'শেষ স্বপ্ন' পূরণে দুই দলেরই অভিন্ন ভাবনা by সামীউর রহমান

শুরুতেই মিথ্যাবাদী রাখাল আর বাঘকে নিয়ে ঈশপের গল্পটা মনে করিয়ে দেওয়া যাক। সেই যে এক রাখাল, বারবার বাঘ এসেছে বাঘ এসেছে বলে গ্রামবাসীদের ধোঁকা দিত। বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল আর ওয়ানডে মর্যাদার লুকোচুরিতে সেই গল্পটাই বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে। কর্মকর্তাদের দেওয়া ভুল তথ্য, দুর্বোধ্য সূচি অথবা আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দলকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখার কৌশল, কারণ ছিল অনেক।


তাই একসময় বলা হচ্ছিল, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে জিতলেই বুঝি ওয়ানডে মর্যাদা পেয়ে যাবে বাংলাদেশের মহিলা দল। সেই ভুল পরে ভাঙল, জানা গেল এত সহজে হচ্ছে না। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে জিতলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলের সঙ্গে প্লে-অফ খেলে সেমিফাইনালে যাওয়ার সুযোগ। কিন্তু ৮০ রানের হারে সেই স্বপ্নও ভেঙেছে। শ্রীলঙ্কাকে হারাতে পারলেও সুযোগ ছিল 'অর্ধেক রাজত্ব ও রাজকন্যা'র মতো ওয়ানডে মর্যাদা ও ২০১৩ সালে মূল বিশ্বকাপের সহ-স্বাগতিক হওয়ার সুযোগ। ৬ উইকেটের হার কেড়ে নিয়েছে সেই আশাও। এবার হারলে আর রক্ষা নেই, কোনো উপায়ও নেই। সামনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তাদের হারিয়ে পঞ্চম-ষষ্ঠ স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জায়গা করে নেওয়ার শেষ সুযোগ। সেখানে 'যদি' বা 'কিন্তু'র কোনো সমীকরণ নেই।
টানা ম্যাচ খেলার ক্লান্তির কারণেই হয়তো ম্যাচের আগের দিন ঘাম ঝরানো অনুশীলনের চিন্তা-ভাবনা বাদ দিয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট। বেশির ভাগ খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দিয়ে শারমিন সুপ্তা, সাথিরা জেসিসহ অল্প কয়েকজনকেই অনুশীলন করিয়েছেন কোচ মমতা মাবেন। স্কোয়াডে থাকলেও এখন মূল একাদশের হয়ে বিশ্বকাপে নামা হয়নি সুপ্তা কিংবা জেসির। কোচ ও অধিনায়ক দুজনেই জানিয়েছেন, একাদশে পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে। ধারণা করা যায়, সে কারণেই জেসি-সুপ্তাদের নিয়ে একটু আগেভাগে অনুশীলনে আসা। সুযোগ পেতে মুখিয়ে আছেন জেসি, নিজেকে প্রমাণ করার অপেক্ষার পালাটা হয়তো আজ সকালেই ফুরিয়ে যাবে তাঁর, 'আক্ষেপ নেই, তবে কষ্ট আছে। শুরুর দিকে চোটের কারণে মাঠে নামা হয়নি।' ডান হাতে ব্যাটিং ও অফব্রেক বোলিং করা জেসি জানিয়েছেন, সুযোগ পেলেই নিজেকে মেলে ধরতে চান উজ্জ্বলভাবে, 'সুযোগ পেলে নিজের সেরাটা উজাড় করে দিতে চাই, দেশের জন্য কিছু করতে চাই।'
অধিনায়ক সালমা খাতুন অবশ্য অনুশীলনে আসেননি। তাঁকে পাওয়া গেল রূপসী বাংলা হোটেলে। আজকের ম্যাচ নিয়ে তাঁর রণ-পরিকল্পনা, 'যদি আগে ব্যাট করতে হয়, চেষ্টা থাকবে দুই শ' বা তার বেশি রান করার। আর যদি আগে বোলিং করি, তাহলে চাইব এক শ রানের নিচে তাদের অল আউট করে দিতে।' একই সঙ্গে আভাস দিয়েছেন দলের মিডল অর্ডারে পরিবর্তনের। বাংলাদেশ দলের কোচ মমতা মাবেনের কণ্ঠেও সেই সুর, 'একটা পরিবর্তন হতে পারে। রাতে আলাপ-আলোচনা করে সকালে সাভারের (বিকেএসপি) উইকেট দেখে সিদ্ধান্ত নেব।' অনুশীলনে সবাইকে না নিয়ে এলেও যুক্তরাষ্ট্রকে মোটেই হালকাভাবে নিচ্ছে না বাংলাদেশ। মাবেনের ভাষায়, 'কোনো দলকেই আমরা হালকাভাবে নেইনি, যুক্তরাষ্ট্রকেও নিচ্ছি না। ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের সতেজ রাখতেই অনেককে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে।' ভারতীয়, পাকিস্তানি ও ক্যারিবীয় ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহিলা দলের অধিনায়ক অবশ্য এই ম্যাচ নিয়ে দারুণ আশাবাদী। তাঁর ধারণা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহিলারা যদি ওয়ানডে মর্যাদা পেয়ে যায়, তাহলে ক্রিকেটটা অভিবাসীদের খেলা থেকে 'প্রকৃত মার্কিনি'দের খেলা হয়ে উঠবে। আসবে পৃষ্ঠপোষক, বাড়বে জনপ্রিয়তা। কোচ রবিন সিংয়ের প্রশিক্ষণে সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে ডরিস ফ্রান্সিসের দল। বাছাই পর্বের ম্যাচে জয়ের চেয়ে পুরো ৫০ ওভার মাঠে কাটানোর ব্যাপারেই যেন বেশি মনোযোগী ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিকেটাররা। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১ উইকেটের জয়ে তারা সুযোগ পেয়েছেন পঞ্চম-ষষ্ঠ স্থান নির্ধারণী ম্যাচের প্লে-অফ খেলার। বাস্তবতার দুনিয়া থেকে খানিকটা দূরত্বেই যেন তাঁর বসবাস, 'আগে ব্যাট করলে আড়াই শ'র মতো রান করতে চাই। যদি আগে বল করতে হয়, তাহলে বাংলাদেশকে ১০০ রানের নিচে অল আউট করতে চাইব।'
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাঁদে রকেট পাঠানোর ইচ্ছেটা যতটা আকাশ-কুসুম কল্পনা, ইনডোরে এবং ম্যাট উইকেটে অনুশীলন করা 'বহুজাতিক' যুক্তরাষ্ট্র দলের বাংলাদেশকে এক শ'র নিচে অল আউট করার ইচ্ছেটাও এখনো তেমন। শক্তি, সামর্থ্য ও অভিজ্ঞতার বিচারে বাংলাদেশ দলই এগিয়ে। কিন্তু কথায় তো বলে, 'ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা।'

No comments

Powered by Blogger.