বিএনপি কি গুম-গুপ্তহত্যার দায়মুক্তি বন্ধ করবে? by মোহাম্মদ আরজু

‘গুম’ করাকে ‘নিখোঁজ’ বা ‘অপহরণ’ ইত্যাদির সঙ্গে তুলনা করা চলেনা। গুম ছাড়া বাকিগুলো গতানুগতিক ফৌজদারি অপরাধ। বিপরীতে ‘গুম’র অপরাধের ধরন ভিন্ন, মাত্রা অনেক চরম। কারণ, যেই রাষ্ট্রের সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে ফৌজদারি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা, যেই রাষ্ট্রের আদালতের দায়িত্ব হচ্ছে সেইসব অপরাধের ন্যায়বিচার করা-

সেই রাষ্ট্রের খোদ সরকারি বাহিনীগুলোই যখন তার নাগরিককে গায়ের ও অস্ত্রের জোরে ধরে নিয়ে সাময়িক বা চিরকালের জন্য হাওয়া করে দেয়; তারেই বলে ‘গুম’।

সম্প্রতি দেশে নতুন করে গুমে’র পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। জানা যাচ্ছে, আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর পরিচয়ে হাজির হয়েই গুম করা হচ্ছে। শিকার ব্যক্তিদের পরিবার-স্বজন বা প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে এমন বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে। যারা আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর পরিচয়ে হাজির হচ্ছে, তারা যদি মিথ্যা পরিচয় দিতো, তবে সরকার নিশ্চিতভাবেই আর সব কাজ ফেলে রেখে তাদের পাকড়াও করতে ছুটতো। কারণ, আইনের লোক না হয়েও এ পরিচয় দেয়া সারা দুনিয়ার মত বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ীও মারাত্মক অপরাধ। কারণ, এতে করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

তাছাড়া ‘অপহরণের’ ঘটনায় আইনি বাহিনীগুলোর তরফে কমবেশি কিছু জানা যায়। থানা মামলা নেয়। ‘তদন্ত হচ্ছে’ বলে জনায়। কিন্তু গুমে’র ঘটনায় থানা মামলা নিতে চাচ্ছে না। অথচ তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করছে। যদি তা-ই হবে, তবে তো তাদের ‘অপহরণ’ মামলা নেবার কথা। শুধু ‘অপহরণ’ না, বরং আইনের লোক বলে মিথ্যা পরিচয় দেবার অভিযোগে ‘অপহরণকারী’দের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ধরনের মামলা করে ব্যবস্থা নেয়ার কথা। কিন্তু কিছুই করছে না। সবমিলিয়ে এটা স্পষ্ট যে অপহরণ নয় এসব, সরকারি বাহিনীগুলোই গুম করছে।

স্বাধীনতার পরপরই এর এমন গায়ের জোরের শাসনের শুরু। ‘আইনের শাসনে’ অন্তত এমন গুম বা গুপ্তহত্যা চলে না। আইনের আদালতে প্রকাশ্যে বিচারের মাধ্যমেই অপরাধের প্রতিকার হয়। দণ্ডবিধান হয়। বিপরীতে এখানে গায়ের জোরে মানুষের জান কেড়ে নেয়া হচ্ছে। গুম হচ্ছে, গুপ্তহত্যা হচ্ছে। দেশের প্রথম সরকারটি থেকে শুরু করে সব আমলেই এসব হয়েছে।

গুম-গুপ্তহত্যার এভাবে অবিরাম চালু রয়েছে সরকারি নির্দেশ ছাড়া আরো এক উপায়ে; অর্থে ও ক্ষমতায় প্রভাবশালী ব্যক্তি নাগরিকও তার প্রভাব খাটিয়ে বা ঘুষ দিয়ে অন্য নাগরিককে সরকারি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত করতে পারে। তবে যে উপায়েই হোক, এই যে টানা চার দশক ধরে গুম-গুপ্তহত্যা চালু আছে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ও অনেক ক্ষেত্রে উৎসাহ হিসেবে কাজ করে ‘দায়মুক্তি’র সুযোগ।

দুই.
একেবারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে গুম-গুপ্তহত্যার টানা অভিযান চালিয়ে পরে বাহিনীগুলোকে আইনগত দায়মুক্তি দেয়ার নজির আছে অনেক। বঙ্গবন্ধুর প্রথম সরকারের সময় রক্ষীবাহিনীকে এভাবে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছিল। সম্প্রতি যেই বিরোধী দলটির একজন উদীয়মান নেতা গুম হয়েছেন, সেই বিএনপিও গত মেয়াদে অপারেশন ক্লিনহার্টের অসংখ্য নির্যাতন-গুম-গুপ্তহত্যা থেকে সরকারি বাহিনীগুলোকে দায়মুক্তি দিয়েছিল।

পাশাপাশি, বিদ্যমান নানা আইনেও নানাভাবে সরকারি বাহিনীগুলোর জন্য কার্যত দায়মুক্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে গুম করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনলে সেই অভিযোগকারীকেই অপরাধটি প্রমাণ করতে হবে। যা প্রমাণ করা ব্যক্তি নাগরিকের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, সরকারি বাহিনী-ই মামলার তদন্ত করবে। সরকারি বাহিনীর জনবল-যান-স্থাপনা ব্যবহার করেই যে অপরাধ হয়, সেই অপরাধটি আইনের বিধিবিধান মাফিক আদালতে প্রমাণ করা নাগরিকের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে অপরাধের দায় থেকে কার্যত মুক্ত থাকে সরকারি বাহিনীগুলো। আইন সংস্কার বা দরকারে নতুন আইন করে এ দায়মুক্তি বন্ধ করতে হবে।

আইনের বিধান হতে হবে এমন, সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো নাগরিক নির্যাতন-গুম-গুপ্তহত্যার অভিযোগ আনলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকেই প্রমাণ করতে হবে যে তারা অপরাধটি করে নি। গতানুগতিক ফৌজদারি অপরাধের মামলায় যা হয়- অভিযোগকারীকেই এমনভাবে অভিযোগ প্রমাণ করতে হয় যে অভিযুক্ত ব্যক্তিটিই যে অপরাধ করেছে তাতে আদালতের সামনে আর কোনো সন্দেহ থাকে না; এর ঠিক উল্টোটা হবে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতন-গুম-গুপ্তহত্যার মামলায়। অভিযুক্ত সরকারি বাহিনীকেই প্রমাণ করতে হবে যে তারা নির্দোষ। নিজেকে দায়মুক্ত প্রমাণ করার আগ পর্যন্ত দায়মুক্তি পাবার সুযোগ নেই।

এমন আইনের অনুপস্থিতিতে প্রশাসন ও বিচার বিভাগের ভূমিকা ও মনোভঙ্গীর মধ্যে দায়মুক্তি দেয়ার চর্চা এতটাই জোরালো যে, নানা নির্বাহী ও বিচারিক আমলাতান্ত্রিক বাধা তৈরি করেও দায়মুক্তি নিশ্চিত করা হয়। খোদ সুপ্রিম কোর্টেও এমন নজির আছে যেকোনো বেঞ্চ এমন বিষয়ে প্রতিকারে উদ্যোগী হলে প্রধান বিচারপতি স্বয়ং তাতে বাধা দেন, বেঞ্চের এখতিয়ার পরিবর্তন করে দেয়া হয়, বেঞ্চ ভেঙে দেয়া হয়।

বর্তমান বিরোধীদল বিএনপি নিজেদের একজন নেতার গুম হয়ে যাবার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে হরতাল করছেন একের পর এক। এ হরতাল গুম ও গুপ্তহত্যার বিরুদ্ধে নয়। তাদের অতীতের ক্ষমতাকালেও গুম-গুপ্তহত্যা চলেছে, সঙ্গে চলেছে দায়মুক্তি। এখন কি তারা অবস্থান পাল্টেছেন? যদি তা-ই হয়, তবে তারা কি নাগরিকদের সামনে সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত রুপরেখা হাজির করবেন যে, ক্ষমতা পেলে কিভাবে ‘দায়মুক্তি’র ব্যবস্থা বন্ধ করবেন?

মোহাম্মদ আরজু: সাংবাদিক ও আইনি বিষয়াদির লেখক।
                        mohammadarju@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.