বন বাঁচাবে মিলি আপার চুলা by এস এম হানিফ

পরিবেশবান্ধব চুলা বানিয়ে বাড়ি বাড়ি সরবরাহ করছেন
আফরোজা বুলবুল। সাধারণ চুলার তুলনায় জ্বালানি কাঠ কম
লাগে বলে বন বঁাচাতে ভূমিকা রাখছে এই চুলা l প্রথম আলো
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের খন্দকারপাড়া গ্রামের পাশেই ফাঁসিয়াখালী বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য। বন থেকেই আসে গ্রামের মানুষের জ্বালানি কাঠের জোগান। তবে গত কয়েক বছরে জ্বালানি কাঠের চাহিদা কমায় গাছ নিধনও কমেছে। আর এসবের পেছনে ভূমিকা রাখছে ‘মিলি আপা’র পরিবেশবান্ধব চুলা। পুরো নাম আফরোজা বুলবুল, ডাকনাম মিলি। খন্দকারপাড়া গ্রামেরই মেয়ে তিনি। সবার কাছে তিনি মিলি আপা নামেই পরিচিত। তাঁর তৈরি চুলায় জ্বালানি কাঠ লাগে সাধারণ চুলার অর্ধেক। ধোঁয়া হয় না বলে পরিবেশদূষণও ঘটায় না, সাশ্রয়ী তো বটেই, সবচেয়ে বড় কথা, বন বাঁচাতে ভূমিকা রাখছে এই চুলা। খন্দকারপাড়া গ্রামের সাধারণ গৃহবধূ আফরোজা বুলবুল ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ মেটাতে শুরু করেছিলেন এমন চুলা বানানো। ছয় বছর আগে চুলা বানানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে এই কাজে লেগে যান তিনি। বন বাঁচাতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নিজের সংসারেও এনেছেন সচ্ছলতা। ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ফাঁসিয়াখালী বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য ও মেধা কচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানসংলগ্ন ৩০টি গ্রামের এক হাজার পরিবার এখন তাঁর তৈরি চুলা ব্যবহার করছে।
কেমন কাজ করে এই চুলা? খন্দকারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. সোলাইমান দেখাতে নিয়ে যান তাঁর রান্নাঘরে। বেশ ঝকঝকে রান্নাঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে দুই মুখের সিমেন্টের পাকা চুলা। চুলার মাঝ থেকে একটি চিমনি উঠে গেছে ছাদের ওপরে। চুলা জ্বললেও নেই দম বন্ধ করা ধোঁয়া।
সোলাইমান জানান, খন্দকারপাড়ার ২০০ পরিবারের মধ্যে এক শরও বেশি পরিবার এখন মিলি আপার তৈরি চুলা ব্যবহার করছে। এই গ্রামের লোকজনের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব চুলা ব্যবহার করছে চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের খোন্দকারপাড়া, মাস্টার আলীপাড়া, নয়াপাড়া, মুসলিমনগর, সিকদারপাড়া, ছড়ারকুল, ঘোনাপাড়া, হাঁসেরদীঘি, ছায়েরাখালী, নতুন মসজিদ, ছগির শাহ কাটা, মিঠাছড়ি ডুমখালী চা বাগানসহ ৩০টি গ্রামের মানুষজন।
গত ৩১ মার্চ সকালে আফরোজা বুলবুলের বাড়িতে গেলে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ছয় বছর আগের কথা। স্বামীর সামান্য আয়ে সংসার চলত না। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ মেটানো কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। এর মধ্যে খবর পেলাম ইন্ডিকেটেড প্রোটেক্টেড এরিয়ার কো-ম্যানেজম্যান্ট (আইপেক) প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। আমি সপ্তাহব্যাপী চুলা বানানোর প্রশিক্ষণ নিলাম। চুলা তৈরির শুরুটা এভাবেই।’
আফরোজা বলেন, প্রথমে চুলার উপকারিতা সম্পর্কে গ্রামের লোকদের বোঝাতে কষ্ট হয়। পরে মাঠ পর্যায়ে মানুষকে সচেতন করতে উঠান বৈঠক ও সভা করেছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং ইউএসএইড কর্তৃপক্ষ। এই দুই সংস্থা ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ইকোসিস্টেমস অ্যান্ড লাইভলিহুডস (ক্রেল) নামের একটি প্রকল্পের আওতায় পরিবেশবান্ধব চুলা জনপ্রিয় করতে উৎসাহ দিচ্ছেন গ্রামবাসীকে।
বালি, কংক্রিট, সিমেন্ট, জিআই তার, প্লাস্টিকের পাইপ, লোহার ছাকনি এসব উপাদান দিয়ে তৈরি হয় পরিবেশবান্ধব চুলা। এক সঙ্গে সাত সেট চুলা তৈরি করেন আফরোজা। তৈরি থেকে বসানো পর্যন্ত সময় লাগে তিন দিন। একটি চুলা তৈরি করতে খরচ হয় ৫৮০ টাকা। আর এ চুলা তিনি বিক্রি করেন ১২০০ টাকায়। এ কাজে তিনি কোনো শ্রমিক ব্যবহার করেন না। এ পর্যন্ত এক হাজারেরও চুলা তৈরি করেছেন আফরোজা।
আফরোজার সংসারে এখন অভাব নেই। স্বামী রুহুল কাদেরকে গ্রামের মধ্যে একটি ফার্মেসি করে দিয়েছেন। ৯০ হাজার টাকা খরচ করে সেমিপাকা ঘর করেছেন। প্রতি মাসে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা বাবদ খরচ করেন সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা। মেয়ে রুমানা জান্নাত পড়ে চকরিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে। আর ছেলে আশরাফুল মোহাম্মদ নিহাদ খোন্দকারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। গত বছর বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলে পুরো বিদ্যালয়ের মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে আশরাফুল। এতে মায়ের আনন্দের শেষ নেই। আফরোজার স্বপ্ন মেয়েকে চিকিৎসক ও ছেলেকে প্রকৌশলী বানাবেন।
ক্রেল প্রকল্পের চকরিয়া উপজেলার সমন্বয়কারী মো. আবদুল কাইয়ুম বলেন, বনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতেই পরিবেশবান্ধব চুলা উদ্ভাবন করা হয়। আফরোজাকে উৎসাহিত করতে প্রতি চুলায় তাঁকে ক্রেলের পক্ষ থেকে ৪০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। আশার কথা হচ্ছে, একটা সময় আসবে একজন লোকও বনের ক্ষতি করবে না।

No comments

Powered by Blogger.