সাংসদদের বাড়ি আর গাড়ি by আলী ইমাম মজুমদার

‘এক চিফ হুইপের এত্ত সরকারি বাসা!’—এ শিরোনামে অল্প কিছুদিন আগে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এসেছে প্রথম আলোয়৷ প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি তাঁর জন্য নির্ধারিত সরকারি বাংলো ও অফিস ছাড়াও সংসদ সদস্য ভবনে আরও সাতটি বাসা নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন৷ যথারীতি প্রতিবাদ এসেছে তাঁর দপ্তর থেকে৷ প্রতিবাদে বলা হয়েছে, প্রকাশিত সংবাদ অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত৷ পক্ষান্তরে, প্রতিবেদক দাবি করেছেন, প্রতিবেদনের সব তথ্যই সঠিক৷ আর চিফ হুইপের নির্ধারিত অফিস ও বাংলোর অতিরিক্ত বাসা তিনি ব্যবহার করছেন বা তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, এমনটা প্রতিবাদপত্র পড়েও দেখা যায়৷ সুতরাং, প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যাদির সংখ্যা ও প্রকৃতি নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত থাকলেও মৌলিক প্রভেদ তেমন দেখা যায় না৷ প্রতিবাদলিপিতে উল্লেখ রয়েছে, জাতীয় সংসদ ভবনের নিরাপত্তা বিবেচনায় ‘নিয়মনীতির মধ্য থেকেই’ অন্য সাংসদদের মতো চিফ হুইপও তাঁর নির্বাচনী এলাকা থেকে আগত জনগণের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সংসদের বাইরে অফিসকক্ষটি ব্যবহার করেন৷ আমাদের জানা মতে, সংসদের বাইরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও নাখালপাড়ার ফ্ল্যাটগুলো সাংসদদের থাকার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়৷ এর কিছুসংখ্যক যে কীভাবে আর কবে থেকে অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা অনেকের অজানা৷ আর যাঁর অফিস রয়েছে, রয়েছে প্রাসাদসম সজ্জিত বাংলো, তিনিই-বা কোন যুক্তিতে এ ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাবেন, তাও বোধগম্য নয়৷ বোধগম্য নয় এর সার্ভিস চার্জ নামক ৬০০ টাকার একটি হাস্যকর অঙ্ক ধার্য করার বিষয়টি৷

সাংসদের দায়িত্ব পালন করতে হলে কিছু রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার আবশ্যকতা রয়েছে৷ কিন্তু বিবেচনা করতে হবে সেই সুযোগ-সুবিধাগুলোর নৈতিক দিক আর এর পরিসর৷ সাংসদেরা কী কী সুযোগ-সুবিধা পাবেন, তা ১৯৭৩ সালের ২৮ নম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত৷ সেই আইনে বহুবার পরিবর্তন এসেছে৷ আর পরিবর্তনগুলো হয়েছে সাংসদদের সুবিধাদি অধিকতর বৃদ্ধি করেই৷ সংযোজন হয়েছে কোনোরূপ ট্যাক্স ও ডিউটি ব্যতিরেকে গাড়ি আমদানি আর নিজ নির্বাচনী এলাকায় একটি অফিস রাখার জন্য সরকারি ভাতার বিধান৷ কিন্তু আইনটির কোথাও বিনা ভাড়ায় এবং নামমাত্র সার্ভিস চার্জ দিয়ে এ ধরনের সরকারি ব্যয়ে সজ্জিত ফ্ল্যাট ব্যবহারের বিধান রাখা হয়নি৷ অবশ্য এটা সত্য যে এ উপমহাদেশে সাংসদদের রাজধানীতে অধিবেশন চলাকালে আবাসনসুবিধার প্রথা রয়েছে৷ কিছু ফ্ল্যাট এমনকি বাংলো বরাদ্দেরও ব্যবস্থা রয়েছে দিল্লিতে৷ কিন্তু সংসদের ভেতরে আর বাইরে অফিস রাখার বিধানটি কোথাও আছে? মন্ত্রীরা সচিবালয়ে ও সংসদ ভবনে অফিস পান৷ পেয়ে থাকেন সরকারি ব্যয়ে বিনা ভাড়ায় সজ্জিত বাসভবন৷ এগুলোর পরিষেবা বিলও মেটায় সরকার৷ এরূপ সুবিধা পেয়ে থাকেন স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধী দলের নেতা-উপনেতা, সংসদের চিফ হুইপ ও হুইপরা৷ তাঁদের কেউ কেউ নিজ বাসায় থাকলেও একে প্রয়োজনীয় সজ্জিত করা, পরিষেবা বিল পরিশোধ আর বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি বরাদ্দ রয়েছে৷ তাঁদের অফিস ও বাসাগুলোয় নির্বাচনী এলাকা থেকে আগত লোকেরা সাক্ষাৎ করতে পারেন৷ এ কারণে সাংসদদের বসবাসের জন্য নির্ধারিত ফ্ল্যাট কেন বরাদ্দ নিয়ে দখলে রাখতে হবে, তা বোধগম্য নয়৷ এটাকে অনৈতিক বলা কি খুব কঠিন ভাষা হবে? মনে তো হয় না৷ তারপর রয়েছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৮০০ বর্গফুটের এ ফ্ল্যাটগুলোর সার্ভিস চার্জ প্রসঙ্গে৷ ঢাকা মহানগরের এ ধরনের ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ, গ্যাস ছাড়াও অন্যান্য পরিষেবা বিল পাঁচ-ছয় হাজার টাকা আসে৷ এ ক্ষেত্রে এ অযৌক্তিক পরিমাণ অঙ্ক কেন ধার্য করা হলো, তা পুনরায় তলিয়ে দেখার আবশ্যকতা রয়েছে৷
এ ফ্ল্যাটগুলোর বরাদ্দ, সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ, ব্যবহারের নীতিমালা তৈরি—সবই করে ১২ সদস্যবিশিষ্ট সংসদের হাউস কমিটি৷ চিফ হুইপ এর প্রধান৷ বলার অপেক্ষা রাখে না, বিষয়টি তাঁদের সুবিবেচনা পেতে ব্যর্থ হচ্ছে৷ অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দ নিয়ে কেউ কেউ অন্যকে থাকতে দেন৷ অথচ তাঁদেরই প্রণীত নীতিমালা অনুযায়ী সাংসদ, তাঁর স্ত্রী বা স্বামী, ছেলেমেয়ে ও মা-বাবা ছাড়া কেউ এগুলোয় বসবাস করতে পারেন না৷ কিন্তু দুঃখজনকভাবে ব্যতিক্রমই এখানে নিয়ম৷ নবম জাতীয় সংসদের শেষ দিকে এমন একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, ৬৬ জন সাংসদ শুধু তা-ই করেছেন৷ আর এগুলো যাঁরা করেছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন কয়েকজন তারকা রাজনীতিক৷ এ নিবন্ধে তাঁদের নাম উল্লেখ যথোচিত হবে বলে মনে হয় না৷ এগুলোকে কেউ ব্যবহার করছেন অফিস হিসেবে৷ অথচ বরাদ্দ হওয়ার কথা শুধু আবাসন হিসেবে৷ আরও একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করার মতো, সাংসদদের সবার না হলেও বেশ কিছুসংখ্যকের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে রাজধানীতে৷ কারও কারও বাড়ি তো প্রাসাদসম৷ তারাও তো এসব ফ্ল্যাটের দাবি ছাড়ছেন না৷ রাজধানীতে যাঁদের বাড়ি নেই, অন্য কোনো সূত্রে সরকারি বাড়ি বরাদ্দ পাননি কিংবা খুবই ছোটখাটো কোনো বাড়িতে থাকেন, তাঁদের জন্যই তো এ ফ্ল্যাটগুলো৷ হাউস কমিটির নীতিমালা মূলত তাই৷ তবে অনেক নীতিমালার মতো এটাও কার্যত উপেক্ষিত৷ এ সংস্কৃতির সূচনা বেশ কিছুকাল আগে৷ তবে ধীরে ধীরে অবস্থান জোরদার হচ্ছে৷
ট্যাক্স ও ডিউটি ব্যতিরেকে গাড়ি আমদানির বিষয়টি তাদের ওপরে উল্লেখিত প্রাধিকারসংক্রান্ত আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এরশাদ শাসনামলে৷ তবে এর পরে রাজনৈতিক সরকারগুলো এ সুযোগের পরিসর ক্রমাগত বাড়িয়েছে৷ এসব বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে চমৎকার ঐকমত্য৷ বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অধ্যাদেশ জারি করে বিধানটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল নৈতিক দিক বিবেচনায়৷ কিন্তু নির্বাচিত সংসদ অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপান্তর না করায় এটার অপমৃত্যু হয়েছে৷ এ সরকারের পান থেকে চুন খসলেই বিএনপি তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে৷ কিন্তু এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব৷ ঠিক তেমনি বিএনপি সরকারের সময়েও আওয়ামী লীগ একই আচরণ করত৷ এসব বিষয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে উদার সহযোগিতা৷ সাংসদদের গাড়ি আমদানিসংক্রান্ত এ ধরনের কোনো সুযোগ নেওয়ার নজির এ উপমহাদেশে নেই৷ ট্যাক্স ও ডিউটি ব্যতিরেকে গাড়ি আমদানির বিধানটি নৈতিক দিক বিবেচনায় অগ্রহণযোগ্য বলে দেশের বিভিন্ন মহল সূচনা থেকেই মতামত দিয়ে যাচ্ছে৷ কিন্তু কোনো সরকারই তা আমলে নিচ্ছে না৷ এসব গাড়ির হাল আমলের ব্যবহারের চিত্র সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা নেই৷ তবে ২০০৭ সালের আগে বেশ কিছু সাংসদ মোটা মুনাফায় তাঁদের গাড়িগুলো বিক্রি করে দিয়েছিলেন৷ সেই ক্রেতা ও বিক্রেতারা এক-এগারোর পর দুই বছর ছিলেন চরম অস্বস্তিতে৷
জাতীয় সংসদ মূলত আইন প্রণয়নের কাজ করে৷ তা ছাড়া, এর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই গঠন করে সরকার৷ সুতরাং, একে অপরের পরিপূরক৷ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিতও করে তারাই৷ সংবিধানের আওতায় সব বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের৷ তাদের নিজেদের সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কেও তারাই প্রণয়ন করে আইন৷ অবশ্য তাদেরই তা করার কথা৷ তবে আমাদের সংবিধান এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারেনি—এমন কথা এখন অনেকেই বলছেন৷ তাঁরা দাবি করেন, ক্ষমতার ভরকেন্দ্র নিয়েই নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে৷ তবে এ বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল দুটো নীরব৷ মনে হয়, তারা এমনটাই চায়৷ আর তা হলেই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগের যথেচ্ছ সুযোগ থাকে৷
চলমান এ সংস্কৃতি থেকে পিছু হটার সময় এসেছে৷ আসবাবে সজ্জিত এসব ফ্ল্যাটের ভাড়া নাই ধরলেন, পরিষেবাসংক্রান্ত প্রকৃত ব্যয়ও তো অন্ততপক্ষে তাঁদের কাছ থেকে আদায় করা সংগত হবে৷ গাড়িসংক্রান্ত বিষয়টিও জনম জনম খোলা না রেখে একটি জায়গায় এনে থামানো দরকার৷ রাজনীতিবিদদের মধ্যে বহু সজ্জন ও বিবেচনাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি আছেন৷ তাঁরা কিছুটা সরব হলে এসব বিষয় অনেকটা যৌক্তিক রূপ পাবে৷ সাংসদদের ন্যায্য সুবিধাদির বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব কারও নেই৷ তবে তা বাস্তবভিত্তিক ও দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের নিরিখে নির্ধারিত হওয়া সংগত৷
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.