লাঙলের ঋজুভাব ও মোতালেব by মাহমুদুজ্জামান বাবু

এই নিয়ে দ্বিতীয়বার তাঁর সঙ্গে দেখা। আমার কংক্রিট মন ও চোখ তাঁকে মনে রাখেনি। রাখার কথাও নয়। কিন্তু তাঁর মাটিমাখা স্মৃতি ভীষণ উর্বর। রাজধানীর শাহবাগ মোড় থেকে তিনি আমাকে এক সন্ধ্যায় রিকশা চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের সামনে। বরাবর আমি সেখানেই নামি। সড়ক বিভাজক টপকে গলি দিয়ে ঢুকে যাই ভাড়াবাসায়। আজও সন্ধ্যায় ফেরার পথে রিকশাভাড়া নিয়ে দর-কষাকষি করতে গিয়ে অসহায় লাগছিল। ৫০ টাকার অভ্যস্ত ভাড়া এক লাফে ৭০ টাকা হয়ে গেছে। কিন্তু রিকশাচালকের যুক্তি অকাট্য। জ্যামের কারণে প্রলম্বিত সময়ক্ষেপণ; এই সময়ে হয়তো তাঁরা আরও দুই-তিনটা ‘খ্যাপ’ মারতে পারতেন বা পারবেন। আবার জীবনযাপনে উচ্চ ব্যয়ভার; মাছ-মাংস বাদ। সরবরাহ থাকার পরও সবজির দাম রহস্যজনকভাবে চড়া। তাঁদের সমস্বর বেদনার্ত যুক্তিতে আমারও মনে পড়ে যায়, মাস খানেক আগেই আমিও কাঁচা মরিচ কিনেছিলাম কেজিপ্রতি ২৬০ টাকায়। তাঁদের এসব অকাট্য যুক্তি আর আমার মধ্যবিত্ত কপট অহম যখন অমীমাংসিত, তখন তিনি রিকশাটা টেনে এগিয়ে এসে বললেন, ‘ওঠেন বাহে।’
উঠে পড়লাম রিকশায়। আমার নিশ্চিন্ত বোধ আমাকে জানাল রোদপোড়া মুখের এই প্রবীণ মানুষটি ‘বাহে’ উত্তরবঙ্গের অঞ্চলের। গাইবান্ধা অথবা রংপুরের। নিষ্ফলা জমি যাদের সরল ও প্রত্যয়ী শ্রমে ফসল ফলায়। যারা রোদে পোড়ে। বৃষ্টিতে ভেজে। ফসল কাটে। আহার উপযোগী করে তোলে প্রগাঢ় মমতায়। তারপর বাজারে বিক্রি করতে গেলে সেই ফসলের লাভ দূরে থাক, উৎপাদন খরচও পায় না। না পেয়ে বাজারের উঠোনে অথবা মহাসড়কের কালচে বুকে অভিমানগুলো ছড়িয়ে দিয়ে যায়। রাগে না। সংঘবদ্ধ হয় না। দায়হীন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আঘাতও করে না। আমরা শহর ও নগরের বাসাবাড়ির রান্নাঘরে কিংবা নামী কোনো রেস্তোরাঁয় সুবাসিত গরম ভাতের গন্ধ নিয়ে মগ্ন হব এই স্বপ্নে যে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ।
কিন্তু আমি আর প্রবীণ মানুষটি অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যেতে পারছিলাম না। হাতিরপুল-ইস্টার্ন প্লাজার সামনে রাস্তাটির দুই পাশের দোকানগুলোতে ঝলমলে আলোয় ভরা ‘বাথরুম ফিটিংস’ সামগ্রী। বিত্তবান ক্রেতারা তাঁদের নিজস্ব গাড়ি নিয়ম ভেঙে বিপরীত দিকে চালিয়ে এসে পার্ক করছেন তেরছা ভঙ্গিতে। পছন্দের দোকানে ঢুকে যাচ্ছেন। জ্যাম এই রাস্তার নিয়তি। নিয়তির গালে থাপ্পড় না মেরে আমরা বাঁ দিকে ঢুকে যাই, সেন্ট্রাল রোডে। তারপর আঁকাবাঁকা আলো-আঁধারির পর গ্রিন রোড। সরল মানুষটি সরল নিয়ম মেনে জটিল রাজধানী শহরের জটিল রাস্তায় রিকশার প্যাডেলে পা ঘোরাতে ঘোরাতে হাঁপিয়ে ওঠেন।
‘মা বেডিং স্টোর’-এর সামনে এসে চতুর্দিকে প্যাঁচ লাগানো জ্যাম আমাদের স্থির করে দিলে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনার বাড়ি রংপুরে?’ চালকের আসনে বসেই তিনি ত্রিকোণ ভঙ্গিতে আমার মুখোমুখি হয়ে বললেন, ‘না বাহে, গাইবান্ধাত’। আমি বলি, গাইবান্ধার কোথায়? কাঁধের মলিন গামছা দিয়ে মুখের ঘাম মুছে বললেন, ‘গাইবান্ধা চিনেন? গেছিলেন তোমরা?’ আমি মাথা নাড়লে তিনি মুখ ঘুরিয়ে সামনের জ্যামের অনড় শরীরটা দেখলেন। বললেন, ‘শহর থাকি যদি পুবদিক যান, মদনের পাড়া। ওটা ছাড়ি গেলে হোসেনপুর। ওটি মোর বাড়ি।’ জিজ্ঞাসা করি, জমি-জিরাত আছে? আবাদ করেন? আমার প্রশ্নে শিশুর মতো হাসলেন এবার। ‘আবাদ করি বাহে। নিজের জমিত নয়। জমি ভাড়া নেওয়া লাগে।’ আমি চমকাই। ভাড়া মানে? কৃষিতে বর্গাপ্রথার কথা জানি। সেটা কি ভাড়া নেওয়া? একসময় তেভাগা ছিল। তেভাগা নিয়ে কৃষকদের বীরোচিত লড়াইও হয়েছিল।
কোথাও কোনো মানবিক ধ্বনি নেই। ভুলে যাচ্ছি, সুন্দরকে ধ্বংস করা সব সময়ই পাপ। দীনতা আসতেই পারে দুঃসময়ে। কিন্তু দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতমদের যে সামান্য সম্পদ অবশিষ্ট আছে, তা হরণ করা সবচেয়ে বড় শয়তানি। মোদ্দা কথা, আমাদের কোনো ঋজুভাব নেই। আছে কি?
আমার উৎসুক জিজ্ঞাসায় যেটা উত্তর এল তা হলো, হোসেনপুরের ধনী জমির মালিকেরা দুই ফসলি চাষের জন্য এখন ভূমিহীন চাষির কাছে জমি ভাড়া দেন। বিঘাপ্রতি ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত এই দর ওঠানামা করে। দলিলপত্রে স্বাক্ষর করে চুক্তি সম্পাদিত হয়। বাকির কারবার নেই। টাকা দিতে হয় অগ্রিম। ফসল তো তখনো স্বপ্নে। ঘুমিয়ে থাকা বীজের বুকে। জমানো টাকা যদি না থাকে, চড়া সুদগ্রহীতা এনজিও আছে। ব্যাংক আছে। এবার লাঙল-বলদ-সার-কীটনাশক জোগাড় করো। পাওয়ার পাম্পের পানি আনো নালা কেটে। বুঝলাম সব হলো নিরাপদে, কিন্তু যদি ধেয়ে আসে অকাল প্লাবন অথবা ঝরে পড়ে অতিবৃষ্টি? যদি ফসল মার খায়? এমন প্রশ্নে তিনি হাসেন আবার। ‘মার খালে মার। কপালত থাকলে কী করা যাবে?’
জ্যামটা চলছে এবার। তিনি বলেন, ‘হামার দুই বেটা। মেলা বুদ্ধি। বুদ্ধি বেচি খায়। গাইবান্ধা শহরত থাকে। ছোট বেটার একটা বেটি। সেটাক হামার কাছত দিয়া গেইছে। ক্লাস সিক্সত পড়ে। নাতনিটাক নিয়াই চিন্তা বাহে।’ পান্থপথের নির্দিষ্ট স্থানে রিকশাটা থেমে গেলে আমার অবাক চোখে চোখ রেখে হাসেন তিনি। ‘তোমাক আর একদিন নিয়া আচ্চিলাম।’ বুকপকেট থেকে পলিথিন মোড়ানো প্যাকেট বের করে ভাঙতি টাকা ফেরত দেন আমাকে। গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে এবার বড় করে নিশ্বাস নেন। ‘নাতনিটাক নিয়া চিন্তা বাহে।’ চিন্তিত তবু ঋজু মোতালেব।
মোতালেব যখন তাঁর নাতনির নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষাজীবন নিয়ে চিন্তা বা দুশ্চিন্তা করছিলেন, তখন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের লেখক-শিল্পীরা তাঁদের দেশের সহনশীলতার পরিবেশ কলুষিত হওয়ার অভিযোগ এনে মোদি সরকারকে দায়ী করে তাঁদের পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন, দিচ্ছেন। আবার এসব মানবিক বোধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আন্তর্জাতিক নির্বাহী চেয়ারম্যান প্রবীণ তোগাড়িয়া বিবৃতি দিয়ে বলছেন, গরু জবাইকারীকে প্রধানমন্ত্রী মোদিও রক্ষা করতে পারবেন না। গরু জবাই করে কেউ ভারতে থাকতে পারে না। এই বিবৃতির এক দিন আগে রাজধানী ঢাকার হোসেনি দালান এলাকায় মহররম পালন ও তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি সমাবেশে জীবনবিনাশী গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুর মাতম হয়েছে। কিছুদিন আগে গণপরিবহনের ভাড়া বেড়ে যাত্রীদের গলায় পা চেপে দাঁড়িয়েছে। মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের ধারাবাহিক অস্বীকারের পরও সেই ফাঁস হওয়া প্রশ্নের কপি ফেসবুক, ভাইবারসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের ওই হুল্লোড়কালীন সারা দেশে ৪২ জনকে অভিযুক্ত করে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁদের একজন র্যাবের হেফাজতে থাকার সময় রাতের অন্ধকারে হৃদ্রোগে (?) আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
সুন্দরবন রক্ষার্থে সিপিবি-বাসদের রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র-বিরোধী প্রতিবাদী যাত্রা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা লাঠিপেটা খেয়েছে পুলিশের। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া চলে গেছেন বিলেতে। একাধিপত্যে, আসন্ন শীতের কুয়াশায় ঝাপসা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। প্রতিবাদহীনতার গণস্নায়ুবিকার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে জিজ্ঞাসার সাবলীল জিব-তালু-টাকরাকে। তাই কোথাও কোনো মানবিক ধ্বনি নেই। ভুলে যাচ্ছি, সুন্দরকে ধ্বংস করা সব সময়ই পাপ। দীনতা আসতেই পারে দুঃসময়ে। কিন্তু দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতমদের যে সামান্য সম্পদ অবশিষ্ট আছে, তা হরণ করা সবচেয়ে বড় শয়তানি। আমরা যারা মোতালেবের ‘বেটা’র মতো বুদ্ধি বেচে খাই, তারা কিছুতেই এখন আর বলতে পারছি না ‘...আমার শিয়রে কোন অদীন দণ্ডাজ্ঞা জেগে নেই,/ আমি ইচ্ছে হলে পাখিদের, শাপলাপাতার নিচে মৌরালার/ ফুল ফোটানো বা ঝরানোর ছলে আমি/ এনে দিতে পারি বাগানের প্রয়োজনীয় বাতাস,/ —আমার জীবনে মনে কোনো জেল নেই।’ ...(সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত)।
মোদ্দা কথা, আমাদের কোনো ঋজুভাব নেই। আছে কি?
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।

Mzamanbabu71@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.