গল্প- 'নূরে হাফসা কোথায় যাচ্ছে?' by আন্দালিব রাশদী

আসমাউল হুসনার বয়স এখনো চার বছর হয়নি। মায়ের সঙ্গে ঘুমায় ডাবল খাটে। জাহাজের খাট। পান্থপথ ফরেন ফার্নিচার মার্ট থেকে তিন হাজার ৩০০ টাকায় কেনা।

জাজিমটাও পুরনো। কিন্তু পাতলা তোশকটা নতুন। নতুন মানে এই নয় যে এক-দেড় মাসের মধ্যে কেনা। কেনা হয়েছে, তাও প্রায় চার বছর। কেনার সময় তোশকটা নতুন ছিল, খাট আর জাজিম পুরনো। পাতলা বালিশ তিনটা। দেড় হাত মাপের কোলবালিশ একটা। পুরনো-নতুন মিলিয়ে চারটা চাদর। চাঁদরের বেলায় পুরনো মানে ব্যবহারে কিছুটা জীর্ণ। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এই চাদরগুলোই বিছায়। বালিশের কভার সাদা রঙের। ব্যবহারে হলদেটে হয়ে গেছে। চাদর ও বালিশের কাপড়ের ম্যাচিং হয়নি। হবে, আগে এই দেড় রুমের বাসাটা পাল্টাক। ছোট রুম হলেও মেয়েকে তো একটা দিতে হবে।
মেয়ের চাদর-বালিশ কোনোটাই সাদা রঙের হবে না। সাদার ওপর শোয়ালে মেয়ের কালো রংটা বেশিই চোখে পড়ে।
আক্কাস আলী প্রায় আড়াই বছরে এই কালো মেয়েকে চকোলেট খাইয়ে আর পুতুল কিনে দিয়ে কমপক্ষে ১৫ হাজার টাকা নষ্ট করেছে। খালি হাতে কখনো আসেনি।
নূরে হাফসা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেছে_এত খরচ করেন ক্যান?
কাজ হয়নি। মেয়েরও প্রত্যাশা বেড়েছে_কিছু না কিছু পাবেই।
এত দিন সমস্যা ছিল না। এক ঘুমে রাত পার করত। হিসু করে বিছানা ভিজানোর পরও ঘুম ভাঙত না। পরিবর্তনটা চোখে পড়ছে এক মাসের বেশি হবে না। হুসনা হঠাৎ করেই জেগে ওঠে। শুয়েই থাকে, কিন্তু চোখ খোলা। প্রথমদিকে চোখে থাকত বিস্ময়। বিস্ময়ের চাহনি আস্তে আস্তে বদলাতে থাকে।
নূরে হাফসা আগে এক বালিশে ঘুমাত। এখন একটাতে মনে হয় মাথা নিচু হয়ে আছে, দুটো লাগে। ডিম লাইটটা বেশ ভালোভাবেই জ্বলে ওঠে। হুসনা ঘুমিয়ে। গরমের কারণেই খালি গা। জোড়া-ঘটি ডিজাইনের হাফপ্যান্ট। দেয়ালের দিকটায় কোলবালিশ। মশারিটা পরিষ্কার। ডিমলাইট মেয়েটাকে ঘিরে নীল রঙের একটা ছায়া ফেলেছে মশারির ভেতর।
উত্তেজিত আক্কাস আলী পুরো নির্বসন হয়ে কামার্ত নূরে হাফসার ওপর যখন আরোহণ করে_গোটা বিশ্বই তখন এই জোড়ের মুঠোয়। নূরে হাফসাও তখন নির্বসন। উষ্ণতা ও আনন্দ যখন প্রায় শিখরে দুদণ্ড পরই হাফসার উদোম বুকে ধপাস করে শুয়ে পড়বে আক্কাস, কাশির শব্দ বিচলিত করে তাকে। দুজনেই দেখে কালো মেয়েটির চোখে ক্ষুব্ধ চাহনি। আক্কাস সহসা শীতল হয়ে যায়। হাফসাও বলে ওঠে, হারামজাদি আর সময় পেলি না।
এ বাধা না সরালেই নয়। দুই হাতের দরকার ছিল না। তবুও আক্কাস দুই হাতেই চেপে ধরল কালো মেয়েটির কণ্ঠ। হাফসা নিজের মেয়ের চোখে হঠাৎ এক আগ্নেয়গিরির উদ্গিরণ লক্ষ করল, পরক্ষণেই মনে হলো এ চোখে আর কোনো ভাষা নেই। নূরে হাফসা বাধা দিল না। নগ্ন আক্কাস আলী বলল, শেষ করে দিলাম।
দুই.
ঘরে তিনটা বাতি।
একটা দীর্ঘায়ু টিউব লাইট। হুদালি্লল মোত্তাকিন তাবুক পৌরসভায় পরিচ্ছন্নতা তত্ত্বাবধানের চাকরিটা পাওয়ার পর পরই দেড় মাস অকেজো থাকা টিউবটা সরিয়ে নতুন একটা লাগিয়ে দিয়েছে। বৈদ্যুতিক কাজে তার হাতটা পাকা না হলেও টিউব বাল্ব এসব লাগানোর মতো বিদ্যা তার ছিলই। ৪০ ওয়াটের একটা বাল্ব দুবার বদলানো হয়েছে। শেষবার সুইচ অন করার পর একটা ঝিলিক দিয়ে বাল্বটা সেই যে অকেজো হয়ে গেল, তারপর টানা এক বছর। ঝুলকালিতে মলিন হয়ে অকেজোটাই হোল্ডার দখল করে রেখেছে। আর একটা ডিমলাইট, বাল্ব ঠিকই আছে, সমস্যা সুইচে, কখনো জ্বলে নীল স্নিগ্ধ আলো ছড়ায়, কখনো ১০ বার সুইচ টিপলেও বাতি জ্বলে না।
তাবুক মদিনা শরিফ থেকেও অনেক দূরে, উত্তর-পশ্চিম দিকে। দাম্মাম এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে তাবুক, যেখানে হুদালি্লল মোত্তাকিনকে থাকতে বলা হলো, জায়গাটা আসলে একটা গোডাউন। একসময় ভেতরে সিমেন্ট, রড, পাথর ও কংক্রিট রাখা হতো। পূর্ত কাজ বেড়ে যাওয়ায় বড় গোডাউন তৈরি করা হয়েছে। পুরনোটায় এখন মানুষ রাখা হয়। এখানে যারা থাকে অর্ধেকই বাংলাদেশের, পৌরসভার বিভিন্ন মানের ক্লিনার। অধিকাংশেরই চুক্তি শেষ বছর। কারোই নবায়ন হবে না জানিয়ে দিয়েছে, কাজ করতে হলে নতুন চুক্তিতে আবার আসতে হবে। তাবুকের লু হাওয়া তার সয়ে গেছে এবং দেখতে দেখতে চুক্তির চার বছর পূর্তি তারও শেষ হতে চলেছে। একবার মক্কা শরিফে এসে সাতবার সাফা ও মারওয়ার ছোটাছুটি এবং সাতবার পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফের মাধ্যমে ওমরাহ সম্পন্ন করছে এবং মদিনা মনোয়ারার কাছাকাছি থাকলেও তিনবারের বেশি নবীজির রওজা মোবারকে হাজির হওয়া সম্ভব হয়নি। যতবার মোনাজাতে হাত উঠিয়েছে নাম ধরে ধরে নূরে হাফসা এবং আসমাউল হুসনার জন্য দোয়া করেছে। দুই বছরের মাথায় ছুটিতে দেশে ফেরার সুযোগ ছিল, ফেরেনি। তখনো কাজ করেছে। টাকা জমুক, কাজে লাগবে। নূরে হাফসা তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী শাহানা ইয়াসমিন বলেকয়েই চলে গেছে। মোত্তাকিন তার পৌরুষ ফলাতে চেষ্টা করেনি, করলে শাহানার বিদায়পর্বটা দীর্ঘায়িত করতে পারত। এমনকি একপর্যায়ে তা হয়তো বাতিলও করে দিতে পারত। কিন্তু করেনি। করেনি, কারণ মোত্তাকিনের ধারণা জোর করে আর যা-ই হোক, সংসার করা যায় না। তাতে কিছুটা ব্যক্তিগত দুর্নাম তার হয়েছে। বন্ধুরা বলেছে, শালা একটা আস্ত ধ্বজভঙ্গ। মোত্তাকিন এটুকু অপবাদ মেনে নেয়। পৃথিবীর বহু সফল পুরুষের স্ত্রী বিয়ের এক মাসের মধ্যেই স্বামীকে ত্যাগ করেছে। শাহানা ইয়াসমিন গুনে গুনে সাড়ে পাঁচ মাস তার সঙ্গে ঘর করেছে। স্ত্রী হলেও অনিচ্ছুক নারীর সঙ্গে সঙ্গম ধর্ষণের পর্যায়েই পড়ে, এটা মোত্তাকিন হয়তো জানেই না, তবুও স্ত্রীর অনিচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে নিজেকে সংযত রাখে। স্ত্রী স্বীকার করেছে, বোনের দেবর আবুল বাশারের সঙ্গে তার বিয়ে ঠেকাতে প্রায় দুই মাস তাকে অন্তরীণ রেখে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করে ঘটক প্রস্তাবিত পাত্র হুদালি্লল মোত্তাকিনের সঙ্গে বিয়েতে বাধ্য করা হয়। শাহানা ইয়াসমিন প্রতারণা করেনি, তার দেওয়া অলংকার ও পোশাকের কিছুই নেয়নি। তাকে ছেড়ে যাওয়ার আগের রাতে পা ছুঁয়ে কদমবুসি করে বলেছে, আপনি আমাকে মাফ করে দেবেন।
হুদালি্লল মোত্তাকিন মাফ করে দিয়েছে। একটি মন্দ কথাও তাকে ছেড়ে যাওয়া স্ত্রী সম্পর্কে বলেনি। ছয় মাস পর যে কথাটি শুনে সে কষ্ট পেয়েছে, তা হচ্ছে আবুল বাশার শাহানা ইয়াসমিনকে বিয়ে করেনি। সে যে আবার তাকে ফিরিয়ে আনবে, সে পথও বন্ধ। প্রথম স্ত্রী চলে যাওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় নূরে হাফসাকে বিয়ে করেছে এবং আট মাসের মাথায় স্ত্রীর মূত্র ছোট স্বচ্ছ বোতলে বহন করে প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে এনে নিশ্চিত হয় যে সে স্ত্রীর গর্ভে সাফল্যের সঙ্গে সন্তানের বীজ বপন করতে সক্ষম হয়েছে। নিজের কথিত ধ্বজভঙ্গজনিত অসমর্থতার বদনাম ঘোচাতে দ্বিতীয় স্ত্রীর জরায়ু স্ফীতির কোনো বিকল্প নেই। স্ত্রীর মূত্র নিজ হাতে বহনের আনন্দস্মৃতি মরুর দেশেও একাধিকবার মনে পড়েছে। স্ফীত উদর নূরে হাফসাকে এয়ারপোর্টের স্বচ্ছ কাচ-দরজার ভেতর থেকে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানিয়ে সৌদি এয়ারলাইনসের বিশালাকৃতির উড়োজাহাজের ভেতরে যখন প্রবেশ করে, তখন তার স্ত্রীর আট মাস চলছে। হুদালি্লল মোত্তাকিন বলেছিল, এমন ভারী পেট নিয়ে এয়ারপোর্ট আসার দরকার নেই। রায়েরবাজারের সনাতনগড় থেকে কুর্মিটোলা খুব কাছের পথ নয়।
বাচ্চাটার জন্ম হয় ঠিক এক মাস ১১ দিন পর। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সবই মায়ের সদৃশ, গায়ের রংটা কেবল বাবার, শ্যামলা। মেয়েই যখন হলো, রংটা ফর্সা হলে ক্ষতি কী ছিল। এই কথাটা নূরে হাফসা নিজেও বলেছে, মেয়েটার বয়স তখন দেড় বছর। হুদালি্লল মোত্তাকিন টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলেছে, এটা কোনো সমস্যাই নয়। আমার মায়ের রংও তো কালো, তাই বলে কি বিয়ে হয়নি। তিন বোনের মধ্যে আমার মা-ই ছিল সবচেয়ে সুখী।
যে সেলফোনটা নূরে হাফসাকে কিনে দিয়েছিল, বছর দেড়েক পর আর ভালো কাজ করছিল না, কথা কেটে কেটে যাচ্ছিল। মোত্তাকিন বলল, শিগগির একটা ভালো সেট পাঠাচ্ছি। এতে ক্যামেরাও থাকবে, ভিডিও করা যাবে।
মোত্তাকিন দুই হাত খুলে স্ত্রী ও সন্তানের জন্য খরচ করে। এমনকি নেট সার্ফিংও করা যায়_এমন একটি মোবাইল টেলিফোন সেটও পাঠাল বাংলাদেশগামী আক্কাস আলীর হাতে। আক্কাস আলীকেই দিল মূলত তার সঙ্গে সখ্য এবং উভয়েরই বসবাস ঢাকায় বলেই। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের লোকই বেশি তার কর্মক্ষেত্রে। ঢাকা তাদের জন্য ট্রানজিট। আক্কাস সেধেই বলল, শুধু স্ত্রীর জন্যই দিলেন, মেয়েকে কিছু দেবেন না? মোত্তাকিনের ভালো লাগল এই অভিব্যক্তি। এক কৌটা ক্যাডবারি এসর্টেড চকোলেটও দিল। আর নূরে হাফসার ঠিকানা ও মোবাইল ফোন নম্বর। শেষ মুহূর্তে আরো একটা প্যাকেট হাল ফ্যাশনের সৌদি বোরকা, হাফসাকে বেশ মানাবে।
মোত্তাকিনের কল্পনা তার স্ত্রীকে কালো বোরকা পরালো। কালো ঠেলে বেরিয়ে এল হাফসার ঘন দুগ্ধ বর্ণ মুখমণ্ডল। তার মনে হলো, সুন্দর একটা কালো চমশা সঙ্গে দিতে পারলে হতো। পুরো আরবি যুবতীই মনে হতো হাফসাকে। থাক, চশমাটা নিজে যাওয়ার সময়ই নিয়ে যাবে।
দুই বছরের মাথায় এক মাসের ছুটিতে দেশে ফেরা যেত। পৌরসভার কাজের পরিধি অনেক বেড়ে যাওয়ায় এবং দক্ষ লোকের ঘাটতি থাকায় বেছে বেছে কজনকে বলা হলো, উড়োজাহাজের ভাড়াটা নগদে দিয়ে দেওয়া হবে। মাসের বেতন তো আছেই। এক মাসেই জমে যাবে লাখ টাকা। দেশে ফিরলে এটা তো যাবেই, স্বজনদের এটা-ওটা কিনে দিতে, নিজের অবস্থারও কিছুটা পরিবর্তন ঘটাতে খরচ হবে আরো দুই লাখ টাকা। তিন লাখ টাকার ফের। যখন স্ত্রীর মতামত চাইল, নূরে হাফসা বলল, আপনি যা ভালো মনে করেন।
মোত্তাকিন বলল, আমি তো আসতেই চাই। কিন্তু টাকাও কম নয়।
হাফসা বলল, থাক একবারেই আসবেন। দেখতে দেখতে দুই বছর কেটে যাবে।
মোত্তাকিন বলল, মেয়েটাকেও ধরে দেখলাম না। মেয়েটাও তো বাপ দেখল না।
হাফসা বলল, আপনার মেয়ে আপনাকে চেনে। ফটোটা সামনে আনলেই বলে, আব্বা, আব্বা।
হুদালি্লল মোত্তাকিন এবং আরো কজন এই বিশেষ অফারটা গ্রহণ করেছে। ফিরবে না। চার-চার বছরের টাকা খরচের পরও যা থাকবে, তাতে একটা ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করা যাবে। বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকাটাই আনন্দের। নিঃসঙ্গ পরবাসের অভিজ্ঞতা তো হলোই।
তিন.
আক্কাস আলী দারিদ্র্য মোচনের জন্যই পৌরসভার ক্লিনিংয়ের কাজ নিয়ে মরুর দেশে গিয়েছে বলা ঠিক হবে না। ইত্তেফাক অভিসার পেরিয়ে যাত্রাবাড়ীর পথ ধরলে হাতের ডানেই একদা কর্মচঞ্চল হরদেও গ্লাস ফ্যাক্টরি। আক্কাসের বাবা ও বড় ভাই কাজ করত এই ফ্যাক্টরিতে। হারিকেনের চিমনি, পানি খাওয়ার গ্লাস এবং টেস্ট-টিউব বানাত। আক্কাসের বাবা কাজটা ভালো করেই রপ্ত করেছিল। ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেলে বড় ছেলেকে নিয়ে ডেমরায় নিজের বাড়িতেই একটি ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করে এবং চাকরিহারা অনেকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করে। বাবা ও ভাই চেয়েছে আক্কাসও ফ্যাক্টরির কাজে হাত লাগাক। কিন্তু কাচ তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। সে তার বাবার ভাষায় ভাদাইম্যাই থেকে যায়। বাবার কিছু টাকা হাতিয়ে নিয়ে কিছু দিন পালিয়ে বেড়ায় এবং একসময় যখন ফিরে আসে এবং আত্মসমর্পণ করে, বাবাকে বলে_টাকাটা নষ্ট করেনি, সৌদি আরব যাওয়ার জন্য জমা দিয়েছে।
বাবা বলল, ফোর টুয়েন্টির পাল্লায় পড়েছিস। টাকাটা মার যাবে।
ছেলে বলল, দেখা যাক।
তারপর আর তিন সপ্তাহ ঢাকায়। ব্যাপারটা কেউ তেমন আমলে নেয়নি। একটা হালকা স্যুটকেস নিয়ে আক্কাস প্লেনে চড়ল। বাবা সবাইকে বলল, দেখিস এক মাসের মধ্যে যদি ফিরে না আসে আমার হাতের তালুতে ঘাস গজাবে।
তালুতে ঘাস গজায়নি। আক্কাস ফিরেছে ঠিক দুই বছর তিন দিন পর। আক্কাসের প্রত্যাবর্তনে সবাই খুশি। কাচ গলানো আগুনের হলকায় বড় ভাইয়ের মুখের বেশ খানিকটা অংশ বিবর্ণ হয়ে গেছে। বাবাও মাঝেমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
ঢাকায় ফেরার পর তৃতীয় দিন যখন ফ্যাক্টরির কাজ দেখতে গেল, পরিবারের সবাই ধরে নিল ছেলে স্থিতধী হয়েছে। সংসার করতে পারবে। মেয়ে দেখা যায়।
চতুর্থ দিন আক্কাস আলী ফ্যান্সি হেয়ার কাটিং সেলুনে ফোম শেইভ করে বাসায় ফিরে কড়া আফটার শেইভ লোশন মেখে হালকা নীল শার্ট এবং ঘিয়ে রঙের প্যান্ট পরে গায়ে একটুখানি পারফিউম ছড়িয়ে নিজের মোবাইল ফোনটা হাতে তুলে নিল। তারই এক স্তর ওপরের স্কেলে বেতন পাওয়া তাবুক পৌরসভার হুদালি্লল মোত্তাকিনের স্ত্রীর ফোন নম্বরটি বের করে সবুজ বোতাম টিপে ধরল, আট থেকে ১০ বার রিং বাজল, কেউ ধরল না। স্ত্রী ও কন্যাকে দেওয়া দুটি প্যাকেট বের করল। প্যাকেটের গায়ে সনাতনগড় রায়েরবাজারের একটি ম্যাপও করে দেওয়া আছে। জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে নেমে সোজা পশ্চিমে মিষ্টির দোকানঘেঁষে ডানে, তারপর বাঁয়ে... এ রকম আরো কিছু নির্দেশ। তারপর মডার্ন লন্ড্রি, লন্ড্রির পেছনে দোতলা বাড়ির ওপর তলায় ডান পাশে। খামের ওপর লেখা নূরে হাফসা এবং মোবাইল ফোন নম্বর।
নম্বরটি মিলিয়ে নিয়ে আক্কাস আবার চেষ্টা করল। এবার সাড়া মিলল। আক্কাস তার পরিচয় ও বৃত্তান্ত তুলে ধরার পর ওপারের ধ্বনি শুনল, জি আক্কাস ভাই, আমি তো ভাবছি আপনি মোবাইল লইয়া পলাইয়া গেছেন। আপনি দেশে ফিরছেন চার দিন। নাকি মিছা কইলাম?
যে কণ্ঠ নূরে হাফসার কথা প্রক্ষেপণ করল, আক্কাসের মনে হলো অনেক দিনের চেনা। একটু পুরুষালি স্বর, চটপটে এবং অনেক দিন আগে বলধা গার্ডেনে দেখা দুটো হিজড়ার একটার স্বরের মতো। বুকের দুই পাশে নারকিলের মালা-জাতীয় কিছু ব্যবহার করে স্তন উঁচিয়ে গান গাইছিল, বুকে আমার আগুন জ্বলে যৌবন ভরা অঙ্গে। দেশে ফেরার পর চার দিন পার হলেও কোনো হিজড়া তার চোখে পড়েনি। হয়তো দেশের হিজড়া জনবল কমে গেছে। স্তন, না নারকিল মালা সেদিন খুব জানতে ইচ্ছে করছিল। একই কণ্ঠ ও প্রান্ত থেকে বলে চলেছে। শোনেন ভাই, গরিবের বাড়িতে আসবেন, ভাত না খাইয়া যাইতে পারবেন না।
কী আশ্চর্য! সৌজন্য বশতও তো না বলে, কিন্তু আক্কাস তা করল না। কেবল বলল, সিম্পল ভাত। পোলাওটোলাও কইরেন না।
অর্থাৎ দাওয়াত কবুল করে নিল।
পুরো পলিথিনের সাদা সৌদি শপিং ব্যাগে মোত্তাকিনের পাঠানো জিনিসপত্র ভরে নিল। বাসে উঠলে প্যান্ট ও শার্ট কুঁচকে যেতে পারে। কালচে দাগ লাগতে পারে, শরীর ঘেমে উঠতে পারে, পারফিউমের গন্ধটা তখন মার খেয়ে যাবে। সুতরাং একটু বাড়তি খরচ লাগলেও অটোরিকশাই নিল। ফুরফুরে একটা ভাব নিয়ে দরজায় টোকা দেওয়া যাবে। মাঝখানে গাড়ি থামাল দুবার, ড্রাইভারকে বলল পুষিয়ে দেবে। একবার কিনল পন্ডস কোল্ডক্রিম, জনসন বেবি লোশন এবং ইয়ার্ডলে পাউডার আর একবার নিল দুই প্যাকেট মিষ্টি সন্দেশ ও বালুসাই মিষ্টি। ক্রিম, লোশন ও পাউডার সৌদি শপিং ব্যাগে ভরে নিল। মোত্তাকিন যেভাবে ম্যাপ এঁকে দিয়েছে, বাসা ভুল হওয়ার কথা নয়। আক্কাস দেখল কোনো কলিংবেল নেই, দরজার কড়া নাড়ল। সাড়া নেই। আবারও যখন নাড়ল, ভেতর থেকে সেই একই হিজড়া কণ্ঠ, আসছি।
মাথায় কাপড় ছিল, কপাল এবং ব্লাউস ঘর্মাক্ত। নূরে হাফসা দরজা খুলে একবার আপাদমস্তক দেখে নিল অতিথিকে। দুই হাতে ব্যাগ। মিলে গেছে। মোত্তাকিন যেমন বলেছে, দেখেই মনে হয় খান্দানি বংশের ছেলে। দেড় রুমের বাড়িতে দুটো ফ্যান, বসার ঘরেরটা প্রচণ্ড ঘরঘর শব্দ করে ঘোরে। তাও ধীর গতিতে, ঠিকমতো কথাও বলা যায় না।
হাফসা বলল, ভেতরে চলে আসেন। ভেতরে মানে বেডরুম। পুরো উদোম মেয়েটা দুই পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। মেয়েটার শিয়রের কাছে একটা একটা হাতলওয়ালা কুশন চেয়ার। হাফসা পরনের শাড়ির আঁচলে গদিটা মুছে বলল, বসেন। বাসা চিনতে অসুবিধা হয় নাই?
না ভাবি, আপনার সাহেব ম্যাপ আঁইকা বাসা চিনাইছে।
আক্কাসও হাফসাকে আপাদমস্তক একবার দেখে চেয়ারে বসল। হাফসা দরজা বন্ধ করে, আমি যাই বলে রান্নাঘরে বসল।
পোলাওর জ্বাল কমিয়ে দিল, মুরগির কোর্মারও। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে একবার ভাবল শাড়িটা-ব্লাউজটা পাল্টে নিলে ভালো হতো, পরক্ষণেই মনে করল এ অবস্থায় যখন একবার দেখেই ফেলেছে, থাকুক, এটাই থাকুক।
আক্কাস নিজেকেই শোনালো, আমি এতটা সেজেগুজে এলাম আর এই মহিলা যে শাড়িতে ছিল, তো সেটাতেই। আমার প্রাপ্য গুরুত্বটুকুও দিল না? কেবল গলাটা পুরুষালি। ঘর্মাক্ত ব্লাউজ স্পষ্টই বুঝিয়ে দিয়েছে নারিকেলের মালায় এই স্তনসজ্জা সম্ভব নয়, পুরোটাই শরীরের ভেতর থেকে উঠে আসা। আক্কাসের হিজড়া ভাবনা মগজ থেকে বের হতে সময় লাগে না। হাফসা ততক্ষণে লেবুর শরবত নিয়ে আসে। পিরিচের ওপর গ্লাস, গ্লাসের ভেতর শরবত এমন হয়। শরবতের গ্লাসটাই সরাসরি হাতে ধরে নিয়ে এসেছে। গ্লাসটা যখন আক্কাসের হাতে দিল, হাফসা চেষ্টা করল সদ্য দেখা এই পুরুষটির আঙুলের স্পর্শ এড়াতে, পুরুষটি চাইল একটু হলেও যেন স্পর্শ লাগে।
সুতরাং, স্পর্শ লাগল এবং সঙ্গে সঙ্গেই দুজন পরস্পরের দিক চাইল। হাফসা চোখ নামিয়ে আনে। তার পরও তাকিয়ে থাকে আক্কাস।
হুদালি্লল মোত্তাকিনের পাঠানো মোবাইল টেলিফোন সেট, সৌদি বোরকা ও চকোলেট একে একে বের করে তার হাতে দেয়। বলে, এগুলো আপনার সাহেবের পাঠানো। আর ক্রিম, পাউডার, লোশন আমি দিচ্ছি। মিষ্টিও আমিই আনছি।
আপনি ক্যান টাকা খরচ করতে গেলেন? হাফসার প্রশ্ন।
আক্কাস বলে বউ-বাচ্চা থাকলে আমি করতাম না?
এত মিষ্টি ক্যান? হাফসা জিজ্ঞেস করে?
খাবেন, মেয়েকে খাওয়াবেন। বাচ্চাদের মিষ্টি খাওয়ালে ব্রেইন পোক্ত হয়।
ঠিক বলছেন। ছোটবেলায় মিষ্টির স্বাদটা ভালো লাগত না। এ জন্য বেশি খাওয়া হয়নি। ব্রেইন পোক্ত হয়নি। এই জন্যে আইএ পরীক্ষায় ডাব্বা মারছি। ডাব্বা মারার শাস্তি বিয়া দেওয়া। বেশ মাইন্যা নিলাম। এইবার বিয়ার শাস্তি পেটে বাচ্চা দিয়া সাহেব চইলা গেলেন সৌদি। এখন একা একা বাচ্চা পালো, সংসার ঠিক রাখো। দূর, আমি কী প্যাঁচাল পারতাছি। আপনি আবার কবে যাবেন?
আক্কাস বলল, আমার কন্ট্রাক্ট শেষ। কম্পানি গাধাগুলোরে মুলা দেখাইয়া রাইখা দিছে, সব ঘোড়া বাদ। আমিও বাদ।
মোত্তাকিন সাহেব? তিনি কি গাধা? নূরে হাফসা জিজ্ঞেস করে।
আক্কাস বলে, জি ভাবি, পারফেক্ট গাধা। কম্পানি যে কজনকে লম্বা সময় ধরে পুষছে, তাদের এক নম্বরে হুদালি্লল মোত্তাকিন। তিনি আমাদের এক নম্বর গাধা। তা ছাড়া, যাক্ কমু না।
থাকবে ক্যান, বলে ফেলেন।
ঘরে এত সুন্দর বউ রাইখা যে বিদেশে পড়ে থাকে, গাধা তো সে-ই। থাক ভাবি, ফোন কইরা এইসব আবার সাহেবকে বইলা দিবেন না কিন্তু।
হাফসা বলে, সুন্দর কি ক্ষুধা মেটায়? টাকা লাগে না?
তখনই চোখ পড়ে নগ্ন হুসনার দু'পা ছড়িয়ে ঘুমানোটা ভালো দেখাচ্ছে না।
হাফসা একটা পাতলা কাপড় দিয়ে হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত মেয়েটাকে ঢেকে দেয়।
শরবতের শেষে ঢোকটুকু গিলে আক্কাস বলে, টাকা লাগে তা সত্যি। সুন্দর ক্ষুধা বাড়ায়ও। থাক ভাবি, আমি আজকে আসি। আমার টেলিফোন নম্বর তো পাইলেনই। দরকার হইলে ফোন দেবেন।
হাফসা বলল, আমি রান্না বসাইছি কার জন্য। আর আধঘণ্টা বসেন। বউ-বাচ্চা যখন নাই-ই এত তাড়া কিসের।
তার তাড়া নেই, এটাই সত্য। সেদিন তাকে পোলাও খেয়েই যেতে হলো। একসময় দেখা গেল ঘুম ভাঙা মেয়েটি নিঃশব্দে জল জল করে মা ও আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে আছে। আগন্তুক ভাবিটির প্রশংসা করে বিদায় নেয়।
মোত্তাকিনের পাঠানো দামি সেটে সিম কার্ড ঢুকাল ঠিকই, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। ফলে আবার ফোন দিতে হলো আক্কাসকে। কি জিনিস দিয়া গেলেন, ফোন তো কাজ করে না।
ফোন পেয়ে আক্কাস স্বস্তি পায় যোগসূত্রটি তাহলে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। হ্যাংলার মতো তাকে তো আর ফোন দিতে হলো না। আক্কাস এবার নেভি ব্লু পেন্ট ও সাদা টি-শার্ট পরে আসে, তাকে আরো তরুণ ও প্রাণবন্ত দেখায়। নতুন সেট ছয় ঘণ্টা চার্জে রাখার কথা। আক্কাস সমস্যাটা মিটিয়ে দেয়। আক্কাস খালি হাতে আসেনি। চারটা বার্গার এবং এক লিটার ঠাণ্ডা কোকও সঙ্গে এনেছে। তারপর নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হয়, আক্কাস সমাধান দেয়। বাড়িওয়ালি জিজ্ঞেস করে, কে? হাফসা অবলীলায় বলে ফেলে, ভাই। বিদেশ ছিল, এখন বোন-ভাগি্নর জন্য দরদি হয়ে উঠছে।
মেয়েকেও শিখিয়েছে, এই আগন্তুক হচ্ছে মামা। যেহেতু খালি হাতে আসছে না, আক্কাসের আবেদন কমছে না। কোনো দিন ফ্রায়েড চিকেন, কোনো দিন পিৎজা, কোনো দিন বগুড়ার দই। ঘনিষ্ঠতা নিবিড় হতে সময় লাগে না। আক্কাস মোটরবাইক কেনে। একদিন হাফসা ও হুসনাকে মোটরবাইকে চড়িয়ে ঢাকা শহর ঘুরিয়ে আনে। হুসনা খিলখিল করে হাসে, আক্কাস ভাবিকে কালো চশমা কিনে দেয়। বোরকা ও কালো চশমায় তাকে আরবি মেয়েদের মতোই দেখায়। যেটুকু ধবল ত্বক দেখা যায়, তা-ই আক্কাসকে উন্মাতাল করে তোলে। তার মোবাইলে তোলা শ্মশ্রুমণ্ডিত মোত্তাকিনের ছবি দেখায়। হাফসা বলে, হুজুরের কথা এখন থাক। পরিকল্পনা করেও অনেক সময় ঘনিষ্ঠ হওয়া যায় না, আবার না চাইতেই হয়ে যায়। নারী ও পুরুষের শরীরের রসায়ন কখন যে পরস্পরকে কাছে টেনে নেয় বলা মুশকিল। হাফসা জানে, ব্যাপারটা ঠিক হচ্ছে না, হাফসা জানে ব্যাপারটা অনৈতিক, তবুও নিজের ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়াটুকু নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে না।
মোত্তাকিন নিজেও প্রশংসা করেছে আক্কাসের। বলেছে, খান্দানি ঘরের ছেলে। নিজে সেধেই তো তাবুক থেকে একটি বোঝা টেনে এনেছে। তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার কথা মোত্তাকিনই শিখিয়ে দিয়েছে।
কয়েক দিন আগেও হাফসা ব্যক্তিগত এ ব্যাপারটা ঘটলে পুরনো নরম শাড়ির টুকরো ভাঁজ করে ব্যবহার করত। সম্পর্কটা এমন এক জায়গায় পেঁৗছেছে, হাফসা আক্কাসকে ফোনে বলতে পারছে, আমাকে কি সারা জীবনই ছেঁড়া শাড়ি গুঁজতে হবে। ফার্মেসিতে বড় স্টোরে কত কিছু পাওয়া যায়।
আক্কাস বলে, সরি এইটা তো মাথায় আসেনি।
একদিন নিয়ে আসে এক বছর চালানোর মতো স্যানিটারি ন্যাপকিন। হুসনার জন্য কেনে ট্রাই সাইকেল। গ্লাস ফ্যাক্টরির কাজ ভালো লাগে না।
এক ব্যাংকার বন্ধুর পরামর্শে শেয়ারবাজারে ঢোকে। আক্কাস প্রাইমারি শেয়ারের আবেদন করে, লটারিতে কখনো পায়, কখনো পায় না। সেকেন্ডারি শেয়ার কেনে। সামান্য লাভেই শেয়ার বেচে দেয়, বেশি টাকার লোভ করে না। শেয়ার বাজারে টিকে থাকার এটাই মূলমন্ত্র। সৌদি আরব থেকে আনা পুরো টাকাই বিনিয়োগ করে। আরো টাকা চাই, আক্কাসকে চাইতে হয় না, হাফসাই বলে, হুজুরের পাঠানো সব টাকাই তো ব্যাংকে আমার নামে। কত লাগবে বলো।
বিনিয়োগের টাকা বাড়তে থাকে। আক্কাস নগদ টাকা হাতে তুলে দেয় হাফসার। এই লও তোমার লাভ।
এত লাভ! হাফসা ভাবে এই ছোট ফ্রিজটা বাদ দিয়ে একটা বড় কেনা দরকার। শেষ পর্যন্ত কিনে একটা মাইক্রোওয়েভ। নিজের বিনিয়োগের লাভের টাকায়। আক্কাস ঠকায়নি, ঠকাতে পারে না। আক্কাস একদিন কিনে নিয়ে আসে ইলেকট্রিক রাইস কুকার। বলে, তোমাকে নগদ টাকা না দিয়ে তোমার লাভের টাকায় এটা কিনে আনলাম। রান্নাঘরে গিয়ে থাকতে হবে না। চাল আর পানি দিয়ে সুইচ অন করলেই যথেষ্ট।
দুজনের শারীরিক সম্পর্কটি স্থাপিত হতে তেমন সময় লাগে না। প্রতিবারই ক্লান্ত আক্কাসকে বলে, আমি যে কী পাপ করছি, আল্লাহ জানেন।
ঘুমাক্রান্ত আক্কাস বলে, আমাদের সৌদিতে হলে পাথর ছুইড়া জান কবচ করত।
হাফসা জিজ্ঞেস করে, শুধু আমার?
আক্কাস জবাব দেয়, আমারও। হুজুর নিজের হাতে দোররা মারত।
হুদালি্লল মোত্তাকিন নামটি হারিয়ে যেতে থাকে। দুজনই তাকে বলে হুজুর। হুজুর প্রতি শুক্রবার জুমার পর খাওয়ার পাট চুকিয়ে স্ত্রীকে ফোন করে। নতুন কোনো জলতরঙ্গের রিং টোন বাজে। হাফসা যথারীতি স্বামীর সঙ্গে সাংসারিক কথা চালিয়ে যায়। বাড়িওয়ালি ভাড়া ৫০০ টাকা বাড়ানোর নোটিশ দিয়েছে, একটা নতুন বিছানার চাদর কিনেছে, মাসিকের সময় এখন তলপেটে আর আগের মতো ব্যথা হয় না, হুসনার পিঠে ঘামাচি উঠেছে, আপনার দেশে ফিরতে আর কত দিন?
চার.
হুজুরের দেশে ফেরার দিন যত ঘনিয়ে আসে আক্কাস, হাফসা ও হুসনা_তিনজনের আচরণে কিছু কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। হাফসা কখনো তার মেয়ে আসমাউল হুসনার আব্বুর প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে আক্কাস বলে বসে, রাখ তোমার হুজুরের কথা। হাফসার সঙ্গে তার রমণটা অনেকটা একপক্ষীয় হয়ে উঠেছে, ব্যাপারটা হাফসার জন্যও একইভাবে আনন্দদায়ক হলো কি না_এটা আর জিজ্ঞেস করছে না। মাঝেমধ্যেই বলছে, শেয়ারবাজারে ধস নামতে যাচ্ছে।
নূরে হাফসার মনে একটা দৃশ্য গেঁথে গেছে, হুজুর তার দেহে দোররা মারছে। আক্কাস দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে, সামান্য বাধাও দিচ্ছে না। আক্কাসের সঙ্গে শরীরি সঙ্গমে প্রায়ই তার চরমানন্দ লাভের ব্যাপারটি ঘটছে না। হুজুর বাদ জুমা ফোন করলে হাফসা বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছে না।
হুসনা তিন বছর বয়স পর্যন্ত ভালোই ছিল। তারপর বদলাতে শুরু করে। বদ মেজাজি হয়ে ওঠে। সাড়ে তিন বছর পেঁৗছার পর অকারণেই তীব্র চিৎকার করতে থাকে। আলাদাভাবে আক্কাস ও মা দুজনকেই পছন্দ করে, কিন্তু দুজন একত্র হলেই তার খেপামিটা বেড়ে যায়। একদিন আক্কাসের হাতে কামড়ে সজোরে দাঁত বসিয়ে দিয়েছিল। মাঝেমধ্যে বিছানা প্রস্রাবে ভিজিয়ে দিচ্ছে। সে চকোলেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। তুচ্ছ কারণে হাফসার হাতের মার খাচ্ছে। হুসনার লাগাতার অসদাচরণের কারণে আক্কাস ও হাফসার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে, পরস্পরের আসক্তিতে টান পড়েছে। কখনো কখনো তাকে, এমনকি হাফসার কাছেও উপদ্রব মনে হচ্ছে। মায়ের সুখও সহ্য করতে পারছে না এই ছোট্ট ডাইনিটা।
হুদালি্লল মোত্তাকিনের প্রায় চার বছরের সঞ্চয়, তার পুরোটাই নূরে হাফসার অ্যাকাউন্টে। প্রতিবার এক মস্ত তৃপ্তিকর সঙ্গমের পর আরো কিছু শেয়ার ক্রয়ের জন্য হস্তান্তরিত হতে থাকে আক্কাসের কাছে। একপর্যায়ে প্রায় শূন্য হয়ে আসে তার অ্যাকাউন্ট।
হাফসা বলে, তাহলে হুজুরকে কী জবাব দেব?
কোনো জবাব দিতে হবে না। এত দিন তোমার সঙ্গে মেলামেশার পর যদি তোমাকে বিয়ে না করি, আমার পাপ হবে, তোমারটাও জেনা হয়ে যাবে। আর শোনো, দরকার হলে বিচ্ছুটাকে হুজুরের গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেও।
হাফসা বলে, একটা কথা ঠিক, হুসনা ব্যাপারটা মানতে পারতেছে না।
আক্কাস বলল, তোমারে কত দিন কইছি বিচ্ছুটা বিছানায় থাকলে আমার জোশ আসে না, তুমি তো কথা শুনলা না। এখনো সময় আছে, কত্ত কই তিন রুমের একটা বাসা নিই।
হাফসা বলে, বেশি বাড়াবাড়ি করলে হুজুর সন্দেহ করবে।
আক্কাস তার কথা উড়িয়ে দেয়, রাখো তোমার হুজুর।
হুদালি্লল মোত্তাকিনের আসার সময় আরো ঘনিয়ে এসেছে। অস্থিরতা বাড়ছে শেয়ারবাজারে, অস্থিরতা বাড়ছে দুজনের। হাফসার প্রশ্ন, টাকাগুলো? হুজুরকে কী জবাব দেব?
আক্কাস বলে, হুজুরকে আরো দুই বছর থেকে আসতে বলো।
বাড়িওয়ালা জানে, হুদালি্লল মোত্তাকিনের বিদেশ প্রত্যাগত সম্বন্ধী এখন মাঝেমধ্যে বোনের বাড়িতে থাকে। আক্কাস জায়নামাজ, তসবিহ ও খেজুরের একটি প্যাকেট বাড়িওয়ালাকে দেয়। তার সন্দেহ যাতে দানা না বাঁধে, সে জন্যই এই উপহার, বলে আমার বোনের জামাই পাঠাইছে।
বাড়িওয়ালা বলেন, তসবিহ, জায়নামাজ যা-ই দেন, জানুয়ারি থেকে ভাড়া আরো ৫০০ বেশি দিতে হবে।
আক্কাস বলে, অসুবিধা নেই। বোনের জামাইর কামাই ভালো।
ঘটনাটা সে রাতেরই। নীল ডিম লাইটে আসমাউল হুসনার ক্ষুব্ধ চাহনি অকস্মাৎ আক্কাসের কামোন্মাদনা শূন্যতে নামিয়ে আনে, আরো একটা অজ্ঞাত অনুভূতি তাকে জাপটে ধরে পরমুহূর্তেই টের পায় অনুভূতিটি অজ্ঞাত নয়_এটি আতঙ্কের, ভয়াবহ শঙ্কার। আক্কাসের সহসা শীতল হয়ে যাওয়া ও হাফসার পরমানন্দের বিস্ফোরণ শুরুতেই হোঁচট খাওয়ায় এই নারীও ঘাবড়ে যায়, ঘাড় ঘুরিয়ে সেও দেখে একজোড়া সংক্ষুব্ধ আতঙ্ক ছড়ানো চোখ।
আক্কাসের মনে হলো, আত্মরক্ষার্থেই এই চোখের রং বদলে দিতে হবে। এইটুকু মেয়ের জন্য এক হাতই যথেষ্ট ছিল। তবুও আক্কাস দুই হাতে কণ্ঠ চেপে ধরল। হাফসা তাকে প্রতিহত করল না, একটা চিৎকারও দিল না। আপাদমস্তক দিগম্বর আক্কাস নগ্ন নারীকে বলল, শেষ করে দিলাম। বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোকেও।
এক অচেনা আক্কাস।
পাঁচ.
নিস্তব্ধ হুসনা বিছানায় শুয়েই আছে।
হাফসা হঠাৎ তীব্র আর্তচিৎকার দিয়ে উঠল, আল্লাহ তুমি এ কী করলা? দ্বিতীয় বাক্য উচ্চারণের আগেই আক্কাস তার মুখ চেপে ধরল। বলল, নো টক।
একসময় ভোর হয়ে আসে। খাটের নিচে রাখা একটা স্যুটকেস বের করে আনে। স্যুটকেসের জিনিসপত্র বের করে শূন্যস্থানে হুসনাকে ঢুকিয়ে দেয়। বেশ ঠাঁই হয়ে যায় ছোট্ট মেয়েটির। বিভিন্ন খাঁজে পুরনো কাপড় ঢুকিয়ে ওপরে একটি কাঁথা ও তার ওপর একটি চাদর বিছিয়ে স্যুটকেসটিকে একটি পূর্ণ লাগেজে পরিণত করে।
আক্কাস গোসল করে, শেভও। নীল শার্ট ও ঘিয়ে রং প্যান্ট এবং কালো জুতো পরে। এক গ্লাস পানি খায়। তারপর স্যুটেকেস হাতে বেরিয়ে যায়। হুদালি্লল মোত্তাকিন সাহেবের সমন্ধীকে স্যুটকেস হাতে বেরিয়ে যেতে কেউ কেউ দেখে থাকবে।
আক্কাস পরিণত চিন্তার মানুষ। বেবিট্যাঙ্েিত কমলাপুর আন্তনগর ট্রেনে চেয়ার কোচের টিকিট নিল, গন্তব্য চট্টগ্রাম। স্যুটকেস উঠিয়ে দিল বাংকারে। ট্রেন ছাড়তে আরো পাঁচ মিনিট। আক্কাস নেমে প্লাটফর্মে পায়চারি শুরু করল। ভ্রাম্যমাণ হকারের কাছ থেকে একটা বাংলা ও একটা ইংরেজি খবরের কাগজ কিনল। চোখ বুলাল একটি সাপ্তাহিকের পাতায়। বাঁশি বাজল ট্রেনের। অত্যন্ত ধীরপদে ট্রেনের দরজার দিকে এগোতে থাকল। শেষ পর্যন্ত মনে হলো অল্পের জন্য আক্কাস ট্রেনটা মিস করেছে। ট্রেন মিস করে স্বস্তির নিঃশ্ব্বাস ফেলে।
আক্কাস হেঁটে হেঁটে স্টেশনের বাইরে চলে এল। স্টেশনের উল্টোদিকে একটা মাজার। মাজারের দক্ষিণে পাশাপাশি তিনটি রেস্তোরাঁ। আক্কাস ঢুকল ঠিক মাঝখানেরটায়। খিদে বেশ প্রবল। পিপাসাও। পরপর দুই গ্লাস পানি খেয়ে নানরুটি, ডাল-গোশতের অর্ডার দিল। ডালটা মুগের, মাংসটা খাসির। আক্কাস কেবল ডালটুকু খেল, এড়িয়ে গেল মাংসটা। প্রথম কামড়ে মনে হয়েছিল মাংসটা মানুষের, চেনা মানুষের_হুদালি্লল মোত্তাকিন ও নূরে হাফসার একমাত্র সন্তান হুসনার, আসমাউল হুসনার। আক্কাস এক কাপ কড়া চায়েরও অর্ডার দিল। ফোন করল হাফসাকে। জবাব এল, এই নম্বরটি এখন বন্ধ আছে, সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে না।
ঘটনাটা বৃহস্পতিবার রাতের। স্যুটকেসের ট্রেনযাত্রা শুক্রবার সকালের। হাফসা জানে, হুজুরের ফোন আসবে জুমার পরপর। জুমার অনেক বাকি। আক্কাস স্যুটকেস নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই তার মনে হচ্ছিল, এখনই হুদালি্লল মোত্তাকিনের ফোন আসছে। প্রথমে ফোনের, সেই দামি মোবাইল সেটের সুইচ অফ করল। হুজুরের কথা প্রতিহত করতে এটাই কি যথেষ্ট? হাফসা সেট খুলে ব্যাটারিটাও বের করে নিল। সেটটা ছুড়ে মারল বিছানার ওপর।
নূরে হাফসা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আবারও এক গ্লাস পানি হাতে নিয়ে চুমুক দিল। এবার তিতকূটে মনে হচ্ছে না। এক গ্লাস শেষ করে দ্বিতীয় গ্লাসে ঢালল ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি।
সৌদি বোরকা ও কালো চশমা পরা নূরে হাফসাকে আরবীয় প্রিন্সেসদের মতো লাগছিল। হাফসা দরজায় ডাবল তালা মেরে রাস্তায় নামল। হাফসা কি জানে কোথায় যাচ্ছে?
টেলিফোনে হাফসাকে ধরতে না পেরে স্টেশনের সামনে থেকে বেবিট্যাঙ্ িনিয়ে রায়েরবাজার সনাতনগড়। আক্কাস দেখে দরজায় ডাবল তালা। আক্কাস জানে না, হাফসা কোথায়। আক্কাস ডাবল তালার সামনে দাঁড়িয়ে আবার হাফসাকে ফোন করে। একই উত্তর_এই নম্বরটি বর্তমানে খালি আছে।
===============================
গল্প- 'হার্মাদ ও চাঁদ' by কিন্নর রায়  গল্প- 'মাটির গন্ধ' by স্বপ্নময় চক্রবর্তী  সাহিত্যালোচনা- 'কবি ওলগা ফিওদোরোভনা বার্গলজ'  গল্পিতিহাস- 'বালিয়াটি জমিদারবাড়ির রূপগল্প' by আসাদুজ্জামান  ফিচার- ‘কাপ্তাই লেক:ক্রমেই পতিত হচ্ছে মৃত্যুমুখে' by আজিজুর রহমান  রাজনৈতিক আলোচনা- 'ছাত্ররাজনীতি:লেজুড়বৃত্তির অবসান আজ জরুরি by বদিউল আলম মজুমদার  কৃষি আলোচনা- 'কৃষিজমি রক্ষার দায় সবার' by আফতাব চৌধুরী  শিল্পি- 'আমি যে গান গেয়েছিলেম...কলিম শরাফী' by জাহীদ রেজা নূর  আলোচনা- 'হাওয়ার হয়রানি নামে ঢেকে যায় যৌন সন্ত্রাস'  সাহিত্যালোচনা- 'মারিও ভার্গাস ইয়োসা'র সাহিত্যে নোবেলের রাজনৈতিক মোড়  রাজনৈতিক আলোচনা- 'জনগণ ও সেনাবাহিনীর বিপজ্জনক বিচ্ছিন্নতা by নূরুল কবীর  রাজনৈতিক আলোচনা- 'নির্মানবীয় রাজনীতি ও জনসমাজের বিপজ্জনক নীরবতা by নূরুল কবীর  আলোচনা- 'সত্য প্রকাশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ত্রিমুখী অভিযান by নূরুল কবীর  খাদ্য আলোচনা- 'খাদ্য উৎপাদনের বাধা দূর করাই ক্ষুধার বিরোদ্ধে প্রধান সংগ্রাম' by ফরিদা আক্তার  রাজনৈতিক আলোচনা- ' কোন পথে ক্ষমতা! হস্তান্তর নয় রূপান্তর চাই   আলোচনা- 'শিল্পনীতি-২০১০:সামর্থ্যের অপব্যবহারে পঙ্গ  আলোচনা- যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদিদের স্বার্থ রক্ষাকারী ইসরাইল লবি ইভটিজং আলোচনা- নারী উৎপীড়ক সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া 


কালের কণ্ঠ এর সৌজন্য
লেখকঃ আন্দালিব রাশদী


এই গল্প'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.