গণতান্ত্রিক উত্তরণের ২৫ বছর by রওনক জাহান

গণতান্ত্রিক উত্তরণ: ১৯৯০–৯১
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যখন সামরিক শাসক এরশাদের পতন হলো, তখন বাংলাদেশ ‘তৃতীয় পর্যায়ের’ গণতন্ত্রে প্রবেশ করে—এই ‘তৃতীয় পর্যায়’ শব্দবন্ধটি বেশ জনপ্রিয় ছিল। বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন গণতান্ত্রিক দেশের ঐতিহাসিক বিবর্তনকে এভাবে তিন পর্যায়ে ভাগ করেছিলেন। তৃতীয় পর্যায়ের এই নতুন ধাঁচের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাও মসৃণ হয়নি। গণতন্ত্র সংহতকরণ তো করতে পারেইনি, বরং বাংলাদেশ গণতন্ত্রের মৌলিক ভিতগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ প্রায় প্রায়ই গণতান্ত্রিক পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে এবং তখন আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো দেশটিকে গণতান্ত্রিক বলে চিহ্নিত করতে সম্মত হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক সংগঠন ও বৈশ্বিক জরিপগুলো যখন আমাদের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করে, তখন আমাদের অনেকেই উল্টো এই সমালোচকদের দেশের গণতন্ত্রের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু আমি মনে করি, সমালোচকদের যুক্তির বিরোধিতা না করে এবং অন্যান্য দেশের গণতন্ত্রের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন না তুলে আমাদের প্রথমে এটা মূল্যায়ন করা উচিত, ১৯৯০ সালে আমরা নিজেরাই যে মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিলাম, সেটা আমরা বজায় রাখতে পারছি কি না। ১৯৯০ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের প্রধান তিনটি রাজনৈতিক জোট সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য একটি রূপরেখা প্রণয়ন করে। এই তিনটি জোটের একটির নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ, আরেকটির নেতৃত্বে ছিল বিএনপি ও তৃতীয়টির নেতৃত্বে ছিল বামপন্থী দলগুলো। আমাদের প্রথমেই মূল্যায়ন করতে হবে, ১৯৯০ সালের তিন জোটের রূপরেখায় সই করে আমাদের রাজনীতিকেরা জাতির কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটা তাঁরা কতটা রেখেছেন।
১৯৯০ সালের তিন জোটের রূপরেখার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক নেতারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের প্রতি অঙ্গীকার করেছিলেন। প্রথমত, তাঁরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার করেছিলেন, যার মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিরা দেশ শাসন করার ম্যান্ডেট লাভ করবেন। দ্বিতীয়ত, তাঁরা সার্বভৌম সংসদ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যার কাছে নির্বাহী বিভাগ জবাবদিহি করবে। তৃতীয়ত, তাঁরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, জনগণের মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য আইনের শাসন বজায় রাখা হবে। আর শেষমেশ, তাঁরা গণতান্ত্রিক বিধান ও মূল্যবোধ অনুসারে নিজেদের কাজকর্ম পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিশেষ করে একে অপরের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
ফলে আজ ২৫ বছর পর এই প্রশ্ন তোলা প্রাসঙ্গিক, যে নেতারা এই রূপরেখায় সই করেছিলেন, তাঁরা সেটা কতটা পরিপালন করেছেন? ১৯৯১ সাল থেকে এক জোটের নেত্রী খালেদা জিয়া ও অন্য জোটের নেত্রী শেখ হাসিনা পালাবদল করে কয়েকবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তাঁরা কি নিজেদের প্রতিশ্রুতি রেখেছেন?
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন
১৯৯০ সালের তিন জোটের রূপরেখায় বলা হয়েছিল, যেহেতু সামরিক শাসকেরা নির্বাচনী ব্যবস্থায় অনেক অগণতান্ত্রিক নিয়মকানুনকে চিরস্থায়ী রূপ দিয়েছে এবং সরকার সব সময়ই নির্বাচনী ফলাফল নিজের পক্ষে নিয়ে যেতে সচেষ্ট, তাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অধিকতর যথাযথ ব্যবস্থা। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচন এই নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম সবচেয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এই নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি সরকার গঠন করে। কিন্তু আক্ষেপ করার বিষয় হচ্ছে, বিএনপি তিন জোটের রূপরেখায় প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুত হয়ে পরবর্তী নির্বাচন নিজের অধীনেই করার সিদ্ধান্ত নেয়। মিরপুর ও মাগুরার ত্রুটিপূর্ণ উপনির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী জোট নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য ১৯৯৪ সাল থেকে গণ-আন্দোলন শুরু করে। এরপর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক সংবিধান সংশোধনীর মধ্য দিয়ে এই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
তারপর তিনটি সংসদ নির্বাচন হয়েছে, প্রথমটি হয়েছে ১৯৯৬ সালের জুন মাসে, দ্বিতীয়টি হয়েছে ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে আর তৃতীয়টি হয়েছে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। এই তিনটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একরকম শান্তিপূর্ণভাবেই ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে, যেখানে ক্ষমতাসীন দল প্রতিবারই ব্যতিক্রমহীনভাবে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু এ রকম স্বাভাবিকভাবে ক্ষমতার ব্যাটন এক দলের হাত থেকে আরেক দলের হাতে গেলেও দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে পারেনি। প্রতিটি নির্বাচনের পর পরাজিত দল নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে, কিন্তু পরবর্তীকালে তা গ্রহণ করে সংসদে বসেছে। তা ছাড়া, প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে প্রভাবিত করে সুবিধা নিতে চেয়েছে। আর শেষমেশ আওয়ামী লীগ সরকার নিজের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে ২০১১ সালে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। ব্যাপারটা বৈপরীত্যমূলক, কারণ আওয়ামী লীগ ১৯৯৪-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য দুই বছরব্যাপী গণ-আন্দোলন করেছে।
২০১১ সাল থেকেই এই দুই প্রধান রাজনৈতিক দল নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে ঐকমত্যে আসতে পারছে না। আমরা ২০১৪ সালে একটি একপক্ষীয় সংসদ নির্বাচন দেখলাম, যেখানে অধিকাংশ সাংসদই ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে আমরা ‘গণতন্ত্র রক্ষার’ নামে বিরোধী দলের আন্দোলনের ফলে নজিরবিহীন সহিংসতাও দেখলাম। যদিও আওয়ামী লীগ ও বিরোধী জোট—এই দুই রাজনৈতিক শক্তি গণতান্ত্রিক উত্তরণকে মসৃণ করার জন্য ১৯৯০ সালের তিন জোটের রূপরেখায় সই করেছিল, কিন্তু এখন তারা এক অনমনীয় ও আপসহীন মনোভাব অর্থাৎ ‘হয় আমার কথা শোনো, নাহয় গোল্লায় যাও’—এমন অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কী উপায়ে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎও বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ল।
সার্বভৌম সংসদ
যেহেতু তিন জোট সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের ব্যাপারে একমত হতে পারেনি, তাই তারা একটি ‘সার্বভৌম’ সংসদের ব্যাপারে একমত হয়েছিল, যার কাছে সরকার দায়বদ্ধ থাকবে। যদিও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এক বিরল ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। আমাদের এখন একটি ‘সার্বভৌম’ সংসদ আছে, কিন্তু এটি কার্যকরভাবে একটি দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে না—১৯৯০ সালের রূপরেখায় আমাদের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল। ১৯৯৪ সাল থেকে বিরোধী দল (যে দলই হোক না কেন) সংসদ বয়কট শুরু করে, সংসদের বদলে তারা রাজপথেই নিজেদের দাবিদাওয়ার কথা বলতে শুরু করে। প্রতিবাদ জানানোর জায়গা হিসেবে রাজপথকেই বেছে নেয় তারা। ফলে সংসদে ক্ষমতাসীন দল ও জোটের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়—সংসদের কার্যকর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই। সরকারের নির্বাহী বিভাগের হাতে সব ক্ষমতা চলে আসে। এর ফলে সব সরকারই সংসদে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা ব্যতীত আইন পাস ও সংবিধান সংশোধন করেছে।
বর্তমান সংসদে একটি বিরোধী দল আছে তা ঠিক, যারা রাস্তায় বিক্ষোভ বা সংসদ বয়কট করে না। কিন্তু এই বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য সরকারের অংশীদার। তাই তাদের ঠিক বিরোধী দল বলে মনে হয় না। এ ছাড়া সরকারকে গভীরভাবে সমালোচনা করা বা নীতিগত বিকল্প পেশ করার মতো সক্ষমতাও তাদের নেই। অর্থাৎ আমাদের রাজনৈতিক নেতারা ‘সার্বভৌম’ সংসদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এমন এক নিষ্ফলা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছেন, যেটা কখনোই কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে সক্ষম হয়নি।
আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
১৯৯১ সালের পর থেকে সব নির্বাচিত সরকার সবচেয়ে গুরুতর যে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, সেটি হলো তারা কেউই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বিভিন্ন বৈশ্বিক মূল্যায়নে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে খারাপ করেছে। গণমাধ্যমে সব সময়ই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের (যারাই ক্ষমতায় থাকুক না কেন) আইন ভঙ্গের খবর প্রকাশিত হয়েছে, একই সঙ্গে ব্যাপক মাত্রায় তাঁদের দায়মুক্তির খবরও এসেছে। যদিও সংবিধানে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই অধিকার লঙ্ঘনের সঠিক প্রতিকার পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যম প্রায়ই নাগরিকদের অধিকার লঙ্ঘনের খবর দিয়েছে, রাষ্ট্র ও অরাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ উভয়ই নাগরিকদের অধিকার হরণ করেছে। নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মতো গোষ্ঠীগুলো সব সময় ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এখনো আমাদের দেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি উঠছে, যাতে বোঝা যায়, কোনো সরকারই এ ব্যাপারে নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার যে অঙ্গীকার ১৯৯০ সালে রাজনীতিকেরা করেছিলেন, সেটা তাঁরা বাস্তবায়ন করেননি। যদিও বেসরকারি গণমাধ্যমের উত্থান ও তাদের মধ্যে কারও কারও সাহসী ও স্বাধীন ভূমিকার কারণে নাগরিকেরা এখন সামরিক শাসনামলের তুলনায় কিছুটা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছেন। গণতন্ত্রের বিভিন্ন মানদণ্ড মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, নাগরিকদের কথা বলার জায়গাটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উজ্জ্বল ও ইতিবাচক একটি জায়গা। অনেক নেতিবাচক দিকের মধ্যে এটি একটি ইতিবাচক দিক।
আচরণবিধি
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তিন জোটের নেতারা আট দফা আচরণবিধিতে জাতির কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আজ সেটা পুনঃপাঠ করলে দুটি বিষয় আমাদের তৎক্ষণাৎ ধাক্কা দেয়—প্রথমত, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই আচরণবিধি আজও কতটা প্রাসঙ্গিক, আর দ্বিতীয়ত, আমাদের নেতারা ওই প্রতিশ্রুতি থেকে কতটা দূরে সরে গেছেন।
আট দফা আচরণবিধিতে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের ভিন্নতাগুলো সহ্য ও শ্রদ্ধা করবে, শান্তিপূর্ণভাবে দলের ও প্রচারণা কার্যক্রম চালাতে দেবে, বেসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনীতিকীকরণ করার চেষ্টা করবে না, প্রচারণা কার্যক্রমে অনৈতিক কৌশল ব্যবহার করবে না, যেমন বিরোধী পক্ষের দেশপ্রেম ও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করবে না বা সাম্প্রদায়িক জিকির তুলবে না, নির্বাচনী ব্যয়ের সীমাসহ নির্বাচনী দিকনির্দেশনা মেনে চলবে, আর শেষমেশ নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে।
এখন আমরা জানি যে এই তিন জোটের রূপরেখায় যাঁরা সই করেছিলেন, তাঁরা ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকেই এই আচরণবিধি ভাঙা শুরু করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে এই লঙ্ঘনের রূপ ছিল আরও অমার্জিত ও অপছন্দনীয়।
আরেকটি ঐকমত্য?
২০১১ সালের পর থেকে আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে নতুন একটি কাঠামো তৈরি করার জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আরেকটি ঐকমত্য হওয়া দরকার কি না, সে বিষয়ে গণপরিসরে বেশ আলোচনা হচ্ছে। এই প্রয়োজনীয়তা সার্বিকভাবে স্বীকৃত হলেও এটা মোটেও পরিষ্কার নয়, আমরা কখন তেমন একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারব। ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর আপেক্ষিক শক্তির মধ্যে বেশ পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৯০ সালে দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের ওপর চাপ প্রয়োগ করার মতো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল। বাম দলগুলোর জোট মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ছাত্রসংগঠনগুলো দল ও জোটগুলোর ওপর ঐকমত্যের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছিল। কিন্তু এখন ছাত্রসংগঠনগুলো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। সব ছাত্রসংগঠনই এখন মূল দলগুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই। বাম দলগুলো শক্তি হারিয়ে ফেলেছে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছে। গত কয়েক বছরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বেশ দুর্বল হয়ে গেছে। তারা আর এমন অবস্থায় নেই যে আওয়ামী লীগকে চাপ দিয়ে একটা অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারবে। এই পরিস্থিতিতে স্রেফ আওয়ামী লীগের নেতা শেখ হাসিনা যদি মনে করেন, বিএনপির কিছু দাবি মেনে নিলে তাঁর আলোকিত স্বার্থ সংরক্ষিত হবে, তাহলেই কোনো ঐকমত্য হতে পারে। এ পর্যায়ে তুরুপের তাস তাঁর হাতেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চান? গণতন্ত্রকে টেকসই করার জন্য তিনি কি ১৯৯০ সালের মতো আবার একটি ঐকমত্য প্রচেষ্টার উদ্যোগ নেবেন, যাতে করে সব গণতান্ত্রিক দল আর একবার নতুন করে আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হবে?
রওনক জাহান: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। সম্মানীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ।

No comments

Powered by Blogger.