীবন যে শৃংখলমুক্ত হবে না, বরং তা যে শুধু দু'দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধানতের উপর নির্ভর হয়ে আছে সেটা বুঝে তারা নিজ নিজ ঘরে ফিরে আসেন। এই রাজনৈতিক সিদ্ধানতের ভিত্তিতে বর্তমানে সেখানে কিছুটা সুযোগ-সুবিধা থাকলেও স্থানীয় মানুষের জীবনে আশঙ্কা ও অস্বাভাবিকতা থেকে গেছে। আর অন্যগুলোর অবস্থার কোন পরিবর্তন নেই।
১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিসতান সীমানা নির্ধারণকারী ব্রিটিশ আইনজ্ঞ রেডক্লিফ ও তাঁর সহযোগীদের অদূরদর্শিতার কারণে আজ অবধি ছিটমহলগুলোতে তিন থেকে চার প্রজন্মের মানুষ অবরুদ্ধ হয়ে আছে। এই অবরুদ্ধ জীবন নিয়ে প্রশ্নে আগের প্রজন্ম তার পরের প্রজন্মকে কী জবাব দিচ্ছেন তা শুধু তারাই জানেন। তবে আমরা জেনেছি পরের প্রজন্মকে নিয়ে দেখা আগের প্রজন্মের স্বপ্নগুলো প্রতিনিয়ত দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। সনতানদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেখে মাথা নীচু করে থাকতে হচ্ছে তাদের কাছে। সনতানরাও কেউ বুঝে কেউবা না বুঝে মেনে নিয়েছে তাদের এই ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় অবজ্ঞা আর অপমান।
১৯৭৪ সালে সম্পাদিত 'ইন্দিরা-মুজিব' চুক্তিতে এই সমস্যা নিরসনের কথা সুস্পষ্টভাবে উলেস্নখ করা হয়েছে। সেখানে বলা আছে, ছিটমহলগুলোর বিনিময় এবং সেখানকার স্থানীয় জনগণের পছন্দমত দেশে বসবাসের নিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা হবে। অথচ এ নিয়ে অনেক কালক্ষেপণ করা হয়েছে। ২০০৬ সালের ১৬ ও ১৭ জুলাই দু'দিনব্যাপী ঢাকায় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ সীমানা ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেবিডবিস্নউজি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পত্রিকায় দু'পক্ষের প্রতিনিধি দলকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে উলেস্নখ করা হয়েছিল। সেই আলোচনায় তেমন অগ্রগতি হয়নি। পরবতর্ীতে ঐ বছরের ২৭ আগস্ট সচিব পর্যায়ে চারদিনব্যাপী আলোচনা চলে। আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের শুধু বিবৃতি শুনানো হয়। আলোচনায় ভারত শুধু সাড়ে ৬ কিঃমিঃ সীমানা চিহ্নিতকরণ সমস্যা, সন্ত্রাসবাদসহ অন্যান্য বিষয়কে আগ বাড়িয়ে দিয়েছিল। জেবিডবিস্নউজি অতীতকে সামনে টেনে আনতে চান না' বরং সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান বলে মিডিয়ার মাধ্যমে বরাবরই সবাইকে আশ্বসত করে আসছে। দীর্ঘ চার বছর পর গত আগস্ট মাসে তারা দিলিস্নতে আলোচনায় বসেছেন বলে জানা গেছে। আবার গত নভেম্বরের ১০-১১ তারিখে বৈঠক হয়েছে। প্রশ্ন হল, জেবিডবিস্নউজি যে বারবার বৈঠক করে নতুন করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে, সেদিকে কী আদৌ সমাধান হবে, নাকি এ প্রচেষ্টা আরও দীর্ঘ হবে? উলেস্নখ্য যে, গত ১৭ আগস্ট 'দাশিয়ার ছড়া' ছিটমহলে 'ইন্দিরা-মুজিব' চুক্তি বাসতবায়নের দাবিতে 'ভারত বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি' বিক্ষোভ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে তা হয়নি। আগামীতে তারা বৃহৎ আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন বাসতবতা হচ্ছে, চুক্তি অনুসারে উভয় দেশকে ছিটমহল ইস্যুটিকে গুরুত্ব দিতে হবে আগে। কারণ দীর্ঘ ৬৩ বছরে এ অঞ্চলগুলোতে মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়ে আসছে। তাই অঞ্চলগুলো পরিদর্শনের সময় জেবিডবিস্নউজি'র সার্বিক দিকগুলো সেখানকার জনগণের কাছে উন্মুক্ত করতে হবে যাতে তারাও এই পরিদর্শনের মর্মার্থ ও ফলাফলের ব্যাপারে স্পষ্ট থাকেন এবং যত দ্রুত সম্ভব উদ্দেশ্য বাসতবায়নে পৌঁছাতে হবে।
আমরা জানি না জেবিডবিস্নউজি আর সচিব পর্যায়ে এত আলোচনার ভবিষ্যৎ কি হবে। তবে দিনের পর দিন ছিটমহলের লক্ষ মানুষ চরম হীনমর্যাদায় আছেন আর এই একবিংশ শতাব্দীর তথাকথিত গণতন্ত্র, বিশ্বায়ন, মানবাধিকার ইত্যাদি তাদের ন্যায়সঙ্গত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারছে না, এ সত্যটুকু আমাদের স্বীকার করে নিতেই হবে। কয়েক বছর আগে এক সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার প্রায় সমবয়সী সাত শিশুর পিতৃত্বের পরিচয়ের সত্যতা যাচাই করার জন্য মানবাধিকার কমর্ীদের প্রচেষ্টার কথা আমাদের এখনও মনে পড়ে। আশা করি, দীর্ঘ ৬৩ বছরে লক্ষ মানুষের যে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কোন ন্যায়সঙ্গত সুরাহা হচ্ছে না, তা মানবাধিকার কমর্ীরা বিবেচনায় নিয়ে দু'দেশের সরকার ও রাজনৈতিক পর্যায়ে জোরালো ভাবে তুলে ধরবেন।
ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার, সেখানে ইউরোপীয়দের আগমন এবং স্থানীয় রেড ইন্ডিয়ানদের উপর ইউরোপীয়ানদের শাসন ও শোষণ এগুলো ইতিহাস, সত্য।
ইউরোপীয়ানদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্থানীয়রা সশস্ত্র সংগ্রাম করায় চতুর ইউরোপীয়ানরা গল্প, উপন্যাস ও সরকারী দসতাবেজে তাদেরকে হিংস্র, দুর্ধর্ষ, বেশ্যা হিসেবে রূপায়ণ করেছে। আর বর্তমান সময়ে ছিটমহলবাসীদেরকে তাদের দুর্বলতার সুযোগে বিভিন্নভাবে অত্যাচার করা হচ্ছে আর তাদেরকে চোরাচালানকারী, জুয়াড়ি ইত্যাদি পরিচয় দিয়ে এসব অন্যায়-অত্যাচারকে উপযুক্ত হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যার সত্যতা বিভিন্ন সময়ে মিডিয়ার মাধ্যমে জেনেছি আর 'গারাতি' ছিটমহলের ঘটনা এর সামপ্রতিক উদাহরণ। এভাবে রাজনৈতিক পরিচয়হীন, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাহীন মানুষের উপর অন্যায়-অবিচার চলতে থাকলে এটা হলফ করে বলা যায়, আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের বর্তমান প্রজন্ম যেভাবে তাদের উপর অতীতের অন্যায় অবিচার এবং জুলুমের ইতিহাস ঘেটে নিজেদের নতুন করে প্রসতুত করছে এবং বিশ্বের কাছে সেই সময়ের সত্যিকারের হিংস্র, আগ্রাসী শক্তির স্বরূপ তুলে ধরছে ঠিক তেমনিভাবে অনাগত দিনে ছিটমহলের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের এই করুণ অবজ্ঞা আর অপমানের ইতিহাসকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরে দু'দেশের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের অতীতের কৃতকর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেই।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিটমহলের মানুষগুলোর জন্য শুধু 'রিলিফ' নয়; বরং সকল ছিটমহলবাসির স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিশ্চিত হোক এবং দু'দেশের পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় থাকুক- এই প্রত্যাশা করছি।
=========================
শিক্ষা আসলে কোনটা  জীবন ব্যাকরণঃ হিরালি  ন্যাটো ও রাশিয়ার সমঝোতা ইরানের ওপর কি প্রভাব ফেলবে  জার্নি বাই ট্রেন  পারিষদদলে বলেঃ  চরাঞ্চলের ভূমি ব্যবস্থাপনা  সচেতন হলে শিশু প্রতিবন্ধী হয় না  স্মৃতির জানালায় বিজয়ের মাস  বিচারপতিদের সামনে যখন ‘ঘুষ’  কয়লানীতিঃ প্রথম থেকে দশম খসড়ার পূর্বাপর  শ্বাপদসংকুল পথ  মুক্তিযুদ্ধে গ্রাম  ১২ বছর আগে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে  চট্টগ্রাম ইপিজেডে সংঘর্ষে নিহত ৪  ড. ইউনূস : প্রতিটি বাংলাদেশির গৌরব  জলাভূমিবাসীদের দুনিয়ায় আবার..  আসুন, আমরা গর্বিত নাগরিক হই  স্মৃতির শহীদ মির্জা লেন  ইয়াংওয়ান গ্রুপের পোশাক কারখানা বন্ধ  ট্রানজিটে ১১ খাতের লাভ-ক্ষতির হিসাব শুরু  চট্টগ্রামের বনাঞ্চল ছাড়ছে হাতি  ট্রেন  স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি  মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধের বিচার  মানবাধিকার লঙ্ঘন দেশে দেশে  ক্ষমতা যেভাবে মানবাধিকার আর ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ করে  চাক্কু মারা 'মশা' কাহিনী  উল্কির ভেলকি  এইচআইভি/এইডস্  উইকিলিকসঃ জুলিয়ান চে গুয়েভারা!  তিন কালের সাক্ষী  বাবর আলীর ইশকুল  এ মাটির মায়ায়  মধ্যবিত্তের উত্থান, না ভোক্তাশ্রেণীর উদ্ভব  হিমালয়ের পায়ের কাছেঃ গোধূলির ছায়াপথে  পতিত স্বৈরাচারের আস্ফালন ও আওয়ামী লীগের নীরবতা  ৪০ বছর পড়ে থাকা লাশটার সৎকার করতে চাই  এই কি আমাদের মানবাধিকার?


দৈনিক ইত্তেফাক এর সৌজন্যে
লেখকঃ গোলাম ফারুক সরকার টুকু
শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


এই আলোচনা'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.