পূর্ণ গণতন্ত্রের জন্য ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য

মঙ্গলবার রাজধানীর ব্রাক সেন্টার ইন-এ পূর্ণ গণতন্ত্র অর্জনের জন্য ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাউথ এশিয়ান লিগ্যাল ইনস্টিটিউটের-এর নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার মঞ্জুর হাসান। পাঠকদের জন্য মূল প্রবন্ধটি হুবহু প্রকাশ করা হলো-
আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র এবং সেই শোষিতের গণতন্ত্রের অর্থ হল, আমার দেশে যে গণতন্ত্রের বিধিলিপি আছে, তাতে যেসব provision করা হয়েছে, যাতে এ দেশের দুঃখী মানুষ protection পায়, তার জন্য বন্দোবস্ত আছে- ঐ শোষকেরা যাতে protection পায়, তার ব্যবস্থা নাই। -বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গণপরিষদের শেষ অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণ। আমরা হয়ত স্বীকার করতে চাই না যে মানুষ ক্ষমতার অপব্যবহার করে, কিন্তু সরকারের প্রয়োজনীয়তাই প্রমান করে যে তারা তা করে: মানুষ যদি ফেরেশতা হতো, তাহলে সরকারের কোনো প্রয়োজন হতো না। -ফেডারেলিস্ট পেপারস এ্যস্যে ৫১
ভূমিকা
চেকস এন্ড ব্যালেন্সেস বা ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য যে কোনো কার্যকর (de facto) বা আইনসম্মত (de jure) রাজনৈতিক ব্যবস্থারই অপরিহার্য অংশ। যে কোনো সংবিধানেরও, লিখিতই হোক বা অলিখিত হোক, ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য থাকলে, সরকারের প্রত্যেকটি বিভাগ - নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগ একে অপরের ক্ষমতার সীমারেখা আরোপ করতে পারে। এর ফলে যেকোনো একটি বিভাগের পক্ষে অতি ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সম্ভবপর নয়। বরং এর মাধ্যমে এক বিভাগ অন্য বিভাগের ক্ষমতা প্রয়োগের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, যাতে পরস্পরের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি হয়।
ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য যাকে ক্ষমতার বিভাজনও (Separation of Power) বলা হয় একটি পুরাতন ধারণা, যার উৎস মূলত ফরাসি চিন্তাবিদ ব্যারোনেস মন্টেসকো। এই ব্যবস্থায় সরকারকে তিনটি বিভাগে বিভক্ত করে প্রত্যেক বিভাগকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হলো কোনো বিভাগ যাতে অতি ক্ষমতাবান হয়ে অন্য বিভাগের ক্ষমতার ওপর হস্তক্ষেপ এবং নাগরিকের অধিকার হরণ করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। আজকের এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো এই রাজনৈতিক দর্শনের ও ব্যবস্থার মূল দিকগুলোর ওপর আলোকপাত করা এবং বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এর প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে একটি গঠনমূলক বিতর্ক উৎসাহিত করা। আমরা বিশ্বাস করি যে, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে শুধুমাত্র খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমেই দৃশ্যত অসমাধানযোগ্য সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলো সম্পর্কে জাতি হিসেবে আমরা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারব।
ফেডারেলিস্ট পেপারস
কীভাবে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য কাজ করে? ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য মার্কিন সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য এবং ফেডারেলিস্ট পেপারস এ্যাসে (Essay) ৫১-তে জেমস মেডিসন এর ওপর আলোকপাত করেন। এ্যাসে ৫১-এর উদ্দেশ্য হলো সরকারের একটি
কাঠামো কীভাবে নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করে তা ব্যাখ্যা করা। মেডিসনের মতে, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি এবং এ স্বাধীনতার জন্য নিশ্চিত করা দরকার যে, কোনো বিভাগই যেন অত্যধিক ক্ষমতাবান না হয়, যা ব্যবহার করে সেই বিভাগ অন্য বিভাগের ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে পারে। এ্যাসে ৫১ অনুযায়ী, কোনো বিভাগে অত্যধিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া বন্ধ করতে এর বিরুদ্ধে সাংবিধানিক বিধান হলো সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ। সবার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি বিশেষের স্বার্থ ও উচ্চাকাক্সক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা।
ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও বিভাজনের বৈশিষ্ট্য
রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতিতে অপেক্ষাকৃত সহজে ক্ষমতা সংজ্ঞায়িত, গঠিত, বিভাজিত ও ছড়িয়ে (diffuse) দেওয়া যায়। কিন্তু অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায় যে, সংসদীয় ব্যবস্থায় সেক্ষেত্রে অনেক জটিলতা ও অনিশ্চয়তা রয়েছে, কারণ সংসদীয় পদ্ধতিতে নির্বাহী বিভাগের উৎপত্তি হয় আইনসভা থেকে। রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয় ব্যবস্থায় উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও বিভাজনের জন্য ভিনড়ব ভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে।
যেমন, স্থায়ী কমিটি, বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা, সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রপতি/প্রধানমন্ত্রীর ও আইনসভার মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্য।
বাংলাদেশের সংবিধানে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পর্কিত অনেকগুলো অনুচ্ছেদ রয়েছে। নিমেড়ব সংবিধানের কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ-এর উল্লেখ করা হলো।
অনুচ্ছেদ ২২: রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচারবিভাগের পৃকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।
অনুচ্ছেদ ৪৮(১): বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন।
অনুচ্ছেদ ৪৮(৩): এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেনঃ
তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌও কোন পরামর্শদান করিয়াছেন কি না এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোন আদালত সেই সম্পর্কে কোন প্রশেড়বর তদন্ত করিতে পারিবেন না।
অনুচ্ছেদ ৫১(১): এই সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদের হানি না ঘটাইয়া বিধান করা হইতেছে যে, রাষ্ট্রপতি তাঁ হার দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া কিংবা অনুরূপ বিবেচনায় কোন কার্য করিয়া থাকিলে বা না করিয়া থাকিলে সেইজন্য তাঁহাকে কোন আদালতে জবাবদিহি করিতে হইবে না, তবে এই দফা সরকারের বিরুদ্ধে কার্যধারা গ্রহণে কোন ব্যক্তির অধিকার ক্ষুণ করিবে না।
(২) রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তাঁহার বিরুদ্ধে কোন আদালতে কোন প্রকার ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের করা বা চালু রাখা যাইবে না এবং তাঁহার গ্রেফতার বা কারাবাসের জন্য কোন আদালত হইতে পরোয়ানা জারী করা যাইবে না।
অনুচ্ছেদ ৫২(৪): অভিযোগ-বিবেচনার পর মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অভিযোগ যথার্থ বলিয়া ঘোষণা করিয়া সংসদ কোন প্রস্তাব গ্রহণ করিলে প্রস্তাব গৃহীত হইবার তারিখে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হইবে।
অনুচ্ছেদ ৫৫(৩): মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন।
অনুচ্ছেদ ৫৬(৩): যে সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাঁহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন।
অনুচ্ছেদ ৫৭(২): সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারাইলে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিবেন কিংবা সংসদ ভাঙ্গিয়া দিবার জন্য লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শদান করিবেন এবং তিনি অনুরূপ পরামর্শদান করিলে রাষ্ট্রপতি, অন্য কোন সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ট সদস্যের আস্থাভাজন নহেন এই মর্মে সন্তুষ্ট হইলে, সংসদ ভাঙ্গিয়া দিবেন।
অনুচ্ছেদ ৭০: কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন; (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দান করেন, তাহা হইলে তাঁহার আসন শূন্য হইবে...।
অনুচ্ছেদ ৭৭(২): সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালকে কোন মন্ত্রণালয়, সরকারি কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের যে কোন কার্য সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাসহ যেরূপ ক্ষমতা কিংবা যেরূপ দায়িত্ব প্রদান করিবেন, ন্যায়পাল সেইরূপ ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করিবেন।
(৩) ন্যায়পাল তাঁহার দায়িত্বপালন সম্পর্কে বাৎসরিক রিপোর্ট প্রণয়ন করিবেন এবং অনুরূপ রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপিত হইবে।
অনুচ্ছেদ ৭৮(১): সংসদের কার্যধারার বৈধতা সম্পর্কে কোন আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।
(২) সংসদের যে সদস্য বা কর্মচারীর উপর সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ, কার্যপরিচালনা বা শৃঙ্খলারক্ষার ক্ষমতা ন্যস্ত থাকিবে, তিনি এইসকল ক্ষমতা প্রয়োগ-সম্পর্কিত কোন ব্যাপারে কোন আদালতের এখতিয়ারের অধীন হইবেন না।
(৩) সংসদে বা সংসদের কোন কমিটিতে কিছু বলা বা ভোটদানের জন্য কোন সংসদ-সদস্যের বিরুদ্ধে কোন আদালতে কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না।
(৪) সংসদ কর্তৃক বা সংসদের কর্তৃত্বে কোন রিপোর্ট, কাগজপত্র, ভোট বা কার্যধারা প্রকাশের জন্য কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আদালতে কোন কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না।
অনুচ্ছেদ ১০২(২): হাইকোর্ট বিভাগের নিকট যদি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আইনের দ্বারা অন্য কোন সমফলপ্রদ বিধান করা হয় নাই, তাহা হইলে
(ক) যে কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদন।-
(অ) প্রজাতন্ত্র বা কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিষয়াবলীর সহিত সংশি−ষ্ট যে কোন দায়িত্ব পালনে রত ব্যক্তিকে আইনের দ্বারা অনুমোদিত নয়, এমন কোন কার্য করা হইতে বিরত রাখিবার জন্য কিংবা আইনের দ্বারা তাঁহার করণীয় কার্য করিবার জন্য নির্দেশ প্রদান করিয়া, অথবা
(আ) প্রজাতন্ত্র বা কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিষয়াবলীর সহিত সংশ্লিষ্ট যে কোন দায়িত্ব পালনেরত ব্যক্তির কৃত কোন কার্য বা গৃহীত কোন কার্যধারা আইনসংগত কর্তৃত্ব ব্যতিরেকে করা হইয়াছে বা গৃহীত হইয়াছে ও তাঁহার কোন আইনগত কার্যকরতা নাই বলিয়া ঘোষণা করিয়া উক্ত বিভাগ আদেশ দান করিতে পারিবেন;
অনুচ্ছেদ ১০৬: যদি কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হয় যে, আইনের এইরূপ কোন প্রশড়ব উত্থাপিত হইয়াছে বা উত্থাপনের সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে, যাহা এমন ধরণের ও এমন জনগুরুত্বসম্পন্ন যে, সেই সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন, তাহা হইলে তিনি প্রশ্নটি আপীল বিভাগের বিবেচনার জন্য প্রেরণ করিতে পারিবেন এবং উক্ত বিভাগ স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত শুনানীর পর প্রশ্নটি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে স্বীয় মতামত জ্ঞাপন করিতে পারিবেন।
অনুচ্ছেদ ১১২: প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সীমানার অন্তর্ভুক্ত সকল নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের সহায়তা করিবেন।
অনুচ্ছেদ ১১৬ক: এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ এবং ম্যজিস্ট্রেটগণ বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে সংবিধানের ১৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে সাংবিধানিক পদ ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে নিয়োগ প্রাপ্তদেরকে অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, আমাদের সংবিধান প্রণেতাগণ সরকারের বিভিনড়ব বিভাগকে পৃক রাখার চেষ্টা করেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও বিভাজনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে কিছু পর্যবেক্ষকের ধারণা যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশাল ব্যক্তিত্বের কথা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে অপেক্ষাকৃত বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, সংবিধানের বিভিনড়ব বিধানের প্রয়োগ ছিলো অত্যন্ত অসন্তোষজনক এবং অনেক ক্ষেত্রে মূল সংবিধানের চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়াও অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন যে, আমাদের সংবিধানের অনেকগুলো বিধান প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে, এগুলো সম্পর্কে নতুন করে ভাবা দরকার এবং এগুলোর সংস্কার জরুরি। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ যার প্রকৃষ্টতম উদাহরণ।
সম্ভাব্য আলোচ্য বিষয়
১. বৃহত্তর ইলেক্টোরাল কলেজ ব্যবহার করে সরাসরি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য নির্বাচন আয়োজন করা এবং সংসদ বিলুপ্ত করার ক্ষমতা ছাড়া রাষ্ট্রপতির ওপর অধিক ক্ষমতা ন্যস্ত করা।
২. একই ব্যক্তির বহুবিধ ভূমিকা- প্রধানমন্ত্রী (প্রধান নির্বাহী), সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান।
৩. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে কিছু বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সংসদ সদস্যদেরকে ফ্লোর ক্রসিং করতে দেওয়া।
৪. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা।
৫. সংসদের উপরের কক্ষের বিধান করে উপরের কক্ষের সদস্যদের সরাসরি নির্বাচনের আয়োজন করা।
৬. মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদ (যেমন, স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, অর্থ, আইন, স্থানীয় সরকার), প্রধান বিচারপতি, জ্যেষ্ঠ বিচারপতিগণ, এবং স্বাধীন কমিশনের সদস্যদের (নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন) নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে খোলামেলা বিতর্ক, ব্যাকগ্রাউন্ড অনুসন্ধান এবং অনুমোদনের আয়োজন করা।
৭. সকল বৈদেশিক চুক্তি সংসদে উত্থাপন করা এবং সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে যথাযথ বিতর্ক ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এগুলো অনুমোদনের বিধান করা। স্পর্শকাতর বৈদেশিক চুক্তির ক্ষেত্রে সংসদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের আয়োজন করা।
উপসংহার
সংবিধান কোনো পাথরে খোদাই করা দলিল নয় এবং সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোকে প্রাসঙ্গিক ও জনগণের প্রয়োজন মেটানোর স্বার্থে এর পর্যালোচনা করা আবশ্যক। একটি গৌরবময় ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সংবিধানের যাত্রা শুরু এবং এটি কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেও, গত কয়েক দশকের অনেকগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও বিভাজনের কার্যকারিতা সম্পর্কে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে একটি পূর্ণ ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন উৎসাহিত করার আমাদের পূর্বের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই প্রবন্ধে কিছু প্রাথমিক সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করা হলো।

No comments

Powered by Blogger.