জাফরানের নীল সুবাস by আউয়াল চৌধুরী

কখন যে টিএসসি ফাঁকা হয়ে গেছে সে খেয়াল করেনি। যখন টের পেল, রাতের চাদর বিস্তৃত হচ্ছে ক্রমেই। বাঁ হাতে কবজি-ঘড়ি। তবুও তাকাতে ইচ্ছে করে না তার। পশ্চিম গেট পেরিয়ে ফুটপাতে এসে দাঁড়ায়। ওপারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। পুরো রাস্তা ফাঁকা। তবুও অভ্যাসবশত টপকানোর আগ মুহূর্তে ডানে-বাঁয়ে তাকায় সে। কিছু নেই। রাস্তায় পা রাখবে। ঠিক তখনই দেখে, ভোজবাজির মতো ছুটে আসছে একজোড়া হেডলাইট। এখনো অনেক দূরে। ট্রাক হবে হয়তো। কিন্তু এ রাস্তায় তো ট্রাক চলার কথা না! সে পা সরিয়ে নিল রাস্তা থেকে। উজ্জ্বল আলো ছুটে আসছে দ্রুত। সে মুহূর্তে কানের কাছে কে যেন ফিসফিসিয়ে ওঠে, ‘ঝাঁপ দে!’
চমকে ওঠে সে! ‘কে?’—আশপাশে তাকায়। কেউ নেই। ফাঁকা ফুটপাত। তাহলে কে ফিসফিসিয়ে উঠল? মুহূর্তেই মাথা ঝিমঝিম করে মগজের ভেতর ছড়িয়ে যায় অদ্ভুত এক নীলাভ আলো।
‘কী হলো?’—আবার সম্মোহনের মতো কানে বাজে সেই কণ্ঠ।
‘কী?’
‘ঝাঁপ দে।’
‘রাস্তায় কেউ ঝাঁপ দেয় নাকি?’
‘এটা তো রাস্তা নয়, নদী। ঝাঁপ দে নদীর জলে। ওই যে দূরে আলো দেখা যায়। ওটা নৌকার লণ্ঠন। মাঝি এসে জল থেকে তুলে নেবে তোকে।’
‘কোথায় নিয়ে যাবে?’
‘অনন্তের পথে!’
এবার তার কানে বাজে ছলছল শব্দ। ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে হয়। দূরে তাকায়—লণ্ঠন জ্বালিয়ে দাঁড় বেয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে মাঝি। ঝাঁপ দেওয়ার আগেই মাঝি যদি তাকে অতিক্রম করে চলে যায়? তাহলে কে তাকে নিয়ে যাবে অনন্তের পথে? লাফিয়ে জলে নামে সে। ডুবে যাওয়ার আগ মুহূর্তে তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। প্রচণ্ড ঘর্ষণের শব্দ! জলের সঙ্গে জলের ঘর্ষণ তো এমন তীব্র নয়। কে যেন লাফিয়ে নামে নৌকা থেকে। আলোর বিপরীতে তাকে ছায়ার মতো দেখায়। সে কি অনন্তের মাঝি? কিছুই বুঝতে পারে না সে। মাঝি তার কাঁধ ঝাঁকায়। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সে। কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে ওঠে মাঝি, ‘এত কিছু থাকতে আমার টেরাকের সামনে মরতে আইলেন ক্যান!’
দাঁত খিঁচিয়ে আর কী যেন বলে। বোঝা যায় না। তখনই খেয়াল হয় মাঝরাস্তায় একা দাঁড়িয়ে আছে সে। আশ্চর্য! এ রকম হলো কেন? সত্যি কি কানের কাছে ফিসফিসিয়ে উঠেছিল কেউ? নাকি সব কিছুই ঘটেছে মনের ভেতর? দূরের লণ্ঠন ছিল ট্রাকের হেডলাইট। ট্রাক যদি ব্রেক না কষত, পিষে চলে যেত তাকে? কপালে ঘাম ফুটে ওঠে। কী ঘটছে এসব? আজ সকালেও এ রকম ভয়াবহ একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল। ছুরি দিয়ে প্রায় কেটে ফেলেছিল বাঁ হাতের কবজি! অথচ সে মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, সবকিছুই স্বাভাবিক। মাথার ভেতরটা এলোমেলো লাগে। দুহাতে চুল খামচে ধরে সে। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাস্তা টপকায় তারপর। সোহরাওয়ার্দীর ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকে। ভাপসা গরম। উদ্যানের ভেতর থেকে ঝিরিঝিরি হাওয়া আসে। শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে। এই কাঁপন তাকে বুঝিয়ে দেয় জ্বর আসছে। কপালে হাত রেখে উত্তাপ বোঝার চেষ্টা করে। কিছুই বোঝে না। পা ভারী লাগে। হাঁটতে ইচ্ছে করে না। পকেটে যা আছে তাতে রিকশা ভাড়া হবে বলে মনে হয় না। তবুও সে হাত ঢোকায় প্যান্টের পকেটে। টাকা-পয়সার অস্তিত্ব টের পাওয়ার আগে জিনিসটার অস্তিত্ব টের পায়—একটা মোটা খাম। খামের ভেতর ফোর আর সাইজের একটা ছবি। দিন দশেক আগে লাবনী লিখেছিল, ‘তুমি কিন্তু না করবে না। আমি জানি ছবিটা এখনো তোমার কাছে আছে। খামোখা স্মৃতি পুষে কী লাভ? ছবিটা আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। তুমি হয়তো বলবে, পাঠানোর দরকার নেই। ওটা ছিঁড়ে ফেলে দেব। না হলে আগুন দেব। প্লিজ, ওসব করতে যেয়ো না। খামে ভরে নিচের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়ো। আমি জানি তুমি খুব ভালো ছেলে। আমার কথা রেখো। যে ঠিকানাটা দিলাম সেটা আমার নয়, এক আত্মীয়ের। এই ঠিকানায় পরে আর কোনো চিঠিপত্র পাঠিয়ো না। ভালো থেকো।’
এটুকুই, আর কিছু লেখেনি লাবনী। চিঠি পেয়ে সে অবাক হয়েছিল! লাবনী তার ঠিকানা পেল কী করে? সে তো হল ছেড়েছে সেই কবে। দূর প্রবাসে থেকেও লাবনী তার মেসের খোঁজ পেল? মেয়েরা সব পারে! পারে বলেই তো লাবনী সেদিন তাকে ছেড়ে যেতে পেরেছিল। কী অবলীলায় তিন বছরের সম্পর্ক চুকিয়ে অতিথি পাখির ডানায় ভর করে উড়াল দিয়েছিল ভিন দেশে।
ছবিটার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সে। লাবনীর চিঠি পেয়ে অনেক ঘেঁটে পুরোনো একটা বইয়ের ভেতর থেকে বের করেছে এই ছবি।
সকাল থেকেই সেদিন আকাশ মেঘলা। বিকেলে ঝুম বৃষ্টি। টিএসসির সুইমিংপুলের বারান্দায় বাঁ হাতে তাকে জড়িয়ে ছিল লাবনী। আর বারান্দার প্রান্ত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ডান হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বৃষ্টির কাছে। হাতের তালুতে জমা হচ্ছে বৃষ্টির জল। লাবনী সেই জল ছুড়ে দেয় তার মুখে। সে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। বৃষ্টির খেলায় সিক্ত হওয়ার বাসনা জেগেছিল তারও। মুন্না তখন ছবিটা তুলেছিল। প্রিন্ট হাতে পেয়ে লাবনী বলেছিল, ‘ছি!’
‘ছি কেন?’
‘তোমাকে কেমন জড়িয়ে আছি। কেউ দেখলে কী ভাববে?’
‘ভাববে প্রিয় মানুষ কাছে থাকলে এমনই হয়।’
সে কি প্রিয় মানুষ ছিল লাবনীর, নাকি ভুল বৃষ্টির জলে দুজনেই মগ্ন ছিল দীর্ঘ প্রহর? এসব নিয়ে এখন আর ভাবতে ভালো লাগে না। সেদিনই খামে ভরে ঠিকানা লিখে বেরিয়েছিল মেস থেকে। সাত দিন হয়ে গেল। খামটি এখনো পকেটেই রয়ে গেছে। আমেরিকায় ডাকে খাম পাঠাতে প্রায় হাজার টাকা লাগবে। মাসের শেষ। হাজার টাকা এখন বিশাল ব্যাপার। এই সাত দিনেও ছবিটা পাঠানোর টাকা জোগাড় করতে পারেনি সে। লাবনী কি জানে হল ছাড়ার পর দুটো টিউশনির ওপর তার জীবন চলছে। মাসের প্রথম সপ্তাহে মেস ভাড়া আর মুদি দোকানের বাকি পরিশোধের পর অর্ধেক মাসও চলে না সেই টাকায়। বাকি দিনগুলো মানুষের কাছে হাত পাততে হয়।
মৎস্য ভবনের সামনে এসে বাসে চাপে সে। দৈনিক বাংলা মোড়ের কাছে নেমে যায়। ফকিরাপুল ট্যাংকের উল্টো দিকে গলির শেষ মাথায় মেস। পুরোনো ছয়তলা ভবন। দেয়ালে নোনা ধরেছে। খুপরির মতো ছোট ছোট ঘর। আলো-বাতাসের অভাব। পুরোটাই মেস। ছয়তলায় ভাড়া খানিকটা কম বলে সেখানেই ঠাঁই নিয়েছে।
কলাপসিবল গেট এখনো বন্ধ হয়নি। দুদিক থেকে চাপান। মাঝখানে অল্প ফাঁকা। সেই ফাঁকায় শরীর গলিয়ে দেয় সে। আর তখনই কানে আসে কান্নার করুণ শব্দ। ‘কে কাঁদে?’
সিঁড়ির মুখে বাল্বটা ফিউজ হয়ে আছে অনেক দিন। আবছা আলোয় রহমত আলীর দেখা পায় সে। বুড়ো মানুষ। চুল-দাড়ি সব সাদা। গেটের পাশে টুল নিয়ে বসে থাকে সারা দিন। দারোয়ানের চাকরি। রাতে সিঁড়ির নিচে মাদুর বিছিয়ে ঘুমায়। সেই মাদুরে হাঁটু ভাঁজ করে বসে আছে রহমত আলী। চোখ বোজা। হাঁটুর ওপর মাথা রেখে ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদছে। রহমত আলীর কাছে গিয়ে গলা নামিয়ে ডাকে সে, ‘কান্দেন ক্যান?’
কান্না থেমে যায়। হাঁটু থেকে মুখ তুলে তাকায় রহমত আলী। আঁধারে তার মুখ পরিষ্কার দেখা যায় না।
‘কান্দি না তো!’
‘আমি যে শুনলাম।’
‘চক্ষু বন্ধ কইরা পুঁথি পড়তাছিলাম। হেইডারেই মনে করছেন কান্দন।’
‘পুঁথি কই?’
‘পুঁথি নাই। জঙ্গনামার কয়েক পাতা মুখস্থ আছে। মন যহন খারাপ থাহে, চক্ষু বন্দ কইরা গুনগুন করি। মাইনষে মনে করে কান্দন।’
আবার চোখ বন্ধ করে রহমত আলী। হাঁটুর ওপর চিবুক রেখে গুনগুন করতে থাকে। ‘আসমানের ওপরে লহু ছিটকাইয়া লাগিল/ সিন্দুরিয়া মেঘ হইয়া আসমানে রহিল...’
রহমত আলীর গুনগুন কথা বোঝা যায় না, তা কেবলই কান্নার মতো শোনায়।
চারতলা পর্যন্ত উঠতেই শরীর ভেঙে পড়তে চায়। দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় সে। ঠোঁট ফাঁক হয়ে যায়। শব্দ করে শ্বাস নিতে থাকে ক্রমাগত। মাথার ভেতরটা দুলছে। আরও দুইতলা। এই দূরত্বটুকু তার কাছে মনে হয় অনন্তের পথ! হাঁচড়ে-পাঁচড়ে একসময় নিজের ঘরে পৌঁছায় সে। শরীর কাঁপছে। জ্বর বাড়ছে হু হু করে। দেয়াল হাতড়ে আলো জ্বালায়। গেল বছর সস্তায় একটা পুরোনো ফ্যান কিনেছিল। কদিন থেকে ঘুরছে না। রাতে ঘুমানোর সময় বিছানার চাদর ভিজে যায় ঘামে। টাকার অভাবে সারানো হচ্ছে না। বিকেলে নাশতা করা হয়নি, চা খেয়েছে শুধু। পাতিলে ভাত আছে। দুপুরে এক পট চাল সেদ্ধ করেছিল হিটারে। সঙ্গে তিনটা আলু। পাতিল আঁচড়ে নিলে খানিকটা ভাত পাওয়া যাবে। সেদ্ধ আলু রয়ে গেছে একটা। খেতে ইচ্ছে করছে না। শরীর অবশ হয়ে আসছে। জামা-কাপড় না পাল্টেই বিছানায় শুয়ে পড়ে সে। তখনই ছুরিটা নজরে আসে। সকালে বিছানার ওপর ফেলে রেখেছিল। ছুরিটাকে মুখের সামনে তুলে ধরে—চার ইঞ্চি ব্লেডের সস্তা দামের ছুরি। ফুটপাত থেকে কিনেছিল বছর দেড়েক আগে। অর্ধেকটা জং ধরা। মুখের কাছটায় ধার আছে এখনো। সেই ধারে চোখ যেতেই মনে পড়ে। ঘটনাটি আজ দুপুরেই তো ঘটেছিল!
বারোটার দিকে চাল আর আলু একসঙ্গে সেদ্ধ দিয়েছিল হিটারে। মাসের শেষ ভাগটায় কেবল সেদ্ধর ওপরই জীবন চলে। চাল যখন টগবগ করে ফুটছে, পেঁয়াজ কাটার জন্য ছুরি হাতে নেয় সে। তখনই কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলে, ‘পেঁয়াজ কেটে লাভ কী? কবজির রগ কেটে ফেল। শান্তি পাবি।’
কথাটা কানে বাজতেই একটা ঘোর তৈরি হয়। ছুরির দিকে ভালো করে তাকায় সে।
‘কী দেখছিস?’
‘ছুরিটায় তো ধার নাই।’
‘মানুষের রগ পেঁয়াজের চেয়ে মোলায়েম। কবজির উল্টোপাশে একটা পোঁচ দে। দেখবি মুহূর্তেই লাল রক্তের প্লাবন বইছে। সেই প্লাবন তোকে নিয়ে যাবে পরম শান্তির কাছে।’
বা হাতের কবজি উল্টে রগের ওপর ছুরিটা বসায় সে। আর সে সময় একটা ধাতব শব্দে ঘোর কেটে যায়। সে চমকে মুখ ফেরায়—পাতিল উপচে পড়ছে ফেনায়। ঢাকনাটা পড়ে গেছে মেঝেতে। পতনের এই শব্দ যদি তার চেতনায় আঘাত না করত? সে কি সত্যি ছুরি চালাত কবজিতে? কী ভয়ংকর! দুঃসহ এই জীবন! ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে গড়িয়ে যাচ্ছে কেবল। তবুও তো তার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা উঠে দাঁড়ানোর। তাহলে কে তাকে ভাসিয়ে নিতে চায়?
ছুরিটা বিছানা থেকে উঠে টেবিলে রেখে আসার শক্তি পায় না সে। ফেলে রাখে বালিশের পাশে। চোখ বুজে ঘুমুতে চায়। পারে না। মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা। জবাই করা মুরগির মতো কাঁপছে শরীর। জ্বর কত উঠেছে? এক শ দুই? তিন? গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। টেবিলে পানির জগ। উঠে যাওয়ার শক্তি নেই। ছোটবেলায় একবার প্রচণ্ড জ্বর হয়েছিল। মা সারা রাত জেগে জলপট্টি দিয়েছিল কপালে। আগুন-কপালে জলের স্পর্শের চেয়ে মার হাতের স্পর্শ ছিল অধিক প্রশান্তির। আহা! মার হাতে মসলা বাটা গন্ধ। সেই গন্ধকে মনে হয়েছিল জাফরানের সুবাস। এখন মায়ের মুখটা মনে করার চেষ্টা করে সে। পারে না। শুধু মনে পড়ে, খানিকটা নুয়ে বসেছিল মা। পরনে সাদা শাড়ি। সেই সাদা কি শিউলির মতো? চিকন খয়েরি পাড় ছিল কি শাড়িতে?
মৃত্যুর আগে প্রিয়জনের কথা খুব মনে পড়ে। আজ রাতে কি তার মৃত্যু হবে? যদি হয়? কেউ টেরও পাবে না। সকাল গড়িয়ে যাবে। লাশ পড়ে থাকবে বিছানায়। একসময় লাশ পচে গন্ধ ছড়াবে। পুলিশ এসে বদ্ধ ঘরের দরজা ভাঙবে। রহমত মিয়া জানে দেশগেরামে তার বাপ-মা কেউ জীবিত নেই। আত্মীয়স্বজনও নেই। তার পরও কারও ঠিকানা পেতে ঘরের ভেতর তল্লাশি চালাবে পুলিশ। কিছুই পাবে না। শুধু তার পকেট থেকে পাওয়া যাবে একটা খাম। খামের ভেতর বৃষ্টিভেজা ছবি। সেই কবে লাবনী বলেছিল, ‘এই ছবি যেন কেউ না দেখে। দেখলে আমি খুব লজ্জা পাব!’
কেউ দেখেনি আর। শুধু নিজে দেখেছে সে—বৃষ্টিভেজা একটা মেয়ে লাউয়ের ডগার মতো জড়িয়ে আছে তাকে। লাবনী চলে গেলে ছবিটা পুরোনো বইয়ের ভাঁজে ঘুমিয়ে ছিল কত বছর। সে ঘুমিয়ে গেলে এখন অনেক মানুষের চোখ পড়বে ছবিটায়!
দুই হাঁটু কুঁকড়ে কাত হয়ে সে শুয়েছিল বিছানায়। আস্তে আস্তে চিৎ হয়। পকেট হাতড়ে খামটা বের করে। ছবিটা মেলে ধরে চোখের সামনে। আলো নেভান হয়নি। তার পরও ঝাপসা দেখায়। চোখ জ্বালা করে। খুলে রাখতে কষ্ট হয়। হাত কাঁপছে। কাঁপা হাতেই ছবিটাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে সে। উড়িয়ে দেয় শূন্যে। ঝুরঝুর করে ছড়িয়ে পড়ে ছবি। মনে হয়, আসমান থেকে হাজারো নক্ষত্র খসে পড়ছে বিছানায়। অবাক বিস্ময়ে সে দেখে, মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে গেছে—আসমান দেখা যায়। সেই আসমানে লাল আভা—‘আসমানের ওপরে লহু ছিটকাইয়া লাগিল/ সিন্দুরিয়া মেঘ হইয়া আসমানে রহিল...’
কার লহু সেই আসমানে? বুক চিড়ে শ্বাস নিতে ইচ্ছে হয় তার। চোখ বোজার আগে বাতাসে জাফরানের নীল সুবাস টের পায় সে।

No comments

Powered by Blogger.