ছোট্ট একটু দুষ্টামি by শাহদীন মালিক

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর ও ছবি এসেছে। একজন ছাত্রী গাছের পেছনে লুকিয়ে ছিলেন। এক পুলিশ সদস্য তাঁর চুল ধরে টেনে এনে দিলেন বেদম উত্তমমধ্যম। বীরদর্পে, সদলবলে। মোটেও বোঝা যাচ্ছে না, তবে এত সংক্ষুব্ধ হওয়ার কী আছে। ১৩ মের প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠার খবর অনুযায়ী, একটি নয়, দুটি নয়, ষাটের বেশি বিভিন্ন গোছের সংগঠন—মানবাধিকার, আইন সহায়তা, নারী অধিকারসহ হরেক কিসিমের সব সংগঠন—প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে পুলিশের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে। এই সংগঠনগুলো মোটেই বুঝল না যে পুলিশ ছোট্ট একটু দুষ্টামি করছিল। পুলিশ সদস্যরা ভেবেছিলেন যে মেয়েটি কানামাছি বা চোর-চোর খেলার জন্য গাছের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। ছোটবেলার কানামাছি খেলায় যেমন গা ছুঁয়ে দিতাম, পুলিশ তেমনি একটু গা ছুঁয়ে দিতে গিয়েছিল। তবে হাজার হলেও পুলিশ তো, গা ছোঁয়াটা একটু ভীষণ জোরেশোরে হয়ে গেছে—চুল টানা, লাঠিপেটা, চড়-থাপ্পড়। দুষ্টামিটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। তাই বলে এত তোলপাড়?
যেমন আইজিপি সাহেব বলেছেন, পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গুটি কয়েক ছেলে কিছু মেয়ের সঙ্গে দুষ্টামি করছিল। এতে এত বেশি হুলুস্থুল-চেঁচামেচির কী আছে? আর ব্যাপারটা যদি গুরুতরই হতো, তাহলে আশপাশের লোকজন ছেলেগুলোকে ধরে শায়েস্তা করল না কেন। অথবা দোষী ব্যক্তিদের ধরে পুলিশের কাছে নিয়ে এল না কেন?
আইজিপি সাহেবের অকাট্য যুক্তি। ১৩ মের প্রথম আলোর খবর থেকে জানলাম, উনি সবাইকে আইনের তালিমও দিয়েছেন—কোনো অপরাধ হতে দেখলে অপরাধীদের যেকোনো নাগরিক তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করতে পারবে। পয়লা বৈশাখের ঘটনায় যেখানে উপস্থিত লোকজন যেহেতু কাউকে গ্রেপ্তার করেনি, সেহেতু গুটি কয়েক ছেলে একটু দুষ্টামিই করছিল, এর বেশি কিছু নয়। এ রকম মারাত্মক বিশ্লেষণ-চিন্তা ও যুক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা আছে বলেই তো তিনি আইজিপি!
পুলিশের হাত থেকে রেহাই পেতে গাছের আড়ালে লুকিয়েছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের এই নেত্রী। কিন্তু পুলিশের এক সদস্য সেখান থেকে তাঁকে চুল ধরে টেনে আনেন। পেছন থেকে লাথি মারেন আরেক পুলিশ সদস্য। গলাধাক্কা দেন অপর পুলিশ সদস্য। গতকাল দুপুরে রাজধানীর শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণি থেকে ছবিগুলো তুলেছেন সাজিদ হোসেন
২...
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, প্রতীয়মান হয়েছে যে সালাহ উদ্দিন এত দিন আত্মগোপনে ছিলেন। তাজ্জব কি বাত! আমাদের গ্রাম পুলিশ আছে, আনসার আছে, আছে পুলিশ, সিআইডি, ডিবি এবং সবার ওপরে র্যা ব। আরও আছে বিজিবি। হাইকোর্টের আদেশ-নির্দেশ, মিডিয়া-সিভিল সোসাইটির তোলপাড়, অনেক মহলের প্রচণ্ড (অহেতুক) সমালোচনা—এত কিছুর মধ্যেও সালাহ উদ্দিন সাহেব পুরো দুই মাস সবাইকে ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপন করে থাকতে পারলেন? শুধু তা-ই নয়, সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারতের হাসপাতালে হাজির!
পুলিশের হাত থেকে রেহাই পেতে গাছের আড়ালে লুকিয়েছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের এই নেত্রী। কিন্তু পুলিশের এক সদস্য সেখান থেকে তাঁকে চুল ধরে টেনে আনেন। পেছন থেকে লাথি মারেন আরেক পুলিশ সদস্য। গলাধাক্কা দেন অপর পুলিশ সদস্য। গতকাল দুপুরে রাজধানীর শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণি থেকে ছবিগুলো তুলেছেন সাজিদ হোসেন
সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচণ্ড আত্মমূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি। সালাহ উদ্দিন সাহেব সরকারি কর্মকর্তা, সাংসদ এবং প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। অর্থাৎ নিত্যনৈমিত্তিক কোনো ছিঁচকে চোর বা ভীষণ সন্ত্রাসী-অপরাধী নন। তাঁর মতো একজন লোক যদি দু-দুমাস এভাবে আত্মগোপন করে থাকতে পারেন, তাহলে কোনো সত্যিকার ভীষণ অপরাধী সহজেই ভাবতে পারে যে বাংলাদেশ লুকিয়ে থাকার জন্য অত্যন্ত উচ্চমানের আশ্রয়স্থল। অথবা সালাহ উদ্দিন সাহেবকে ওস্তাদ মেনে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে কীভাবে দীর্ঘ সময় আত্মগোপন করে থাকতে হয়, তার তালিম নিতে পারে।
ভুল স্বীকার দোষ অল্প। সালাহ উদ্দিন ‘আত্মগোপনে’ যাওয়ার সাত দিনের মাথায় ভেবেছিলাম, এই ‘আত্মগোপন’টা চিরস্থায়ী। এই ভুলের জন্য দুঃখ নেই। তিনি জীবিত ফিরে এসেছেন। সব ভালো যার শেষ ভালো।।
৩...
অনন্ত বিজয় দাশ খুন হয়েছেন। আগে খবরে শুনতাম, পত্রিকায় পড়তাম যে দুনিয়ায় অনেক দেশ আছে, যেখানে লেখালেখির কারণে, মত প্রকাশ করার কারণে জেল-জুলুম-নির্যাতন হয়, হত্যা হয়। গত কয়েক বছরে জেল-জুলুম-নির্যাতন বেশ কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অতীতে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক নিহতও হয়েছিলেন।
অনন্ত বিজয় দাশের হত্যার খবরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের যে প্রতিক্রিয়া, অর্থাৎ ‘হেডলাইন নিউজ’ আর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের যে উদ্বেগ, তাতে এটা স্পষ্ট যে তারা মনে করছে, বাংলাদেশে মত প্রকাশের জন্য হত্যা এখন রুটিন ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়তে থাকলে যা হয়, আমাদেরও তা-ই হচ্ছে। পুলিশ এখন ‘দুষ্টামি-দুষ্টামি খেলছে, অন্যকে দুষছে আর হত্যাকারীরা দল বেঁধে দিবালোকে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলছে। অপরাধীদের চিহ্নিত করে খুঁজে বের করে প্রমাণ সাপেক্ষে আদালতে বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করা—এটা বোধ হয় আমাদের পুলিশ আর পারবে না। পুলিশ এখন পারে মেয়েকে প্রকাশ্যে নির্যাতন করতে, গ্রেপ্তার-বাণিজ্য করতে আর...। থাক, আর বললাম না।
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট, অধ্যাপক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.