নজরুলের বিচার আমাদের ভ্রান্তি by কুদরত-ই-হু

নজরুল
বাংলাভাষী মানুষ কবি নজরুল বলতে যে নজরুলকে সাধারণভাবে বুঝে থাকেন, সেই নজরুলের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯২২ সালে অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে। তখন তাঁর বয়স তেইশ বছর। তেইশ বছর বয়সী এই কবির আবির্ভাব বাংলা কাব্যজগতে বেশ একটা অস্বস্তি তৈরি করে। এই অস্বস্তির কারণ কেবল তাঁর কবিতা নয়, স্বয়ং তাঁর কবিতার নন্দনতত্ত্ব। এতকাল বাঙালি কাব্যপাঠক কবিতা বলতে যা বুঝতেন, সেই ধারণার সঙ্গে নজরুলের কবিতা ঠিক খাপ খাচ্ছিল না—না বিষয়গত দিক থেকে, না প্রকাশভঙ্গির দিক থেকে। ‘আধুনিক’ বাংলা কবিতার প্রায় পৌনে এক শতাব্দীর যে ইতিহাস, সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নজরুলের কবিতা রক্ষা করেনি। নজরুলের যে কাব্যসাধনা, তা নিঃসন্দেহে দাবি করে এক নতুন নন্দনতত্ত্বের প্রস্তাবনা। কিন্তু নজরুলের সমকালীন এবং পরকালীন অধিকাংশ সমালোচকই নতুন নন্দনতত্ত্বের প্রস্তাবনায় যাননি। তাঁরা অধিকাংশ সময় নজরুলকে প্রথাগত নন্দনতত্ত্বের মাপকাঠিতে মেপে হয় তাঁকে খাটো করেছেন, নয়তো বলেছেন, নজরুল বাংলা কাব্যে এক নতুন সুর ও স্বরের বার্তা ধ্বনিত করেছেন। নজরুল-মূল্যায়ন করতে গিয়ে প্রায় সব সমালোচকই ‘আধুনিক’ বাংলা কাব্য-বিবেচনার যে মাপকাঠি বা নন্দনতত্ত্ব তাকেই প্রয়োগ করেছেন।
এই ‘আধুনিক’ নন্দনতত্ত্বের ধারণা উপনিবেশের হাত ধরে বাংলায় প্রবেশ করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি ‘পশ্চিমি আধুনিক’ সাহিত্যের রুচি ও চেতনা নিয়ে বাংলা সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। ফলে এর নন্দনতত্ত্বও ইউরোপ থেকে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। এই নন্দনতত্ত্বের প্রধান শর্তই হচ্ছে সাহিত্যকে বিশুদ্ধ শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা। শৈল্পিক সুষমা তৈরি, মানসিক আনন্দ প্রদান আর মহৎ মনের প্রতিফলন ঘটানোই সাহিত্য-বিবেচনার এবং সাহিত্য রচনার মূল উদ্দেশ্য। বুর্জোয়া জীবনের ফিটফাট ‘আধুনিক’ বুর্জোয়া সাহিত্যের শর্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। ‘আধুনিক’ নন্দনতত্ত্বের এই ধারণার মধ্য দিয়েই উপনিবেশ-পরবর্তী সময়ের বাংলা সাহিত্য এবং সাহিত্য-সমালোচনা বেড়ে উঠেছে। ফলে, এই প্রথাগত ‘আধুনিক’ নন্দনতত্ত্বের মাপকাঠি যখনই নজরুলের মূলধারার কাব্য-কবিতার মধ্যে চারিয়ে দিয়েছেন, তখনই তাঁরা অবাক হয়ে লক্ষ করেছেন যে, নজরুলের কাব্য-সাহিত্য সেই মানদণ্ডের একদম নিচে পড়ে থাকে। এ রকম কাজ অনেকেই করেছেন। কাজী আবদুল ওদুদ, বুদ্ধদেব বসু, এমনকি হালের হুমায়ুন আজাদ। ওদুদ ১৯৪১-এ লিখিত তাঁর ‘নজরুল ইসলাম’ শিরোনামের প্রবন্ধে বললেন, ‘নজরুলের কবিতায় যে তারুণ্য রূপ পেয়েছে তার সাহিত্যিক মর্যাদা কেমন, সেটিও একটি বড় অনুধাবনের বিষয়। একটু মনোযোগী হলেই চোখে পড়ে, নজরুলের রচনা, বিশেষ করে তাঁর বিদ্রোহী যুগের রচনা অনবদ্য নয়। শ্রেষ্ঠ কবিদের বিশেষ বিশেষ কবিতায় কবি-কল্পনার যে পূর্ণাঙ্গতা প্রকাশ পায়, নজরুলের রচনায় সেটির অভাব মাঝে মাঝে প্রায় বেদনাদায়ক হয়েছে।’
নজরুলের মধ্যে ওদুদ ‘বুর্জোয়া ফিটফাট’-এর খোঁজ করেছেন। নজরুলবিষয়ক তাঁর লেখা তিনটি প্রবন্ধেই তিনি মহৎ কবির উদাহরণ হিসেবে টেনেছেন রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ। বারবার তিনি নজরুলের মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে না পেয়ে হতাশ হয়েছেন। অনেকে এ জন্য ওদুদকে দোষারোপ করেন। যেমন, আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর নজরুল: কালজ কালোত্তর গ্রন্থে ওদুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, এটি ওদুদের সমস্যা নয়। এটি মূলত নন্দনতত্ত্বের সমস্যা। ওদুদ-ঘরানা ছাড়াও নজরুলের আরও একধরনের মূল্যায়ন চালু আছে। সেটিকে আমরা বলতে পারি দায়হীন মূল্যায়ন। এই মূল্যায়ন নজরুলের নন্দনতাত্ত্বিক মূল্যায়নের দায়িত্ব নেয় না; বরং নজরুলের স্বর ও সুরের ভিন্নতা বিষয়ে উচ্ছ্বসিত হয়, কিন্তু সেই ভিন্নতার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নির্মাণ করে না। নজরুলের জন্য যে ভিন্ন কাব্যপাঠ-ব্যাকরণের প্রয়োজন, সেই ব্যাকরণিক সূত্র নির্দেশ করে না। অথচ ভিন্ন নন্দনতত্ত্বের প্রস্তাবনা ছাড়া নজরুলকে সম্যকভাবে পাঠ সম্ভব নয়। সেই নন্দনতত্ত্বটি কী—কবির নিজের ভাষ্য এবং তাঁর কাব্যপ্রবণতা পর্যালোচনা করে তার একটি রূপরেখা হাজির করা যেতে পারে। নজরুল সাহিত্যকে নিছক আনন্দ আর সৌন্দর্য সৃষ্টির ক্ষেত্র মনে করতেন না। বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব হয়েছে ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল’ বন্ধ করার দায়িত্ব নিয়ে। নজরুলের আগের প্রায় পৌনে এক শতাব্দীর কাব্য তার মুষ্টিমেয় জনগোষ্ঠীর মর্মে পশ্চিম থেকে আগত রোমান্টিক আনন্দ-বেদনা আবিষ্কারের ও প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছিল। ওই কবিতা তার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর গ্লানিময় ইতিহাসকে, অবমাননাকে রুখে দেওয়ার দায়িত্ব নেয়নি।
দায়িত্ব নিয়েছিল ইউরোপীয় নতুন ভাব-কল্পনাকে ভাষা দেওয়ার। এ কারণে এসব কবিকে আবিষ্কার করতে হয়েছিল বাংলা শব্দের ছদ্মাবরণে ইউরোপীয় অর্থে মার্জিত ভাষাকাঠামো। কিন্তু নজরুল তো সে পথের পথিক ছিলেন না। দীর্ঘকাল থেকে জমে ওঠা জঞ্জাল সাফ করতে যেমন বহু মানুষের সমবায়ী প্রচেষ্টা দরকার হয়, তিনিও তেমনি বহু মানুষের মুখের ভাষাকে আশ্রয় করে কোলাহল-মুখরিত এক কাব্যভুবন নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতা মানেই বহু মানুষের শোরগোল, অসভ্য-অমার্জিত অট্টহাস্য, ধসে পড়ার শব্দ, আসুরিক চিৎকার। সর্বৈব ধ্বংস আর সম্মিলিত প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে নতুন কিছু সৃজনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি কাব্যরচনা করেছেন। তাঁর কাব্যবিচারের নন্দনতত্ত্ব সৌন্দর্য ও আনন্দ-সৃজননির্ভর ‘আধুনিক’ নন্দনতত্ত্বের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলা ভাষা যে এত ধারালো, তা তো নজরুলই আবিষ্কার করলেন। সাহিত্য যে প্রতিরোধের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, তার উদাহরণও প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি। নজরুলের স্বতন্ত্র জীবনদৃষ্টি এবং জীবনবোধের তীব্রতাই তাঁকে স্বতন্ত্র নন্দনতত্ত্বের অনুসন্ধানী করেছে। ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া/ ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া’—এই বাকভঙ্গি এবং শব্দচয়নকে তো বাংলা গদ্য এবং কবিতা ঊনবিংশ শতাব্দীতেই কবর দিয়েছে। বাংলায় ‘আধুনিকতা’ যেমন এর জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক যাপনের ধারাবাহিকতায় দেখা দেয়নি, তেমনি বাংলা কাব্য-সাহিত্যও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত-মুন্সিদের হাতুড়ি-বাটালি দিয়ে গড়াপেটা করা একটা চাপানো ভাষার ভেতর দিয়ে বিকশিত হয়েছে।
নজরুল সেই কাব্য এবং ভাষার মহান আদর্শকে হেঁচকা টানে সদর রাস্তায় নিয়ে এলেন। তিনি কাব্যে আরবি-ফারসি শব্দের বহুল প্রয়োগ করেছেন—এটি তাঁর ভাষাবিচারের ক্ষেত্রে আক্ষরিক কথা। কিন্তু ভাবার্থের কথা হচ্ছে, নজরুল ভাষাকে উদার, মুক্ত এবং গণতান্ত্রিক করে দিলেন; জনবিচ্ছিন্নতার কেটে যাওয়া সূত্র লাগিয়ে জনসম্পৃক্ত করলেন। আহমদ ছফা তাঁর ভাষার মধ্যে এই জনসম্পৃক্তি লক্ষ করেই বলেছেন, ‘নজরুল তার কাব্যভাষা নির্মাণে চলতি ভাষারীতির...দ্বারস্থ হয়েছেন।’ আর ভাষায় গণতান্ত্রিকতার বিষয়ে বলেছেন, ‘নজরুলের কাছে সমগ্র বাঙালী সমাজের ঋণ এই যে, নজরুল বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যকে বাঙলার হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করে নব বিকাশধারায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে অনেক দূর পর্যন্ত গাঁথুনি নির্মাণ করেছিলেন।’ এর মানে এই নয় যে, নজরুল সংস্কৃত শব্দকে তাঁর কাব্যভাষা থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন। তাঁর কাব্যভাষায় প্রচুর সংস্কৃত শব্দ ব্যবহূত হয়েছে, কিন্তু ভাষার ভেতরের আকাশটাকে উদারীকরণ করে, যে-সে-শব্দের প্রবেশ অনুমোদন দিয়ে এবং মৌখিক বাকভঙ্গি ব্যবহার করে তিনি বাংলা কবিতা থেকে চোখ ও কানের দূরত্বকে ঘুচিয়ে দিয়েছেন। ঔপনিবেশিক সাহিত্য কবিতাকে দৃষ্টি-ইন্দ্রিয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল। কবিতাকে শ্রুতির সম্পর্ক থেকে বিচ্যুত করেছিল। নজরুল সেই শ্রুতি-ইন্দ্রিয়কে বাংলা কবিতায় ফিরিয়ে আনলেন। এ কারণে নজরুলের অনেক কবিতা পড়ার সময় সংস্কৃত শব্দের প্রচুরতা একধরনের কাঠিন্য তৈরি করলেও সেই কবিতা যখন কানের কাছে আসে, তখন তা বেশি বোধগম্য ও সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে ছন্দও এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে তাঁর কবিতায়। দেখা যাবে, তাঁর মূলধারার অধিকাংশ কবিতা স্বরবৃত্ত অথবা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। এই ছন্দ গ্রহণের ক্ষেত্রে নজরুলের সঙ্গে আরেক গণসম্পৃক্ত কবি জসীমউদ্দীনের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে।
কবিতাকে সহজ ও গণগ্রাহ্য করে তোলার জন্য জসীমউদ্দীনও এই সহজবোধ্য ও আরামপাঠ্য স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দের পিঠে সওয়ার হয়েছিলেন। যদিও নজরুলের কাব্যে বিষয়ের ও ভাবের ওচড়-মোচড়ের কারণেই স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দের বৈচিত্র্য ও নিরীক্ষা অনেক বেশি, যা জসীমউদ্দীন-এ নেই। তবু অক্ষরবৃত্তের নানা নিরীক্ষা এবং তার প্রয়োগ উপেক্ষা করে নজরুল মধ্যযুগের পয়ারের মতোই বোধগম্য ও জনসম্পৃক্ত স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। নজরুল স্পষ্ট কথা বলার পক্ষের লোক। তিনি মনে করেন, ‘স্পষ্ট কথা বলায় একটি অবিনয় নিশ্চয় থাকে; কিন্তু তাতে কষ্ট পাওয়াটা দুর্বলতা।’ বেশি বিনয় ‘মানুষকে ক্রমেই ছোট করে ফেলে, মাথা নীচু করে আনে’—নজরুল এই বিনয়ের বিপক্ষের লোক ছিলেন। তিনি মনে করতেন ‘দেশের যারা শত্রু, দেশের যা-কিছু মিথ্যা, ভণ্ডামি, মেকি তা সব দূর করতে হবে।’ এই কাজ কবির, এই কাজ নজরুলের। জীবনে এবং প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি ‘মেকি’র বিরুদ্ধে। তাঁর নিজের লেখার ভেতরবাড়ির স্বরূপ সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমার লেখায় ফুটে উঠেছে সত্য, তেজ আর প্রাণ।’ নিজেকে তিনি মনে করতেন ‘সত্য প্রকাশের যন্ত্র’। ‘অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস’ই নজরুল-নন্দনতত্ত্বের অন্যতম নিয়ামক। এ ছাড়া ‘যে ভাষা-শৃঙ্খলে আমাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা, তাতেই আছে অসংখ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো—জ্ঞানের, শৃঙ্খলার, সংযমের, সভ্যতার। এগুলোই আমাদের সংকোচে বিহ্বল করে রাখে। আমরা এগুলোকেই নির্মাণ-পুনর্নির্মাণ করতে থাকি, কদাচ ভেঙে তৈরি করি নতুন কাঠামো।
জন্মসূত্রে, শিক্ষাসূত্রে, জীবনযাপনসূত্রে, আর মনের বিশিষ্ট গড়নের কারণে নজরুল নিয়ন্ত্রক-কাঠামোগুলোর বাইরে থেকেছেন।’ (মোহম্মদ আজম, সাহিত্য পত্রিকা, বাংলা বিভাগ, ঢা.বি, বর্ষ-৫০, সংখ্যা-২-৩) উপর্যুক্ত জীবনচেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি, বেড়ে ওঠা, ঘোষণা এবং উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলা কবিতায় আর কেউ আবির্ভূত হননি। এসব কারণে নজরুলের নন্দনতত্ত্বের মধ্যে বহু মানুষের সমাগম এবং তাদের কল্যাণের মতো মাপকাঠি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। জনবিচ্ছিন্ন, ব্যক্তিগত ভোগ-উপভোগের যে সাহিত্যতত্ত্ব, তার বদলে নজরুলে প্রযুক্ত হয়েছে সম্মিলিত ভোগ-উপভোগ এবং জাগরণের তত্ত্ব। ভাবে-ভাষায়-প্রকাশে এই নন্দনতত্ত্ব অকৃত্রিমতার পক্ষপাতী। বুর্জোয়া-জীবনের মতো সাহিত্যে ‘বুর্জোয়া ফিটফাট’ তাঁর নন্দনতত্ত্বের আওতায় সম্পূর্ণভাবে আঁটে না। এ কারণেই নজরুলের কাব্যপ্রবাহ তৈরি করেছে উপনিবেশবিরোধী এক নতুন নন্দনতত্ত্ব। নন্দনতত্ত্বের এই ভিন্নতা লক্ষ করে আল মাহমুদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘র্যাঁবো যেমন গল জাতির কাব্যবিচার ও সৌন্দর্যতত্ত্বের ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তেমনি নজরুলও বাংলা ভাষাভাষী দ্রাবিড় ভেড্ডিড রক্তমিশ্রিত একটি বিরাট মানবগোষ্ঠীর প্রচলিত উপমা পদ্ধতির শৃঙ্খলাকে তোলপাড় করে দিয়েছিলেন।’ আল মাহমুদ কথিত ‘প্রচলিত উপমা পদ্ধতি’-ই হচ্ছে ঔপনিবেশিকতার হাত ধরে আসা ইউরোপীয় নন্দনতত্ত্ব। নজরুল এই ঔপনিবেশিক নন্দনতত্ত্বের বাইরে গিয়ে ‘দ্রাবিড় ভেড্ডিড রক্তমিশ্রিত একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর’ জন্য তার নিজস্ব একটি নন্দনতত্ত্ব হাজির করেছেন, যার নামকরণ করা যায় বাঙালিয়ানা নন্দনতত্ত্ব।

No comments

Powered by Blogger.