মাহমুদুলের স্মরণসভায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলামের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশের সংবিধানে বাক্স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাস্তবে কেমন রয়েছে, তার ওপর একটি জ্ঞানগর্ভ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হলো গত ১৬ ফেব্রুয়ারি। এশিয়াটিক সোসাইটি মিলনায়তনে মূল নিবন্ধকার ছিলেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল মতিন। তাঁর দুই পর্বের বক্তব্যের প্রথমটির শিরোনাম, আইনি দার্শনিক মাহমুদুল ইসলাম। আর দ্বিতীয়টির শিরোনাম, বাংলাদেশের অলিখিত সংবিধান ও ১১১ অনুচ্ছেদ। মিলনায়তনটি ছোট হলেও বিচার বিভাগের বিশিষ্টজনের উপস্থিতিতে আলোচনা সভা বেশ প্রাঞ্জল ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন কলকাতা হাইকোর্টের দেড় শ বছর উদ্যাপনের প্রসঙ্গে জানালেন, বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততা ছাড়া এই উদ্যাপন যে অসম্পূর্ণ ও খণ্ডিত থেকে গেছে, সেটা তিনি ভারতীয় বিশিষ্ট আইনবিদদের বোঝাতে পেরেছেন।
ঢাকা কোনো আয়োজন করলে তাতে ভারতের সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল সোলি সোরাবজি ও জ্যেষ্ঠ আইনবিদ ফলি এস নরিম্যান কথা দিয়েছেন, তাঁরা ঢাকায় আসবেন। এদিনের আলোচনা সভার মূল সুরটি খুব ভালো লেগেছিল। কারণ, সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের কর্মরত বিচারকদের উপস্থিতিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গটি একটা আত্মজিজ্ঞাসা এবং অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি সেতুবন্ধ তৈরির মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। যদিও আমরা সাহসী মাইলফলক আদেশ বা রায় বিরল ক্ষেত্রেই দেখতে পাই। মূল নিবন্ধকার মো. আবদুল মতিন যখন বলছিলেন যে মাহমুদুল ইসলাম তাঁর বইয়ের সর্বশেষ সংস্করণে লিখেছেন, সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রদ্রোহিতা সংক্রান্ত ৭ ক (২) যুক্ত করে বাক্স্বাধীনতার ওপরে ‘চিলিং এফেক্ট’ (নিস্তেজক প্রভাব) তৈরি করেছে। তিনি স্মিত হেসে বলছিলেন, নম্রভাষী মাহমুদুলের এই পরিভাষাটি বড় বেশি পরিশীলিত। আসলে এটা দিয়ে তিনি ফ্রাইটেনিং এফেক্ট (ভীতিপ্রদ) বোঝাতে চেয়েছেন। ভেবেছিলাম, সভাপতির আসনে থাকা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তাঁর সমাপনী বক্তৃতায় এর একটা প্রতিক্রিয়া দেখাবেন। কিন্তু সেটা তিনি দেখাননি; বরং আলোচকদের সঙ্গেই যতটা সম্ভব সংহতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। এটা নির্দেশ করে যে আমাদের সমাজে এখনো লোকসমক্ষে ঔচিত্যবোধ বজায় রাখার শক্তি নষ্ট হয়ে যায়নি। সেদিনের আলোচনায় কামাল হোসেন উল্লেখ করেছিলেন, আদালতের শ্রদ্ধা বাড়ে মানুষের আস্থা থেকে। সে জন্যই কয়েক শ বছর আগের ইংল্যান্ডের প্রধান বিচারপতি কোকের কথা আমরা মনে রাখি। ভারতের বিচারপতি ভগবতী সবার শ্রদ্ধার পাত্র।
তাঁর কথায়, কোনো স্বাধীন বিচার বিভাগ নেই তো, কোনো আইনের শাসন নেই। এর সঙ্গে তিনি আরেকটি কথা জুড়ে দিয়েছেন, ‘কোনো স্বাধীন আইন পেশা নেই তো, কোনো আইনের শাসন নেই।’ আমরা বারগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো জরুরি মনে করি। বার কাউন্সিল, সুপ্রিম কোর্ট বার ও ঢাকা বারসহ দেশের প্রধান বারগুলোতে নিয়মিত ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচন হয়ে থাকে। কিন্তু তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুরক্ষায় কী ধরনের কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে অ্যাটর্নি জেনারেলকে সরকারি লোক ভাবা যে সঠিক নয়, কামাল হোসেন তা পরিষ্কার করেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, বাহাত্তরের সংবিধানে অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ আমরা সৃষ্টি করেছিলাম, যাতে এই পদধারীরা নিজেদের কাজকে সরকারি চাকরি বলে মনে না করেন। আদালত যখন আপনার কাছে ব্যাখ্যা চাইবেন, তখন সরকার কী চায়, সেই ব্যাখ্যা আপনি দেবেন না। আপনার বিবেক ও জ্ঞান কাজে লাগাবেন। মাহমুদুল ইসলাম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে সেটা কিন্তু দেখিয়ে গেছেন। তিনি দলীয় ব্যক্তি হিসেবে আইনের ব্যাখ্যা দেননি। কামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা আইনজীবীরা বরং তাঁর কথায় কখনো অখুশি হতাম। কারণ এভাবে না বলে ওভাবে বললে তো আমাদের সুবিধা হয়।’ মাহমুদুলের ওই দৃষ্টিভঙ্গি লোপ পেতে বসেছে। স্মরণসভায় মো. আবদুল মতিন বিশ্বসভ্যতার সব থেকে যাঁরা নামীদামি বিচারক ও আইনবিদ, তাঁদের অবদান স্মরণ করেন। নিজেদের ক্ষুদ্র মনে হলো ১৬ কোটি মানুষের দেশে সংবিধান বিষয়ে মাহমুদুল ইসলামই একমাত্র লেখক। সংবিধান বিষয়ে তাঁর বইটিই সবেধন নীলমণি।
বক্তারা ঢাকা হাইকোর্টের অতীত ঐতিহ্য স্মরণ করছিলেন। তাঁরা রওশন বিজয়া শওকত মামলার রায়কে বললেন ‘জঘন্য ব্রিটিশ জুরিসপ্রুডেন্স’। কারণ, তাতে কাউকে ডিটেনশন দিতে নির্বাহী বিভাগের মনোগত (সাবজেকটিভ) সন্তুষ্টিকেই বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। ঢাকা হাইকোর্টই তা উল্টে দিয়েছেন। বলেছেন, ‘না। কাউকে আটক করতে হলে তাতে বস্তুগত সন্তুষ্টির উপাদান থাকতে হবে।’ সোলি সোরাবজি একদিন ড. কামালকে বলেছিলেন, ‘আমরা মৌলিক কাঠামো তোমাদের কাছ থেকেই ধার করেছি। আর সেটা হলো ১৯৬৪ সালে ফজলুল কাদের চৌধুরী বনাম আবদুল হক মামলা। এর রায়ে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী চাকরি হারান। ঢাকা হাইকোর্টের রায় পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টে টিকেছিল। পরের ৫৩ বছরে আমরা ওই ঘটনার সঙ্গে তুলনা করতে পারি এমন কোনো রায় পেলাম কি? রায় হয়তো পেলাম (সম্প্রতি দুজন মন্ত্রী আদালত অবমাননায় অভিযুক্ত হন), কিন্তু কোনো মন্ত্রীর চাকরি গেল কি? অনেক গণতন্ত্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওজন ক্ষমতায় যাঁরা আছেন, তাঁদের প্রতিকূলে যাওয়া রায়ের সংখ্যা দিয়ে করা হয়। কামাল হোসেন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জায়গা থেকে অষ্টম ও ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের উল্লেখ করেন। দুটোকেই এই ভাগে ফেলা যায়। কিন্তু এই দুটোতেই বিচার বিভাগের স্পর্শকাতরতা রয়েছে। সামরিক শাসনামলে সামরিক আইন বৈধ এবং তা চলে যাওয়ার ঢের পরে অবৈধ বলা হয়েছে। কামাল হোসেন আরও বলছিলেন, সুপ্রিম কোর্টকে শেষ করতে পারলে সংবিধান থাকবে না। আইন থাকবে না। তোমরা-আমরা থাকব না। কিছুদিন আগে একজন জার্মান আইনজ্ঞ, যিনি কলকাতা হাইকোর্টে এক আদালত অবমাননার মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন, তাঁর সঙ্গে ঢাকায় এক নৈশভোজে আলাপ হলো।
তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, সুপ্রিম কোর্ট ভেঙে গিয়েছিল বলে আপনাদের ভাইমার প্রজাতন্ত্র ভেঙে গিয়েছিল। এর কারণ কী ছিল? তিনি বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট সে যুগের কর্তৃত্ববাদী শাসকদের জারি করা কালাকানুনগুলোকে সমর্থন দিয়ে চলছিলেন। কামাল হোসেন সেদিন আরও বলেছিলেন, নির্বাহী বিভাগ যা ইচ্ছে তা-ই করলে রুল অব ল থাকে না। তিনি আবেগাপ্লুত হন। বলেন, আমি ‘এ পর্যন্ত’ শব্দটি ডাবল আন্ডারলাইন করতে চাই। সেটা হলো, আমরা ‘এ পর্যন্ত’ এসব ধরে রেখেছি। তিনি স্মরণ করেন, ‘মাহমুদুল তাঁর জীবনসায়াহ্নে বলতেন, “সংবিধান কি আছে?” আমি বলতাম, ভাই, বুঝতে পারছি, আপনার গভীরের ব্যথা। তবে বাইরে যেন কোনোভাবে এ রকমের ধারণা না হয়। আমরা যদি বলি সংবিধান এখনো আছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এখনো আছে। তাহলে মানুষ নিরাশ হবে না। মানুষ এখনো কোর্টে যাবে।’ তিনি এরপর থেমে যান। বলেন, আমি জটিল এলাকায় যাব না। এখানে জাজরা আছেন। একটু থেমেই বললেন, ১৬তম সংশোধনী হাইকোর্ট কি বাতিল করেননি? আর কিছু বলব না। কারণ এটা বিচারাধীন। তিনি তখন বিচারপতি মতিনের দেওয়া ১ কোটি ৪০ লাখ ভুয়া ভোটারের মামলার রায়ের কথা বললেন। কামাল হোসেনের কথায়, ২০০৮ সালে গণতন্ত্র যতটুকু রক্ষা করা গেছে, তা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে’ বিচার বিভাগ ও আইনজীবীদের ভূমিকায়। কামাল হোসেন নিজে তখন বারের সভাপতি ও একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন (আশির দশকে)। তাঁর প্রশ্ন: ‘কেউ কি বলতে পারবেন, আমি কখনো দলীয় পরিচয় দিয়েছিলাম?’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু বিচারক ও আইনজীবীদের ব্যাপারে বলেছিলেন, ‘এখানে আমরা দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিচ্ছি না। দেব না।’ তিনি শেষ করেন এই বলে যে, ‘সেটা এখনো তো কিছুটা রক্ষা করে যাচ্ছি আমরা। সেটা যাতে আমরা রক্ষা করতে পারি।’ কণ্ঠ তাঁর ম্রিয়মাণ। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, তিনি বিচারপতি মতিনের প্রবন্ধে বর্ণিত মার্কিন বিচার বিভাগের বিবর্তনের দিকটি উপভোগ করেছেন। মানুষ বেচাকেনার এক শ বছরকে মার্কিন গণতন্ত্রের ইতিহাসের মধ্যে ফেলা যায় কি না, সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি।
তিনি যখন ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশকে একজন জেলা জজের ঠেকিয়ে দেওয়া উল্লেখ করেন, তখন তিনি উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। তিনি গর্বিত হন এই বলে যে এ বিষয়ে ট্রাম্পের সাহস হচ্ছে না সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার। তখন আমরা নিজেদের দেশের অবস্থার সঙ্গে মেলাই। দ্রুত কূল পাই না। তিনি ফজলুল কাদের, চিত্তরঞ্জন এবং লতিফ মীর্জার মামলার উদাহরণ দেন। ওই সব মামলায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহল বড় ঝাঁকুনি পেয়েছে। তাই তাঁর উদাহরণে যেন অকস্মাৎ ছন্দপতন ঘটে। কারণ, তিনি সাম্প্রতিক উদাহরণ দেন। বলেন, সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন, একজন সাংসদ পাঁচটির বেশি স্কুল কমিটিতে থাকতে পারবেন না। সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবীর মেয়ে মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। রিটে তা চ্যালেঞ্জ করা হলে হাইকোর্ট দেখতে পান যে অন্তত চারটি প্রশ্নই ছিল ভুল। হাইকোর্টের রায়ে ওই ছাত্রী একটি সরকারি মেডিকেলে ভর্তি ও ১৪ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ পান। অ্যাটর্নি জেনারেল প্রশ্ন রাখেন, ‘এগুলো কি আমাদের বিচার বিভাগের সাফল্য নয়? নিশ্চয়ই সাফল্য।’ তিনি লক্ষণীয়ভাবে ইঙ্গিত দেন যে হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ না করলে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার ভাগ্য ভিন্ন হতে পারত। তিনি বলেন, ‘আমাদের জুডিশিয়ারি যদি এভাবে না দাঁড়াত, কী হচ্ছে? রিপোর্ট দাও।’ তবে এরপর যা তিনি বললেন, সেটা যদি তিনি ও তাঁর দপ্তর একটি নীতি হিসেবে নেন, তাহলে খুবই ভালো হয়। তিনি প্রশংসনীয়ভাবে বলেন, ‘আজকেই আপিল বিভাগে চেম্বার জজের কাছে গিয়ে আমি ধাক্কা খেয়েছি। হাইকোর্ট থেকে বলা হয়েছে, এই পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলবে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে (স্টে নিতে) গিয়েছি।’ বলেছেন, আপনি এসেছেন কেন? এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেই। তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে ধরা হয়েছে। আসামিকে মেরে চোখ জখম করেছে। জ্যোতি কমিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এসব ইতিবাচক দিক নিয়ে আমরা অগ্রসর হব। “গ্লাস শূন্য না বলি” অর্ধেক পানি আছে বলি। তাহলে তো প্লাস পয়েন্ট পাই।’ আমরা তাঁর সঙ্গে একমত হতে পারি। তবে এটাও বলব, গ্লাসে অর্ধেক পানি কিন্তু থাকতে হবে। বিচারপতি মতিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাহমুদুল ইসলাম চেয়ারের জন্য বিচারপতি সৈয়দ রিফাত আহমেদের নাম এবং সুপ্রিম কোর্টের শুনানি রেকর্ডিং চালুর প্রস্তাব করেন। সুখের বিষয়, দুটোতেই অ্যাটর্নি জেনারেল একমত হন। তবে ১০ বিচারকের মামলার অথর জাজ বিচারপতি মতিন যথার্থই বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির পরামর্শ সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক বলেছেন। সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের জন্য তাঁরই লেখা নির্দেশিকা ‘অলিখিত সংবিধান’ বলেছেন। কিন্তু সেই ‘অলিখিত সংবিধান’ কি মানা হচ্ছে? এর উত্তর, ‘না।’
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.