কর্পোরেট দুনিয়া ছেড়ে বাংলাদেশী কৃষকের পাশে একজন আইরিশ

মাইক পালমারের জন্ম আয়ারল্যান্ডের কো কর্ক কাউন্টির ইনিশানন গ্রামে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন খাতে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে এই ব্যবসা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞের। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি এখন বাংলাদেশের দরিদ্র কৃষকদের সাহায্য করছেন। তার এই কাহিনী প্রকাশিত হয়েছে আইরিশ ইন্ডেপেন্ডেন্ট পত্রিকায়।
পালমার বলেন, ‘আমি যখন আরও তরুণ ছিলাম, তখন কর্পোরেট দুনিয়ার এই একঘেঁয়ে রুটিন থেকে বের হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। কোথাও খানিকটা জমি কিনে সেখানে স্থায়ী হয়ে একটা ভালো জীবন যাপনের স্বপ্ন দেখতাম।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আকাক্সক্ষাও আজ মিলিয়ে গেছে হয়তো।’
তিনি বলেন, আমি বহুদিন ধরে প্রযুক্তি জগতে কাজ করছিলাম। এর মাঝেই ব্যবসা ব্যবস্থাপনার ওপর মাস্টার্স করে ফেলি। তখনই ভবিষ্যতে কোন এক সময় উন্নয়ন নিয়ে কাজ করার চিন্তা করি। এমবিএ পড়তে পড়তে আমি বুঝলাম, আমার অর্ধেক পড়াশোনার সঙ্গেই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা শিক্ষার মিল রয়েছে। তাই আমি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
পালমার যে কোম্পানিতে কাজ করতেন, সেটি একসময় ভিন্ন ধরণের কাজ শুরু করলো। ফলে পালমার নিজের ক্যারিয়ারে পরিবর্তন আনার সুযোগ পেলেন। তিনি বলেন, ‘মূলধারার কাজ করা শেষ করে আমি উন্নয়ন খাতে কাজ করার সুযোগ খুঁজছিলাম। খুব দ্রুতই আবিষ্কার করলাম আমার কর্পোরেট অভিজ্ঞতা একেবারেই ফেলনা নয়। তবে আমি যেমনটা ভেবেছিলাম, ততটা চমৎকারও নয়।’
মাঠে কাজ করা একটা কর্পোরেট অফিসে কাজ করার চেয়ে অনেক কঠিন। এটা বোঝার পর মাইক মাঠ পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ডাবলিন ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন ভলান্টারি সার্ভিস ওভারসিস (ভিএসও)-এর আয়ারল্যান্ড শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কোন সুযোগ থাকলে তাকে জানাতে বলেন। পালমার জানান, শেষ পর্যন্ত সুযোগ আসে। ভিএসও ২৪টি দেশে দারিদ্রতা মোচনের জন্য কাজ করে। বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। তার ভাষ্য, ‘আমি কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি বাংলাদেশে কাজ করবো। কিন্তু যখন সুযোগ এল, আমি হ্যাঁ বলে দিলাম।’
২০১৬ সালের দিকে তিনি ভিএসও’র ‘গ্রোয়িং টুগেদার’ নামের একটি প্রকল্পে কাজ করছিলেন। ওই প্রোগ্রামে তাদের সহযোগী ছিল একটি সুইশ ক্রিষি-রাসায়নিক ও বীজ বিষয়ক কোম্পানী সিনজেন্টা। তাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের ১০ হাজার ক্ষুদ্র জোতদার কৃষকের জীবনমানে উন্নতি ঘটানো। পালমার বলেন, ‘আমি যখন প্রথম আসি, তখন ওই প্রকল্পটি সুন্দরবন অঞ্চলে কাজ করছিল।’ তিনি জানান, বঙ্গোপসাগরের কাছে অবস্থিত এই অঞ্চলটিতে হিমালয় থেকে নেমে আসা পানি মিশে মাটিকে লবণাক্ত করে ফেলেছে। ফলে এই মাটিতে আর ধান চাষ করা সম্ভব নয়।’ ফলে কৃষকরা তাদের ধান ক্ষেতগুলোকে মাছ চাষের পুকুরে পরিণত করেছে।
পালমার বলেন, ‘এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষিকাজে জড়িত নারীদের জন্য ব্যবসা মডেল দাঁড় করানো। যাতে করে তারা আয় করতে পারেন। শুধু আয় বৃদ্ধিই নয়, এতে করে নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়। তাদের অবস্থান দৃঢ় হয় । তাদের ভেতর আত্মবিশ্বাস জন্মায়।’ এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের আওতায়, বেশ কয়েকজন কৃষকের সবজি উৎপাদন ৮০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ বছর গ্রোয়িং টুগেদার রংপুরের ১০ হাজার কৃষি পরিবারকে নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে আলু চাষীরা তাদের উৎপাদন গড়ে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। দাম বেড়েছে আরও বেশি। কৃষকরা পাচ্ছেন উন্নত প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃষকদের ৯০ শতাংশ বলছেন, তাদের আয় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কৃষক কুটির বা কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে কৃষকরা বেসরকারি কোম্পানীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।  মাইক স্বীকার করেন, এক্ষেত্রে তার দক্ষতা মূলত এসেছে ব্যবসা খাতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে, কৃষি খাত থেকে নয়।
তিনি বলেন, ‘এই মানুষগুলো কি করছে তা আমি দেখি। কীভাবে একে ব্যবসায়িক রূপ দেওয়া যায় সেই চিন্তা করি। যাতে করে আমরা একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে চরম দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষদের জন্য আর্থিক সহায়তা পেতে পারি। এর মাধ্যমে তাদের কৃষিকাজের পরিধি বৃদ্ধি পায়। আর তারা দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে পারে।’ পালমারের ভাষ্য, বাংলাদেশে বহু ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্টান ও ক্ষুদ্র ঋণ নেয়ার ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী কৃষকদের ধরাছোাঁয়ার বাইরে। তিনি বলেন, ‘আমরা যেটা করতে পারছি, সেটা হলো, এই কৃষক ও ব্যাংকের মধ্যে একটা যোগাযোগ তৈরি করে দিই। তাদের কৃষিকাজকে একটি সফল ব্যবসায়িক প্রকল্প হিসেবে ব্যাংকের কাছে তুলে ধরি। এই কৃষিকখাতকে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিখাত হিসেবে তুলে ধরি।’
পালমার বর্তমানে ঢাকায় কাজ করছেন। তিনি ভিএসও’র পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা উত্তরাঞ্চল-ভিত্তিক ৬টি ফার্ম সেন্টারের সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি এসব ফার্ম সেন্টারকে কৃষকের খামার থেকে পণ্য সংগ্রহ করে ঢাকায় বা আঞ্চলিক বড় ব্যবসায়ীদের কাছে বাজারজাত করতে উৎসাহিত করছেন। তার ভাষ্য, ‘এক একরের দশভাগের একভাগ জমিতে কৃষিকাজ করে দারিদ্র্যপীড়িত উত্তরাঞ্চলের কৃষকেরা তাদের পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছেন। আর তারা এখন দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাচ্ছে। তারা চেষ্টা করছে সমিতির মতো একতাবদ্ধ উপায়ে তাদের পণ্য বিক্রি করার। ফলে দেখে মনে হবে বড় একটি খামারের পণ্য এসব। এ কারণে বড় বড় ব্যবসায়ীরা এখন এই কৃষকদের কথা মাথায় রাখছেন। তারা এখন কৃষকদের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, কারণ উচ্চমানের এসব পণ্য উৎপাদন করা হয়েছে টেকসই উপায়ে ও সঠিক সুরক্ষা পদ্ধতি ব্যবহার করে। সবাই বুঝতে পারছেন আমরা এখন কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়ের জন্য ন্যায্য মূল্যে ভালো পণ্য সরবরাহ করতে সক্ষম।’
চ্যালেঞ্জ
পালমারের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কৃষকদেরকে পণ্য ধীরে ধীরে বাজারে ছাড়ার ব্যাপারে রাজি করানো। বাংলাদেশে একটা প্রবনতা আছে যে, কৃষকরা তাদের পণ্য ধরে রাখেন। যখন অর্থের দরকার হয় তখন বিক্রি করেন। এছাড়া তারা মূল্য হারানোর ব্যাপারেও ভীত। পালমার বলেন, আমরা মেনে নিচ্ছি যে, এটা একটা বড় ভয়ের কারণ। কিন্তু আমরা ফার্ম সেন্টার ব্যবস্থাপকদের উদ্যোক্তাতে রূপান্তরিত করেছি। ফলে প্রতিদিন সকালে তারা প্রথমেই তাদের বাণিজ্যিক আংশীদারদের ফোন করছে। আমরা তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, আরেকটু ঝুঁকি নিলেই কিন্তু কৃষকের পণ্য বাজারে হাজির হবে। আমরা তাদেরকে পরিকল্পনা, প্রকল্প ও অনুমান করার ব্যাপারে শেখাচ্ছি। কিন্তু সমস্যা হলো, আপনি যদি দরিদ্র হন, তাহলে আপনি আজকের কথা আগে চিন্তা করবেন। কালকের কথা পরে। দুই সপ্তাহ বা দুই মাস বা দুই বছরের কথা চিন্তা করার অবস্থায় আপনি নেই।
তিনি আরও বলেন, আমরা এখন আশা করছি যে, আগামী ৫ বছরে ১ লাখ কৃষক এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হবে। আমরা এখন একটি ছোটখাঁটো প্রকল্প থেকে একটি নিবন্ধিত সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছি। পালমারের প্রত্যাশা, তার সঙ্গে থাকা প্রতিটি ফার্ম সেন্টারকে তিনি একটি লাভজনক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের শুধু লাভের আকাঙ্খাই থাকবে না। পাশাপাশি থাকবে সামাজিক দায়বদ্ধতা। ফলে ফার্ম সেন্টারের সঙ্গে থাকবে কমিউনিটি সেন্টার যেখানে থাকবে স্বাস্থ্য ক্লিনিক। থাকবে ইয়ুথ ক্লাব। এগুলোর ব্যবস্থাপনায় থাকবেন স্থানীয় জনগণ।

No comments

Powered by Blogger.