যানজট, জনজট ও জলজট: মহা​জটে কী করণীয় by মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন

৪০০ বছরেরও আগের কথা। বুড়িগঙ্গা নদীতীরে পত্তন করা হয় ঢাকা শহর: এলাকা ১ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার; লোকসংখ্যা সঠিক জানা নেই, হয়তো বা হাজার খানেক। আর ২০১৩ সালে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা মহানগরীর আয়তন ৩০২ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ১ কোটি ৪৩ লাখ ৯৯ হাজার। দেশে-বিদেশে আলোচিত এবং সমাধানের বলিষ্ঠ প্রচেষ্টাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে এর যানজট, জনজট ও জলজট।
জনসংখ্যার ঘনত্ব
ঢাকা এখন পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম জনবহুল নগর। জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪৫ হাজার। বিশ্বের সর্বোচ্চ ঘনবসতির অন্যতম। দেশের জনসংখ্যা বছরে শতকরা ১ দশমিক ৩ ভাগ হারে বাড়ে তো ঢাকা মহানগরীতে বাড়ে শতকরা ৪ দশমিক ৫ ভাগ। দৈনিক গড়ে নিট দুই হাজারজনেরও বেশি মানুষ ঢাকার জনারণ্যে যোগ দেয়।
বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীর প্রায় চারশ বর্জ্যমুখ
১৬১০ সালের ১৬ জুলাই ঢাকাকে সুবে বাংলার রাজধানী করা হয়। অনেক পটপরিবর্তনের পর ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকাকে বাংলা ও আসামের রাজধানী করা হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকায় স্থাপিত হয় তদানীন্তন পূর্ব বাংলার (পরে পূর্ব পাকিস্তান) রাজধানী। বহু মূল্যে কেনা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা নবগৌরবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এসব ঘটনাপরম্পরায় ঢাকার গুরুত্ব যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি এর জনসংখ্যাও। কিন্তু আয়তন, সুযোগ-সুবিধা ও সেবা সৃষ্টিতে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ে মহানগরী।
যানজট
ঢাকা মহানগরীতে প্রতিদিন ২০০টিরও অধিক মোটরযান নিবন্ধিত হয়। এখানে রিকশার সংখ্যা ৪ লাখ ৫০ হাজার, তার মধ্যে নিবন্ধিত এক-চতুর্থাংশ। ঢাকায় পাকা রাস্তার দৈর্ঘ্য ২০০০ কিলোমিটারের মতো। চলাচল স্বস্তিদায়ক হতে হলে একটি মহানগরীতে ২৫ শতাংশ এলাকা রাস্তায় নিয়োজিত করতে হয়। ঢাকায় আছে মাত্র ৭ শতাংশ। ঢাকার রাস্তায় চলাচলকারী মোট যানের প্রায় এক–চতুর্থাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন; কিন্তু এগুলো সড়কের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ দখল করে রাখে। ৬৫০টি সংযোগকেন্দ্রের জন্য মাত্র ৬০টি ট্রাফিক লাইট। ঢাকার রাস্তায় মোট আট রকম গতির যানবাহন চলাচল করে। রাস্তা তুলনামূলকভাবে সরু বলে ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন নেই। সম্প্রতি ফ্লাইওভার তৈরি করে যানজটের তীব্রতা সাময়িকভাবে কমানো হলেও যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ লোক স্থানান্তরে নগরে নতুন জনসংযুক্তি এবং জলাবদ্ধতার কারণে সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী তো নয়ই, মধ্যমেয়াদি সমাধানও দুরূহ হয়ে পড়েছে।
জলজট
ঢাকার কেন্দ্রীয় পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থায় নগরবাসীর পানি সরবরাহের জন্য যথেষ্ট না হলেও অন্যান্য শোধনাগারের মাধ্যমে শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি মানুষ সুপেয় পানি পাচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়; সরকারি ও বেসরকারি প্রচেষ্টায় খুবই কষ্ট করে এর ব্যবস্থাপনা হতো। সম্প্রতি বর্জ্য ও পানির লাইন পাকাপোক্তভাবে আলাদা করা হয়েছে। কিন্তু ৩৭টি খাল, তথা জলাধারের মধ্যে ১২টি বাদে বাকি সব কটি দখল অর্থাৎ ভরাট হয়ে গেছে। এর ফলে এবং চতুর্দিকে পাকা করা রাস্তা ও উদ্যানের উপস্থিতিতে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে বাধাগ্রস্ত হয় এবং বৃষ্টি হলেই জলজটের সৃষ্টি হয়।
সমাধানের উপায়
বাংলাদেশে নগরায়ণ হয়েছে খুব দ্রুত ও অপরিকল্পিতভাবে। যানজট বা নগর ব্যবস্থাপনাকে মূলত একটি যান্ত্রিক বা ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয় হিসেবে দেখা হয়। একটি সমন্বিত সামগ্রিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সময় নির্ঘণ্টক কর্মকাণ্ড গ্রহণ করা দরকার। কবে হবে জানি না। তবে নিউইয়র্ক বা নয়াদিল্লির মতোই একটি আলাদা ঢাকা মেট্রোপলিটন গভর্নমেন্ট এখন সময়ের দাবি। যত দিন তা না করা যাবে তত দিন সুস্পষ্ট শর্তাবলি ও পুরস্কার-তিরস্কার প্রথা প্রবর্তন করে দৃঢ় ও কঠোর সমন্বয় ব্যবস্থা চালু করা সমীচীন হবে।
যানজট, জনজট ও জলজট সমস্যাটিকে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি এবং বহুমাত্রিক আর্থসামাজিক-নৃতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক ও দৃষ্টিভঙ্গিপ্রসূত বিষয় হিসেবে আনা প্রয়োজন। আরও দরকার অগ্রাধিকারভিত্তিক সম্প্রতি উচ্চারিত সরকারি কৃতসংকল্প কর্মকাণ্ড প্রণয়ন এবং ধাপে ধাপে কঠোর হস্তে তার বাস্তবায়ন।
ক) স্বল্প মেয়াদে:
অর্থাৎ তাৎক্ষণিকভাবে শুরু করে আগামী দুই বছরে যা শুরু করা প্রয়োজন তা হলো:
 ১. সব ধরন ও মাধ্যমের প্রথমে শতকরা ৫০ ভাগ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি অঞ্চলভিত্তিক বাধ্যতামূলক করা; দুই বছর পর তা শতকরা ১০০ ভাগে উন্নীত করা।
২. সব ধরন ও মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের স্কুলবাসে যাতায়াত বাধ্যতামূলক করা।
৩. সরকারি ও বেসরকারি অফিসে নয়টা-তিনটা ও সাড়ে এগারোটা-সাড়ে পাঁচটা নমনীয় অফিস সময়সূচি পালন করা।
৪. গণপরিবহনে পুরোনো লক্কড়ঝক্কড় ছোট ছোট গণযানের পরিবর্তে বড় আধুনিক ও আরামদায়ক বাস রাস্তায় নামানো। আলাপ-আলোচনা, আইনগত ব্যবস্থা এবং সর্বে​াপরি ১০ বছরের পুরোনো গণযানে বেশি হারে রোড ট্যাক্স চালু করা।
৫. ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা মেট্রোপলিটন পুলিশের আর ট্রাফিক লাইটের অভিভাবক করপোরেশন হওয়ার ফলে সৃষ্ট দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটিয়ে একক কর্তৃত্বে লাইট বিশেষে (র‍্যাংগস বাইপাস, বসুন্ধরা সিটি সোনারগাঁও ইন্টার সেকশন, গুলশান) ১০, ১৫, এমনকি ২০ মিনিটের যতির পরিবর্তে তিন থেকে চার মিনিট পরপর গাড়ি ছাড়া। ক্ষমতার উচ্চতানির্বিশেষে উল্টো দিক থেকে গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৬. জলাধার উদ্ধার ও পুনঃখননের জন্য কৃতসংকল্প আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
৭. ঢাকা মহানগরীর সব প্রবেশপথে টোল মেশিন বসিয়ে টোল আদায় করা।
৮. নিজ নিজ অঞ্চলে যাতে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা সরকারিভাবে নির্মিত নিম্ন আয়ের শপিং মলে স্থানান্তরিত হতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা।
৯. কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় (যথা মতিঝিল) যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা।
(খ) মধ্য মেয়াদে দুই থেকে পাঁচ বছরে:
১০. গৃহনির্মাণে ভূমিকম্প প্রতিরোধ ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বিধান বাস্তবায়ন করা।
১১. নির্মাণাধীন সব ফ্লাইওভার শেষ করে চালু করা।
১২. বেশ কিছু সরকারি অফিস ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করা, যেমন: রেলওয়ের হেড অফিস, নৌবাহিনীর সদর দপ্তর এবং বন্দর, শিপিং ও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় চট্টগ্রামে স্থানান্তর। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও কৃষি মন্ত্রণালয়কে ময়মনসিংহে স্থানান্তর করা। শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে উত্তরবঙ্গে স্থানান্তর। বস্ত্র মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে ফরিদপুরে স্থানান্তর করা।
১৩. অনুরূপভাবে বেসরকারি খাতের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-বাণিজ্য স্থাপনার হেড অফিস ঢাকার বাইরে স্থানান্তরে উৎসাহ ও প্রণোদনা প্রদান করা।
১৪. নিটওয়্যার ও তৈরি পোশাকশিল্প এবং ওষুধ কারখানাকে ঢাকার বাইরে স্থাপনের প্রণোদনা প্রদান করা।
(গ) দীর্ঘ মেয়াদে:
১৫. ঢাকা রেলস্টেশন টঙ্গীতে স্থানান্তর করা যাবে। কারণ, তত দিনে মেট্রোরেল চালু হবে এবং সার্কুলার রোড ও নৌ চলাচলে রুটগুলো ঢাকা মহানগরীর চতুর্দিকে যাতায়াত করবে।
১৬. বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বেশ দূরে ময়মনসিংহ, ফরিদপুর অথবা সিলেট অঞ্চলে স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে।
১৭. ২০৪০ সালে বাংলাদেশ যখন একটি উন্নত দেশের পর্যায়ে উন্নীত হবে, তখন অবশ্যই শহর ও গ্রামের পার্থক্য থাকবে না এবং যানজট সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: সভাপতি, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ড ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

No comments

Powered by Blogger.