কৃষি আলোচনা- চরাঞ্চলের ভূমি ব্যবস্থাপনা ইত্তেফাকের সৌজন্যে

সোনালী ধানে ভরিয়া গিয়াছে গলাচিপার চরাঞ্চল। মাঠে মাঠে পাকা আমনের সমারোহ। যে দেখে তাহারই চোখ জুড়াইয়া যায়। কিন্তু প্রান্তিকচাষী, যাহারা রোদে পুড়িয়া, বৃষ্টিতে ভিজিয়া এই ধানের আবাদ করিয়াছেন তাহাদের চোখে ঘুম নাই। দুশ্চিন্তা তাহাদের, এই সোনালী শস্য আপন গোলায় তুলিতে পারিবেন কিনা। স্থানীয় ভূমি অফিসের প্রতিনিধি আসিয়া ধান ভরা চরের অনেক জমিতে লাল নিশান উড়াইয়া দিয়াছে।
এই নিশানের অর্থ জমিটি খাস। এই জমির মালিক সেই কৃষক নহে, যিনি আবাদ করিয়াছেন। অভিযোগ রহিয়াছে _যখন এই জমিন পতিত পড়িয়াছিল, যখন চাষী ধানের চারা রোপণ করিয়াছেন তখন ভূমি অফিসের খবর ছিল না। এখন ধান পাকিয়াছে, তাহারা লাল নিশান নিয়া হাজির। এই ধান চাষীর নহে। খাস জমিতে ধান ফলিয়াছে। সেই ধান কাহার গোলায় উঠিবে; ইহাই প্রশ্ন। চর জীবনের অভিজ্ঞতা বলে, এই ধান সেই কাটিয়া লইবে, যাহার আছে লাঠির জোর। আর এই জন্যই চরাঞ্চলে এখনও অনেক কদর লাঠিয়ালের। জোর যার মুলস্নুক তার; আদিম বেদনা নিঃসৃত এই বচনটিকে এখনও মহৎ বলিয়া প্রমাণিত করিবার জন্যই কিনা কে জানে ভূমি অফিস লাল নিশান উড়াইয়া দিয়াছে, যখন ধান পাকিয়াছে। এই সংবাদ ছাপা হইয়াছে গত বৃহস্পতিবার পত্রিকান্তরে।
গলাচিপা বলিয়া কথা নহে। চরের জমি লইয়া এই দেশে বিবাদ-বিসম্বাদ, মামলা-মোকদ্দমা এবং লাঠিয়ালের উৎপাত নূতন নহে। যুগ যুগ ধরিয়া এই সমস্যাটি এইখানে বিরাজমান। নদীমাতৃক বাংলাদেশে এ পাড় ভাঙ্গে ও পাড় গড়ে, বর্ষা শেষে জাগিয়া ওঠে নূতন নূতন চর, আবার পুরোনো চরের জমিনের সীমানাচিহ্ন ধুইয়া-মুছিয়া যায় বানের পানিতে। নূতন জাগিয়া উঠা চর প্রায়শ খাস বলিয়া চিহ্নিত হইয়া থাকে। তবে ভূমি অনুযায়ী নদীতে ভাঙ্গিয়া নিয়া যাওয়ার পরও যদি জমির মালিক খাজনা পরিশোধ করিয়া যাইতে থাকেন, তাহা হইলে সেই জমি খাস হইবার কথা নহে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নদীসিকস্তি মানুষ নদীগর্ভে বিলীন হইয়া যাওয়া জমির খাজনা নিয়মিত পরিশোধ করেন না বা করিতে পারেন না। ফলে সেইসব জমি স্বাভাবিক নিয়মেই খাস হইয়া যায়। বহু বৎসর পর জাগিয়া ওঠা সেইসব জমির মালিকানা নিয়া দেখা দেয় বিরোধ। জমি দখল করিয়া নিতে শক্তিমানরা বল প্রয়োগ করেন। ইহা লইয়া হানাহানি, খুনাখুনির ঘটনাও ঘটিয়া থাকে। অতীতে এই সমস্যাটি খুবই বেশি ছিলো। এখন কিছুটা কমিয়াছে, এই কথাও সত্য।
বাংলাদেশে চরের জমির মোট আয়তন কত, তাহার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নাই। বেসরকারি হিসাবে সারাদেশে ৪ লাখ একর চরভূমি রহিয়াছে। ২০০০ সালে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় বলা হয়, বাংলাদেশের পাঁচটি প্রধান নদী অববাহিকায় চরভূমির আয়তন ১ হাজার ৭২২ দশমিক ৮৯ বর্গ কিলোমিটার। সবচাইতে বেশী চরাঞ্চল রহিয়াছে যমুনায়। পদ্মা ও মেঘনা অববাহিকাতেও বিপুলায়তন চরভূমি রহিয়াছে। অনেক সময় সেইসব জমি জোতদাররা স্থানীয় প্রান্তিক চাষীদের নিকট ভাড়া দিয়া থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রান্তিক চাষীদের নূতন জাগিয়া উঠা চরে নির্বিঘ্নে ফসলের বীজ বপন করিতে দেওয়া হয়, যেন কোনো সমস্যাই নাই। কিন্তু শস্য পাকিবার পর শক্তিমানরা স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করিয়া থাকে। এই ক্ষেত্রে অভিযোগ রহিয়াছে যে, স্থানীয় ভূমি অফিসের একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী দখলদারদের প্রতি বাড়াইয়া দেয় সহযোগিতার হাত, ক্ষতিগ্রস্ত হন অসচেতন দরিদ্র চাষী।
এই পরিস্থিতির অবসান হওয়া দরকার। দেশে নদী সিকস্তি নদী পয়স্তির যেই আইন রহিয়াছে, সেইটাকে যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। জমির মূল মালিকের উত্তরাধিকারীদের অগ্রাধিকার বিবেচনায় রাখিয়া মালিকানা বিরোধ নিষ্পত্তি করা বাঞ্ছনীয়। সর্বোপরি চরাঞ্চলের জন্য আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তোলা একান্ত প্রয়োজন।
======================
সচেতন হলে শিশু প্রতিবন্ধী হয় না  স্মৃতির জানালায় বিজয়ের মাস  বিচারপতিদের সামনে যখন ‘ঘুষ’  কয়লানীতিঃ প্রথম থেকে দশম খসড়ার পূর্বাপর  শ্বাপদসংকুল পথ  মুক্তিযুদ্ধে গ্রাম  ১২ বছর আগে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে  চট্টগ্রাম ইপিজেডে সংঘর্ষে নিহত ৪  ড. ইউনূস : প্রতিটি বাংলাদেশির গৌরব  জলাভূমিবাসীদের দুনিয়ায় আবার..  আসুন, আমরা গর্বিত নাগরিক হই  স্মৃতির শহীদ মির্জা লেন  ইয়াংওয়ান গ্রুপের পোশাক কারখানা বন্ধ  ট্রানজিটে ১১ খাতের লাভ-ক্ষতির হিসাব শুরু  চট্টগ্রামের বনাঞ্চল ছাড়ছে হাতি  ট্রেন  স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি  মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধের বিচার  মানবাধিকার লঙ্ঘন দেশে দেশে  ক্ষমতা যেভাবে মানবাধিকার আর ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ করে  চাক্কু মারা 'মশা' কাহিনী  উল্কির ভেলকি  এইচআইভি/এইডস্  উইকিলিকসঃ জুলিয়ান চে গুয়েভারা!  তিন কালের সাক্ষী  বাবর আলীর ইশকুল  এ মাটির মায়ায়  মধ্যবিত্তের উত্থান, না ভোক্তাশ্রেণীর উদ্ভব  হিমালয়ের পায়ের কাছেঃ গোধূলির ছায়াপথে  পতিত স্বৈরাচারের আস্ফালন ও আওয়ামী লীগের নীরবতা  ৪০ বছর পড়ে থাকা লাশটার সৎকার করতে চাই  এই কি আমাদের মানবাধিকার?  ঐতিহ্যের মধ্যে সমকাল  কেমন দেখতে চাইঃ ঢাকা আন্তর্জাতিক বইমেলা  দ্রীপ প্রতিভার দ্যুতিময় স্মারক  গল্প- বৃষ্টি  শহীদুল্লা কায়সারঃ রাজনৈতিক সৃষ্টিশীলতা  আনোয়ার পাশাঃ জাতিরাষ্ট্রের অংশ ও প্রেরণা


দৈনিক ইত্তেফাক এর সৌজন্যে

এই আলোচনা'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.