বাবা কি কখনও সন্তানের ঘাতক হন? by হারুন উর রশীদ

হারুন উর রশীদ
মামলাটির এখনও তদন্ত চলছে। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি না। আদালতের রায়ও দেখতে হবে। এরপরও হবিগঞ্জের কিশোরী বিউটি আক্তারকে হত্যার ঘটনায় তার বাবা জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ। আর তাদের এই দাবির ভিত্তি হলো—বিউটির বাবা সায়েদ আলী ও কথিত চাচা ময়না মিয়ার আদালতে দেওয়া জবানবন্দি। বিউটির নানি ও ময়না মিয়ার স্ত্রীও সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানন্দি দিয়েছেন।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের কিশোরী বিউটিকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আমি শুরু থেকেই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। এই ঘটনা একসঙ্গে ঘটেনি। অন্তত তিন-চার মাস ধরে এই ঘটনার পরম্পরা আছে। এর সর্বশেষ দৃশ্যে বিউটির লাশ পাওয়া যায় হাওরে। তাই ঘটনাগুলোর পরম্পরা একটু মিলিয়ে দেখা দরকার।
১.বিউটিকে বাবুল গত কয়েকমাস ধরেই যৌন হয়রানি করে আসছিল। এ নিয়ে গ্রাম্য সালিশে গত ডিসেম্বর মাসে অভিযোগ দেয় তার পরিবার। বিচার মেলে না।
২. অভিযোগ দেওয়ায় বিউটিকে বাবুল ও তার সহযোগীরা তুলে নিয়ে যায় ২১ জানুয়ারি। তাকে উদ্ধারে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। না পুলিশ না সমাজিপতিরা। ওই সময় তাকে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ।
৩.গত ২১ ফেব্রুয়ারি কৌশলে বিউটিকে তাদের বাড়িতে রেখে যায় বাবুল।
৪. ১ মার্চ বাবুল ও তার মায়ের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন বিউটির বাবা।  ৪ মার্চ আসামিদের গ্রেফতারে নির্দেশ দেন আদালত।
৫. হাওরে বিউটির লাশ পাওয়া যায় ১৭ মার্চ।
৬. লাশ পাওয়ার পর পুলিশ বাবুলের মা কলম চান ও এক তরুণকে আটক করে।
৭. র‌্যাব বাবুলকে আটক করে ৩১ মার্চ।
এই ঘটনাপ্রবাহ যা, তাতে সাধারণভাবে বাবুলকেই বিউটি হত্যায় সন্দেহভানভাজন বলে অভিযুক্ত করা যায়। বিউটির বাবা সায়েদ আলী  লাশ উদ্ধারের পর মামলাটি সেভাবেই করেছেন। কিন্তু ৬ এপ্রিল আদালতে সায়েদ আলী ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ময়না মিয়াসহ চারজনের জবানবন্দি তদন্তে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
৭ এপ্রিল হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা তা সংবাদ মাধ্যমের কাছে তুলে ধরেন। তার কথা, ‘বিউটির বাবা, ময়না মিয়া ও একজন ভাড়াটে খুনি বিউটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত, বাবুল নয়। বিউটিকে হত্যার সময় বিউটির বাবা সায়েদ আলী দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। একজন পেশাদার ভাড়াটে খুনি বিউটির হাত-পা চেপে ধরে রাখে। আর ময়না মিয়া বিউটির শরীরে ছুরি দিয়ে আঘাত করে।’

এই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ কী? তার জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, ‘গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর ইউপি নির্বাচনে ব্রাহ্মণডোরা ইউনিয়নের ২ নম্বর সংরক্ষিত আসনে ময়না মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তার বাবুল মিয়ার মা কলম চানের কাছে পরাজিত হন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বাবুলের পরিবারকে ফাঁসাতে বিউটিকে হত্যা করে লাশ হাওরে ফেলে দেন তিনি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ময়না মিয়া বাবুলের মা কলম চানকে নির্বাচনে দাঁড়াতে নিষেধও করেছিলেন। ’
কিন্তু সায়েদ আলী  কেন তার কিশোরী মেয়েকে ময়না মিয়ার প্রতিশোধের বলি হতে দিলেন? তার জবাবে পুলিশ সুপার জানান, ‘ময়না মিয়া বিউটির বাবাকে বুঝিয়েছে বিউটি ‘নষ্ট’ হয়ে গেছে। তার আরও দুই মেয়ে আছে বিউটির কারণে তাদের বিয়ে দিতে সমস্যা হবে। এই কথা বলে বিউটিকে হত্যায় প্ররোচিত করে।’
জবানবন্দিতে এই তথ্য কোথাও পাওয়া যায়নি যে, ময়না মিয়ার কাছ থেকে সায়েদ আলী কোনও সুবিধা নিয়েছেন।
৩১মার্চ বাবুলকে সিলেটের বিয়ানি বাজার থেকে বাবুলকে র‌্যাব গ্রেফতার করার পর বিউটি হত্যায় বাবুল জড়িত না থাকলেও ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে বলে র‌্যাব সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে।
এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে তিনটি বিষয় খুবই স্পষ্ট। ১. প্রথমবার গ্রাম্য সালিশে অভিযোগ দিয়ে বিচার পাননি বিউটির বাবা। ২. সালিশে বিচার দেওয়ার ‘অপরাধে’ তার মেয়ে বিউটিকে অপহরণ করে একমাস আটেকে রেখে ধর্ষণ করে বাবুল। কেউ তার মেয়েকে উদ্ধারে সহায়তা করেনি। ৩. এরপর ধর্ষণের মামলা দেওয়া হলেও পুলিশ বাবুলকে আটক করেনি।
পুলিশ যে তার দায়িত্ব পালন করেনি, তার প্রমাণ দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শায়েস্তাগঞ্জ থানার তদন্ত কমকর্তা জাকির হোসেনকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
ময়না মিয়ার কথায় কেন রাজি হলেন বাবা!
আমরা এখনও জানি না বিউটির বাবা সায়েদ আলী বিউটি হত্যাকাণ্ডে সত্যিই জড়িত কিনা। তবে পুলিশের ব্রিফিং করা আদলতে দেওয়া জবানবন্দি ধরেই বিশ্লেষণের চেষ্টা করছি। ঘটনা যদি সত্য হয়, তাহলে ময়না মিয়া আমাদের সামাজিক পরিস্থিতি ও বিচারহীনতাকে ব্যবহার করেছে।  গ্রাম্য সালিশে বিচার না পেয়ে বিউটির বাবা হতাশ হয়ে পড়েন।   এরপর ধর্ষণ মামলা করেও কোনও ফল না পাওয়ায় তারা হতাশা বেড়ে যায়। আর ময়না মিয়া আমাদের সামাজিক পরিস্থিতির নেতিবাচক দিক তাকে বুঝিয়ে এক ধরনের ভয়ের মধ্যে ফেলে দেয়। তার দু’টি মেয়ের (তিন ও ছয় বছর বয়স) অন্ধকার ভবিষ্যতের ছবি এঁকে দেখায় ধূর্ত ময়না মিয়া। ধর্ষণের শিকার  ‘কলঙ্কিত’ মেয়ে ও তার প্রভাবে পুরো পরিবার যে সমাজে ‘কলঙ্কিত’ হবে, কোথাও ঠাঁই পাবে না, তা বিউটির বাবার মাথায় ঢুকিয়ে দেয় ময়না মিয়া। এই পরিস্থিতি এক ভয়াবহ শূন্যতা ভর করে। সবকিছু অর্থহীন মনে হয়। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে। অন্ধকার ভবিষ্যৎ থেকে মুক্তির পথ খোঁজে। বিউটির দরিদ্র ও লেখাপড়া না জানা বাবা সমাজ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হয়তো ময়না মিয়ার ফাঁদে পা দেন। বেঁচে থাকার উপায় খোঁজেন সন্তানকে ‘বলি’ দিয়ে! আর ময়না মিয়ারা তাদের স্বার্থ হাসিল করার পথ পায়—প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এক অসহায় বাবার ওপর ভর করে!
বিউটির বাবাকে ময়না মিয়া প্ররোচিত করতে পেরেছে তিন কারণে
১. গ্রাম্য সালিশে বিচার না পাওয়া।
২.পুলিশের কোনও সহযোগিতা না পাওয়া। ধর্ষক গ্রেফতার না হওয়া।
৩. ধর্ষণ-পরবর্তী পর্যায়ে ধর্ষককে নয়, ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি সামাজিক নিন্দা। ‘নষ্ট মেয়ে’র প্রচলিত অপবাদ।
৪.পুরো পরিবারটি বিপর্যয়ের মুখে পড়া।

বিউটিকে জীবন দিতে হতো না:
যদি প্রথমে গ্রাম্য সালিশে বিউটির পরিবার বিচার পেতো, যদি অপহরণের পর বিউটিকে দ্রুত উদ্ধার করা হতো, অথবা ধর্ষণ মামলা হওয়ার পর যদি বাবুল গ্রেফতার হতো, তাহলে বিউটিকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হতো বলে আমি মনে করি না। সমাজ যদি বিউটির পরিবারকে সাহস জোগাতো, সালিশের মোড়লরা যদি পরিবারটিকে অভয় দিতো, তাহলে হত্যাকাণ্ড নয়, পরিবারটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারতো। বিউটি হত্যার দায় তাই সমাজের, পুলিশের, গ্রাম্য টাউট ময়না মিয়ার। আর একজন বাবা সায়েদ আলী সন্তানের হন্তারকের পরিচয় পেয়েছেন তাদের জন্যই।
বাবা যদি সত্যিই ঘাতক হন, তাহলে তাকে তো শাস্তি পেতেই হবে। কিন্তু এই সমাজ, পুলিশের দায়িত্বহীনতা ও সুযোগসন্ধানী টাউটদের বিচার করবে কে?
আমিও একজন বাবা। সায়েদ আলীর ‘হন্তারক বাবা’ হওয়ার এই পুলিশি সরল হিসাব, আদালতে দেওয়া জবানবন্দির ‘অকাট্য দলিল’ আমাকে কষ্ট দেয়। কাঁদায়। প্রশ্ন করি নিজেকে , বাবা কি কখনও সন্তানের ঘাতক হন?
লেখক: সাংবাদিক
ইমেইল:swapansg@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.