আসুন শিশুদের পাশে দাঁড়াই

শিশুদের নির্যাতন করে মেরে ফেলা হচ্ছে। একের পর এক শিশুহত্যার নির্মম ঘটনায় মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। এ বছরের শিশুহত্যার সঙ্গে একটা বেদনাদায়ক অধ্যায় যুক্ত হয়েছে, সেটা হচ্ছে নৃশংসতা। ১০ আগস্ট ২০১৫, প্রথম আলোর আয়োজনে ‘আসুন শিশুদের পাশে দাঁড়াই’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হলো।
সূত্র: বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম
আলোচনা
আব্দুল কাইয়ুমআজকের আলোচনার বিষয়বস্তু ‘আসুন শিশুদের পাশে দাঁড়াই’। শিশুদের নির্যাতন করে মেরে ফেলা হচ্ছে। একের পর এক শিশুহত্যার নির্মম ঘটনায় মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। এ বছরের শিশুহত্যার সঙ্গে একটা বেদনাদায়ক অধ্যায় যুক্ত হয়েছে, সেটা হচ্ছে নৃশংসতা।
অনেক সময় শিশুদের প্রাণে না মারলেও তাদের বকাঝকা, পীড়ন করা, মানসিক নির্যাতন করা, চিন্তাভাবনাকে খর্ব করে দেওয়ার মতো নির্যাতনগুলোর কোনো হিসাব নেই। অথচ একজন শিশুর মনের বিকাশের জন্য প্রয়োজন একটি অনুকূল পরিবেশ। আমরা চাই, শিশু নির্যাতন ও হত্যার প্রতিটি ঘটনার দ্রুত বিচার হোক, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, নাগরিক সমাজ সচেতন হোক, প্রতিরোধ গড়ে উঠুক।
আনিসুজ্জামান
আনিসুজ্জামান
আমরা বর্তমানে যে অবস্থার সম্মুখীন হয়েছি, তাতে মনে হচ্ছে যে বাঙালি চরিত্র সম্পর্কে আমরা যেসব কথা বলে থাকি যে সংগীতপ্রিয়, শান্তিপ্রিয় ইত্যাদি, এগুলো সব অতিরঞ্জিত। সংগীতপ্রিয় হতে পারি কিন্তু শান্তিপ্রিয় নই। বরং খুবই মারমুখী এবং নিষ্ঠুর।
যেসব ঘটনা আমরা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজে পড়ি—শুধু নির্যাতন নয়, নির্যাতনের পদ্ধতির মধ্যে একটি নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতা আছে। যেটা আমাদের সমগ্র সমাজ সম্পর্কে একটা প্রশ্নের মুখোমুখি করে, যে সমাজের মানুষ এমন আচরণ করে, সে সমাজের গলদটা কোথায়? শিশুদের ক্ষেত্রে আমরা দেখছি শারীরিক ও মানসিক—দুই রকমের নির্যাতন।
আমি স্কুলের কথা বলি, বিভিন্ন সময় কাগজে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষকেরা ছাত্রদের যে শাস্তি দিচ্ছে, সেই শাস্তির ফলে হাসপাতালে যাচ্ছে ছাত্র। পরিবারের মধ্যে শিশুরা লাঞ্ছিত হচ্ছে। এই শারীরিক নির্যাতনের বাইরেও দেখা যায় মানসিকভাবেও খর্ব করার একটা চেষ্টা আছে।
বাংলাদেশের সমাজ ক্রমে একটা সংকীর্ণতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। যে উদার একটা পরিবেশ আশা করেছিলাম, আমাদের সে আশা কোনোভাবেই সাফল্যের কাছাকাছি যাচ্ছে না। এই হতাশাজনক অবস্থায় শিশুরাও আমাদের অবিবেচনার শিকার এবং এর প্রতিকার পাওয়া দুরূহ এই জন্য যে শিশুদের বেশির ভাগের পক্ষেই নিজেদের সাহায্য করার জন্য কাউকে আহ্বান জানানো সম্ভব নয়।
তাদের হয়ে কাউকে না কাউকে বলতে হচ্ছে। সেই বলার দায়িত্বটা নিশ্চয় সমাজের সচেতন মানুষের। আমরা সবাই মিলে যেন সামাজিকভাবে অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। মোটকথা, শিশুরা যেভাবে নির্যাতিত হচ্ছে, সেই অমানবিকতার বিরুদ্ধে আমাদের সবারই দাঁড়ানো দরকার।
সমাজকে রক্ষার জন্য, একটি উন্নত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে।
সেলিনা হোসেন
সেলিনা হোসেন
আজকের আলোচনার শিরোনাম ‘আসুন শিশুদের পাশে দাঁড়াই’। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ প্রবল একটি মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে চলেছে। এই মানবিক বিপর্যয় শুধু আইন বা শুধু পুলিশ দিয়ে রক্ষা করা যাবে তা নয়। সমাজকে রক্ষা করার জন্য অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, এই দাঁড়ানোটা আমাদের নাগরিক সমাজের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাগরিক সমাজ যদি এ বিষয়টাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে এককভাবে ছেড়ে না দিয়ে যৌথভাবে কাজ করে, তাহলে এ বিপর্যয়ের হাত থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি। নইলে আমাদের রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়।
আজকে মানবিক বিপর্যয়ের কথা বলছি, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কথা বলছি। এ বিচারহীনতার সংস্কৃতি অনেক দিন ধরে আমাদের ভেতর চলে আসছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিশুপুত্র শেখ রাসেলসহ যে কয়েকজন শিশুকে িনর্মমভাবে হত্যা করেছিল দুর্বৃত্তরা, সেখান থেকে যদি ধরি, তাহলে আজকে ২০১৫ পর্যন্ত একটা দীর্ঘ সময় ধরে শিশুরা দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
দুর্বৃত্তরা কখনোই পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভাবছে না। দেশের ভবিষ্যতের কথা ভাবছে না এবং বলছে না যে এই শিশুদের আমরা কোলে টেনে নিই, এই শিশুদের আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঠিকমতো দিই। এটা আমাদের কাছে খুবই বিস্ময়ের ব্যাপার মনে হয় যে মূল্যবোধের জায়গায় আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি এবং মূল্যবোধের এ অবক্ষয় যদি আমরা রোধ করতে না পারি, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আমাদের গ্রাস করবে।
এ প্রক্রিয়াটাকে আমাদের রোধ করার জন্য আজকে যে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে—এভাবে যদি আমরা সব জায়গায় সচেতন করি, তাহলে মূল্যবোধের খানিকটুকু আমরা দেখব।
রাশেদা কে চৌধূরী
রাশেদা কে চৌধূরী
অনেক ধন্যবাদ প্রথম আলোকে আজকে আমাদের সবাইকে এখানে সমবেত করার জন্য। এ দেশের নাগরিক হিসেবে এ ধরনের আয়োজনেই শুধু নয়, আমাদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ সবই গড়ে তোলা উচিত। শুরুতে যেটা দিয়ে বলতে চাই, সেটা হলো যেকোনো নাগরিকের স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এখানে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধীদের আমরা শাস্তির আওতায় না এনে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা আসলে অপরাধীদের উৎসাহিত করছে কি না, এটা আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন এবং এটার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া খুবই প্রয়োজন। কারণ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি তখনই তৈরি হয়, যখন অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার পরিবেশটা আমরা তৈরি করে দিই।
শিশুদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। শিশুদের এ ধরনের নির্যাতন আমরা একসময়ে শুধু স্কুলে দেখেছি। শারীরিক ও অবমাননাকর শাস্তির বিরুদ্ধে মহামান্য আদালত নির্দেশনা দিয়েছিলেন, এটা করা যাবে না। তারপরও ঘটে চলেছিল। কিন্তু সেটা নৃশংসভাবে মেরে ফেলার মতো জায়গায় যায়নি, সে জন্য সেটাকে নিয়ে হয়তো জনসমক্ষে অত সোচ্চার হয়নি কেউ।
এখন এই ঘটনাগুলো ঘটে যাওয়ার পর তিনটি জায়গায় আমি একটু দৃষ্টি আকর্ষণ করব—একটা হচ্ছে শিশুদের সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দ্বিতীয় হচ্ছে পারিবারিক মূল্যবোধ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটা দেখতে হবে; মাদক, আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন আমাদের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলছে; তথ্যপ্রযুক্তি কীভাবে প্রভাব ফেলছে—সেটাও আমাদের দেখার প্রয়োজন। তৃতীয় হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধ তৈরি হওয়ার জায়গায় যখন ছাত্র দেখছে একজন শিক্ষক কোচিং-বাণিজ্যের পেছনে ছুটছেন, সেখানে সেই মূল্যবোধ তৈরি হচ্ছে না। এটা বৈজ্ঞানিকভাবেই সত্য, যে নির্যাতনের শিকার হয়, সে প্রথম সুযোগ পেলেই আরেকজনকে নির্যাতন করবে। তাই এটাও দেখার বিষয় আছে। নির্যাতনকারীদের অসুস্থ বলে হাসপাতালে পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই। এরা মানসিক বিকারগ্রস্ত, কিন্তু অপরাধী। তাই এদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
মোমিনুল ইসলাম
মোমিনুল ইসলাম
আমি খুলনার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি আজকে আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। রাকিব হত্যার ঘটনা ঘটে ৩ আগস্ট। লোমহর্ষক ঘটনা। আমি এটাকে বর্ণনা করব না, শুধু এটুকু বলব, সাধারণ মানুষ কিন্তু এখন সচেতন হয়েছে। এ ঘটনা জানার পরপরই সাধারণ মানুষ কিন্তু পুলিশকে সহায়তা করেছে এবং তিনজন আসামিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে। খুলনার জনগণসহ সারা বাংলাদেশের জনগণ প্রতিরোধ, প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে। খুলনার পুলিশ ও জনগণ যৌথভাবে একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। খুলনার পুলিশের ভূমিকায় আমরা খুলনাবাসী অত্যন্ত সন্তুষ্ট। খুলনার পুলিশ কমিশনার সরাসরি বলেছেন, জিরো টলারেন্স। কিন্তু শুধু জিরো টলারেন্স হলে হবে না। শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
চার্জশিট দেওয়ার পরে একটা পর্ব থাকে, এই পর্ব হচ্ছে বিচারের পর্ব। বিচারের পর্ব যদি দীর্ঘ হয় তাহলে বিচার থেকে বঞ্চিত হতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার হওয়া উচিত এ ধরনের ঘটনার। একই সঙ্গে শুধু চার্জশিট দিলেই পুলিশের দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে তা নয়, স্থানীয় সাক্ষী এবং বাদীকে নিরাপত্তা দেওয়া দায়িত্ব। ধন্যবাদ সবাইকে।
সুলতানা কামাল
সুলতানা কামাল
আজকে এখানে যাঁরা উপস্থিত আছেন, সবাইকে আমার শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমরা সবাই জানি, আমাদের সেই একুশে ফেব্রুয়ারির যেই গান, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’, সেখানেই একটা লাইন আছে শিশুহত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা। আমাদের চিন্তার মধ্যে তো একেবারে প্রথম থেকেই এই চেতনা ছিল যে শিশুহত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা। এত বড় কথা আমরা বলেছি। অর্থাৎ শিশুর কথাটি যে আমাদের মনের ভেতর ছিল না, সেটা কিন্তু না। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে, বাংলাদেশের চিন্তাভাবনার মধ্যে দার্শনিক দিক থেকে ভাবতে গেলে সেই ভাবনা কিন্তু ছিল।
কিন্তু আমরা বাস্তব জীবনে তার কতখানি পরিস্ফুটন দেখেছি কিংবা কিছু একটা করতে পেরেছি কিংবা করতে না পারার কারণে আমাদের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে সমাজের মধ্যে, সেগুলো নিয়ে হয়তো আমাদের ভাবনাচিন্তার সময় এসেছে।
অবশ্যই যারা অপরাধ করছে, তারা এই বার্তাই পেয়ে যাচ্ছে, অনবরত অপরাধ করলে তাদের কোনো রকম জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে না। অতএব তারা নিজেদের সংযত করার কোনো চেষ্টা করছে না। ভয় পাচ্ছে না। শিশুদের ওপর অত্যাচারের ঘটনা ঘটে কী করে?
এত মানুষ যারা আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকে, তারাও বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা দেখে কিন্তু সেটা প্রতিরোধ করতে পারে না কিসের জন্য? এত মানুষ জানছে, তারা সেখানে গিয়ে দেখছে, ছবি তুলছে। আমাদের পুলিশ বাহিনীর কারও কানে কি সেটা পৌঁছায় না?
অমর্ত্য সেন একটা বক্তৃতায় একবার বলেছিলেন, প্রত্যেক মানুষের একটা আনুষ্ঠানিক দায় থাকে, একটা অনানুষ্ঠানিক দায় থাকে। আনুষ্ঠানিক দায় নিয়ে বসে আছেন আমাদের রখফার সুলতানা খানম (এআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ), তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব এটার সুরাহা করা। মানুষ হিসেবে পরোক্ষ দায়িত্ব হচ্ছে, এ বিষয়গুলো যাতে আর সমাজে না ঘটে, সেটার চেষ্টা করা। অর্থাৎ প্রত্যেকের নৈতিক দায়বদ্ধতা আছে শিশুহত্যার মতো অপরাধ প্রতিরোধ করা।
রখফার সুলতানা খানম
রখফার সুলতানা খানম
সবাইকে শুভেচ্ছা। আমাদের পুলিশের আনুষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার পরেও কিছু অনানুষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা থাকে এবং সেটা অনেক সময় পুলিশ করে। এটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের পুলিশ সদর থেকে প্রতিটি পুলিশ স্টেশনে শিশু আইনের আলোকে শিশুবান্ধব কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, হচ্ছে। এখন শিশুবান্ধব কর্মকর্তাদের যোগ্যতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের অধীনে আটটি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার আছে।
সেই ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলোতে শিশুদের সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। খাবার ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়। কাউন্সেলিং করা হয়। এ ছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরে আছে মনিটরিং সেল। নারী ও শিশুসংক্রান্ত মামলাগুলো মনিটরিং করা হয়। সম্প্রতি শিশুদের ক্ষেত্রে যে অমানবিক ঘটনাগুলো ঘটে গেল আমরা মনে করি এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। মানে কোনো অপরাধী চক্র করছে না। রাজনকে যারা মেরেছে কিংবা রাকিবকে যারা মেরেছে এদের অতীত ইতিহাসে কিন্তু এরা ক্রাইম, ক্রিমিনাল, ডাকাত, চোর এ রকম রেকর্ড আমাদের হাতে এখন পর্যন্ত নেই। তারপরও শিশুদের ক্ষেত্রে যে মামলাগুলো হচ্ছে সেগুলোর দেখাশোনার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি আলাদা পরিপত্র জারি করা হয়েছে। এটা পুলিশের কর্তব্যের অংশ, যেটা আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব।
অনানুষ্ঠানিক দায়িত্ববোধের ক্ষেত্রে পুলিশ হয়েও আমি যেটা মনে করি, শিশুরা আত্মনির্ভরশীল হবে, শিশুদের বিকাশটা সুন্দর হবে। শিশুরা নির্ভার থাকবে, শক্ত ভিতের ওপর নিজেদের জীবন গড়ে তুলবে এবং সেখানে একটা আত্মরক্ষামূলক শিক্ষা থাকবে।
সমাজকে শিশুবান্ধব হতে হবে। শিশুর ভেতরের মনোজগৎকে আমরা বিকশিত করব। আমরা শিশুকে প্রস্ফুটিত হওয়ার সুযোগ করে দেব।
মেহতাব খানম
মেহতাব খানম
ধন্যবাদ, আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। স্বাধীনতার পর আমরা ৪৪ বছর পার করেছি। আসলে একটা সভ্য জাতি হিসেবে আমরা নিজেদের দাবি করতে পারি কি না, সেই প্রশ্নটা আজকাল আমাকে ভীষণভাবে ভোগাচ্ছে। এই যে একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে, এগুলোকে আমাদের বিছিন্ন ঘটনা বলার কোনো অবকাশ নেই। এগুলো কিন্তু অনেকগুলো ঘটনার একটা সমন্বয়, যার ফলে জিনিসগুলো ঘটছে। অনেকগুলো বিষয়ের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। আমাদের মানসিক জায়গাটাতে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য তৈরি হয়েছে। আমরা মানসিক সুস্থতা বোধ হয় হারিয়ে ফেলেছি।
শিক্ষিত মানুষ যখন অসুস্থ মানসিকতার হয়, এ দুটির ব্যবধান কিন্তু সাংঘাতিক হয় এবং এ দেশে তিনটি দল সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হচ্ছে। নারী, শিশু এবং দরিদ্র মানুষ। যারা হত্যার শিকার হয়েছে, তারা সবাই কিন্তু দরিদ্র শিশু। তাদেরই টার্গেট করা হয়েছে।
আমাদের পারিবারিক চর্চায় কী হচ্ছে, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কী হচ্ছে, আমাদের সামাজিক জায়গায় কী হচ্ছে। আমাদের মনে হয়, তিনটি জায়গাতেই আলাদা করে মনোযোগী হতে হবে। গণমাধ্যমগুলো একসঙ্গে বসে এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার, কোনটা দেখানো হবে, কোনটা দেখানো হবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বয় না করে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আসলে সে সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন হবে না।
আমি বলি যে বাংলাদেশ বড়দের জন্য, শিশুদের জন্য নয়। শিশুদের জন্য কোনো বিনোদন তো নেই। গণমাধ্যমে যে অনুষ্ঠানগুলো বানানো হয়, তা শিশুদের জন্য নয়। আমাদের সামাজিক বিনোদন তো শেষ হয়ে গেছে, গণমাধ্যমের বিনোদনগুলো সবই কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ককেন্দ্রিক। কাজেই আমাদের শিশুদের সুন্দর মন তৈরি হওয়ার জায়গাটা একেবারেই শেষ হয়ে গেছে।
আনিসুজ্জামান: আমাদের দেশে অধিকার ভঙ্গের ব্যাপারটা অনেক ব্যাপক হয়েছে। আজকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুর অধিকার, নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুর অধিকার, ভিন্নমতাবলম্বীর অধিকার ভঙ্গ হচ্ছে। নারী, শিশুর অধিকার ভঙ্গ হচ্ছে। তাহলে আমাদের এই সংবিধান, আমাদের এই সামাজিক অধিকার—এসব কোথায় যাচ্ছে? এই প্রশ্নটি আমাদের করতে হবে। সংকীর্ণতা এমনভাবে আমাদের গ্রাস করছে, মানসিক সংকীর্ণতা, যার মধ্যে আমরা পড়েছি, এটা ক্রমে বাড়ছে।
এটা বাংলাদেশের ভিত্তির মূলে আঘাত করছে। এটা থেকে আমাদের আত্মরক্ষা করতে হবে, অন্যদেরও বাঁচাতে হবে। আমাদের পরিবারের মধ্যে অনেক ত্রুটি আছে। পরিবারেও একধরনের স্বৈরাচারী সংগঠন হিসেবে কাজ করে, সেটা মারাত্মক। এত ব্যাপক সংস্কার তো আর রাতারাতি হবে না। কিন্তু একটা উদারনৈতিক আবহাওয়া তৈরির জন্য সবাই মিলে যেন চেষ্টা করি। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
লক্ষ্মীকান্ত সিংহ
লক্ষ্মীকান্ত সিংহ
ধন্যবাদ। এর মধ্যে আমার অনেক বিষয় আমার পূর্ববর্তী বক্তাদের মধ্যে চলে আসছে। একটা বিষয় আমি একটু স্মরণ করে দিতে চাই—বিচারহীনতার বিষয়টা। আমাদের সিলেটে ৮ জুলাই শিশু রাজন হত্যার আগে ১১ মার্চ কিন্তু আরেকটি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ওর নাম আবু সাঈদ। ওটাও নির্মম ছিল। শিশুটির লাশ পাওয়া গেছে একজন পুলিশ সদস্যের বাসায়। আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিন্তু এখনো চার্জশিট দেওয়া হয়নি। রাজনের ঘটনার পর ওটা আবার চাপা পড়ে যায়। আমরা আগে শুনতাম, ঘুষ লেনদেন চুপিসারে হতো, এখন নাকি দরাদরি করে হয়। এখন দেখছি, হত্যা, গুমের ভিডিও ধারণ করে হচ্ছে। এখানে সামাজিক আন্দোলন করা দরকার। শিশু রাজনের হত্যাকারী কোনো আসামিকে কিন্তু পুলিশ ধরেনি। সাধারণ জনগণ ধরে পুলিশে দিয়েছে।
সাধারণ জনগণের সহযোগিতার কোনো ঘাটতি নেই। যে বিষয়টি আমি একটু বলতে চাইছি, রাজন হত্যার বিষয়ে আমরা সামাজিক সংগঠনগুলো আন্দোলন করি, কিন্তু আমাদের যে মূল ধারার রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, তাঁদের কিন্তু সেভাবে দেখি না। আমরা চাই যে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে একটা অঙ্গীকার হোক।
যারিন মুসাররাত মানিতা
যারিন মুসাররাত মানিতা
এ ধরনের একটি অনুষ্ঠানে আজকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য প্রথমেই সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। রাজন হত্যার ব্যাপারটি আমরা জেনেছিলাম ফেসবুক এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। আমরা সহপাঠীরা সবাই অনেক বেশি বিস্মিত ছিলাম এ ব্যাপারটি দেখে যে এ রকম নৃশংস একটি ভিডিও ফেসবুকে বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচার হতে পারে। আবার আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেও ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে। আমার অভিভাবকেরা, শিক্ষকেরা যখন এ ধরনের ঘটনা দেখছেন, তখন স্বাভাবিকভাবে তাঁদের মধ্যেও একটা ভীতি সৃষ্টি হচ্ছে—আমার বাচ্চা বা ছাত্রীর নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত করা যায়। রাজন একটি সাধারণ শিশু ছিল।
সামাজিক যে বৈষম্যের ব্যাপারটা আমরা পত্রিকায় পড়ছি, কিছু মানুষ অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা পাবে এবং কিছু মানুষ পাবে না। ব্যাপারটি যে আমাদের দেশে বা আমাদের শহরে ঘটছে, এটা আমাদের কাছে একটি স্বাভাবিক ব্যাপার মনে হচ্ছে। সুতরাং আমি আশা করব, শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত এ ধরনের ঘটনা যাতে আজকে কোনো শিশুর মনস্তাত্ত্বিকতায় এত বেশি আঘাত করতে না পারে, এ ব্যাপারটিতে সবাই সচেতন হবেন।
আমি আশা করব, সবার পক্ষ থেকে সম্মিলিতভাবে আমাদের কথা চিন্তা করে হলেও কিছু বাস্তব এবং জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। আমি মনে করি, এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সে জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি।
আবদুছ সহিদ মাহমুদ
আবদুছ সহিদ মাহমুদ
ধন্যবাদ, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পক্ষ থেকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। উন্নত বিশ্বে যখন শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তখন তার একটা দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করা হয় এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এটা নিশ্চিত করা হয়। আমাদের দেশে অন্য অনেক ঘটনা, অন্য অনেক অপরাধের মতোই ঠিক এ ক্ষেত্রেও আসামিদের অনেক ক্ষেত্রেই বিচারের সম্মুখীন হতে হয় না। আরেকটি সীমাবদ্ধতা আছে, আমাদের দেশে যেটা অন্য বিচারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, চার্জশিট দিতে দেরি হয়ে যায়। সরকারের কাছে একটা অনুরোধ, শিশু নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটলে সেটা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হোক। শিশুরা তো সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে। এদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই।
তাই বিচারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রভাব, সেটা রাজনৈতিক হোক বা সামাজিক হোক, কোনো প্রভাব যাতে বিস্তার করতে না পারে, এটিও যেন সরকার নিশ্চিত করে। এ ধরনের ঘটনা শুধু আইন বা পুলিশ দিয়ে দূর করা যাবে না। পরিবার থেকে এগুলোর সূত্রপাত করতে হবে। রাষ্ট্র, আইন, সরকার, পুলিশ—সবকিছু পারবে না। সবার সম্মিলিত প্রয়াস দরকার। চার দেয়ালের ভেতরে যে অপরাধ হচ্ছে, সেগুলো নিরসন করতে হবে।
মা-বাবা তাঁর শিশুসন্তানকে শাসন করেন, এটাও একটা নির্যাতন। যখন স্কুলের শিক্ষার্থীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, সেটিও একটি নির্যাতন। বাংলাদেশ শিশু আইন ২০১৩ আছে, খুব ভালো, যুগোপযোগী। কিন্তু শিশু সুরক্ষা নীতি একটি থাকা দরকার।
মাহবুবা নাসরীন
মাহবুবা নাসরীন
ধন্যবাদ। আমাদের একটা জেলা শিশু অধিকার মনিটরিং কমিটি আছে। একটা প্রকল্প আছে, শিশু অধিকার প্রকল্প, যেটা ৬৪টি জেলায় আছে। ৬৪টি জেলায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিও আছেন, যাঁরা শিশু সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে কাজ করেন। এগুলো আমাদের কয়জন জানি? মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শিশু সুরক্ষার জন্য কাজ করছে। এদের আলাদা নীতিও আছে। চাইল্ড প্রটেকশন পলিসি অনেক আগেই বাংলাদেশে ইউনিসেফসহ যত বেসরকারি সংস্থা আছে, সবাই করে যাচ্ছে। দারিদ্র্য কিন্তু অপরাধের একটা কারণ নয়। এটা যেন আমরা না মনে করি। আমাদের মানসিকতাটা এ রকম যে দরিদ্রদের বেশি অপরাধী করা যায়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটা হেল্পলাইনও আছে। কিন্তু সবচেয়ে যেখানে আমাদের সমস্যা, সেটা হচ্ছে আমরা অনেকেই জানি না। প্রচার নেই। এত বেশি নেতিবাচক খবরগুলো না দিয়ে আমরা যদি আমাদের বাংলাদেশের এত জায়গায় গিয়ে আমি সহায়তা পেতে পারি, এটা আরেকটু বেশি প্রচার হয়, এটা আরেকটু বেশি জানা যায়, শিশুরাও জানবে, শিশুদের অভিভাবকেরাও জানবেন। কিন্তু এই জানার জায়গাটা আমাদের কম। অনেক সময় শিশু অধিকারের বিষয়টি দিবস পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সুতরাং আমরা যদি শিশুর জন্য সংবেদনশীল একটি সমাজ গড়তে চাই, তাহলে সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি শিশুসহ প্রত্যেকের জন্য কার্যকর করতে হবে। আমাদের যা আছে, সেগুলোকেই আমরা যেন সবাই জানতে পারি আর সবাই যেন সে জায়গাগুলোতে একসঙ্গে কাজ করি।
মিজানুর রহমান
মিজানুর রহমান
আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। আমি কটি মন্তব্য করব। এগুলো হয়তো মনে হতে পারে বিক্ষিপ্ত কতগুলো মন্তব্য। কিন্তু সবার বক্তব্য শোনার পর আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। একটি হচ্ছে খুব মোটা দাগে যদি বলি, আজকে শিশুর প্রতি নির্যাতন, পাশবিকতা কেন হয়েছে। আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, আমরা সাংঘাতিকভাবে এক সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে চলেছি। এই অস্থিরতা অসহিষ্ণুতার জন্ম দিয়েছে। এটা এমন পর্যায়ে যে মুহূর্তের জন্য ধৈর্য থাকছে না। একটা হেস্তনেস্ত করে দেওয়ার মানসিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছি। অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতা কেন হচ্ছে? এক নম্বরে আসবে বিচারহীনতা। আমরা যা-ই বলি না কেন, অপরাধ করে পার পাওয়া যায়। সেটার দৃষ্টান্ত ভূরি ভূরি।
কেন এই বিচারহীনতা, সেটা খুঁজতে গেলে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে কারণ খুঁজতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কল্যাণকর কাজের চেয়ে নিকট অতীতে আমরা দেখেছি তারা অকল্যাণকর কর্মকাণ্ডে নিজেদের বেশি করে নিয়োজিত রেখেছে। মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে, দগ্ধ করেছে। যদি এ রকম মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেও শুধু আমি রাজনীতি করি বা রাজনৈতিক দলের সদস্য হই, তাহলে আমাকে কোনো কিছু স্পর্শ করতে পারবে না—সেখানে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, তা-ই স্বাভাবিক।
আরেকটা কারণ দুর্নীতি। শুধু অর্থনৈতিক দুর্নীতি নয়, রাজনৈতিক প্রভাবের দুর্নীতি, পেশিশক্তির প্রভাব ও দুর্নীতি। দুর্নীতি এত বেশি ছেয়ে গেছে যে এটা থেকে মুক্তি না পেলে কীভাবে বিচারের সংস্কৃতিকে, আইনের শাসনকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে, সেটা কিন্তু বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। আরেকটি কারণ আমাদের রাষ্ট্র ক্রমান্বয়ে বহুত্ববাদকে বিসর্জন দিয়ে একত্ববাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অন্যদিকে অগ্রাহ্য করার, বাতিল করে দেওয়ার যে প্রবণতা, সেটার যে একটা প্রভাব পরবর্তী সময়ে সমগ্র জাতিকে গ্রাস করতে পারে, সেটা অনেক সময় আমরা মনে করি না।
আমাদের শিক্ষায়, শিক্ষাপদ্ধতিতে কোনো ত্রুটি হচ্ছে কি না, আমরা সঠিকভাবে এগোচ্ছি কি না, এটা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা দরকার। আমাদের শিশুদের মেরুদণ্ড আমরা সোজা হতে কখনোই দেব না। আমরা তাদের পুস্তকের ভারে এমন ন্যুব্জ করে দিয়েছি যে তারা সারা জীবনের জন্য কুঁজো হয়ে থাকবে। শিশুদের শৈশবকে রক্ষা করতে হলে বিশ্রামের অফুরন্ত সময় নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজটি রাষ্ট্রকেই করতে হবে।
সবকিছুকে রাজনৈতিকীকরণের অশুভ তৎপরতা থেকে সরে আসা প্রয়োজন। বিরাট একটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমরা দাঁড়িয়েছি। আমরা শিশুর পাশে দাঁড়ানোর যে অঙ্গীকার নিয়ে এখানে এসেছি, তাদের রক্ষা করার জন্য, তাদের শৈশবকে রক্ষা করার জন্য। আমরা কিন্তু আন্তরিকভাবেই বলি, রুশ লেখক আন্থন চেখভের মতো আমাদের শিশুদের যেন বলতে না হয়, ‘আমার শৈশবে আমার কোনো শিশুকাল ছিল না।’ আমাদের শিশুদের যেন এ আক্ষেপ করতে না হয়।
সুমনা শারমীন: সব মিলিয়ে শিশুদের বিষয়টিকে কি সবাই আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি? হয়তো দিচ্ছি না। রাজনৈতিক খবরের ভিড়ে সব হারিয়ে যায়। যদি নির্যাতনের ঘটনাগুলো না ঘটত, তাহলে আমাদের হয়তো এভাবে বসাই হতো কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন।
আমরা ঘুরেফিরে আমাদের শিশুদের বিষয়টিকে কম মূল্য দিচ্ছি। অথচ যখন ঘটনাটি একটি সাংঘাতিক রকমের খারাপ ঘটনা হচ্ছে, তখন সবাই মিলে আমরা একেবারে প্রতিবাদে ফেটে পড়ছি। তাহলে আমাদের আসলে করণীয় কি আরেকটা রাজনের ঘটনার জন্য অপেক্ষা করা? নাকি আরও কিছু করা?
শিশুদের পাশে আমরা দাঁড়াই—এটা অঙ্গীকার করে আমরা এখান থেকে যাচ্ছি। যার যার অবস্থান থেকে আমরা আমাদের কাজ করব, সেটাই আমাদের চাওয়া। এখানে আসার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।

যাঁরা অংশ নিলেন

আনিসুজ্জামান : ইমেরিটাস অধ্যাপক, সভাপতি, বাংলা একাডেমি
মিজানুর রহমান : চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন
সুলতানা কামাল : নির্বাহী পরিচালক, আইন ও সালিশ কেন্দ্র
রাশেদা কে চৌধূরী : নির্বাহী পরিচালক, গণসাক্ষরতা অভিযান
সেলিনা হোসেন : চেয়ারম্যান, শিশু একাডেমি
মেহতাব খানম : অধ্যাপক, এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মাহবুবা নাসরীন : সমাজবিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
রখফার সুলতানা খানম : এআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ
আবদুছ সহিদ মাহমুদ : পরিচালক, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম
মোমিনুল ইসলাম : আইনজীবী, খুলনা
লক্ষ্মীকান্ত সিংহ : মানবাধিকার কর্মী, সিলেট
যারিন মুসাররাত মানিতা : ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
সঞ্চালক
সুমনা শারমীন : ফিচার সম্পাদক, প্রথম আলো
আব্দুল কাইয়ুম : সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো
আলোচনায় সুপারিশ
* যেকোনো নাগরিকের স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব
* প্রত্যেকের নৈতিক দায়বদ্ধতা আছে সমাজে শিশুহত্যার মতো অপরাধ প্রতিরোধ করার
* সমাজকে রক্ষার জন্য, একটি উন্নত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে
* শাস্তির আওতায় না এনে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা আসলে অপরাধীদের উৎসাহিত করছে কি না, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন
* সবকিছুকে রাজনৈতিকীকরণের অশুভ তৎপরতা থেকে সরে আসা প্রয়োজন

No comments

Powered by Blogger.