প্রবন্ধ- রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের 'অবরোধবাসিনী' থেকে

আমরা বহু কাল হইতে অবরোধ থাকিয়া থাকিয়া অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছি সুতরাং অবরোধের বিরুদ্ধে বলিবার আমাদের-বিশেষতঃ আমার কিছুই নাই। মেছোণীকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় যে, “পচা মাছের দুর্গন্ধ ভাল না মন্দ?”-সে কি উত্তর দিবে?
এস্থলে আমাদের ব্যক্তিগত কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা পাঠিকা ভগিনীদেরকে উপহার দিব-আশা করি, তাঁহাদের ভাল লাগিবে। এস্থলে বলিয়া রাখা আবশ্যক যে গোটা ভারতবর্ষে কুলবালাদের অবরোধ কেবল পুরুষের বিরুদ্ধে নহে, মেয়েমানুষদের বিরুদ্ধেও। অবিবাহিতা বালিকাদিগকে অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া এবং বাড়ীর চাকরাণী ব্যতীত অপর কোন স্ত্রীলোকে দেখিতে পায় না। বিবাহিতা নারীগণও বাজীকর-ভানুমতী ইত্যাদি তামাসাওয়ালী স্ত্রীলোকদের বিরুদ্ধে পর্দ্দা করিয়া থাকেন। যিনি যত বেশী পর্দ্দা করিয়া গৃহকোণে যত বেশী পেঁচকের মত লুকাইয়া থাকিতে পারেন, তিনিই তত বেশী শরীফ। শহরবাসিনী বিবিরাও মিশনারী মেমদের দেখিলে ছুটাছুটি করিয়া পলায়ন করেন। মেম ত মেম-সাড়ী পরিহিতা খ্রীষ্টান বা বাঙ্গালী স্ত্রীলোক দেখিলেও তাঁহারা কামরায় গিয়া অর্গল বন্ধ করেন।
১.
ঢাকা জিলায় কোনো জমিদারের প্রকাণ্ড পাকা বাড়ীতে দিনে-দুপুরে আগুন লাগিয়াছিল। জিনিসপত্র পুড়িয়া ছারখার হইল_ তবু চেষ্টা করিয়া যথাসম্ভব আসবাব সরঞ্জাম বাহির করার সঙ্গে বাড়ীর বিবিদেরও বাহির করা প্রয়োজন বোধ করা গেল। হঠাৎ তখন পাল্কী, বিশেষত: পাড়াগাঁয়ে এক সঙ্গে দুই চারিটা পাল্কী কোথায় পাওয়া যাইবে? অবশেষে স্থির হইল যে, একটা বড় রঙীন মশারির ভিতর বিবিরা থাকিতেন, তাহার চারিকোণ বাহির হইতে চারিজনে ধরিয়া লইয়া যাইবে। তাহাই হইল_আগুনের তাড়নায় মশারি ধরিয়া চারজন লোক দৌড়াতে থাকিল, ভিতরে বিবিরা সমভাবে দৌড়াইতে না পারিয়া হোঁচট খাইয়া পড়িয়া দাঁত, নাক ভাঙ্গিলেন, কাপড় ছিঁড়িলেন। শেষে ধানক্ষেত দিয়া, কাঁটাবন দিয়া দৌড়াইতে দৌড়াইতে মশারিও ছিঁড়িয়া খণ্ড খণ্ড হইয়া গেল।
অগত্যা আর কি করা যায়? বিবিগণ একটা ধানের ক্ষেতে বসিয়া থাকিলেন। সন্ধ্যায় আগুন নিভিয়া গেলে পর পাল্কী করিয়া একে একে তাঁহাদের বাড়ি লইয়া যাওয়া হইল।


২.
বঙ্গদেশের জনৈক জমিদারের বাড়ীতে বিবাহ হইতেছিল। অতিথি অভ্যাগতে বাড়ী গমগম। খাওয়া-দাওয়ায় রাত্রি ২টা বাজিয়া গিয়াছে, এখন সকলের ঘুমাইবার পালা। কিন্তু চোর চোট্টা ত ঘুমাইবে না_ এই সুযোগ তাহাদের চুরি করার।
সিঁধ কাটিয়া চোর ঘরে প্রবেশ করিয়াছে। একজন চৌকিদার চোরের সাড়া পাইয়া বাড়ীর কর্তাদিগকে সংবাদ দিয়াছে। কর্তারা ছিলেন, পাঁচ-ছয় ভাই। তাঁহারা প্রত্যেকে কুঠার হস্তে সে ঘরটার চারদিকে ঘুরিয়া বেড়াইতেছিলেন চোরের সন্ধানে।
ঘরের ভিতর বিবিরা চোরকে দেখিয়া আরো জড়সড় হইয়া চাদর গায়ে দিয়া শুইলেন_ একেবারে নীরব, যেন নিঃশ্বাস ফেলিবারও সাহস নাই। বিশেষত 'বেগানা মরদটা' যেন তাঁহাদের নিঃশ্বাসের শব্দও না শুনে। চোর নিঃশঙ্কচিত্তে সিন্দুক ভাঙ্গিয়া নগদ টাকা ও গহনাপত্র বাহির করিয়া লইল। পরে একে একে প্রত্যেক বিবির হাত পায়ের গহনা খুলিয়া লইতে লাগিল। তাহা দেখিয়া বিবিরা তাড়াতাড়ি নাক, কান ও গলার অলঙ্কার খুলিয়া শিয়রে রাখিতে লাগিলেন। ইহাতে চোরের বেশ সুবিধাই হইল_ সে আর অনর্থক বেগম-খানমদের নাক, কান বা গলা স্পর্শ করিবে কেন? সেই ঘরে একটি ছিলেন নতুন বউ, সে বেচারী নাকের নথটী ত খুলিয়া দিয়াছেন, কিন্তু তাঁহার কানের ঝুমকা প্রভৃতি গহনাগুলো পরস্পরে জড়াইয়া বড় জটিল হইয়া পড়িল_ কিছুতেই খোলা গেল না। চোর মহাশয় ভদ্রতার অনুরোধে কিয়ৎক্ষণ অপেক্ষা করার পর কলমতারাশ ছুরি দিয়া বউ বিবির উভয় কান কাটিয়া লইয়া
গহনার পুঁটুলিতে ভরিয়া সেই সিঁধ পথে পলায়ন করিল।
ঘরের ভিতর এত কাণ্ড হইয়া গেল_ বাহিরে পুরুষগণ কুঠার হস্তে চোরের জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। কিন্তু বিবিরা কেহ টুঁ শব্দ করিলেন না_ পাছে 'বেগানা মরদটা' তাঁহাদের কণ্ঠস্বর শুনে! চোর নিরাপদে বাহির হইয়া গেলে পর বিবিরা হাউমাউ আরম্ভ করিয়া দিলেন!
পাঠিকা ভগিনী! এইরূপে আমরা অবরোধ প্রথার সম্মান রক্ষা করিয়া থাকি।



৩.
পাটনায় এক বড় লোকের বাড়ীতে শুভবিবাহ উপলক্ষে অনেক নিমন্ত্রিত মহিলা আসিয়াছেন। দাসী আসিয়া প্রত্যেক পাল্কীর দ্বার খুলিয়া বেগম সাহেবাদের হাত ধরিয়া নামাইয়া লইয়া যাইতেছে, পরে বেহারাগণ খালি পাল্কী সরাইয়া লইতেছে এবং অপর নিমন্ত্রিতার পাল্কী আসিতেছে। বেহারা ডাকিল_'মামা! সওয়ারী আয়া!' মামারা মন্থর গমনে আসিতেছে। মামা যতক্ষণে হাশমত বেগমের পাল্কীর নিকট আসিবে ততক্ষণে বেহারাগণ 'সওয়ারী' নামিয়াছে ভাবিয়া পাল্কী লাইয়া সরিয়া পড়িল। অতঃপর আর একটা পাল্কী আসিলে মামারা পাল্কীর দ্বার খুলিয়া যথাক্রমে নিমন্ত্রিতাকে লইয়া গেল।
'সওয়ারী' নামিলে পর সব খালি পাল্কী এক প্রান্তে বটগাছের তলায় জড়ো করিয়া রাখিয়া দেওয়া হইয়াছে। অদূরে বেহারাগণ ঘটা করিয়া রান্না করিতেছে। রাত্রিকালে আর সওয়ারী খাটিতে হইবে না। সুতরাং তাহাদের ভারী স্ফূর্তি_ কেহ গান গায়, কেহ তামাক টানে, কেহ খইনী খায়_ এরূপে আমোদ করিয়া খাওয়াদাওয়া করিতে রাত্রি ২টা বাজিয়া গেল।
এদিকে মহিলা মহলে নিমন্ত্রিতাগণ খাইতে বসিলে দেখা গেল_ হাশমত বেগম তাঁহার ছয় মাসের শিশুসহ অনুপস্থিতা। কেহ বলিল, ছেলে ছোট বলিয়া হয়ত আসিলেন না। কেহ বলিল, তাঁহাকে আসিবার জন্য প্রস্তুত হইতে দেখিয়াছে_ ইত্যাদি।
পরদিন সকালবেলা যথাক্রমে নিমন্ত্রিতাগণ বিদায় হইতে লাগিলেন_ একে একে খালি পাল্কী আসিয়া নিজ নিজ 'সওয়ারী' লইয়া যাইতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে একটি 'খালি পাল্কী আসিয়া দাঁড়াইলে তাহার দ্বার খুলিয়া দেখা গেল হাশমত বেগম শিশুপুত্রকে কোলে লইয়া বসিয়া আছেন! পৌষ মাসের দীর্ঘ রজনী তিনি ঐভাবে পাল্কীতে বসিয়া কাটাইয়াছেন!
তিনি পাল্কী হইতে নামিবার পূর্বেই বেহারাগণ পাল্কী ফিরাইয়া লইয়া গেল_ কিন্তু তিনি নিজে ত টুঁ শব্দ করেন নাই_ পাছে তাঁহার কণ্ঠস্বর বেহারা শুনিতে পায়, শিশুকেও প্রাণপণ যত্নে কাঁদিতে দেন নাই_ যদি তাহার কান্না শুনিয়া কেহ পাল্কীর দ্বার খুলিয়া দেখে! কষ্ট সহ্য করিতে না পারিলে আর অবরোধ-বাসিনীর বাহাদুরী কি?


৪.
শিয়ালদহ স্টেশনের প্লাটফরমে ভরা সন্ধ্যার সময় এক ভদ্রলোক ট্রেনের অপেক্ষায় পায়চারি করিতেছিলেন। কিছু দূরে আর একজন ভদ্রলোক দাঁড়াইয়া ছিলেন; তাঁহার পাশ্র্বে এক গাদা বিছানা ইত্যাদি ছিল। পূর্বোক্ত ভদ্রলোক কিঞ্চিৎ ক্লান্তি বোধ করায় উক্ত গাদার উপর বসিতে গেলেন। তিনি বসিবামাত্র বিছানা নড়িয়া উঠিল_তিনি তৎক্ষণাৎ সভয়ে লাফাইয়া উঠিলেন। এমন সময় সেই দণ্ডায়মান ভদ্রলোক দৌড়িয়া আসিয়া সক্রোধে বলিলেন_'মশায়, করেন কি? আপনি স্ত্রীলোকদের মাথার উপর বসিতে গেলেন কেন?' বেচারা হতভম্ব হইয়া বলিলেন, 'মাফ করিবেন, মশায়! সন্ধ্যার আঁধারে ভালোমতে দেখিতে পাই নাই, তাই বিছানার গাদা মনে করিয়া বসিয়াছিলাম। বিছানা নড়িয়া উঠায় আমি ভয় পাইয়াছিলাম যে, এ কি ব্যাপার!'



৫.
আমার দূর-সম্পর্কিয়া এক মামী শাশুড়ি ভাগলপুর হইতে পাটনা যাইতেছিলেন; সঙ্গে মাত্র একজন পরিচালিকা। কিউল স্টেশনে ট্রেন বদল করিতে হয়। মামানী সাহেবা অপর ট্রেনে উঠিবার সময় তাঁহার প্রকাণ্ড বোরকায় জড়াইয়া ট্রেন ও প্লাটফরমের মাঝখানে পড়িয়া গেলেন। স্টেশনে সে সময় মামানীর চাকরানী ছাড়া অপর কোনো স্ত্রীলোক ছিল না। কুলিরা তাড়াতাড়ি তাঁহাকে ধরিয়া তুলিতে অগ্রসর হওয়ায় চাকরানী দোহাই দিয়া নিষেধ করিল_'খবরদার! কেহ বিবি সাহেবার গায়ে হাত দিও না।' সে একা অনেক টানাটানি করিয়া কিছুতেই তাঁহাকে তুলিতে পারিল না। ট্রেন ছাড়িয়া দিল।
ট্রেনের সংঘর্ষে মামানী সাহেবা পিষিয়া ছিন্নভিন্ন হইয়া গেলেন,_ কোথায় তাঁহার 'বোরকা'_ আর কোথায় তিনি! স্টেশন ভরা লোক সবিস্ময়ে দাঁড়াইয়া এই লোমহর্ষক ব্যাপার দেখিল_ কেহ তাঁহার সাহায্য করিতে অনুমতি পাইল না। পরে তাঁহার চূর্ণপ্রায় দেহ একটা গুদামে রাখা হইল; তাঁহার চাকরানী প্রাণপণে বিনাইয়া কাঁদিল, আর তাঁহাকে বাতাস করিতে থাকিল। এই অবস্থায় ১১ (এগার) ঘণ্টা অতিবাহিত হইবার পর তিনি দেহত্যাগ করিলেন! কি ভীষণ মৃত্যু!


৬.
রেলযোগে কোন বেহারী ভদ্রলোক সস্ত্রীক পশ্চিমে বেড়াইতে যাইতেছিলেন। তিনি স্ত্রীকে লেডীর কক্ষে না দিয়া নিজের সঙ্গেই রাখিলেন। বেগম সাহেবা বোরকা পরিয়াই রহিলেন। এক সময় সাহেব বাথরুমে থাকিতে ট্রেন কোন স্টেশনে থামিল। অপর এক যাত্রী কোথাও স্থান না পাইয়া ঐ কক্ষে উঠিয়া অতি সঙ্কুচিতভাবে বসিয়া একটা জানালা দিয়া মুখ বাহির করিয়া রহিলেন। এদিকে পূর্বোক্ত সাহেব বাথরুম হইতে আসিয়া দেখেন, তাঁহার স্ত্রী অনুপস্থিত! কি করিবেন_ চলন্ত ট্রেন। পরবর্তী স্টেশনে আগন্তুক ভদ্রলোকটি নামিয়া গেলেন। আমাদের কথিত সাহেবও নামিয়া স্টেশনের পুলিশ সংবাদ দিলেন যে, তাঁহার স্ত্রী অমুক ও অমুক স্টেশনের মধ্যবর্তী স্থানে হারাইয়াছে।

বেচারা পুলিশ বিভিন্ন স্টেশনে টেলিগ্রাম করিল যে, কালো বোরকায় আবৃতা একটি মহিলার খোঁজ কর। একজন কনস্টেবল বলিল, 'একবার এই গাড়িখানাই ভালো করিয়া খুঁজিয়া দেখি না।' যে বেঞ্চে সাহেব বসিয়াছিলেন, কনস্টেবল সেই বেঞ্চের নিচে কালো একটা কি দেখিতে পাইয়া টানিয়া বাহির করিবা মাত্র সাহেব চেঁচাইয়া উঠিলেন, 'আরে ছোড় ছোড়_ ওহি ত মেরা ঘর হায়!' পরে জানা গেল সেই নবাগত ভদ্রলোককে দেখিয়া ইনি বেঞ্চের নিচে লুকাইয়া ছিলেন।================================ফিচার- ‘হিমশীতল শহরগুলোর দিনরাত' by তামান্না মিনহাজ  গল্পালোচনা- ''সে কহে বিস্তর মিছা যে কহে বিস্তর'  সাক্ষাৎকার- হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমদাদুল হক মিলন  ইতিহাস- পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডাইনোসরের ফসিল 'স্যু' এর কাহিনী  খাদ্য আলোচনা- 'অপুষ্টির প্রধান কারণ দারিদ্র্য ও অজ্ঞতা by শেখ সাবিহা আলম  গল্পালোচনা- 'ডান রাস্তার বামপন্থী' by কাওসার আহমেদ  খবর- 'মারা যাবে না একটি শিশুও' -বিলগেটসপত্নী, মেলিন্ডা গেটস  আলোচনা- 'সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের অঙ্গীকারঃ  নিবন্ধ- সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড-একটি দেশ একটি কবিতার জন্ম by আলীম আজিজ  আলোচনা- 'আরও একটি সর্বনাশা দেশ চুক্তির বোঝা' by আনু মাহমুদ  গল্পালোচনা- হতাশার বিষচক্র থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হবে     কালের কণ্ঠ এর সৌজন্যে
লেখকঃ রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন

এই আলোচনা'টি পড়া হয়েছে...

free counters

No comments

Powered by Blogger.