তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও ধূমপানমুক্ত পরিবেশ

সূত্র: ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার
(নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩)
গত ১৮ এপ্রিল ২০১৫, প্রথম আলো ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা প্রজ্ঞার আয়োজনে ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও ধূমপানমুক্ত পরিবেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত  হলো।
আলোচনা
আব্দুল কাইয়ুম: তামাক ও ধূমপান বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি। ধূমপানকারী ব্যক্তি বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। চিকিৎসকদের এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিদিন ধূমপানের জন্য ১৪ মিনিট করে আয়ু কমতে থাকে। তামাকের ভয়াবহতা হ্রাসে বাংলাদেশ সরকার ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে গৃহীত আন্তর্জাতিক চুক্তি এফসিটিসিতে (ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল) স্বাক্ষর করে।
চুক্তির বিধানসমূহ প্রতিপালনে সরকার পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করে। কিন্তু কিছু দুর্বলতার কারণে আইনটি ততটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই ২০১৩ সালের মে মাসে আইনটি সংশোধিত আকারে পাস হয়। সর্বশেষ গত ১২ মার্চ পাস হয় সংশোধিত আইনের আলোকে তামাক নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০১৫। সংশোধিত আইন ২০১৩ ও বিধিমালা ২০১৫-তে নারী-শিশুসহ সব অধূমপায়ীকে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার থেকে রক্ষায় কঠোর বিধান রাখা হয়েছে।
এ লক্ষ্যে ‘পাবলিক প্লেস’ ও ‘পাবলিক পরিবহনে’ ধূমপান সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিধিমালা পাস হওয়ার সঙ্গে আইন বাস্তবায়নের পথ সুগম করতে এ বিষয়ে সর্বস্তরের জনসাধারণের সচেতন হওয়া একান্ত জরুরি। আলোচনায় এসব বিষয় আসবে। এখন সূচনা বক্তব্য দেবেন মতিউর রহমান।
মতিউর রহমানআমার পরিবারের কেউ ধূমপান করত না। প্রায় ৩০ বছর যেসব বন্ধুর সঙ্গে ছিলাম, তারা ধূমপান করত। আমি ধূমপান থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অন্যান্য ক্ষেত্রের মানুষ বিভিন্নভাবে ধূমপানে প্রভাবিত হয়।
অনেকেই গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা বলেছেন। আমরা সব সময় সামাজিক সমস্যার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কিন্তু পত্রিকা বের হওয়ার পর অনেক সময় নিজেরাও খুব একটা স্বস্তি পাই না। কারণ রাজনীতি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি এত জায়গা নিয়ে নেয় যে নারী-শিশু, তামাক, মাদক ইত্যাদি ক্ষেত্রে যেভাবে বিষয়টি তুলে আনতে চাই, সেভাবে অনেক সময় পারি না। তবে এসব ক্ষেত্রে আমরা সব সময় সহযোগিতা করতে চাই।
এ ধরনের গোলটেবিলে প্রস্তাব দিয়ে রেখেছি নারী, শিশু, তামাক, মাদক ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারের যদি কোনো প্রচারের বিষয় থাকে, সেটা বিনা খরচে প্রচার করব। ২০১১-১২-১৩ সালে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনেক বিজ্ঞাপন প্রচার করেছি। আমরা নিজেরাও সামাজিক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করি। প্রায় পাঁচ বছর যাবৎ মাদক পরামর্শ সহায়তা নামে একটি অনুষ্ঠান করছি। এ অনুষ্ঠান থেকে মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা উপকৃত হচ্ছেন।
একটা স্থিতিশীল রাষ্ট্র পেলে হয়তো আরও অনেক কিছু করতে পারতাম। এর মধ্যেও দেশ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে আমরা বেশি এগিয়ে আছি। সবার প্রচেষ্টায় নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে আমাদের দেশ আরও এগিয়ে যাবে।
আসাদুজ্জামান খান কামাল
আসাদুজ্জামান খান কামাল
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০৪ সালের এক হিসাবমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে মারা যায় ৫৭ হাজার মানুষ। পঙ্গুত্ববরণ করে প্রায় চার লাখ মানুষ। ধূমপানের ক্ষতি ছাড়া কোনো ধরনের উপকার নেই। দেশে কয়েকটি সংস্থা এ ক্ষেত্রে কাজ করছে। তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সচেতনতার কাজে অংশ নিয়েছি। সরকার থেকেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধিমালা জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে ধূমপান আগের চেয়ে অনেক কমে আসছে।
এখন আর পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে খুব একটা ধূমপান দেখা যায় না। দরিদ্র শিশু-কিশোরেরা সিসাসহ কিছু মাদকদ্রব্য গ্রহণ করছে। যেকোনোভাবে এটা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তা না হলে এদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হবে। দেশে অনেক তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জায়গায় ধান-পাট বাদ দিয়ে তামাকের চাষ হচ্ছে।
তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান তামাক চাষের জন্য অগ্রিম টাকা দিচ্ছে। তামাক চাষের কারণে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। জামিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এ প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য আমাদের সবার ফলপ্রসূ উদ্যোগ নিতে হবে।
আপনারা এসব বিষয়ে ভালো ধারণা রাখেন। বিভিন্ন দিক নিয়ে আপনারা আলোচনা করবেন। আলোচনা থেকে অনেক পরামর্শ আসবে। আমাদের দিক থেকে যা যা করণীয়, সেসব ক্ষেত্রে আমরা উদ্যোগ নেব। ভবিষ্যতে তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আমরা আরও সামনের দিকে এগোতে পারব বলে আশা করি।
মেখলা সরকার
মেখলা সরকার
ধূমপানে শারীরিক ব্যাপক ক্ষতি সম্পর্কে আমরা জানি। এটা ধীরে ধীরে মানুষের জীবনকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। ধূমপান এমন একটি ক্ষতিকর বিষয়, যা একজন মানুষের সব অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এক হিসাবে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের চেয়ে ধূমপানকারীদের ফুসফুসের ক্যানসারের হার অনেক বেশি। ধূমপানের কারণে স্ত্রী, সন্তানসহ তাঁর সংস্পর্শে থাকা অন্যদেরও বিভিন্ন প্রকার ক্ষতি হয়। একজন ধূমপানকারীর অনাগত সন্তান বিকলাঙ্গসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
ধূমপানের ফলে শ্বাসযন্ত্র ক্ষতি হয়। ধূমপানে কিশোর-কিশোরীরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ে। যেমন তাদের শরীরের চামড়া এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে নিজেদের বয়সের তুলনায় বেশি বয়সী মনে হয়। অধিকাংশ মুখের ক্যানসারই ধূমপানের জন্য হয়। ধূমপানের ফলে মানুষের পাকস্থলীর ক্ষতি হয়।
ধূমপান থেকে ধূমপায়ীরা অন্যান্য মাদকের দিকে যায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা ধূমপান করেন, তাঁরা সাধারণত প্রথম দিকে গাঁজা ও অ্যালকোহলে আক্রান্ত হন। পরে অন্যান্য মাদক গ্রহণ করেন। এটি ধূমপানের একটি ভয়ংকর দিক। তামাক এমন একটি উপকরণ, যাতে মানুষের ন্যূনতম উপকার নেই। ধূমপানের ভয়াবহতা থেকে তাই মানুষকে বাঁচাতেই হবে।
ইকবাল মাসুদ
ইকবাল মাসুদ
দীর্ঘদিন যাবৎ ধূমপানবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। ২০০৫ ও ২০১৩ সালের ধূমপানবিরোধী আইনের বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ধূমপান বাংলাদেশের মানুষকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। সমাজ থেকে ধূমপান দূর করতে হলে দুটি বিষয় জরুরি। এক. আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। দুই. চাহিদা হ্রাসকরণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
চাহিদা হ্রাসকরণ প্রক্রিয়া একটি চলমান ব্যবস্থা। বহু বছর আগে থেকেই এ কার্যক্রম চলে আসছে। আমাদের ফাউন্ডেশনে ৭০ বছরের পুরোনো একটি বই আছে। সেখানে আমরা দেখি যে সেই ব্রিটিশ আমলে বহরামপুরে ধূমপানবিরোধী সভা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া আজও থেমে নেই। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে স্পষ্ট বলা আছে কারা এ কাজ করবেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে তিনটি বিভাগ আছে। বাংলাদেশ পুলিশ প্রশাসন, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিসের নির্দিষ্ট কাজ আছে। পুলিশ প্রশাসন অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে বেশি জড়িত। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কাজ করার কথা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি সার্কুলার জারি করা প্রয়োজন। তাহলে সব বিভাগ আরও গুরুত্বের সঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা করবে। ২০১৩ সালে আইন পাস হয়। কিন্তু বিধিমালা করতে দুই বছর লাগার পেছনে তামাক উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর ষড়যন্ত্র ছিল। তার পরও সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের জন্য এ আইন ও বিধিমালা আমরা পেলাম।
এখন এ ক্ষেত্রে কাজ করার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে। কিন্তু কোম্পানিগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর বিরোধিতা করছে। ধূমপান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
আমিন উল আহসান
আমিন উল আহসান
ধূমপান আইনের ক্ষেত্রে অধূমপায়ীদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে কর্মস্থলে ৬৩ শতাংশ অধূমপায়ী পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। বিশ্বে ১০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় পরোক্ষ ধূমপানের জন্য। দেশের ৪৩ শতাংশ মানুষ তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করে। চার কোটির বেশি মানুষ ধূমপান করে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তাই মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এখনকার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি খুব ভালো একটি আইন। ব্যক্তির পরিবর্তে এখন প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয়েছে। একটি জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল আছে। এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন। এ সেলের কাজ হলো দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রয়োগ করা। জাতীয় পর্যায়ে একটা টাস্কফোর্স কমিটি আছে। প্রতি জেলায় টাস্কফোর্স কমিটি আছে। প্রতি তিন মাস পর পর তাদের সভা করার কথা। এ কমিটিগুলোকে কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে এ কমিটি কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে হবে। পুলিশ নিজেও জানে না তার দায়িত্ব কী। তার পাশে একজন ধূমপান করছেন। পুলিশ নির্বিকার দাঁড়িয়ে দেখছে। কারণ, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সম্পর্কে তার ধারণা নেই। কাজেই আইনের কার্যকারিতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানানো জরুরি।
শাহনাজ মুন্নী
শাহনাজ মুন্নী
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি পাস হওয়ায় আমরা খুশি। একটু দেরিতে হলেও বিধিমালা হয়েছে। এসবই তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের অগ্রগতি। কিন্তু বড় শঙ্কার জায়গা হলো প্রয়োগ। দেশে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা রয়েছে। আইনটি কী? আইনের বিধি কী? এ বিষয়ে আইনের লোক ও জনসাধারণ—কারোরই তেমন কোনো ধারণা নেই।
আরেকটি বড় বিষয় হলো জবাবদিহি। জবাবদিহি নেই বললেই চলে। এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতে হবে।
সচেতনতার ক্ষেত্রে গণমাধ্যই বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আমার মনে হয়, গণমাধ্যম সে কাজটি করছেও। সাড়ে তিন শ সাংবাদিক নিয়ে প্রজ্ঞা একটি অ্যান্টি টোব্যাকো অ্যালায়েন্স (ধূমপানবিরোধী সংগঠন) করেছিল। আমিও এর সদস্য। আমাদের সাংবাদিকেরা বিগত দিনে এ বিষয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ ধূমপানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অনেক প্রতিবেদন করেছে। এখন আবার গণমাধ্যম আইন ও বিধি জানানোর কাজটি করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে নাটক, চলচ্চিত্র নির্মাতারাও কিছুটা সতর্ক থাকতে পারেন। নাটক, চলচ্চিত্রে ধূমপানের দৃশ্য যেন না দেখানো হয়। নায়কের হাতে সিগারেট দেখলে তরুণেরা এ থেকে প্রভাবিত হতে পারেন। ধূমপানমুক্ত পরিবেশের কথা বারবার আসে। ধূমপানমুক্ত পরিবেশ প্রায় নেই বললেই চলে। এ জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় নারী-শিশুদের। অফিসে কোনো সহকর্মীর সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলছি, তিনি একটি সিগারেট ধরিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন।
এ ক্ষেত্রে কিছুই বলার থাকে না। শিশুদের কথা চিন্তা না করেই হয়তো কেউ তাদের পাশে ধূমপান করছেন। শিশুরা এখানে অসহায়। এভাবে প্রতিনিয়ত নারী-শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে।
কোনগুলো ধূমপানমুক্ত পরিবেশ, অনেকে সেটা জানেই না। বিদেশে সইনবোর্ড থাকে। আমাদের দেশে এ ব্যবস্থা করা জরুরি। অনেক রেস্টুরেন্টে লেখা থাকে ধূমপান নিষেধ। তার পরও টেবিলে বসে অনেকে ধূমপান করছেন। তাই টেবিলেও যদি ধূমপান নিষিদ্ধের সাইনবোর্ড থাকে, তাহলে ভালো হয়। এসব ক্ষেত্রে তদারকটা খুব জরুরি। সঠিক তদারক না থাকলে কোনো অর্জনই আসলে হবে না।
বাইরের দেশে সিগারেটের প্যাকেটে ভয়ংকর সব ছবি থাকে। অন্তত নতুন যারা ধূমপান করতে চায়, এটা দেখে তারা সতর্ক হয়। আমাদের দেশে এক বছর পর এ ধরনের ছবি থাকার কথা। এ ধরনের ছবি সিগারেটের প্যাকেটে থাকছে কি না, সেটা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।
তামাকের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তামাক কোম্পানিগুলো। তারা তামাক চাষের জন্য মানুষকে অর্থ দেয়। এরা বিশাল কায়েমি স্বার্থবাদী সংঘ। মানুষের জীবনের বিনিময়ে মুনাফা করে। এদের নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনে বিধিবিধান আছে। এগুলো যেন শক্তভাবে প্রয়োগ করা হয়।
রিয়াজ আহমেদ
রিয়াজ আহমেদ
ছাত্রজীবনে ধূমপান করতাম। আমার স্ত্রীসহ ভালো কিছু বন্ধু ধূমপান থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করেছে। সমাজে এখন ধূমপানবিরোধী প্রচারণা কাজ করছে। কারণ, মধ্যবয়সীদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা অনেক কমে গেছে। একসময়ে আমাদের অফিসে ধূমপানকারীর সংখ্যা ছিল বেশি। এখন ধূমপান করে না এমন সংখ্যা বেশি। আমাদের অফিসের অল্প কিছু সদস্য ধূমপান করেন।
কিন্তু তরুণদের মধ্যে ধূমপান আগের মতোই আছে। কারণ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ধূমপানের প্রবণতা কমেনি। কিছু তামাক কোম্পানি এ ক্ষেত্রে তাঁদের উৎসাহিত করছে বলে মনে হয়। তারা বিজ্ঞাপন দিচ্ছে না কিন্তু এমন সব কাজের সহযোগী থাকে, যাতে শিক্ষার্থীরা ধূমপানে উৎসাহিত হয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কনসার্ট, বিতর্ক, কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে খুব কৌশলে তাদের কোম্পানির প্রচার করা হয়।
এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা খুবই প্রয়োজন। প্রজ্ঞাসহ কিছু সংস্থা এ ক্ষেত্রে কাজ করছে। কিন্তু এখানে সরকারের ভূমিকা প্রবলভাবে থাকতে হবে। ধূমপান একা আসে না। ধূমপান হলো অন্যান্য মাদকের প্রবেশদ্বার। অর্থাৎ ধূমপান যাঁরা করেন, তাঁদের প্রায় অনেকেই মদ, গাঁজাসহ অন্যান্য মাদক নেন। আবার অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গেও ধূমপান আসে। যেমন অনেকে ধূমপান করেন না। তামাক গ্রহণের কারণে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, সেটা মোকাবিলা করতে সরকারের বিশাল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই ব্যয়ের তুলনায় খুব সামান্য পরিমাণ কর তামাক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সরকার পায়।
আমাদের দেশেও এভাবে আইনের কড়াকড়ি প্রয়োগ করতে হবে, যাতে সবাই ধূমপান থেকে বিরত থাকে।
আহমেদ হেলাল
আহমেদ হেলাল
ধূমপান ছাড়া সহজ। কেউ নিজ থেকে ইচ্ছে করলে সহেজই ধূমপানমুক্ত হতে পারেন। তবে এর জন্য সহযোগিতার প্রয়োজন। এ সহযোগিতা পরিবার, চিকিৎসক ও বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে আসতে পারে। তিনি একা ইচ্ছে করলে ধূমপান ছেড়ে দিতে পারেন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে অল্প দিনের মধ্যেই হয়তো আবার ধূমপান করতে পারেন। কারও তত্ত্বাবধানে থকলে তিনি স্থায়ীভাবে ধূমপানমুক্ত হতে পারবেন।
এ আইনটি হচ্ছে অধূমপায়ীদের স্বার্থরক্ষার আইন। ২০১১ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব শিশু পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়, তাদের আচরণের পরিবর্তন হয়। দীর্ঘ ছয় বছরের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, যারা ধূমপান করেন, তাঁদের অন্য নেশায় আসক্ত হওয়ার আশঙ্কা ৭ থেকে ১৬ গুণ বেশি।
১৯৯৫ সালে ২০টি উন্নত রাষ্ট্রের ওপর গবেষণা করা হয়েছিল। সে গবেষণায় বলা হয়েছে, যাঁরা ধূমপান করেন, তাঁদের ৪৪ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। এটা সাধারণ উদ্বিগ্নতা, সিজোফ্রেনিয়া ইত্যাদি হতে পারে। অধূমপায়ীদের বাঁচানোর জন্য এ আইন। অধূমপায়ীদের যেকোনোভাবে ধূমপানের ক্ষতিকর দিক থেকে রক্ষা করতেই হবে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ক্ষেত্রে আমার একটি অভিজ্ঞতা আছে।
২০০৫ সালে ধূমপান আইন পাস হয়। আমি তখন মুন্সিগঞ্জে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ছিলাম। জেলা প্রশাসক ম্যাজিস্ট্রেটসহ আমাদের বললেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পেলাম, আপনারা জোরেশোরে কাজ শুরু করেন। আমরা কাজ শুরু করলাম। আইনটি প্রয়োগের সময় দেখলাম, একটা শ্রেণি এত প্রান্তিক যে তাদের কাছ থেকে ৫০ বা ১০০ টাকা আদায় করা খুবই কষ্টকর। আরেকটা শ্রেণির এত টাকা আছে যে তারা পারলে টাকাটা ছুড়ে দিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরায়।
এ রকম বিভিন্ন সমস্যার জন্য হয়তো নতুন আরেকটি আইন পেলাম। তাই মনে হয়, শুধু আইন দিয়ে হবে না। আইনের পাশাপাশি ধূমপানের ব্যাপক ক্ষতিকর দিক নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আনিসুল হক
আনিসুল হক
অনেক আগে নাটক-চলচ্চিত্রের চরিত্রদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা ছিল। এখন সারা পৃথিবীতে নাটক-চলচ্চিত্রে ধূমপানকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। আমরা যারা নাটক লিখি, তারাও ধূমপানকে নিরুৎসাহিত করছি। তার পরও কিছু স্যাটেলাইট চ্যানেলের নাটক-সিনেমায় ধূমপানের দৃশ্য দেখা যায়। এগুলোও বন্ধ হবে বলে আমার বিশ্বাস।
ধূমপানের দৃশ্য ছাড়াই ভালো নাটক-সিনেমা হতে পারে। তাই এখান থেকে একটা প্রস্তাব করতে পারি, আমরা যারা নাটক-সিনেমা বানাই, তারা স্ক্রিনে ধূমপানের দৃশ্য রাখব না। এ কাজটি করা খুবই সম্ভব। আমার শিল্প-সাহিত্যে ধূমপানের বিষয়গুলো থাকবে না বলে কথা দিতে পারি। তবে গত দুই দশক থেকে ধূমপানের ক্ষেত্রে মানুষের সচেতনতা অনেক বেড়েছে। মানুষ ধূমপানের ক্ষতিগুলো বুঝতে শিখেছে। একসময় বিড়ির ওপর কর বসানোর জন্য প্রতিবাদ হিসেবে সম্পাদকীয় লেখা হতো। যুক্তি ছিল, বিড়ি গরিবের বিনোদন। বাংলাদেশে সে অবস্থা এখন আর নেই।
আমার বন্ধুরা যারা অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছে, তারা বলছে ওখানে ধূমপান খুব কঠিন। একটা সিগারেটের পেছনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ পড়ে। তা ছাড়া ধূমপান করার জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না। আগে বিমানে ধূমপানের জায়গা ছিল, এখন নেই। ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিমানে কেউ ধূমপান করছেন না। তার পরও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে কিছুটা বেড়েছে বলেই মনে হয়।
হাত বাড়ালেই বিড়ি, সিগারেট কিনতে পারি। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ধূমপানের এটাও একটা কারণ। তবে আইনের প্রয়োগ করতেই হবে। দু-তিনবার জরিমানা করলে অবশ্যই ধূমপানের প্রবণতা কমে আসবে। মানুষের প্রবণতাই এমন, যখনই সে আইনের মধ্যে থাকবে, তখন আইন মানবে। একটু সুযোগ পেলেই আইন মানবে না। তাই আইনের প্রয়োগ করতেই হবে। আমাদের গণমাধ্যম, নাটক, সিনেমা, সংগীত, চলচ্চিত্র—সব মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ধূমপান না করার প্রচার চালাতে হবে।
তাহলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা আসবে। মানুষ ধূমপান করবে না। সারা বিশ্বেই ধূমপানকে ‘না’ বলা হচ্ছে। আমাদের দেশেও এখন আর ধূমপানকে সহজভাবে নিচ্ছে না। ফলে আমরা যারা ধূমপান করি, তারা এ থেকে বেরিয়ে আসতে পারব বলে বিশ্বাস করি।
বেগম ফজিলাতুন নেসা
বেগম ফজিলাতুন নেসা
যত দিন না পর্যন্ত একটি ধূমপানমুক্ত রাষ্ট্র হচ্ছে, তত দিন এ আন্দোলন চলবে। এ বছর মার্চ মাসের ১২ তারিখ ছিল আমাদের জন্য একটি আনন্দের দিন। মহান জাতীয় সংসদে এই দিন তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালাটি পাস হয়।
২০০৫ সালে আইনটি প্রথম পাস হয়। ২০১৩ সালে এটি সংশোধিত হয়। ২০১৫ সালে আমরা এ আইনের বিধিমালা পাই। পর্যায়ক্রমে কাজগুলো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। তামাক নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ যথেষ্ট কি না, বিষয়টি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন।
২০১৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজারের রামুর ডাক্তার কাটা গ্রামে তামাক চাষে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ, শিশুদের খুব কম পয়সা দিয়ে কাজ করানো যায়। প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় জমিতে তামাক চাষের কারণে এখন আর পাখি আসে না। এক গবেষণা থেকে জানা যায়, ৫৮ শতাংশ পুরুষ ও ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ নারী প্রতিবছর তামাক ব্যবহারে আক্রান্ত হচ্ছে। তামাকজাত পণ্য প্রক্রিয়াকরণের কাজে নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ কাজ করার সময় একজন গর্ভবতী নারীর কী ক্ষতি হতে পারে, তা একজন চিকিৎসক ভালো বলতে পারবেন। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, এসব নারীর সন্তান বিকলাঙ্গ ও অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা অনেক। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে অনুরোধ করব, তিনি যেন একটি বিশেষ সেল গঠন করে তামাকের ক্ষতিকর বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদারক করেন ।
প্রতিবছর তামাক গ্রহণের ফলে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয় ১১ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বে মারা যায় ৬০ লাখ মানুষ। তামাকের পরোক্ষ ক্ষতিতে মারা যায় ছয় লাখ মানুষ। কেবল কর্মক্ষেত্রে ১ কোটি ১৫ লাখ মানুষ পরোক্ষ ধূমপানে আক্রান্ত হন। পাবলিক প্লেস ধরলে এ সংখ্যা হবে ভয়াবহ। প্রতিদিন বিড়ি-সিগারেটে ব্যয় হচ্ছে ৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। বছরে ব্যয় হয় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে মানুষ মৃত্যু অথবা পঙ্গুত্ব কিনছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০৪ সালের এক জরিপ থেকে জানতে পারি, তামাক গ্রহণের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৫৭ হাজার মানুষ মারা যায়। পঙ্গু হয় ৩ লাখ ৮২ হাজার মানুষ। আর এখন এ সংখ্যা কোথায় দাঁড়িয়েছে, আমরা কেউ বলতে পারি না।
বৃহত্তর রংপুরে সাতটি জেলা, কুষ্টিয়া অঞ্চলের চারটি জেলা ছাড়াও পার্বত্য অঞ্চল, নড়াইল, ফরিদপুর, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জায়গায় তামাক কোম্পানিগুলো তামাক চাষে প্রলুব্ধ করছে। এরা কত কৌশলে তরুণদের তামাকে প্রভাবিত করে, তার একটি উদাহরণ দিই। তামাক কোম্পানির পক্ষে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের হেল্প ও ইনফরমেশন ডেস্ক একটি বিখ্যাত সিগারেট কোম্পানির ছবি দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে। এর অর্থ, যাতে শিক্ষার্থীরা ওই কোম্পানির সিগারেটের প্রতি প্রভাবিত হয়।
২০১৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে দেখলাম, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এটা ১ লাখ ৮ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। তামাক কোম্পানির এই আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
মো. মোস্তাফিজুর রহমান
মো. মোস্তাফিজুর রহমান
আজকের আলোচ্য বিষয়ে দুটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো আইনের প্রয়োগ, অন্যটি সচেতনতা। একটি প্রাচীনতম নেশার উপকরণ তামাক। ১৯১৯ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য যুভেনাইল আইন হয়েছিল। তামাকের ক্ষতি থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য ১০০ বছর আগে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আমাদের ডায়রিয়ার প্রচারণা ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার প্রচারণা দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে চলে গেছে। মনে হয়, দেশে খুব কম মানুষই পাওয়া যাবে, যিনি ‘এক চিমটি লবণ, এক মুঠো গুড়, তারপর দিলাম ঘুটা’ ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণের এই প্রচারটার কথা জানেন না। তামাকের ক্ষেত্রেও সচেতনতাকে এই পর্যায়ে নিতে হবে। তাহলে এ ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা অর্জন করতে পারব।
গ্রামাঞ্চলে পারিবারিকভাবে তামাক গ্রহণের প্রবণতা রয়েছে। যেমন: গুল, জর্দা, সাদাপাতা—এ–জাতীয় তামাক সবাই মিলে বসে উৎসবের মতো করে ব্যবহার করে। অথচ তামাক গ্রহণের কুফল ছাড়া একটি সুফলও নেই। এ ক্ষেত্রে ডায়রিয়ার ওই বিজ্ঞাপনের মতো এমন একটি প্রচার সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশে অনেক এনজিও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করে। যে যে কাজই করুক না কেন, সে তার কাজের সঙ্গে ধূমপানের বিষয়টি যুক্ত করবে। ধূমপানের জন্য স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ব্যয় হয় ১১ হাজার কোটি টাকা। কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে রাজস্ব আসে হয়তো দুই বা তিন হাজার কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে সরকারের নিট ব্যয় আট হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সমাজে ধূমপান না থাকলে সরকারের আট হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। বাংলাদেশে সরকারের লাখো-কোটি টাকা বাজেটের সামনে দুই হাজার কোটি টাকা রাজস্ব কোনো অর্থই হতে পারে না। যেখানে এর বিনিময়ে জীবন ধ্বংস হয়, সেখানে আইনের প্রয়োগ করতেই হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম, সরকার, এনজিও—সবাই মিলে এমনভাবে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
আসাদুজ্জামান খান কামাল: দুইভাবে তামাক গ্রহণ করা হয়। ধোঁয়ার মাধ্যমে ও গুল, জর্দা, সাদাপাতা হিসেবে। তামাকের কুফল সম্পর্কে আপনারা বিশদ আলোচনা করেছেন। আমি মনে করি, শুধু আইন দিয়ে সবকিছু হবে না। আমাদের ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। আজকের আলোচনায়ও সচেতনতার ওপর গুরুত্বের কথা এসেছে।
আগের থেকে মানুষ অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। এখন প্রকাশ্যে ধূমপান করতে প্রায় দেখাই যায় না। আবার কেউ প্রকাশ্যে ধূমপান করলে তার পাশের জন প্রতিবাদ করে। মানুষ সচেতন হয়েছে বলেই প্রকাশ্যে ধূমপান কমে আসছে। এ ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা, আহ্ছানিয়া মিশনসহ অন্যান্য সংস্থার ভূমিকা রয়েছে। কারণ, তারা দীর্ঘদিন যাবৎ ধূমপানের বিরুদ্ধে কাজ করছে।
তামাক চাষ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা আমাদের আতঙ্কের বিষয়। প্রথমে মানিকগঞ্জ থেকে শুরু হয়েছিল। এখন রংপুর, পার্বত্য অঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় তামাকের চাষ হচ্ছে। ভবিষ্যতে চাষিরাই এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কারণ, দু-একবার তামাকের চাষ করলে সে জমির উর্বরতা শক্তি অনেক কমে যায়। ফলে চাষিরা অন্য ফসল উৎপাদনে আর লাভবান হবেন না। তবে এসব ক্ষেত্রে গণমাধ্যম অনেক কিছু করতে পারে।
অনেক সময় লক্ষ করেছি, সমাজের কোনো একটি বিষয় নিয়ে আমরা ভাবছি। ভাবতে ভাবতেই দেখেছি, প্রথম আলোয় সে বিষয় লেখা হয়েছে। তামাকের ফলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
তামাক কোম্পানিগুলো যেন বিভিন্ন কৌশলে প্রচার-প্রসার করতে না পারে, সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে। ভবিষ্যতে আমরা তামাকের ব্যবহার কমাতে পারব বলে আশা করি।
আব্দুল কাইয়ুম: আলোচনায় সবাই একমত যে ধূমপানে কুফল ছাড়া একটিও সুফল নেই। আমাদের জন্য আতঙ্ক হলো তামাক চাষের জমি যেমন বাড়ছে, তেমন নারী ও শিশু এ কাজের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। আলোচনায় এসেছে, প্রতিবছর ১১ হাজার কোটি টাকা ধূমপানজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ব্যয় হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ আলোচনায় উপস্থিত আছেন। তিনি এ ব্যাপারে খুবই সচেতন।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন, গণমাধ্যম, সরকার, এনজিওসহ সংশ্লিষ্ট সবাই যদি এ ক্ষেত্রে প্রতিরোধ গড়ে তুলি, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা প্রায় একটি ধূমপানমুক্ত সমাজ পাব বলে আশা করি। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।
আলোচনায় সুপারিশ
: তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড বন্ধ করার জন্য আমাদের সবার ফলপ্রসূ উদ্যোগ নিতে হবে
: ধূমপানের ভয়াবহতা থেকে মানুষকে বাঁচাতেই হবে
: ধূমপান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে
: মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে
: চলচ্চিত্রে ধূমপানের দৃশ্য যেন না দেখানো হয়
: স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যেন একটি বিশেষ সেল গঠন করে তামাকের ক্ষতিকর বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদারক করেন
যাঁরা অংশ নিলেন
আসাদুজ্জামান খান কামাল : প্রতিমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
বেগম ফজিলাতুন নেসা : সাংসদ, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ
মো. মোস্তাফিজুর রহমান : যুগ্ম সচিব, ল অ্যান্ড জাস্টিস ডিভিশন
আমিন উল আহসান : সমন্বয়ক, ন্যাশনাল টোব্যাকো কন্ট্রোল সেল, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়
আহমেদ হেলাল : সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট
মেখলা সরকার : সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট
শাহনাজ মুন্নী : বার্তা সম্পাদক, এটিএন বাংলা
রিয়াজ আহমেদ : অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর, দ্য ডেইলি স্টার
ইকবাল মাসুদ : পরিচালক, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন
আনিসুল হক : সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো
মতিউর রহমান : সম্পাদক, প্রথম আলো
সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম : সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

No comments

Powered by Blogger.