অর্থমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়াঃ দুর্নীতি উৎসাহিত হবে

সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক গ্রুপের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা হইচই করার মতো কিছু নয় এবং আত্মসাৎ হওয়া তিন-চার হাজার কোটি টাকা বড় কোনো অঙ্ক নয়_ অর্থমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
তারা অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে অগ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে বলেছেন, এমন বক্তব্যে দুর্নীতিবাজরা উৎসাহিত হবে। সরকারের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্বজ্ঞানহীন, অবিবেচনাপ্রসূত, অযৌক্তিক ও বিচারিক মূল্যহীন মন্তব্য করেছেন। এ ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী মূল সংকটকে এড়িয়ে দুর্নীতিবাজদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত মঙ্গলবার এক গোলটেবিল বৈঠকে হলমার্ক কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গে বলেন, ব্যাংকিং খাতে আমরা ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিই। এর মধ্যে মাত্র তিন বা চার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। এটা কোনো বড় অঙ্কের অর্থ নয়। এ নিয়ে হইচই করারও কিছু নেই। সংবাদমাধ্যম এটা নিয়ে অতিরিক্ত প্রচারণা করে দেশের ক্ষতি করছে। এমন ভাব, যেন দেশের ব্যাংকিং সেক্টর ধসে গেছে। অর্থমন্ত্রীর এমন মন্তব্যে যখন দেশের সব মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে; অর্থমন্ত্রী গতকালও একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন। গতকাল প্রধান বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা
হয়েছে।
হলমার্ক গ্রুপসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংকের রাজধানীর হোটেল রূপসী বাংলা শাখা থেকে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রায় চার হাজার কোটি আত্মসাৎ করেছে। এ ঘটনায় ব্যাংকিং খাতসহ সারাদেশে তোলপাড় চলছে। সোনালী ব্যাংকের কয়েক জন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দু'জন ডিএমডিকে ওএসডি করা হয়েছে। দুদক বিষয়টি তদন্ত করছে। ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এত বড় কেলেঙ্কারি দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে আগে কখনও ঘটেনি। জনগণের আমানতের এমন ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার আর্থিক খাতের জন্য খুবই উদ্বেগজনক। চার হাজার কোটি টাকা কোনোভাবেই ছোট অঙ্ক নয়। একটি ব্যাংকের জন্য এটি বিশাল অঙ্ক।
মহাজোটের শরিক ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে সমকালকে বলেন, 'ব্যাংকের টাকা জনগণের টাকা। অর্থমন্ত্রীর নয়। চার হাজার কোটি কেন; চার টাকা তছরুপ হলেও তার শাস্তি হতে হবে। বড় অঙ্ক নয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার মতে, অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে দুর্নীতিবাজ ও রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাৎকারীরা উৎসাহিত হবে। হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের বিচার দাবি করে ইনু বলেন, 'কেলেঙ্কারির নায়কদের কারাগারে দেখতে চাই। অর্থমন্ত্রী যা-ই বলুন, তাতে দুর্নীতিবাজদের রক্ষা হবে না।' দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও গতকাল এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে তার পদের সঙ্গে অসামঞ্জ্যপূর্ণ ও কাণ্ডজ্ঞানহীন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার। তিনি অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে সমকালকে বলেন, সরকারের কয়েক জন উপদেষ্টা ও মন্ত্রী হলমার্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত। তাদের বাঁচাতেই মন্ত্রী আবোল-তাবোল বক্তব্য দিচ্ছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বছরে ৪০ হাজার কোটি ঋণ দেয়। চার হাজার কোটি টাকা এর ১০ শতাংশ। এটিকে 'বড় অঙ্ক নয়' বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলেন, তার বক্তব্য লুটপাটকে উৎসাহিত করছে। হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে জড়িত সরকারি লোকদের বাঁচাতেই এই বক্তব্য। তিনিও অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমীন হাওলাদার বলেন, ব্যাংকের টাকা জনগণের আমানতের টাকা। এই টাকা নিয়ে কেলেঙ্কারি অনাকাঙ্ক্ষিত। চার হাজার কোটি টাকাকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
'হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা সঠিক নয়'_ অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সমালোচনা করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান। সাবেক এই অর্থ সচিব সমকালকে বলেন. 'গণমাধ্যম যে কাজ করেছে, তা শতভাগ সঠিক। ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতিকে সবার সামনে নিয়ে এসেছে।' চার হাজার কোটি টাকা বড় অঙ্ক নয়_ অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যেরও সমালোচনা করে তিনি বলেন, দায়িত্বহীন বক্তব্য দিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার (অর্থমন্ত্রী) দায়িত্ব ঋণ আদায় করা। কোনো কেলেঙ্কারি হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ৪ হাজার কোটি টাকা কোনোভাবেই কম টাকা নয়। একটি ব্যাংক থেকে একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের মাধ্যমে এই পরিমাণ টাকা নেওয়া বিরাট ব্যাপার। ব্যাংক বা পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি_ সবই এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থমন্ত্রী যেভাবে এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন, তাতে দুর্নীতিবাজরা উৎসাহ পাবে। নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে। মন্ত্রীর পক্ষ থেকে এ রকম বিবৃতি কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত হয়নি বলে তিনি মনে করেন।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অবিবেচনাপ্রসূত। এর কোনো যৌক্তিকতা বা বিচারিক মূল্য নেই। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একটি ব্যাংক একজন ঋণ গ্রহীতাকে যে পরিমাণ ঋণ দিতে পারে, এ ক্ষেত্রে তার চেয়ে ৩শ' গুণ বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে, যা এখন সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। এটা কোনো দেশের কোনো ব্যাংকিং আইনেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো বেসরকারি ব্যাংকে এ ঘটনা ঘটলে ব্যাংক ধসে যেত। অন্য দেশ হলে এ রকম পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রশাসক বসিয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদকে বিচারের আওতায় আনা হতো। কিন্তু এখানে যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা, তা নেওয়া হচ্ছে না।
হলমার্ক কেলেঙ্কারিকে 'চৌর্যবৃত্তি' বলে আখ্যা দিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, 'এই টাকা কোনো ঋণ নয়। জালিয়াতির মাধ্যমে এই টাকা নেওয়া হয়েছে। এই জালিয়াতিতে সরকারের লোকজনের সহায়তা রয়েছে।' কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের বাঁচানোর চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর তা আরও পরিষ্কার। চার হাজার কোটি টাকাকে বড় অঙ্ক বলেই মনে করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ৬শ' কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারিতে ওরিয়েন্টাল ব্যাংক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চার হাজার কোটি টাকা বিশাল অঙ্ক। বার্ষিক ঋণদানের ১০ শতাংশ। এ টাকা আদায় না হলে যে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. পিয়াস করিম বলেন, অর্থমন্ত্রী একেবারেই দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো কথা বলেছেন। ৪ হাজার কোটি টাকা একটি ব্যাংকের জন্য বিশাল অঙ্ক। অর্থমন্ত্রী এ রকম কথা বলে সংকটকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নিয়মবহির্ভূত ভাবে ব্যাংকিং খাত থেকে এত বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে ইতিপূর্বে ঘটেনি। এ থেকে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনার সংকটও প্রতিফলিত হয়েছে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমজাদ খান চৌধুরী বলেছেন, এ ঘটনায় অনেক ব্যবসায়ী ঋণ পাবে কি-না তা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। ওই সব উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীকে সান্ত্বনা দিতে হয়তো অর্থমন্ত্রী এমন কথা বলেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, অন্য ব্যবসায়ীদের ঋণ পেতে সমস্যা হবে না। তবে এটা সত্য_ ব্যাংকের যে তদারকি পদ্ধতি, তা এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্য যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা দ্রুত নিতে হবে, যাতে আগামীতে এ ধরনের কোনো ঘটনা আর না ঘটে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, শোনা যাচ্ছে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা তছরুপ হয়েছে। এত বিশাল অঙ্ক একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া কোনোভাবেই ব্যাংকিং নিয়মের মধ্যে পড়ে না। এটা অবশ্যই দুঃখজনক। এ ঘটনায় ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন ও বিস্মিত।

No comments

Powered by Blogger.