সাক্ষাৎকার-সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই প্রধান প্রতিষেধক by ডা. এ কে আজাদ খান

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : বদরুদ্দোজা সুমন  সমকাল : ডায়াবেটিসের প্রকোপ কোন পর্যায়ে রয়েছে? আজাদ খান : সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ বিশ্বজুড়ে কমে গেছে। অন্যদিকে বেড়েছে অসংক্রামক ব্যাধি। বর্তমানে উন্নত এবং উন্নয়নশীল প্রায় সবক'টি দেশে অসংক্রামক ব্যাধির কারণে প্রাণসংহার হচ্ছে বেশি।


ডায়াবেটিস অসংক্রামক ব্যাধিগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। দ্রুত এ রোগ বাড়ছে। বাংলাদেশেও ডায়াবেটিস পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পর্যবেক্ষণ বলছে, গ্রামের মানুষের মধ্যে প্রি-ডায়াবেটিস কন্ডিশনের হার বেশি, আর শহরের লোকের মধ্যে ডায়াবেটিস বেশি। এ দেশে কমবেশি ৭০ লাখ মানুষ ঘাতক রোগ ডায়াবেটিসে ভুগছে। বিপুলসংখ্যক এই রোগীর সেবা নিশ্চিত করা আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সমকাল : বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের ব্যাপকতার কারণ কী?
আজাদ খান :আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন এ জন্য দায়ী। শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে দিয়েছে মানুষ। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে খোলা মাঠ কমে গেছে। নগরায়নের বিপক্ষে নই আমি; কিন্তু নগরায়ন করতে হলে যে তাতে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা রাখা যাবে না তা তো নয়। এমনকি বিভিন্ন স্কুলেও আজকাল খেলার মাঠ থাকে না। প্রতিটি স্কুলে খেলার মাঠ থাকবে_ এটা প্রত্যাশা করা আজকাল বিলাসিতা মনে হবে; কিন্তু দু'তিনটি স্কুল মিলে তো একটি খেলার মাঠের ব্যবস্থা করতে পারে। একেক দিন একেক স্কুলের শিশুরা তাতে খেলা করবে। খেলাধুলা না করা, অতিরিক্ত চর্বি ও শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণ করা এবং শারীরিক পরিশ্রম না করার ফলে মানুষের দেহে ডায়াবেটিস বাসা বাঁধছে। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, ডায়াবেটিসের সব ধরনের ঝুঁকির উপাদান (রিস্ক ফ্যাক্টর) এ দেশে বিদ্যমান।
সমকাল :এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
আজাদ খান : ঘাতক এই রোগটি প্রাথমিকভাবে প্রতিরোধের কথাই ভাবতে হবে। রোগটি থেকে বাঁচতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি হতে হবে প্রধান দাওয়াই। যাদের রোগটি হয়ে গেছে তাদের মনে রাখা চাই_ 'শৃঙ্খলাই জীবন।' অর্থাৎ সুশৃঙ্খল জীবনযাপন আপনাকে দীর্ঘায়ু প্রদান করতে পারে। ফাস্টফুডে উচ্চ ক্যালরি এবং অতিরিক্ত মুটিয়ে যাওয়ার সব উপাদান থাকে। আমরা খেতে নিষেধ করছি না, কম খেতে বলছি।
সমকাল : দেশে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা সুবিধা কোন অবস্থায় আছে?
আজাদ খান : দেখুন, ডায়াবেটিস চিকিৎসায় বাডাস দেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল 'বারডেম' পরিচালনা করছে। এই আঙিনায় একবার এলে রোগীরা আস্থা খুঁজে পান। উচ্চমূল্যের ইনসুলিন বিনামূল্যে দেওয়াসহ দরিদ্র রোগীদের জন্য বেশকিছু সেবা চালু আছে। বাডাসের কাছ থেকে 'অ্যাফিলিয়েশন' (অধিভুক্তি) নিয়ে জেলাপর্যায়ে ডায়াবেটিক সমিতি চালাচ্ছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। মাঠপর্যায়ে সমিতি পরিচালিত হাসপাতালগুলোতে কর্মরত চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করে দেওয়া হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে এক অর্থে ডায়াবেটিক রোগীর সেবাকে আমরা অন্তত জেলাপর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছি। কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য যে, সীমিত সামর্থ্যের কারণে এ পর্যন্ত আমরা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের বেশি ডায়াবেটিক রোগীকে সেবার আওতায় আনতে পারিনি। আর্থিক সঙ্গতির অভাবসহ আরও অনেক সমস্যা মোকাবেলা করে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
সমকাল : সেবা সম্প্রসারণে নতুন কী পদক্ষেপ নিয়েছে বাডাস?
আজাদ খান : জেলাপর্যায়ে অধিভুক্ত সমিতিগুলো রোগীদের সেবা দিতে নিরন্তর কাজ করছে। সেবা ছড়িয়ে দিতে ২০১০ সালের দিকে 'এক্সটেনশন অব ডায়াবেটিক কেয়ার' শীর্ষক প্রকল্প নেওয়া হয়। এ পর্যন্ত ঢাকার বাইরের প্রায় ছয় হাজার চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু থানাপর্যায়ে ওই ধরনের কোনো ব্যবস্থায় আমরা যেতে পারিনি। থানাপর্যায়ে ডায়াবেটিসের প্রাথমিক সেবার ব্যবস্থা করতে ব্যক্তিপর্যায়ে পরিচালিত প্রাইভেট চেম্বার ও জেনারেল প্র্যাকটিশনারদের দক্ষতা বাড়ানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। উপরোক্ত প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত চিকিৎসকদের ৩৬টি প্রাইভেট চেম্বারে 'কুল চেইন' অনুযায়ী ইনসুলিন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে দেওয়া এবং ব্লাড সুগার পরীক্ষা করার সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। থানাপর্যায়ে প্রায় ৯০ জন চিকিৎসককে ডায়াবেটিক রোগীকে সেবা দেওয়ার মতো প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচি চলমান এবং এটিকে আরও এগিয়ে নিতে চাই। টেলিমেডিসিন পদ্ধতিতে 'এম কেয়ার' কর্মসূচির আওতায় রোগী নিবন্ধন করে জরুরি পরামর্শ সেবা প্রদানের ব্যবস্থা চালু করতে পেরেছি। এতে উপকৃত হচ্ছেন নিবন্ধিত রোগীরা।
সমকাল : ডায়াবেটিক সেবা সম্প্রসারণে কী কী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে?
আজাদ খান : সমিতি তার নিজস্ব সামর্থ্যে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। সরকার বার্ষিক হিসাবে বাডাসকে কিছু অর্থ সহায়তা বরাদ্দ দেয়। এর বাইরে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে প্রাপ্ত সহায়তা নিয়ে কার্যক্রম চলে। মূল কথা হলো, এতদসত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক রোগীর চাহিদা মেটাতে সরকারসহ অন্যদের সম্মিলিত সহায়তাও যথেষ্ট হচ্ছে না। আমাদের সাধ আছে কিন্তু সাধ্যের অভাবে এগোতে পারি না। কোনো ডায়াবেটিক রোগী যাতে বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়, ওই অবস্থায় আমরা এখনও পেঁৗছাতে পারিনি। এ লড়াই চলমান। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানপর্যায়ে আরও অনেক সংগঠনকে আমরা পাশে পেতে চাই। সরকারেরও আরেকটু উদারতা আমরা প্রত্যাশা করি।
সমকাল : ডায়াবেটিস থেকে অন্য কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?
আজাদ খান :ডায়াবেটিস অনেক রোগ সৃষ্টিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির সংকোচন অন্যতম। এতে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। কিডনি রোগের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস বড় রিস্ক ফ্যাক্টর। এ ছাড়া স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা এবং অন্ধত্ব ও দৃষ্টি বিচ্যুতির অন্যতম প্রধান কারণ ডায়াবেটিস।
সমকাল :কোনো লক্ষণ ছাড়া কি ডায়াবেটিস হতে পারে?
আজাদ খান : হ্যাঁ, হতে পারে। দেখুন, ডায়াবেটিস দুই ধরনের হয়। টাইপ-১ এবং টাইপ-২। বিশেষত টাইপ-২ ডায়াবেটিস পূর্বলক্ষণ ছাড়াই হঠাৎ কোনো একটি জটিলতা নিয়ে ধরা পড়তে পারে। তাই ৪৫ বছরের ঊধর্ে্ব সব মানুষের, বিশেষ করে যাদের পূর্বপুরুষ ও পরিবারের অন্যদের ডায়াবেটিসের ইতিহাস আছে, তাদের প্রতি ছয় মাস থেকে এক বছর পরপর ডায়াবেটিসের পরীক্ষা করানো উচিত।
সমকাল : ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণগুলো কী কী?
আজাদ খান : ঘন ঘন প্রস্রাব, স্বল্প সময়ে ওজন কমে যাওয়া, অধিক তৃষ্ণা এবং মুখ শুকিয়ে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, অতিশয় দুর্বল ভাব, ক্ষতস্থান সহজে না শুকানোর মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো উচিত।
সমকাল :খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে বিশেষজ্ঞীয় পরামর্শ কী?
আজাদ খান : ডায়াবেটিস একবার হয়ে গেলে সারাজীবন এটি বয়ে বেড়াতে হয়। এই রোগ সম্পূর্ণভাবে নিরাময় হয় না। শুধু নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তাই খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গটি সবার আগে চলে আসে। অতিরিক্ত তেল-চর্বিজাতীয় খাবার অবশ্যই পরিহার করতে হবে। বিড়ি-সিগারেটসহ অন্যান্য তামাকপণ্য সেবন করা চলবে না। আঁশযুক্ত খাবার যেমন_ শাকসবজি খেতে হবে নিয়মিত।
সমকাল :ফাস্টফুড নিয়ে কিছু বলবেন কি?
আজাদ খান : আজকাল বাবা-মায়েরা শিশুকাল থেকেই সন্তানদের ফাস্টফুডে অভ্যস্ত করে তুলছেন। ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে কেউ জেনে, আবার কেউ না জেনেই এগুলো বাচ্চাদের খাওয়ান। উচ্চ ক্যালরি ও তেল-চর্বিসমৃদ্ধ এসব খাবার দ্রুত মুটিয়ে যাওয়ার কারণ। অতিরিক্ত মুটিয়ে গেলে শুধু ডায়াবেটিসই নয়, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোকের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। ফাস্টফুডের প্যাকেটের গায়ে কী পরিমাণ ক্যালরি আছে সে তথ্য লেখা থাকছে না। এটিকে বাধ্যতামূলক করা দরকার।
সমকাল : মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আজাদ খান : আপনাদেরও ধন্যবাদ। পাঠকসমাজকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি ডায়াবেটিস নিয়ে সচেতন থাকার আবেদন রাখছি।

No comments

Powered by Blogger.