‘ধার করা’ প্রার্থী দিয়ে সিটি নির্বাচন! by সোহরাব হাসান

মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর তিন সিটিতে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত হলো। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীকও বরাদ্দ করে দিয়েছে। এই নির্বাচনী যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততা নিয়ে আমরা কোনো প্রশ্ন করতে চাই না। সেটি ভোটাররা বিচার-বিশ্লেষণ করে ২৮ এপ্রিল রায় দেবেন। তবে অধিকাংশ মেয়র পদপ্রার্থী নিজ নিজ দলে নবাগত, কেউ বা ‘ধার করা’। দলে যোগ্য প্রার্থী না থাকলেই ধার করতে হয়। ছোটখাটো দলে প্রার্থী সমস্যাটি না হয় মানা যায়। কিন্তু ৬৫ বছরের পুরোনো আওয়ামী লীগ এবং ৩৭ বছর বয়সী বিএনপিকে যদি ধার করা প্রার্থী দিয়ে নির্বাচন করতে হয়, সেটি তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই পরিচয়। দুই দলেই ডজন ডজন নেতা আছেন। কিন্তু নির্বাচন এলেই তাঁরা গুটিয়ে যান। কিংবা নির্বাচনে যাঁরা অতি উৎসাহ দেখান, তাঁদের ওপর শীর্ষ নেতৃত্ব আস্থা রাখতে পারেন না।
স্থানীয় সরকার সংস্থার (আমাদের সংবিধান কেন্দ্রিকতার দোহাই দিয়ে স্থানীয় সরকার কথাটি লিখতে সাহস পায়নি, লিখেছে স্থানীয় শাসন) নির্বাচন রাজনৈতিক পরিচয়ে হওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক আছে। একটি পক্ষ মনে করে, রাজনৈতিক পরিচয়েই হওয়া উচিত। নাচতে নেমে ঘোমটা দেওয়া কেন? আরেক পক্ষ মনে করে, এই নির্বাচনটি অরাজনৈতিক পরিচয়ে হলে দলের বাইরের ‘ভালো মানুষেরাও’ জয়ী হতে পারেন। কিন্তু সত্য যে নির্বাচনী রাজনীতিতে দলের বাইরের ‘ভালো মানুষেরাও’ শেষ পর্যন্ত বাইরে থাকতে পারেন না। সবাইকে দলীয় বৃত্তে নাম লেখাতে হয়। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বাইরের ভালো মানুষকে দলে টানতে যতটা আগ্রহী, দলের ভেতরে ভালো মানুষ তৈরি করতে ততটাই নিষ্ক্রিয়।
এই আলোচনায় যাওয়ার আগে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মনোভাবটা জেনে নিই। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন রাজনৈতিক পরিচয়ে হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন। এর আগে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও অনুরূপ মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদও মনে করেন, এই নির্বাচনও রাজনৈতিক পরিচয়ে হওয়া উচিত। বিরোধী দল বিএনপি এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেনি। ২০১৩ সালে পাঁচ সিটি করপোরেশন এবং ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন তারা দলীয় ও জোটগতভাবেই করেছে। দেশব্যাপী ৯২ দিন নিষ্ফল অবরোধ পালন করার পর এবারও তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এখন কথা হলো যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে করার ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে, নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, সেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব দলের ভেতরে যোগ্য প্রার্থী তৈরি করার চেষ্টা করছেন না। মোহাম্মদ হানিফের মৃত্যুর পর ঢাকা সিটিতে মেয়র পদে প্রার্থী দেওয়ার মতো নেতা তৈরি করতে পারেনি। এমনকি ২০১২ সালে যখন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছিল, তখনো দলটি প্রার্থী-সংকটে ছিল। শীর্ষ নেতৃত্ব দক্ষিণে সাবের হোসেন চৌধুরীর কথা ভাবলেও তিনি সংসদ সদস্য পদে ইস্তফা দিয়ে বিভক্ত ঢাকার একাংশের মেয়র হতে রাজি হননি। উত্তরে যাঁদের নাম শোনা গিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে বর্তমান মেয়র পদপ্রার্থী আনিসুল হক ছিলেন না। আওয়ামী লীগের যেসব নেতার নাম ছিল, তাঁদের প্রতি শীর্ষ নেতৃত্ব ভরসা রাখতে পারেনি বলেই প্রার্থী ধার করতে হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের অভিপ্রায় অনুযায়ী স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনটি যদি রাজনৈতিকভাবে হতো, তাহলে দলের সদস্য না হয়ে কেউ দলীয় প্রার্থী হতে পারতেন না। ২০০৮ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী কোনো দলের পক্ষে কেউ প্রার্থী হলে তাঁকে ওই দলে কমপক্ষে তিন বছর আগে যোগ দিতে হতো।
আওয়ামী লীগ দক্ষিণে যাঁকে সমর্থন দিয়েছে, সেই সাঈদ খোকন দলে নবাগত না হলেও তাঁর এক-এগারো পরবর্তী ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সেনা-সমর্থিত সরকারের আমলে তিনি কিংস পার্টি নামে পরিচিত ফেরদৌস আহমদ কোরেশীর প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক পার্টিতে (পিডিপি) যোগ দিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। মন্ত্রিসভার অন্তত তিনজন সদস্য সাঈদ খোকনের বদলে হাজি সেলিমকে প্রার্থী করার পক্ষপাতী ছিলেন বলে পত্রিকায় খবর এসেছে। সে ক্ষেত্রে একসঙ্গে দুপুরের আহার ও জুমার নামাজ সেই তাঁর মনোবেদনা কাটাতে পারবে কি না, সে বিষয়ে সংশয়মুক্ত হওয়া যাচ্ছে না।
ওদিকে বিএনপির অবস্থা আওয়ামী লীগের চেয়ে কিঞ্চিৎ ভালো বলার উপায় নেই। বিএনপির সিটি কমিটিতে খোকা-আব্বাসের বিরোধ পুরোনো। সেই বিরোধ কতটা তীব্র নগরবাসীর সঙ্গে বিএনপির নেতৃত্বও টের পেয়েছে মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর। এখনো মানুষ বিএনপির নগর কমিটি বলতে সাদেক হোসেন খোকাকেই বোঝে। অসুস্থতার কারণে তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। রাজনৈতিক মহলে যে কথাটি চাউর আছে তা হলো, খোকার ইঙ্গিত ছাড়া মির্জা আব্বাসের জয়ী হওয়া যেমন কঠিন, তেমনি হাজি সেলিমের সমর্থন ছাড়া সাঈদ খোকনের জিতে আসাও অসম্ভব। মোহাম্মদ হানিফের পর আওয়ামী লীগ যেমন ঢাকা মহানগরে কোনো নেতা তৈরি করেনি, বিএনপিও সাদেক হোসেন খোকার বিকল্প ভাবেনি। এ কারণে দুই সিটিতেই নির্বাচনের আগে তাদের প্রার্থী ‘ধার’ করতে হয়।
ঢাকা উত্তরে আওয়ামী লীগের বিপরীতে বিএনপি যাঁকে সমর্থন দিয়েছে, সেই তাবিথ আউয়ালও একজন ধারের প্রার্থী। তিনি কখনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাঁর বাবা আবদুল আউয়াল মিন্টু বর্তমানে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হলেও ব্যবসায়ী নেতা হিসেবেই পরিচিত। তিনিও আনিসুল হকের মতো এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ছিলেন। মিন্টু এখন যেমন বিএনপির নেত্রীকে উপদেশ দেন, শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে তখন তাঁকেও উপদেশ দিতেন। আওয়ামী লীগ থেকে তাঁর বিএনপিতে হিজরতের কারণও মেয়র পদ। আওয়ামী লীগ জানিয়ে দিয়েছিল, মোহাম্মদ হানিফ থাকতে আর কাউকে মেয়র পদে সমর্থন দেওয়া হবে না। মিন্টু বর্তমান সরকারের আমলে জেলও খেটেছেন। কিন্তু এক ছেলের হাতে বাবার এবং আরেক ছেলে তাঁর নিজের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া নিয়ে বিএনপি মহলে নানা গুঞ্জন রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ‘সামান্য ভুলে’ আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায় এবং ছেলে তাবিথ আউয়ালই দলের সমর্থন পান। বিকল্পধারার মাহী বি. চৌধুরীও সমর্থনের প্রতিযোগিতায় ছিলেন। কিন্তু ২০০২ সালে বাবা বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর যে ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল, সেটি নবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
চট্টগ্রামের দৃশ্যপট ভিন্ন। সেখানে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম বিএনপির নেতা ছিলেন না। তিনি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুগত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে মনজুর আলমই মেয়রের দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু এক-এগারোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। মহিউদ্দিন গ্রেপ্তার হলে মনজুরকে ভারপ্রাপ্ত মেয়র করা হয়। ২০১০ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। সে ক্ষেত্রে তিনি এবারের না হলেও আগেরবারের ধারের প্রার্থী। বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা চেয়েছিলেন আবদুল্লাহ আল নোমান কিংবা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মেয়র পদে দাঁড়ান। কিন্তু তাঁরা কেউ রাজি হননি। মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেনকে ঠেকাতেই মনজুর আলমকে বেছে নেওয়া হয়। যদিও গত পাঁচ বছরে তাঁর সাফল্যের পরিমাণ প্রায় শূন্য। আওয়ামী লীগের সমর্থক প্রার্থী আ জ ম নাছির বহুদিন দলীয় নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত ছিলেন। বছর দুই আগে মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক হলেও সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছিল। তাঁদের দুজনের নামে ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপ আছে, যাঁরা অন্তর্দলীয় কোন্দলে প্রতিপক্ষের কর্মীকে খুন করতেও দ্বিধা করে না।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাসিন্দা এমন একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জানিয়েছেন, এবার মহিউদ্দিনকে আওয়ামী লীগ সমর্থন দিলে তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি ভোটও পেতেন না। চট্টগ্রাম বিদ্রোহের অন্যতম নায়ক বিনোদবিহারী চৌধুরীর সঙ্গেও তিনি বিরোধে জড়িয়েছিলেন। তবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মতে, চট্টগ্রামে এখনো মহিউদ্দিনের বিকল্প নেই। মেয়র পদে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। দুই ‘প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে’ বাদ দিয়ে দলীয় নেতৃত্ব অপেক্ষাকৃত তরুণ আ জ ম নাছিরকে বেছে নেয়।
দুই প্রধান দলের জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যাঁরা এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন, ব্যতিক্রম ছাড়া তাঁরা প্রায় সবাই ষাট ও সত্তর দশকের। কিন্তু এরপর আর নতুন নেতা তৈরি হয়নি। কোনো দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রচর্চা নেই। আড়াই দশক ধরে দুই দল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচন বন্ধ রেখেছে। অথচ আজকের জাতীয় পর্যায়ের নেতা–নেত্রীদের বেশির ভাগই এসেছেন ছাত্রসংসদ নির্বাচন করে। দুর্ভাগ্য, যে সুযোগটি তাঁরা পেয়েছেন, নতুন প্রজন্মের জন্য সেই সুযোগটি করে দিতে চান না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক দল—কোথাও গণতন্ত্রচর্চা না থাকলে নেতা তৈরি হবেন কীভাবে? সে কারণেই যত বড় দলই হোক না কেন নির্বাচন এলেই প্রার্থী ‘ধার’ করতে হয়।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.