এরশাদের কাছে দেশ কতটা নিরাপদ? by সোহরাব হাসান

১৯৯০ সালে গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ নতুন একটি সংগঠনের জন্ম দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সমর্থক পেশাজীবী সংগঠন আছে। বিএনপি-সমর্থক পেশাজীবী সংগঠন আছে। অতএব এরশাদ সাহেবেরও একটি সংগঠন দরকার। সেই সংগঠনের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে গত রোববার জাতীয় পার্টি আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বরাবরের মতো নিজের সাফাই গেয়েছেন। এরশাদ বলেছেন, তিনি নাকি ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করতে চাননি। বিচারপতি আবদুস সাত্তার স্বেচ্ছায় ও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁর কর মোবারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব সঁপে দিয়েছিলেন। আমাদের ইতিহাসে সামরিক শাসকদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার নজির কম নয়। তবে সেটি ঘটে থাকে বন্দুকের মুখে। ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবরও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা আইয়ুব খানের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিলেন। আইয়ুব খান সে সময়ে ক্ষমতা দখল করতে যে জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের ব্যবহার করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উদ্যমী ছিলেন ইয়াহিয়া খান। তিনিই প্রেসিডেন্ট হাউসে গিয়ে আইয়ুব খানের ইচ্ছের কথাটি জানান এবং পদত্যাগের জন্য চাপ দেন। এরই পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ। আইয়ুব খান জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে দেশের বিশৃঙ্খল অবস্থায় দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর সহায়তা চেয়েছিলেন। পরে তথ্যপ্রমাণে দেখা যায়, আইয়ুব ওই ভাষণ স্বেচ্ছায় দেননি। তাঁকে দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এরপর আইয়ুব কয়েক দিন প্রেসিডেন্ট হাউসে থাকার ইচ্ছে প্রকাশ করলেও তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়নি। তারপরও আইয়ুব নিজেকে ভাগ্যবান দাবি করতে পারেন। কেননা, ইয়াহিয়া খান তাঁকে অন্তত দেশে থাকতে দিয়েছেন। আইয়ুব তাঁর পূর্বসূরি ইস্কান্দার মির্জাকে দেশেও থাকতে দেননি। ষাটের দশকে লন্ডনে ইস্কান্দার মির্জার মৃত্যু হলে তাঁর ছেলেরা চেয়েছিলেন, বাবার মরদেহ দেশে নিয়ে আসবেন। আইয়ুব তাঁদের সেই অনুমতি দেননি। সামরিক শাসকেরা এ রকমই নিষ্ঠুর হন। এরশাদ বলেছেন, ‘আমার রাষ্ট্রের দায়িত্ব (ক্ষমতা) নেওয়ার ইচ্ছা ছিল না। জাস্টিস সাত্তারের অনুরোধে দায়িত্ব নিয়েছিলাম। তিনি তখন দেশ চালাতে অপারগ ছিলেন।’ ‘আমি নির্বাচন দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সবাই ভোট বর্জন করল।
আমাকে বাধ্য হয়ে দল গঠন করতে হয়েছে।’ এর চেয়ে ডাহা মিথ্যে আর কী হতে পারে? তিনি নির্বাচন দিয়ে যদি ব্যারাকেই ফিরে যাবেন, তাহলে গণভোট দিয়েছিলেন কেন? তাঁর পূর্বসূরি জিয়াউর রহমান ১৯ দফার পক্ষে গণভোট দিয়েছিলেন, আর এরশাদ ১৮ দফার পক্ষে। রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় এরশাদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংসদ নির্বাচনে আসার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, বিভিন্ন দল থেকে লোক ভাগিয়ে নিয়ে প্রথমে ১৮ দফা বাস্তবায়ন পরিষদ, পরে জাতীয় পার্টি গঠন করেন। এরশাদ সাহেব দাবি করছেন, তিনি ব্যারাকে ফিরে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আগে ১৯৮১ সালের ডিসেম্বরে তিনি যে পত্রিকার সম্পাদকদের ডেকে প্রকাশ্যে শাসনক্ষমতায় সেনাবাহিনীর ভাগ চাইলেন, তার জবাব কী। ১৯৮১ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এরশাদ বিচারপতি সাত্তারকেই সমর্থন দিয়েছিলেন। কেননা, তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে এ রকম একজন দুর্বল রাষ্ট্রপতিই প্রয়োজন। আসলে সেনাবাহিনীর নাম ব্যবহার করে নিজে ক্ষমতা দখল করেছেন এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিরোধের সুযোগ নিয়ে নয় বছর ক্ষমতায় থেকেছেন। এমনকি নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের পরও তিনি নতুন করে সামরিক শাসন জারির পাঁয়তারা করেছিলেন। তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল (অব) মঞ্জুর রশিদ খানের বইয়ে যার বিস্তৃত বিবরণ আছে (আমার সৈনিক জীবন: পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, প্রথমা)। এরশাদ বলেছেন, ‘ইংরেজি সাইনবোর্ডের নিচে বাংলা চালু করা আমিই প্রথম শুরু করি। আমিই অগ্রদূত। আমি ক্যালেন্ডারে ইংরেজির নিচে বাংলা চালু করাও বাধ্যতামূলক করেছিলাম।’ কিন্তু এরশাদ যে কথাটি বলেননি, তা হলো, তিনিই একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে বেদাত কাজ বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে গিয়েই ১৯৮৩ সালে দেশের খ্যাতনামা লেখক-বুদ্ধিজীবীরা গঠন করেছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সেই থেকে আজ অবধি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যেতে পারেননি। সাংবাদিক সমাজও এই স্বৈরশাসকের জন্য জাতীয় প্রেসক্লাবের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। এরশাদ সাহেব বলেছেন, আওয়ামী লীগের কাছে বিএনপি নিরাপদ নয়। আর বিএনপির কাছে আওয়ামী লীগ নিরাপদ নয়। খুবই হক কথা। এই দুটি দল একে অপরকে ঘায়েল করতে ব্যস্ত ছিল এবং এখনো আছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এরশাদের হাতে দেশ, রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিরাপদ। যেই এরশাদ শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে বেদাত বলতেন, যে এরশাদ কথায় কথায় পত্রিকা বন্ধ করে দিতেন, সেই এরশাদের কাছে কী করে দেশ নিরাপদ থাকে? যে ফেব্রুয়ারি মাসে এরশাদ জাতিকে নানা বিষয়ে সদুপদেশ দিচ্ছেন, ১৯৮৩ সালের সেই মাসেই (১৪ ফেব্রুয়ারি) ছাত্রমিছিলে গুলি করে জাফর, জয়নাল, দীপালিদের হত্যা করা হয়েছিল। আর ১৯৮৪ সালের ২৮ ফ্রেরুয়ারি মিছিলে ট্রাক উঠিয়ে দিয়ে খুন করা হয়েছিল ইব্রাহিম সেলিম ও দেলোয়ার হোসেন নামের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে। বিস্মৃতপ্রবণ বলে বাঙালির বদনাম আছে। কিন্তু এত নিকট অতীতের কথা কীভাবে ভুলে যাবে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.