শিক্ষার্থীদের দরকার নতুন ভুবনের খোঁজ by মো. শফিকুল ইসলাম

কেউ স্বীকার করুক আর নাই-বা করুক দেশে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশলবিষয়ক পড়াশোনা, গবেষণা, জ্ঞানচর্চা, অধ্যাপনা ইত্যাদি আজ বিবেচিত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত বিষয় হিসেবে। বাণিজ্য ও কলাবিষয়ক পড়াশোনা, গবেষণা, জ্ঞানচর্চা, অধ্যাপনা ইত্যাদি আপাতদৃষ্টিতে দেশের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে বলে মনে করলেও এর জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাশুল দিতে হবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে, ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল শিক্ষার বিকল্প আছে কি না আমার জানা নেই।

২০০৫ সালের ৬ অক্টোম্বর ‘বিজ্ঞান সংস্কৃতি পরিষদ’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মেকাট্রনিকস-বিষয়ক একটি সেমিনারের আয়োজন করে। উপলক্ষ ছিল, চীনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক রোবট প্রতিযোগিতায় বুয়েটের টিম মেম্বারদের প্রথম স্থানে পুরস্কারপ্রাপ্তির অভিজ্ঞতার কথা শোনা ও তাঁদের অভিনন্দন জানানো৷ ওই সেমিনারে মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং ও রোবটিকস শিক্ষা সম্পর্কে বিজ্ঞানশিক্ষার্থীদের দেশে-বিদেশে চাকরি ও উচ্চশিক্ষার অত্যন্ত আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগের বিষয়টি আমি তুলে ধরেছিলাম৷ সেমিনারে উপস্থিত রোবট প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী দলনেতা বুয়েটের অধ্যাপক মো. জহুরুল হক, বিজ্ঞান সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, অধ্যাপক অজয় রায়, অধ্যাপক মনসুর মুসা, অধ্যাপক মাহবুবুল হক প্রমুখ সবাই কায়মনোবাক্যে মেকাট্রনিকস বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় রূপদানের জন্য জোরালো মতামত ব্যক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের জন্য একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ) কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি চার বছরমেয়াদি স্নাতক কোর্সটি প্রথমবারের মতো দেশে চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম৷ এ পর্যন্ত মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স থেকে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে ডিগ্রি সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই আকর্ষণীয় বেতনে চাকরি পেয়েছে এবং অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে তারা চাকরি করছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এত চাহিদা ও কদর থাকা সত্ত্বেও দেশে মেকাট্রনিকস শিক্ষা জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না কেন? এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে বিজ্ঞানশিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে বাস্তবভিত্তিক প্রযুক্তি ও প্রকৌশল শিক্ষা সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাব, টেকসই উন্নয়নে প্রকৌশলশিক্ষা চলমান শিল্পকৌশলের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ইত্যাদি। শুধু একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগের মাধ্যমে মেকাট্রনিকসে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে সবার আস্থায় আনা দুরূহ ব্যাপার বৈকি। আসলে নতুন বিষয়ে একটি কোর্স চালু করলেই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিক্ষার্থীরা পাঠ শেষে কোথায় চাকরি পাবে এবং চাকরিদাতার এ বিষয় সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা আছে কি না, তা প্রচার-প্রচারণা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, পত্রিকায় নিবন্ধ ইত্যাদির মাধ্যমে তুলে ধরা দরকার হয়। শুধু তা-ই নয়, এসব শিক্ষার্থী দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি প্রকৌশল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানায় যন্ত্র, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস কৌশলের মতো মেকাট্রনিকস কৌশল ডিগ্রিধারীদের বেলায় চাকরির বিজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

এসব কার্যক্রম একক উদ্যোগকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একা করা সহজ কাজ নয়। কেননা, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় নতুন একটি বিষয়ে জনবল নিয়োগ দিতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্মকমিশন হয়ে অনুমোদিত হলে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে শেষ করতে হয়, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে আশার কথা, রাজশাহী প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) চার বছরমেয়াদি মেকাট্রনিকস কোর্সটি ৩০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এ বছর এপ্রিলে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে। মেকাট্রনিকস শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সরকারি উদ্যোগ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় এটাই প্রথম। পলিটেকনিক পর্যায়ে সরকারি উদ্যোগে তা চালু হয়েছে রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে।

মেকাট্রনিকস হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির সূতিকাগার। বিশ্ব দ্রুত এগিয়ে চলছে। সেই সঙ্গে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হচ্ছে প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিবিদ্যার। বর্তমান যুগে প্রাত্যহিক জীবনের সব প্রকৌশলপণ্য তৈরিতে যে প্রযুক্তি বহুল ব্যবহৃত হয়, তা হলো মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং৷সঠিক মেকাট্রনিকস শিক্ষায় দীক্ষিত হতে পারলে বিজ্ঞানশিক্ষার্থীরা খুঁজে পাবে অপার সম্ভাবনাময় আরেকটি প্রায়োগিক ক্ষেত্র। এ প্রায়োগিক ক্ষেত্রই সব প্রকৌশলপণ্যের উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিকীকরণের জন্য দায়ী। মেকাট্রনিকস বিষয়ে দক্ষতা অর্জনকারীদের প্রয়োজন দেশে-বিদেশে কখনো ফুরিয়ে যাবে না।

মেকাট্রনিকসে যন্ত্র, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস এবং কম্পিউটার কৌশলের সংবর্ধক সম্মিলন ঘটেছে। মেকাট্রনিকস প্রকৌশলীরাই কেবল পারবেন দ্রুততম সময়ে একই সঙ্গে যন্ত্র, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস ও কম্পিউটার কৌশল সম্পর্কে পারদর্শিতা অর্জন করতে এবং প্রায়োগিক ক্ষেত্রের সমস্যা স্বল্প সময়ে ও সঠিকভাবে সমাধান করতে৷ গত ফেব্রুয়ারিতে চীনে এক সেমিনারে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের সঙ্গে আলাপকালে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান যুগে সবচেয়ে জনপ্রিয় কোর্স কোনটি? জবাবে জানালেন, মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তি হচ্ছে মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং। এখনই সময় আমাদের দেশে মেকাট্রনিকস শিক্ষাকে কম্পিউটার শিক্ষার মতো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় রূপ দেওয়া।

ড. মো. শফিকুল ইসলাম: যন্ত্র ও পরমাণু প্রকৌশলী, নিউক্লিয়ার সেফটি, সিকিউরিটি ও সেফগার্ডস বিভাগ, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন।

shafiq12@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.