সফর আলীরা আবার কেন আসছেন? by ফারুক ওয়াসিফ

বছরের শেষ দিনটা তাঁদের ভুখাই কাটল। থার্টি ফার্স্ট উৎসবের ভোরটাও তেমনই হওয়ার কথা। বাড়িতে যারা তাঁদের দিকে চেয়ে আছে, হয়তো শিশুরা ভাবছে বাবা বা মা বা বড় ভাই বা বোন ঢাকা থেকে এমন কিছু নিয়ে আসবেন, যার পর তাদের আর গরিব থাকতে হবে না। ঢাকা থেকে টাকা তথা এমপিওভুক্তির স্বীকৃতি বাবদ মাসকাবারি বেতনের নিশ্চয়তা তবু সোনার হরিণই থেকে যাবে। গত কিছুদিন এমন ধারার আন্দোলন-অনশনের পরিণতি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই লবডঙ্কা। এর সাফল্যও বড়জোর কদিন আগের সহকারী প্রাথমিক শিক্ষকদের ‘সাফল্যের’ মতোই হবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর হাত দিয়ে শরবত খেয়ে খালি হাতেই তাঁদের বাড়ি ফিরতে হয়। এমপিওভুক্তির দাবিতে শিক্ষকেরা টানা পাঁচ দিনের অবস্থান আন্দোলনের পর রোববার যখন তাঁরা অনশন আন্দোলনে বসলেন, ততক্ষণে পিইসি ও জেএসসির ফল প্রকাশ হয়ে গেছে। পাসের সাফল্যের সেই মিষ্টির ভাগ শিক্ষক হিসেবে সবার আগে তাঁদেরই—অনশনরত এই সব শিক্ষক এবং তাঁদের পর্যায়ের সবারই পাওনা।
কিন্তু অনশনে থাকায় তাঁরা সেই মিষ্টি ছুঁতে পারবেন না। সরকার প্রতিবছর পাসের রেকর্ড নিয়ে গর্ব করে, অভিভাবকেরা করেন উল্লাস। সাক্ষরতার হার নিয়ে দেশ-বিদেশে কম বড়াই হয় না। যে শিক্ষক ভাত পান না বলে গরু চরান বা দিনমজুরি করেন বা ইটভাটায় কাজ করেন, তাঁর সামনে এই গর্বের মিষ্টি নিয়ে দাঁড়াতে লজ্জা হবে না আমাদের? শুধু কুণ্ঠাহীন রয়ে যাচ্ছে সরকার। সরকারি স্বীকৃতিধন্য ৫ হাজার ২৪২টি বিদ্যালয়ের ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর ভাগ্যের শিকে ২০১১ সালের পর আর ছিঁড়ছেই না। আশ্বাস আর শরবতের বাইরে এসে আসুন একটা হিসাব কষে দেখি। বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্য আয়ের এক গর্বিত দেশ। প্রবৃদ্ধি প্রায় সাতের কাছাকাছি। দেশবাসীর মাথাপিছু আয় বছরে ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এই হিসাবে প্রতিটি নাগরিকের মতো শিক্ষকদের প্রত্যেকের ভাগেও মাসিক অন্তত ১০ হাজার টাকা পড়ার কথা। অথচ মাথাপিছু আয় আসলে দেশের মোট আয়ের এক শুভংকরী গণিতের অঙ্ক। ধনীর হাজার কোটি টাকার সঙ্গে গরিবের হাজারখানেক টাকা যোগ করে গড় করার এই তরিকায় হারিয়ে যায় গরিব মানুষের সত্যিকার বাস্তবতা। তারপরও সরকারি হিসাবে গত তিন বছরে গড় আয় ২৮২ ডলার যে বাড়ল, তার ছিটেফোঁটাও কি এসব শিক্ষক পেতে পারেন না? সৈয়দ মুজতবা আলীর পণ্ডিত মশাইয়ের গল্পটা বর্তমান সময়ে বেমানান। সাহেবের তিন ঠেঙ্গে কুকুরের কয় ঠ্যাঙ্গের খরচের সমান আমাদের সময়ের সরকারি-বেসরকারি, নন-এমপিওভুক্ত ও তহবিলহীন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের বেতন, এই কায়দায় প্রশ্ন তুলে শিক্ষকদের করুণ অপমানের জ্বালা, পাঠক আপনাদের দেব না। শুধু প্রশ্ন করব, উন্নয়ন তাহলে কার হলো, কীভাবে হলো?
সরকার ২১ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়িয়ে অন্তত ২১ লাখ পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেছে। লাখ দেড়েক সহকারী শিক্ষক, নন-এমপিও মাধ্যমিক, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য কিছু করতে পারে না? বাংলাদেশ ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা পাচারের ঘটনা দেখে, লাখো হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হওয়ার খবর পড়ে, পানামা পেপার্স, প্যারাডাইস পেপার্সের বরাতে অবৈধভাবে অর্থ পাচারের মহাদেশীয় সুড়ঙ্গের খোঁজ পেয়ে আমরা যখন বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ে সড়ক-সেতু-বিদ্যুৎ প্রকল্পের রেকর্ডের তলায় চাপা পড়ে থাকি, তখন জানতে চাওয়া কি অন্যায় হবে যে এত টাকা কোথায় যায়? এত যে কর ও ভ্যাট, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বাড়তি মূল্য আদায়—কার কল্যাণে তা ব্যয় হচ্ছে? ব্যাংক ডাকাত, শেয়ারবাজারের দস্যু, মুদ্রা পাচারের মাফিয়া—সবারই কদর, মাধ্যমিকে ১ হাজার ১১৬ কোটি টাকার চলন্ত সিঁড়ি প্রকল্পের আদর; কেবল শিক্ষকের বেলায় থলে ঠনঠনা? সরকারের উন্নয়ন দর্শনে কি কেবল ভবন আর অবকাঠামোই থাকবে, মানুষ থাকবে না, শিক্ষক থাকবে না, শিক্ষার মান থাকবে না? প্রেসক্লাবে বা শহীদ মিনারে শিক্ষকদের সাংবৎসরিক অনশন হয়তো প্রতীকী। কিন্তু আয়ের অনশনে ভোগা জীবনের প্রতিটি দিন একেবারে বাস্তব। সেই জীবনের কোনো সুন্দর প্রতীক হয় না। সেই জীবন মধ্যম তো দূরের কথা নিম্ন-মধ্যম আয়েরও নয়। আমি এমন বেসরকারি কলেজশিক্ষকদের চিনি, যাঁরা মাসের পর মাস বেতন পান না। তারপরও প্যান্টের ভেতর শার্ট ইন করে ওই শিক্ষকদের হাসিমুখে ছাত্রছাত্রীদের সামনে দাঁড়াতে হয়। যখন তাঁরা ক্লাসে যান কিংবা ঘরে ফেরেন, কত গ্লানি,
কত লজ্জা তাঁকে ঠুকরে খায়, তা সুখী মানুষের জামা পরা মানুষেরা অনুভব করেন? ২০১৬ সালের নভেম্বরে কলেজে ঢুকে পুলিশের প্রহারে এক শিক্ষকের মৃত্যু হয়। ২০১২ সালের শিক্ষা দিবসের ঠিক আগের দিন ঢাকার রাজপথে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর জলকামান হামলে পড়ে। তাঁরাও এসেছিলেন দাবি নিয়ে। ২০১২ সালে নির্যাতিত একজন শিক্ষক বাড়ি ফিরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সেই মৃত্যুর দায় কেউ নেয়নি। সফর আলী নামের সেই শিক্ষকের মৃত্যু হলেও দাবিটা এখনো মরেনি। সফর আলীদের ঢাকামুখী যাত্রাও থামেনি। জাতীয়করণসহ ১১ দফা দাবিতে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের ৯টি সংগঠন ২২ জানুয়ারি থেকে জাতীয় ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। এর আগে প্রাথমিকের সহকারী, তার আগে নন-এমপিও, তার আগে এমপিওভুক্তদের বেতন বৃদ্ধির দাবি নিয়ে সফর আলীরা আসছেনই। তাঁদের দিকে তাকিয়ে আমিও ছোট হয়ে যাই না? ব্যক্তিগতভাবে আমি ছোট হয়ে যেতেই চাই। যখন ছাত্র ছিলাম, সেই সময়ের মতো ছোট। যেন আমার ছোট মনের নজরে তাঁদের বিরাট মহিরুহের মতো মনে করতে পারি। আধপেট খাওয়া ছাত্রছাত্রীর চোখে না-খাওয়া শিক্ষককেও যেন সুখী ও মর্যাদাবান লাগে, এতটা অবুঝ কৈশোরিক হয়ে যেতে চাই। শিক্ষকের লাঞ্ছনার বেদনা যাতে আর গায়ে না লাগে, এতটা ছোট আমাদের করে দাও প্রভু।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
faruk.wasif@prothom-alo.info

No comments

Powered by Blogger.