‘আওয়ামী লীগের মুখোশ’ by সোহরাব হাসান

স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর জিয়াতনয় তারেক রহমান মহা আবিষ্কার করে ফেললেন যে জিয়াউর রহমান কেবল স্বাধীনতার ঘোষক নন, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতিও। তিনি যে তাঁর এই প্রচারণা লন্ডনে বক্তৃতা-বিবৃতিতে সীমিত রেখেছেন, তা-ই নয়, এ নিয়ে একটি বইও সম্পাদনা করে ফেলেছেন৷ এর আগে পলিটিক্যাল থটস অব তারেক রহমান নামে লন্ডন থেকে ইংরেজি ভাষায় পূর্ব-পশ্চিমের পণ্ডিতদের আরও একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল৷ পশ্চিমের কিছু গবেষক অর্থের বিনিময়ে যেকোনো বিষয়ে যেকোনো ব্যক্তির চাহিদা অনুযায়ী ঢাউস ঢাউস রচনা সরবরাহ করে থাকেন৷ তাঁর সম্পাদিত সদ্য প্রকাশিত বইটির প্রকাশনা উপলক্ষে রঙিন পোস্টারে রাজধানীর দেয়ালগুলো ঢেকে দিলেও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কয়েকজন দলীয় বুদ্ধিজীবী ও মুষ্টিমেয় নেতা-কর্মীর বাইরে কাউকে দেখা গেল না। এমনকি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও সেখানে তসরিফ আনেননি। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে তারেক রহমানের প্রবল আপত্তির কারণেই মির্জা সাহেবের ভারপ্রাপ্তের ভারমুক্তি হচ্ছে না।

লন্ডন থেকে তারেক রহমান সম্পাদিত ও জিয়া ফাউন্ডেশন প্রকাশিত জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও স্বাধীনতার ঘোষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম তাঁর বন্দনা করতে গিয়ে বললেন, ‘বইটি প্রকাশের মাধ্যমে তারেক রহমান আওয়ামী লীগের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। ...আওয়ামী লীগের নেতারা যখন চারদিকে মিথ্যার বেসাতি ছড়াচ্ছিল, সত্যকে মিথ্যা বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছিল, তখন তারেক রহমান এই বইটি প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন।’ (নয়া দিগন্ত, ১৬ জুন, ২০১৪)
একটি পত্রিকা শিরোনাম করেছে ‘আওয়ামী লীগের মুখোশ উন্মোচন করেছেন তারেক’৷ দেখে আশান্বিত হয়েছিলাম। সংসদ বাংলা অভিধান অনুযায়ী মুখোশ খোলা বা উন্মোচনের অর্থ হলো প্রকৃত রূপ উদ্ঘাটন৷ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখন মুখ ও মুখোশের খেলা এবং সব দলে সৎ ও নিষ্কলুষ মুখগুলো পেছনে ফেলে মুখোশগুলোরই দোর্দণ্ড প্রতাপ চলছে, তখন তারেক রহমান যদি কারও মুখোশ উন্মোচন করেন, তাহলে তাঁকে সাধুবাদই জানাতে হয়।
কিন্তু তারেক রহমান বা তাঁর বাংলাদেশ প্রতিনিধি তরিকুল ইসলাম বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে সারা দেশে যে মুখোশেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের সম্পর্কে কিছুই বলেননি৷ তাদের কারও নাম উচ্চারণ করেননি৷ তারেক-তরিকুলরা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের ‘মুখোশ উন্মোচন’ করছেন৷ বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান৷ তাঁর অনুপস্থিতিতে, তাঁরই নামে নয় মাস মুক্তিযুদ্ধটি পরিচালনা করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন মুজিবনগর সরকার৷ জিয়াউর রহমান ছিলেন সেই মুজিবনগর সকারের অধীনে পরিচালিত রণাঙ্গনের একজন সেক্টর কমান্ডার৷ এখন মুজিবনগর সরকার কিংবা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে অস্বীকার করলে মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদানকেও কি অস্বীকার করা হয় না?
তারেক-তরিকুলরা বলতে চাইছেন, সাতই মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেশবাসীকে আহ্বান জানাননি, তিনি বাংলাদেশের প্রথম বৈধ রাষ্ট্রপতি ছিলেন না। ১৯৭২ সালে তাঁর নেতৃত্ব গঠিত সরকারটিও বৈধ ছিল না। শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন সরকারটি অবৈধ হলে সেই সরকারের নিয়োগ পাওয়া সেনাবাহিনীর উপপ্রধান জিয়াউর রহমানও যে অবৈধ হয়ে যান, সেই সহজ সত্যটি তারেক রহমান বুঝতে না পারুন, অন্তত তরিকুল ইসলামের মতো একদা কড়া বাম নেতার বোঝার কথা৷
আমরা ভেবেছিলাম, তারেক রহমান বই লিখে বা সম্পাদনা করে বর্তমানে আওয়ামী লীগের যেসব নেতা মুখোশ পরে ঘুরছেন, যাঁরা দলের নামে নানা অপকর্ম করছেন, যাঁরা সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি করছেন, একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন, তাঁদের মুখোশ উন্মোচন করতে তৎপর হবেন। কিন্তু তিনি সেদিকে না গিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে টান দিয়েছেন৷ রাজনীতির ক খ পড়া ব্যক্তিরা এটি জানেন যে মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনেই সেই যুদ্ধ সংঘটিত ও পরিচালিত হয়েছে। সেখানে জিয়াউর রহমান বা অন্য কোনো সেক্টর কমান্ডারের ভূমিকা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকাকে ছাপিয়ে যেতে পারে না৷
তবে বিএনপির নেতারা মুক্তিযুদ্ধকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘মুখোশ’ নিয়ে যতই টানাটানি করুন না কেন, বর্তমানে দলটির বর্তমান নেতৃত্বে মুখোশ নিয়ে সম্ভবত বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে চান না। এই না-চাওয়ার কারণ কি ২০০১-০৬ মেয়াদের বিএনপির শাসন? এর কারণ কি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা? এর কারণ কি কিবরিয়া-আহসানউল্লাহ হত্যার ঘটনা? এই যে নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনা ঘটল, ফেনীতে উপজেলা চেয়ারম্যানকে খুন করা হলো, লক্ষ্মীপুরে একের পর এক মানুষ খুন হচ্ছে, সারা দেশে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডারদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ, সর্বশেষ মিরপুরের বিহারিপল্লিতে হামলা চালিয়ে, আগুন দিয়ে ১০ জন মানুষকে খুন করা হলো, বিদেশি বন্ধুদের ক্রেস্ট দেওয়ার নামে সোনা জালিয়াতির ঘটনা ঘটাল, ক্ষমতাসীনেরা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ছোবড়া করে ফেলল, বিএনপি নেতারা এর প্রতিবাদে মতিঝিলে বা নয়াপল্টনে একটি মিছিল পর্যন্ত বের করলেন না৷ কিংবা জনগণের প্রাত্যহিক সমস্যা নিয়েও তাঁরা একিট মানববন্ধন করতে এগিয়ে আসেননি। তাঁরা কি এ কারণে আওয়ামী লীগের নেতাদের মুখোশ উন্মোচন করছেন না যে তাতে তাঁদের মুখোশও খুলে যেতে পারে৷
বিএনপি আট বছর ক্ষমতার বাইরে থাকলেও অতীত তাদের পিছু ছাড়ছে না। তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র হত্যা করার অভিযোগ এনেছে। কিন্তু ২০০১ সালের বিপুল ভোটে বিজয়ী বিএনপিও গণতন্ত্র সমুন্নত রেখেছে, তার প্রমাণ নেই। নির্বাচনের দিন থেকেই বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর তাণ্ডব চালাল দলীয় ক্যাডাররা৷ অনেকের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে–পুড়িয়ে দিল৷
চাঁদের যেমন নিজস্ব আলো থাকে না, তেমনি আমাদের দেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিজের মহিমায় ক্ষমতায় আসে না। প্রতিপক্ষের অপকর্মের পাল্লা ভারী হওয়ার কারণেই তারা জয়ী হয়। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের অপকর্মের পাল্লা ভারী ছিল বলে বিএনপি জয়ী হয়েছে। ২০০৮ সালে তার বিপরীতটাই ঘটেছিল। ২০১৪ সালে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলে কী হতো, তা নিয়ে এখন বিতর্ক করে লাভ নেই৷ কেউ বলেন, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচন করলেও বিএনপি জয়ী হতো। কেউ বলেন, আওয়ামী লীগ সেই সুযোগ দিত না৷ কিন্তু বিএনপি তো নির্বাচন করার প্রস্তুতি ও সরকারি দলের ষড়যন্ত্র মোকাবিলার প্রস্তুতিটা নিতে পারত৷ রাজনৈতিক মহলের ধারণা, অন্য কোনো শক্তির ভরসায় তারা সেই প্রস্তুতিটুকুও নেয়নি৷ সম্ভবত তাদের ধারণা ছিল ২০০৭ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটবে৷ কিন্তু তা ঘটেনি৷ আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার সুযোগ পেল৷ ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পাঁচ মাস পরও বিএনপি কেন জনগণের সমস্যা নিয়ে মাঠে নামছে না, তা রহস্যজনক।
আসলেই কি বিএনপি আওয়ামী লীগের মুখোশ খুলতে চায়? চায় না। আওয়ামী লীগের মুখোশ খুললে যদি তাদের মুখোশটিও বেরিয়ে পড়ে! এ কারণেই তারেক রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস নতুন করে লেখার দায়িত্ব নিয়েছেন। এটি বিএনপির জন্য রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল হবে বলে অনেকে মনে করেন৷
বিএনপি যদি সত্যি সত্যি আওয়ামী লীগের মুখোশ খুলতে চাইত, তাহলে তারা নারায়ণগঞ্জে শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে, ফেনীতে নিজাম হাজারীর বিরুদ্ধে, লক্ষ্মীপুরে আবু তাহেরের বিরুদ্ধে, কক্সবাজারে আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে, মিরপুরে ইলিয়াস মোল্লাহর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতো। অন্তত আর কিছু না পারুক, একটি মানববন্ধন করতে বা মিলাদ পড়তে পারত। কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার চেয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের গডফাদার-মাস্তানদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা অনেক সহজ। তাতে স্থানীয় জনগণের সমর্থনও পাওয়া যেত৷ এমনকি ক্ষমতাসীন দলের সুবিধাবঞ্চিত নেতারাও তা সমর্থন করতেন৷ স্থানীয় জনগণের অভাব-অভিযোগ ও সমস্যা নিয়ে কথা বললে মানুষ তাতে তাঁদের স্বার্থেই সাড়া দিত।
কিন্তু আমাদের একশ্রেণির বামপন্থী অতীতে যেমন বিপ্লবের চেয়ে এক কণা কম কিছুতে রাজি ছিলেন না, তাঁরা ভোটের বাক্সে লাথি মেরে সুন্দরবনে আস্তানা গাড়তে চেয়েছিলেন, তেমনি বর্তমান বিএনপির নেতারাও শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও নতুন নির্বাচনের বাইরে কিছু দেখছেন না।
পত্রিকান্তরে দেখলাম, বিএনপি দুই কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। এক, বিদেশি কূটনীতিকদের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে নতুন নির্বাচন দিতে বাধ্য করা। নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া বিএনপির নেতাদের মুখে কোনো কথা নেই।
এই যে সারা দেশে সন্ত্রাস-দুর্নীতি চলছে, মানুষ খুন হচ্ছে, একেকটি জনপদ সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, সেসবের বিরুদ্ধেও তাদের সোচ্চার হতে দেখা যায় না। এমনকি বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে যারা সহযোগী ছিল, তারাও অনেকটা দূরে সরে যাচ্ছে। বিএনপির বিগত আন্দোলন-সংগ্রাম ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ দলীয় ও জোটের নেতা-কর্মীদের বাইরে তাতে গণমানুষকে সম্পৃক্ত করতে না পারা। সেই গণমানুষকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও নেই দলের পক্ষ থেকে। ফলে ক্ষমতাসীন দলের অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার মানুষগুলোও আর বিএনপির প্রতি ভরসা করতে পারছে না।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.