চারিদিকে বারুদ, চাপা কান্না এবং দেশবাসীর আর্তনাদ! by গোলাম মাওলা রনি

কযেকদিন যাবৎ ঘুমাতে পারছিনা। পরিবার পরিজন, বন্ধু বান্ধব ও পরিচিত জনের কাউকেই হাসতে দেখিনি কয়েকমাসে। রুটি রুজির জন্য অফিসে আসতে হয়। আমার গাড়ীর গ্লাসটি ককটেলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থ হবার পর রিক্সায় ঘুরে বেড়াই।
বাসে উঠতে ভয় পাই গান পাউডার এর অগ্নিতে কাবাব হবার আশংকায়। শরীর-মন হাহাকার করছে- এক অজানা শংকায়- বিশেষ করে গাজীপুরে স্যান্ডার্ড গার্মেন্টস পুড়ে ১২০০ কোটি টাকার ক্ষতি এবং অসহায় মালিকের গগন বিদারী কান্না দেখার পর। বার বার মনে হচ্ছে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে যাই- কিন্তু একজন ব্যর্থ রাজনীতিবীদ হিসেবে আমার কলংকিত মুখ ঐ সব আগুনে পোড়া মানুষজনকে যে দেখানো যাবেনা- এতটুকু চেতনা এখনো ধারন করছি বলেই আমার মনজগতে অনেক উথাল পাথাল হচ্ছে প্রতি মূহুর্তে।


সন্ধ্যার পর ঢাকা ভূতরে নগরী হয়ে যায়। দিনের বেলায় সবাই চলে ইতিউতি চোখ নিয়ে- সর্বদা একই ভয়- এই বুঝি কেউ এলো আর ককটেল মেরে দৌড় দিলো। টেলিভিশনে পুলিশের কিছু তৎপরতা দেখা যায়। কিন্তু নাগরিক হিসেবে রাস্তায় চললে দেখবেন- কোন এক জায়গায় বেঞ্চ পেতে তারা অলস সময় কাটাচ্ছে। টহলরত অবস্থায় পুলিশের গাড়ী দেখা যায় কালে ভদ্রে। রাতের বেলায় তারা একদমই চলে না। মাঝে মধ্যে হুইসেল বাজিয়ে ৩/৪ টি পুলিশের গাড়ী চলে যায় ব্যস্ত সড়ক দিয়ে। অবস্থা দেখে মনে হয় তারা হুইসেল বাজিয়ে কাউকে নিরাপদে সরে যাবার আহবান করছে।

ঢাকা মুলত: এই মূহুর্তে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। আপনি যদি নিউমার্কেট অথবা মোহাম্মদপুর কাঁচা বাজারে যান তাহলে দেখবেন সেখানে নিত্য প্রয়োজনীয় কাঁচা মালের কিরুপ হাহাকার যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক- অভিভাবক- আর শিক্ষার্থীরা গুমরে গুমরে কাদঁছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলের অফিসের সামনে কিছু কর্মী নিয়ে কয়েকজন নেতাগোছের মানুষ মুছকি মুছকি হেসে ক্যামেরায় পোজ দিচ্ছে। শহরের যে কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যান এবং শুনুন সবার কথা। বিশ্বাস না হলে তাদের কাগজপত্র পরীক্ষা করুন- দেখবেন সকলেই হয় ইতিমধ্যে দেউলিয়া হয়ে গেছে নয়তো দেউলিয়া হওয়ার পথে। এরপর আপনি তাদের মনের কথা জানার জন্য সম্প্রতি আবিস্কৃত হওয়া যন্ত্রটির সাহায্য নিন এবং ভালো করে শুনুন তারা কি আপনাকে অভিশাপ দিচ্ছে না অন্য কাউকে?

বিভাগীয় শহর, জেলা শহর এবং প্রত্যন্ত গ্রাম্য হাটবাজারে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। ঠিক যেনো জাতিগত দাঙ্গার মতো, যেমনটি হয়েছিলো ভারত ভাগের পর। এ দেশের টিভি গুলো নৈতিক কারনে অনেক কিছু প্রকাশ করছেনা বা পারছেনা। কিন্তু বিদেশী টিভিতে যা দেখাচ্ছে তাতে পরিস্থিতি সিরিয়া, কাবুল বা কান্দাহারের চেয়েও ভয়াবহ ভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে আর এসব দেখে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীরা ঐ দেশীয় লোকদের নিকট শরমে মরমে মরে যাচ্ছে আর দেশে বসবাসরত তাদের আত্নীয় স্বজনের জন্য কান্নাকাটি করছে। এতসব তান্ডবের মধ্যে নির্বাচনের চেষ্টা হচ্ছে। ঢোল, ডগর বাঁজিয়ে একদল নাছছে আর একদল ভি চিহ্ন দেখিয়ে রাজপথ প্রকম্পিত করছে- ঠিক যেনো নজরুলের কবিতার মতো- আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুস্পের হাসি। তারা সবাই আপনার সামনে বীরত্ব দেখিয়ে হম্বিতম্বি করে আর পর্দার আড়ালে এসে ভয়ে জড়সড় হয়ে ভিন্ন কথা বলে। ভিন্ন চিত্র ও অবশ্য আছে- কেউ কেউ আপনাকে পতনের অতলান্তে নিয়ে যাবার জন্য ঠান্ডা মাথায় অনেক কিছু করছে। আপনিতো অবশ্যই জানেন অতিরিক্ত তৃষ্ণার্ত মানুষকে হঠাৎ করে ঠান্ডা সুপেয় পানি দিলে লোকটির কি অবস্থা হয়। সে পানি খেয়ে মারা যায় অথবা আপনার হাত থেকে পানি ছিনিয়ে নেবার জন্য আপনার ওপর যেকোন জঘন্য অনাচার ঘটিয়ে দেয়।

যারা একবার আপনার শত্রু হয়ে গেছে তারা কখনো বন্ধু হবেনা। আপনি দীর্ঘদিন যাদেরকে অপমানিত করেছেন আপনার প্রয়োজনে তাদেরকে যদি সম্মানিত করেনও সে ক্ষেত্রে তাদের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হয়ে দাড়ায়- আপনার প্রতি প্রতিশোধ নিয়ে নিজেদের অতীত অপমানের ঝাল মেটানো এবং তৎপর উল্লাস নৃত্য করা। আপনি বিশ্বাস করুণ- দীর্ঘ ইতিহাসের পথ প্ররিক্রমায় এর ব্যতিক্রম ঘটেনি একবারের জন্যও বিশেষত রাজনীতিতে। হায় আল্লাহ্! শেষ মুহুর্তে কেনো আপনি সেই উদারতা কিংবা দূর্বলতা দেখিয়ে পুরস্কার গুলো দিলেন যার জন্য তারা বহু বছর ধরে অপেক্ষা করছিলো।

১৭৫৭ সালের এপ্রিল মে মাসের কিছু ঘটনা যা কিনা ঘটেছিলো মূর্শিদাবাদের রাজ দরবারে, তার সঙ্গে আপনার জীবনের কিছু উপাখ্যান ইচ্ছে করলে মিলিয়ে নিতে পারেন। প্রথম থেকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা রাজ্যের সিনিয়র কিছু আমীর ওমরাদের অপছন্দ করতেন এবং উঠতে বসতে অপমান করতেন। একবার তাদেরকে রাজ দরবারে গ্রেফতারও করে বসেন। তারপর আবার তার চারিত্রিক দূর্বলতার কারণে আমীর ওমরাদেরকে ছেড়ে দেন। ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধের ঠিক এক মাস আগে নবাব তার ৫৩ হাজার সদস্যের সেনাবাহিনীর মূল কমান্ড তাদের হাতে দিয়ে দেন যাদেরকে তিনি এতকাল অপমান করে আসছিলেন। অন্যদিকে নিঃস্বার্থভাবে যারা তাকে ভালোবাসতো সেইসব জেনারেলকে রাজধানী রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে তিনি নিজে রণাঙ্গনে উপস্থিত হলেন। চক্রান্তকারীরা যুদ্ধক্ষেত্রে এসে নবাবের তাবু এমনভাবে সুরক্ষিত করলো যে মোহন লাল, মীর মদনরা তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগও পেলো না।

আপনাকে আমি ইতিহাসের শ’খানেক উদাহরণ দেখাতে পারবো যেখানে গত একহাজার বছরে বার বার একই ভুল করা হয়েছে এবং হুবহু একই পরিণতি হয়েছে। আমার প্রশ্ন কেনো এমনটি হয় বার বার! এর উত্তর কিন্তু আঁতেল প্রকৃতির লোকেরা দিয়ে গেছেন যাদেরকে আবার আপনারা ভারী অপছন্দ করে থাকেন। মানুষ একটা সময় এসে নিজেকে অতিমানব ভাবতে শুরু করে। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটি নফস যার নাম ‘এজাহারে তাজাল্লুল’- এর প্রভাবেই এমনটি হয়ে থাকে।

অনেকে দেশের মানুষকে আনুগত্যহীন ও অস্থির প্রকৃতির বলে গালি দিতে চায়। কিন্তু আমার মনে হয় উত্তম শাসকের অভাবে মানুষ অস্থিরতা দেখায়। এই বাংলায় শশাংক, সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ, হোসেন শাহ কিংবা শায়েস্তা খানের মতো শাসক ছিলেন যারা একেক জন ২০/৩০ বছর এক নাগারে শাসন করেছেন। তখন বিদ্রাহ ছিলো না, অপরাধীও ছিলো না এবং কারাগার গুলো বলতে গেলে খালি ছিলো। পাল বংশ এক নাগারে ৪০০ বছর নির্বিঘ্নে রাজত্ব করলো আর আমরা চার বছর পার করতে পারছিনা। রাজার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য্য হলো তার ন্যায়পরায়ণতা আর রাজাকে শেষ করে দেয় তার মোনাফিকী এবং অন্যায় আচরণ।

মানুষ হিসেবে আপনি যদি সম্রাট শাহজানের সেই গল্পটির ইতিকথা স্মরণ করেন তবে অনেক কিছুই এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে। দিল্লীতে কায়েস নামক এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক ছিলো। বহুবছর ভিক্ষা করার পরও তার চাল চুলো কিছুই হলো না দেখে শহরবাসী মুরুব্বীরা সহানুভূতি জানিয়ে বললো- কি গো কায়েস তোমার তো কিছুই হলো না। তুমি কি সারাজীবন ভিক্ষা করেই যাবে? ভিক্ষা ছাড়া আর করবোই বা কি! লোকজন তো এক পয়সার বেশি দেয় না- তাও আবার সবাই দেয় না। হবে কিভাবে! কায়েস উত্তর করলো। লোকজন বললো- বাদশার কাছে যাও। তিনি মস্ত বড় দাতা। একবার দিলে আর জীবনে ভিক্ষা করতে হবে না। কায়েস বললো- কিভাবে যাবো? রাজ দরবারে তো কোন ভিক্ষুক ঢুকতে দেয় না। বাদশাহ রাজপথে নামার আগে প্রহরীরা সেখানকার সব ভিক্ষুক তাড়িয়ে দেয়। লোকজন বললো- তুমি এখন দিল্লী জামে মসজিদে যাও। বাদশাহ নামাজ পড়ছেন। তুমি মুসল্লির বেশে ঢুকে অপেক্ষা কর এবং নামাজ শেষে তাকে সালাম দিয়ে মনের দুঃখ বল। কায়েস সত্যিই মসজিদে ঢুকলো এবং দেখল বাদশাহ নামাজ শেষে মোনাজাত করছেন। হাউমাউ করে অঝরে কাদছেন। অনেকক্ষণ দাড়িয়ে কায়েস ভারী আশ্চর্য হয়ে বাদশার কান্নাকাটি দেখলো। মোনাজাত শেষে বাদশাহ উঠে দাড়ালেন এবং অশ্রুসজল নেত্রে কায়েসের দিকে তাকিয়ে সালাম দিলেন। বাদশার মন ছিলো ঐ মুহুর্তে যথেষ্ট নরম এবং অহংকার মুক্ত। কায়েস সালামের উত্তর দিয়ে মসজিদ থেকে বের হতে উদ্যত হলো-

বাদশাহ কায়েসকে ডাক দিলেন। বললেন- তোমাকে দেখেতো একজন ভিক্ষুক বলেই মনে হচ্ছে। আরো মনে হচ্ছে তুমি হয়তো আমার কাছে কিছু চাইতে এসেছিলে। আমার কাছে যারা আসে তারা তো কিছু না চেয়ে ফেরত যায় না। অথচ কি আশ্চর্য তুমি ফেরত চলে যাচ্ছো! কায়েস বললো- হে বাদশাহ নামদার! আপনি ঠিকই ধরেছেন যে আমি একজন ভিক্ষুক এবং আপনার নিকট ভিক্ষা চাইতে এসেছিলাম। কিন্তু আপনাকে দেখে আমার জ্ঞানের চক্ষু খুলে গেছে। আমি মানুষ জনের কাছে ভিক্ষা চাই কিন্তু জীবনে কোনদিন কান্নাকাটি করিনি। কিন্তু আজ আমি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শাহনশাহকে দেখলাম অন্য কারো নিকট আমার চেয়েও বড় ভিক্ষুক হয়ে চোখের পানি ফেলে ভিক্ষা চাইতে। কাজেই এখন থেকে আমি তারই কাছেই সবকিছু চাইবো যার নিকট শাহেন শাহ ভিক্ষার হাত বাড়ান।
সূত্র: ফেসবুক স্ট্যাটাস

No comments

Powered by Blogger.